কোরআন মাজীদ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ

0
536

কোরআন মাজীদ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ
সূরা ‘আল ক্বামার’ মক্কায় অবতীর্ণ কোরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। আল্লাহ তায়ালা এই সূরায় একটি বিশেষ আয়াত চার বার উল্লেখ করেছেন। সে বিশেষ আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, ‘অবশ্যই আমি শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, অতএব আছে কি তোমাদের মাঝে কেউ এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার?’
বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ কোরআন পাঠকের মতো আমার মনকেও এক সময় এই আয়াতটি দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে যখন দেখি আল্লাহ তায়ালার নাযিল করা আলোর এই একমাত্র উৎসটির ভাষান্তর করতে গিয়ে কিছু মানুষ একে সহজ করার বদলে দিন দিন কঠিন ও দুর্বোধ্য করে ফেলছে। যে ‘আলো’ একজন পথিককে আঁধারে পথ দেখাবে তা যদি নিজেই স্বচ্ছ না হয় তাহলে ‘আলো’ সামনে থাকা সত্ত্বও পথিক তো আঁধারেই হোঁচট খেতে থাকবে।
কোরআন লওহে মাহফুযের অধিপতি আল্লাহ তায়ালার কালাম, এর ভাষাশৈলী, এর শিল্প সৌন্দর্য সবই আল্লাহ তায়ালার একান্ত নিজস্ব। এ কারণেই বিশ্বের সব কোরআন গবেষকরাই মনে করেন, এই মহান গ্রন্থের যথার্থ ভাষান্তর কিংবা এর যথাযথ অনুবাদ কোনোটাই মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। যাঁর কাছে এই বিস্ময়কর গ্রন্থটি নাযিল করা হয়েছিলো তাঁকে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে এই কেতাবের মর্মোদ্ধার করা সম্ভবপর হয়েছিলো। এমনকি কোরআন যাদের সর্বপ্রথম সম্বোধন করেছিলো রসূল (স.)-এর সে সাহাবীরাও কোরআনের কোনো বক্তব্যের ব্যাপারে মতামত দেয়ার আগে রসূল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করে নিতেন। যদিও তারা নিজেরা সে ভাষায়ই কথা বলতেন, যে ভাষায় কোরআন নাযিল হয়েছিলো। সম্ভবত এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামদের বিদায়ের বহুকাল পরও ভিন্ন ভাষাভাষী কোরআনের আলেমরা কোরআনের অনুবাদ কাজে হাত দিতে সাহস করেননি, কিন্তু দিনে দিনে কোরআনের আলো যখন আরব উপদ্বীপ থেকে অনারব জনপদে ছড়িয়ে পড়লো, তখন কোরআনের প্রয়োজনে তথা ভিন্ন ভাষাভাষীদের সামনে কোরআনের বক্তব্য তুলে ধরার জন্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকলো না। এমনি করেই অসংখ্য আদম সন্তানের অগণিত ভাষায় কোরআন অনুবাদের যে স্রোতধারা শুরু হলো, আমাদের মায়ের ভাষা বাংলায়ও একদিন এর প্রভাব পড়লো। কোরআনের পণ্ডিত ব্যক্তিরা একে একে এগিয়ে এলেন নিজেদের স্ব-স্ব জ্ঞান গরিমার নির্যাস দিয়ে এই অনুবাদ শিল্পকে সাজিয়ে দিতে।
একথা স্বীকার করতেই হবে যে, উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাষা হিসেবে আরবীর পরেই ছিলো ফার্সী ও উর্দূর স্থান। স্বাভাবিকভাবেই কোরআন অনুবাদের কাজও তাই এ দুটো ভাষায়ই বেশী হয়েছে। সুলতানী আমলের শুরু থেকে মুসলমান শাসক নবাবরা যখন সংস্কৃত ভাষার সীমিত গণ্ডি থেকে বাংলা ভাষাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরিমন্ডলে নিয়ে এলেন, তখন থেকেই ধীরে ধীরে এই ভূখণ্ডে কোরআনের বাংলা অনুবাদের প্রয়োজনও অনুভূত হতে লাগলো।
৪৭ ও ৭১ সালের পরস্পর দুটো পরিবর্তনের ফলে এ ভূখণ্ডের মুসলমানরা নিজেদের ভাষায় কোরআনকে বুঝার একটা ব্যাপক পরিসরে পা রাখার সুযোগ পেলো। অল্প কিছুদিনের মাঝেই কোরআনের বেশ কয়েকটি অনুবাদ বেরিয়ে গেলো। নিতান্ত সীমিত পরিসরে হলেও আমাদের পশ্চিম বাংলার মুসলমানরাও এ সময়ের মধ্যে কোরআনের কয়েকটি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুবাদক ও প্রকাশকরা তাদের অনুবাদকর্মকে ‘কোরআনের বাংলা অনুবাদ’ না বলে ‘বাংলা কোরআন শরীফ’ বলে পেশ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। তাদের দু’একজনের এই অজ্ঞতাপ্রসূত প্রয়াস সত্ত্বেও মুসলমানদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর লোকেরা এগুলোকে কোরআনের বাংলা অনুবাদ বলেই গ্রহণ করেছে। এই বিষয়টিকে বাদ দিলে আমাদের দেশে অনূদিত ও প্রকাশিত কোরআনের প্রতিটি গ্রন্থই নানা বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আল্লাহ তায়ালার কেতাবের মর্মকথা মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজে যে যতোটুকু অবদান রেখেছেন আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সে পরিমাণ ‘জাযায়ে খায়ের’ দান করুন।
কোরআন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর রসূল (স.)-এর কাছে পাঠানো তাঁর বাণীসমূহের এক অপূর্ব সমাহার। সূদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিপ্লবের সিপাহসালারকে তাঁর মালিক যে সব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তার অধিকাংশই বলতে গেলে পারিপার্শ্বিকতার বিশ্লেষণ- তথা এক একটি ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে জড়িত। এ কারণেই কোরআনের তাফসীরকাররা কোরআন অধ্যয়নের জন্যে সে সময়ের আন্দোলনের সমসাময়িক পরিস্থিতি জানার ওপর এতো বেশী জোর দেন।
তারপরও কোরআনের মূল অনুবাদ কিন্তু কোরআন পাঠকের কাছে জটিলই থেকে যায়। অনেক সময় মূল কোরআনের আয়াতের হুবহু বাংলা অনুবাদ করলে কোরআনের বক্তব্য মোটেই পরিস্কার হয় না। সে ক্ষেত্রে কোরআনের একজন নিষ্ঠাবান অনুবাদককে অনুবাদের সাথে ভেতরের উহ্য কথাটি জুড়ে দিয়ে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দিতে হয়। আরবী ভাষার ব্যাকরণ ও বাক্য গঠন প্রক্রিয়ায় এগুলোর প্রচলন থাকলেও বাংলাভাষায় এ বিষয়গুলো কোরআনের পাঠককে মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলে। তারা হেদায়াতের এই মহান গ্রন্থে এসব অসংলগ্নতা দেখে বর্ণনাধারায় ‘মিসিং লিংক’ খোঁজার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ কারণেই সচেতন অনুবাদকরা এ সব ক্ষেত্রে নিজের কথার জন্যে ‘ব্রাকেট’ কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন ধরনের টাইপ ব্যবহার করে সেই মিসিং লিংকটাকে মিলিয়ে দেন। আমাদের মধ্যে যারা ‘তাফসীরে জালালাইন’ পড়েছেন তারা সেখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করে থাকবেন। এই তাফসীরে বিজ্ঞ তাফসীরকাররা তাদের নিজেদের কথাকে ‘আন্ডার লাইন’ করে আল্লাহ তায়ালার কথা থেকে আলাদা করে নিয়েছেন। কোরআনে এ ধরনের বহু আয়াত রয়েছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে সূরা আল মায়েদা ৬, সূরা ইউসুফ ১৯, সূরা আর রাদ ৩১, সূরা আঝ ঝুমার ২২, সূরা কাফ ৩ এই আয়াতগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ আয়াতগুলোর অনুবাদের প্রতি তাকালে একজন পাঠক নিজেই এ বিষয়টি বুঝতে পারবেন, কি ধরনের ধারাবাহিকতার কথা আমি এখানে বলতে চেয়েছি। আমাদের এই গ্রন্থে অনুবাদের সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যে আমরা আল্লাহ তায়ালার কথা থেকে নিজেদের কথা আলাদা করার জন্যে এ ধরনের () ‘ব্রাকেট’ ব্যবহার করেছি। কোরআনের মালিককে হাযির নাযির জেনে আমরা যেমন চেষ্টা করেছি ব্রাকেটের ভেতর আল্লাহ তায়ালার কথা না ঢুকাতে, তেমনি চেষ্টা করেছি ব্রাকেটের বাইরে অনুবাদকের কথা না ছড়াতে। তারপরও যদি কোথাও তেমন কিছু ভুল ক্রটি থেকে যায় তা আগামীতে শুদ্ধ করে নেয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞার পাশাপাশি আমার মালিককে বিনীত চিত্তে বলবো, হে আল্লাহ, তুমি আমার ভেতর বাইর সবটার খবরই রাখো, আমার নিষ্ঠার প্রতি দয়া দেখিয়ে তুমি আমার সীমাবদ্ধতাকে ক্ষমা করে দিয়ো।
এই গ্রন্থে ব্যবহৃত কোরআনের এই নতুন ধারার অনুবাদটি একান্ত আমার নিজস্ব চেষ্টা সাধনার ফল। কিশোর বয়স থেকে যখন আমি কোরআনের সাথে পথচলা শুরু করেছি তখন থেকেই আমি কোরআনের এমনি একটা সহজ সাবলীল অনুবাদের স্বপ্ন দেখতাম। আমি এ কথাটা প্রায়ই চিন্তা করতাম, আল্লাহ তায়ালা নিজে যেখানে বলেছেন আমি কোরআনকে সহজ করে নাযিল করেছি সেখানে আমরা কেন কোরআনের অনুবাদটাকে সহজ সরল করার বদলে দিনে দিনে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছি। বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের অনুবাদ দেখে অনেকের মতো আমিও বহুবার নিরাশ হয়েছি, মনে হয়েছে আরবী কোরআনের চাইতেও বুজি এর বাংলা অনুবাদ বেশী কঠিন। এমনটি বহু ক্ষেত্রেই ঘটেছে যে, অনূদিত অংশটি বার বার পড়েও একজন পাঠক বুঝতে পারেন না, আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে আসলেই কী বলতে চেয়েছেন। অথচ আমরা সবাই জানি আল্লাহ তায়ালা এই কোরআনকে সহজ করে নাযিল করেছেন।
আমার মালিক আল্লাহ তায়ালার হাজার শোকর তিনি আমার মনের কোনে লালিত দীর্ঘদিনের সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার একটা সুন্দর সুযোগ এনে দিলেন। বিশ্ববরেণ্য তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’ এর যখন বাংলা অনুবাদ প্রকাশনার কাজ আমি শুরু করলাম, তখন যেন আমি কোরআনকে আমার নিজের করে বুঝবার ও বুঝাবার একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’-এ ব্যবহারের জন্যে আমাদের তখন একটি মানসম্পন্ন বাংলা তরজমার প্রয়োজন দেখা দিলো। বহুদিন পর কোরআন যেন নিজেই আমাকে হাতছানি দিয়ে নিজের দিকে ডাক দিলো। আমিও মনে হয় এমনি একটা ডাকের জন্যে দীর্ঘ দিন থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম।
সাইয়েদ কুতুব শহীদের অমর স্মৃতি আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’Ñএর বাংলা অনুবাদ প্রকল্প যখন হাতে নেয়া হয় তখন আমি ভাবতেও পারিনি, কোরআনের কথা বলতে গিয়ে যিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন তাঁর মহান তাফসীর গ্রন্থের পাতায় আমার মতো একজন নগণ্য বান্দার এই অনুবাদকর্মটিও চিরদিনের জন্যে স্থান পেয়ে যাবে। মালিকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় আমার দেহমন আপ্লুত হয়ে উঠলো। এটা আমার প্রতি আমার মালিকের একান্ত দয়া যে, তিনি একজন মহান শহীদের মহান তাফসীরের হাজার হাজার পৃষ্ঠার বিশাল পরিমন্ডলে আমার জন্যেও একটু জায়গা করে দিলেন! ১৯৯৫ সালে যখন এই তাফসীরের আমপারার অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন থেকে এই তাফসীরকে যারা ভালোবেসেছেন তারা এই অধমের কোরআনের অনুবাদকেও তাদের বিপুল ভালোবাসা দিয়েছেন। আমি একান্ত আগ্রহের সাথেই এই নতুন ধারার অনুবাদটির ব্যাপারে দেশের ওলামায়ে কেরাম ও সুধী বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিলাম। আলহামদু লিল্লাহ! শহীদী নযরানা হিসেবে এই তাফসীরকে যেমন এখানকার সর্বস্তরের মুসলমানরা ভালোবেসেছেন, তেমনি এই তাফসীরে ব্যবহৃত অধমের কোরআনের অনুবাদকেও তারা প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছেন। অনেকেই বলেছেন, তারা এই প্রথম কোরআনের এমন একটি অনুবাদ হাতে পেয়েছেন যা কোনোরকম ব্যাখ্যা বা টীকার আশ্রয় ছাড়াই তাদের কোরআনের মূল বক্তব্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সাইয়েদ কুতুব শহীদ তাঁর তাফসীরের পটভূমিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছেন, কোরআন অধ্যয়ন করার সময় মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে কোরআন নিজেই বুঝি এক এক করে আমার সামনে নিজের জটিল গ্রন্থীগুলো খুলে ধরছে। আসলে এ হচ্ছে কোরআনের মালিকের সাথে কোরআনের একজন নিবেদিত প্রেমিকের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপার! এ পরিবেশের সাথে শুধু সে ব্যক্তিই পরিচিত হতে পেরেছে যে নিজের জীবনটাকে কোরআনের ছায়াতলে কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি জানি, শহীদ কুতুবের কোরআনের ছায়াতলে জীবন কাটানো আর আমার মতো এক গুনাহগার বান্দার সেই কোরআনের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার অদম্য আগ্রহের মাঝে আসমান যমীন ফারাক, কিন্তু আমাদের উভয়ের মাঝে এই বিশাল ফারাক সত্ত্বও জানি না, আমরা উভয়ে একই অনন্ত যাত্রার যাত্রী হবার সুবাদে কিনা কোরআনের অনুবাদ করার সময় আমিও বহুবার এটা অনুভব করেছি, আমি যখন কোনো আয়াতের সামনে তার বক্তব্য অনুধাবনের জন্যে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছি, নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও ভাষাজ্ঞান যখন আর আমাকে সাহায্য করতে পারছিলো না, তখনি আমি দেখেছি কে যেন আমাকে বলে দিচ্ছে, ওহে দ্বিধাগ্রস্ত পথিক, এই নাও তোমার কাংখিত সে তথ্য।
আলহামদু লিল্লাহ, আজ আমি একান্ত নিবিষ্ট চিত্তে একথাটা বলতে পারছি, কোরআনের এই অনুবাদকর্মটি যেমনি আমার দিবস রজনীর পরিশ্রম, তেমনি তা আল্লাহর গায়বী মদদ নিসৃত নিষ্ঠারই বহিপ্রকাশ। তারপরও আমার অনুবাদে ভুল থাকবে না এমন কথা বলার ঔদ্ধত্য আমি কখনোই দেখাবো না। সে ধরনের ভুলের দিকে আমি যেমন তী² নযর রাখবো তেমনি সুধী পাঠকদেরÑ বিশেষ করে সম্মানিত ওলামায়ে কেরামদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাও আমি স্মরণ করিয়ে দেবো। যখনি এ ধরনের কোনো সামান্য ভুলও আমাদের কাছে ধরা পড়বে আমরা ইনশাআল্লাহ সাথে সাথেই তা সংশোধনের চেষ্টা করবো।
আল্লাহ তায়ালার রহমতে তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’ এর প্রকাশনা সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে আমার কোরআনের অনুবাদের কাজটিও শেষ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’এর অসংখ্য পাঠক শুভানুধ্যায়ীরা আমাকে অনুরোধ করেছেন আমি যেন কোরআনের এই অনুবাদকে আলাদা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করি। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাথে আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি, তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েই আমরা ‘কোরআন শরীফ: সহজ সরল বাংলা অনুবাদ’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছি। আল্লাহ তায়ালার সীমাহীন করুণায় মাত্র দু’বছর সময়ের মধ্যেই এই গ্রন্থটি দেশের কোরআন অনুবাদ সাহিত্যে শীর্ষ মর্যাদার আসন লাভ করেছে। কেউ কেউ আবার আমাদের কোরআনের শুধু অনুবাদ অংশটিকে আলাদা পুস্তকাকারে প্রকাশেরও অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা কোরআনের ‘মতন’ ছাড়া কোনো অনুবাদ গ্রন্থের প্রকাশনার নীতিগত বিরোধী হওয়া সত্বেও আমাদের যুগান্তকারী প্রকাশনা ও বিশ্বের সর্বপ্রথম বিষয়ভিত্তিক রংগীন পরিবেশনা ‘আমার শখের কোরআন মাজীদ’ এর সাথে দেয়ার জন্যে এমনি একটি শুধু অনুবাদ গ্রন্থের প্রয়োজন অনুভব করছিলাম, তাছাড়া বিগত দু’তিন দশকে দেশে বিদেশে এ ধরণের অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় অবশেষে আমরাও শুধু অনুবাদ অংশ নিয়ে আলাদা একটি বই প্রকাশ করেছি।
নতুন অংগ সৌষ্ঠভে সজ্জিত অনুবাদের বর্তমান সংস্করণটিকে আমরা কোরআন সম্পর্কিত এমন অনেক তথ্য ও তত্বে সজ্জিত করার চেষ্টা করেছি যা এর সহজলভ্য সংস্করণে আমরা দিতে পারিনি। বর্তমান সংস্করণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে আমরা কোরআনের বিষয়সূচীকে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের আলোকে স¤ক্সূর্ণ এক নতুন পদ্ধতিতে সাজিয়ে পরিবেশন করেছি। এই পদ্ধতিতে একজন কোরআন পাঠক সহজেই কোরআনের পাতা থেকে তার ই¯ক্সীত অংশ বের করে নিতে পারবেন। কোরআনের মৌলিক ‘তাজওয়ীদ’-এর বিষয়গুলোকেও আমরা এতে সংযোযন করে দিয়েছি। সংযোযন করেছি কোরআনের মর্যাদা ও কোরআনের পাতায় কোরআনের নাম শীর্ষক আরো দু’টো নতুন বিষয়।
আলহামদু লিল্লাহ, এই গ্রন্থের পাতায় আমরা পাঠকদের আরেকটি দীর্ঘ দিনের দাবীও পূরণ করতে পেরেছি। সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী কোরআন পাঠকদের সবাই জনপ্রিয় কলকাতা হরফেই কোরআন দেখতে ও পড়তে চান। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমরা এর পূর্ণাংগ একটি সফটওয়্যারও ডেভেলপ করিয়েছি। এখন থেকে আশা করি আমাদের প্রকাশিত সব কয়টি কোরআন মাজীদ, কোরআনের অনুবাদ ও তাফসীর গ্রন্থসহ অন্যান্য সব পুস্তকে কোরআনের উদ্ধৃতির জন্যে আমরা এই কলকাতা হরফ ব্যবহার করতে পারবো।
যাদের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা আমাকে কোরআন সাধনা ও কোরআনকেন্দ্রিক জীবন গঠনে দিবানিশি প্রেরণা দিয়েছে তারা হলেন আমার মহান আব্বা মরহুম মাওলানা মানসূর আহমদ ও জান্নাতবাসিনী মা জামিলা খাতুন। আজ তারা কেউ তাঁদের সন্তানের এ খেদমতটুকু দেখার জন্যে দুনিয়ায় জীবিত নেই, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অপার করুণা দিয়ে তাদের উভয়কে জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান করে দিন। আমার স্ত্রীখ্যাতিমান লেখিকা খাদিজা আখতার রেজায়ীÑ যে মহীয়সী নারী তার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা শুধু কোরআনের জন্যে উজাড় করে দিয়েছেন তার কথা বাদ দিয়ে কোরআনের এই অনুবাদ গ্রন্থের ভূমিকা লিখবো কি করে? বলতে দ্বিধা নেই তিনি পাশে আছেন বলেই আল্লাহর নামে মাঝে মাঝে ছেড়া পালেও আমি সাগর পাড়ি দেয়ার সাহস করি। হে আল্লাহ, আমাদের উভয়ের সাগরে যে অপূর্ণতা রয়েছে তাকে তুমি তোমার দয়া ও মাগফেরাত দিয়ে পূর্ণ করে দিয়ো। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে কোরআনের এই অনুবাদ গ্রন্থটিকে যিনি তার আল্লাহ প্রদত্ব মেধা দিয়ে পরিচিত করিয়েছেন তিনি হচ্ছেন আমাদের কালের একজন শীর্ষস্থানীয় কোরআনের গবেষক ও দেশ বিদেশের পর্বতসম খ্যাতির অধিকারী আল্লামা দেলাওর হোসাইন সাঈদী। এ অনুবাদ কর্মটির শিল্প ও সৌন্দয্য বর্ধনের জন্যে তিনি সব সময়ই আমাদের মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। নানাভাবে আরো প্রেরণা জুগিয়েছেন দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মাসজিদের খতিব মওলানা উবায়দুল হক, বিদগ্ধ কোরআন গবেষক সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান, বিশিষ্ট কোরআন সাধক ও ইসলামিক ফাউন্ডেশান বাংলাদেশের ডাইরেক্টর জেনারেল সাবেক সচিব এ, জেড, এম শামসুল আলম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি কোরআনের বাংলা অনুবাদক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও খ্যাতনামা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শমসের আলীসহ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা আমাদের সবার জীবনকে কোরআনের নূরে আলোকিত করুন।
‘আল কোরআন একাডেমী লন্ডন’ বাংলাদেশ কার্যালয়ের ক¤েক্সাজ, ডিজাইন, প্রুফ, প্রেস, বাইন্ডিং বিভাগে নিয়োজিত আমার সহকর্মীরা দিবারাত্রি পরিশ্রম করে এই পুস্তকের প্রকাশনাকে ত্বরানি¦ত করেছেন, আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। নতুন সফটওয়্যারে কোরআনের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্যে বিগত মাসগুলোতে হাফেজ মওলানা আবু নায়ীম, হাফেজ মওলানা আহমদ রফিক, হাফেজ মওলানা সাদ আল মামুন ও হাফেজ মওলানা শরাফতুল্লাহর সমন¦য়ে গঠিত এই টীমটি আমার সতর্ক তত্ত্বাবধানে দিবানিশি পরিশ্রম করেছে। এ গ্রন্থকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করার জন্য আমাদের অফিসের নাহিদ, আল-আমীন ও জান্নাত ভাইও তাদের অনেক শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছেন। আরো যাদের নাম আমি এখানে উল্লেখ করতে পারিনি অথচ যারা আমাকে নিত্য পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়েছেনÑ তাদের সবার জীবনকে আল্লাহ তায়ালা কোরআনের বরকত দিয়ে ভরে দিন। আল্লাহ তায়ালা তাদের সবার সাথে আমাদেরও জান্নাতের ফুল বাগিচায় একই সামিয়ানার নীচে সমবেত করুন। আমীন!

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY