বাংলাদেশে হাদিস চর্চা

মুহাম্মাদ রাশিদুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সংগৃহীত

সম্রাট গিয়াস উদ্দিন বলবন ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তার শাসনকাল ১২৬৬ থেকে ১২৮৭ ঈসাব্দ পর্যন্ত। তিনি নিজ শাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান এবং রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তার আমলে শরিয়তভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ দুর্নীতি দমন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। দীর্ঘ ২২ বছর তার রাজত্ব স্থায়িত্ব লাভ করে।

সম্রাট গিয়াস উদ্দিন বলবনের শাসনামলে হজরত শাহ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা হিজরি ৬৬৮ সাল মোতাবেক ১২৭০ ঈসাব্দে ঢাকা থেকে ১৬ মাইল দূরে অবস্থিত তৎকালীন রাজধানী সোনারগাঁ আসেন। প্রখ্যাত এই আলেম সেখানে গড়ে তোলেন একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে তিনি বোখারি ও মুসলিম শরিফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হাদিসের কিতাবের পাঠ দিতে শুরু করেন। সম্ভবত এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ইতিহাসে বোখারি ও মুসলিম শরীফের পাঠদান সূচিত হয়।

এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, দূর-দূরান্ত থেকে হাদিসের জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থীরা এই হাদিসের ক্লাসে অংশ নিতে শুরু করে। তার শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য সমবেত হয় সুদূর দিল্লি এবং সেরহিন্দ থেকে আসা ছাত্ররাও। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ববাংলার রাজধানী হিসেবে সোনারগাঁয়ে বহু হাদিস বিশারদ সমবেত হতে থাকেন।

তদানিন্তনকালে এ অঞ্চলে হাদিসচর্চার ব্যাপকতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, বহু মসজিদ ও খানকা শুধু এই উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রসিদ্ধ হাসিদবিদ তকিউদ্দিন রহ. (মৃ. ৯২৯ হি.)-এর চেষ্টায় এ অঞ্চলে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সোনারগাঁয়ের বহু সংখ্যক মসজিদের পাশে বিখ্যাত বহু আলেম ও নাম না জানা অনেক শিক্ষার্থীর কবর এ অঞ্চলে হাদিসচার্চর বাস্তব সাক্ষী। শায়েখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা তাদের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

হাদিসশাস্ত্রের সঙ্গে এ অঞ্চলের সম্পৃক্ততার সাক্ষী হয়ে আছে অসংখ্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। সেগুলোর মধ্যে শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপিঠের ধ্বংসাবশেষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐতিহ্যবাহী সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবকিছুই কালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চুন-সুরকির গাঁথুনির সমেত প্রধান ফটকটি। যদিও অযতœ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন তা জরাজীর্ণ। এর পাশেই শুয়ে আছেন এক সময়ের প্রখ্যাত শাইখুল হাদিস হজরত শাহ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (রহ.)। এখানে আরও যাদের কবর আছে, তারা হলেন- শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আহমাদ মুনিরি রহ. (মৃ.৭৭৩ হি.) ও তার স্ত্রী, হজরত ইউসুফ দানেশমান্দ, ইবরাহিম দানেশমান্দ, শাহ কামেল (রহ.) এবং নাম না জানা আরও অনেক বুজুর্গ।

ধারণা করা হয়, হয়তো এসব কবরের আশেপাশেই কোথাও ছিলো হাদিস পাঠদানের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এখন তার আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। তবে অদুরেই রয়েছে একটি বিস্ময়কর ভগ্নপ্রায় দালান। সীমাহীন অযত্ন অবহেলার জরাগ্রস্থ সেটিও। চৌকাঠবিহীন দরজা দিয়ে ভেতরে গেলে দেখা যায় ময়লা আবর্জনার স্তুপ। জানালাবিহীন কামরা। চারপাশের দেয়ালে মেঝের তিন ফুট ওপর থেকে প্রায় ছাদ পর্যন্ত রয়েছে ইটের গাঁথুনিতে করা সেল্ফ। দেখেই বোঝা যায় যে, এটিই ছিল এক সময়ের সরগরম বিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ লাইব্রেরী।

কামরাটির ডান পাশ দিয়ে নিচে নেমে গেছে সরু একটি সিঁড়ি। দু’জন একসঙ্গে নামার উপায় নেই। আট দশটা সিঁড়ি ভাঙ্গার পর মোড় নিতে হয় হাতের বাম দিকে। তখন আর খালি চোখে কিছুই দেখা সম্ভব নয়। অন্ধকারে চোখের আলো কোনো কাজে আসে না। গা ছমছমে পরিবেশ। ৮ থেকে ১০ বর্গ ফুটের একটি কামরা। উচ্চতা হবে সর্বোচ্চ ছয় ফুট। জনশ্রুতি আছে, এটি ছিল হজরত শাহ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর ইবাদত ঘর। ভগ্নপ্রায় এই ভবনটি ওই এলাকায় ‘আন্ধার কুটির’ নামে পরিচিত। এলাকাবাসীর অভিমত হলো, এখানেই নীরবে-নিভৃতে ইবাদত করতেন তিনি এবং তার ভক্ত ছাত্ররা।

ইতিহাস সমৃদ্ধকারী ঐতিহ্যবাহী ও স্মৃতিবিজড়িত এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটির কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ কেউ নেয়নি। অথচ হাদিসশাস্ত্রের সঙ্গে এ দেশের প্রাচীন ও নিবিড় সম্পর্কের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে স্থানটির গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। ইতিহাস গবেষকদের মত হলো, যথাযথ সংস্কার ও পরিচর্যার মাধ্যমে স্থানটি একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে। হয়ে উঠতে পারে হাদিসশাস্ত্রবিদদের গবেষণার কেন্দ্রস্থল। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: মুহাদ্দিস ও প্রবন্ধকার

বাংলাদেশ সময়: ১৮৪৭ ঘন্টা, মার্চ ১৮, ২০১৫

বাংলা নিউজ 24.কম

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY