মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর তিনটি চিঠি

0
321

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর তিনটি চিঠি

-আলী নাযেমিয়ান ফারদ।
ইসলাম একটি বিশ্বজনীন ধর্ম এবং সেই প্রথম থেকেই সকল প্রকার গোত্র এবং গোষ্ঠীর সীমানার বাইরে। এ কারণেই রাসূল (সা.) ৬ষ্ট হিজরিতে তার বিশ্বজনীন দায়িত্বকে সামনে রেখে জাজিরাতুল আরবের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে চিঠি লিখে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন।
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে রাসূল (সা.) এর তিনটি চিঠি বর্ণনা করেছেন:
১। হাবাশার রাজা নাজ্জাশীকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি, ২। ইরানের বাদশা খসরু পারভেজকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি।, ৩। রোমের সম্রাট হেরকেলকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি। আমরা এই প্রবন্ধে এই তিনটি চিঠি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইসলাম প্রচারে কুরাইশদের বাধা এবং রাসূল (সা.) ও তার সাথীদের উপর মুশরিকদের চাপের কারণে রাসূল (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ইসলামের জন্য একটি শক্ত ও মজবুত কেন্দ্রের প্রয়োজন। যার মাধ্যমে মুসলমানরা মুশরিকদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে এবং ইসলাম প্রচারের জন্য ইসলামেরও একটি মজবুত ঘাটি ও কেন্দ্র হবে।
এভাবে নবুয়াত ঘোষণার ১৩ বছর পর রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরত করেন এবং সেখানে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ স্থাপন করে ইসলামের জন্য একটি শক্ত ও মজবুত কেন্দ্র স্থাপন করেন। কিছু দিন না যেতেই রাসূল (সা.) এর এই কেন্দ্র একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হল এবং রাসূল (সা.) সেখান থেকে সারা বিশ্বে ইসলামের বাণী প্রচার করতে লাগলেন।
রাসূল (সা.) বিশেষ কোন গোত্রের জন্যে প্রেরিত হননি যে তিনি শুধুমাত্র সেই গোত্রের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কাজ করবেন।  বরং কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী (১) তিনি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ইসলামের বানী পৌঁছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। ৬ষ্ট হিজরিতে রাসূল (সা.) তার বিশ্বজনীন দায়িত্ব পালন করার জন্য বিভিন্ন দেশে চিঠির মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দেন। এ সময়ে রাসূল (সা.) দেখলেন যে, ইহুদীরা তেমন কোন ক্ষতি করতে পারবে না এবং মক্কার মুশরিকদের সাথে হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি হয়েছে, তখন তিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চিঠি লিখে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন। (২)
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে রাসূল (সা.) এর তিনটি চিঠি বর্ণনা করেছেন:
১। হাবাশার রাজা নাজ্জাশীকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি।, ২। ইরানের বাদশা খসরু পারভেজকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি।
৩। রোমের সম্রাট হেরকেলকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি। কিন্তু এর পাশাপাশি শুধু উল্লেখ করেছেন যে, রাসূল (সা.) মিশরের রাজা মাকুকেশ, ওমানের রাজা জঈফর ও আবদ, বাহরাইনের গভর্নর মানযার বিন সাভীকে চিঠি দিয়েছিলেন তবে তার বিস্তারিত কিছু লেখেননি।
তারিখে তাবারীতে ৬ষ্ট হিজরিতে রাসূল (সা.) এর লেখা প্রথম যে চিঠির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে রোমের সম্রাট হেরকেলকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি। এই চিঠিটি দেহিয়ায়ে কালবীর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছিল:
بسم الله الرحمن الرحیم
من محمد بن عبدالله و رسوله الى هرقل عظیم الروم .
سلام على من اتبع الهدى. اما بعد: فانى ادعوك بدعایة الاسلام، اسلم تسلم و اسلم یؤتك الله اجرك مرتین. فان تولیت فعلیك اثم الاریسین. (৩)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে রোমের সম্রাট হেরকেলকে।
যে সত্যের অনুসরণ করে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে শান্তিতে থাকবে। ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে দুইবার পুরষ্কার দিবেন। যদি ইসলাম গ্রহণ না কর তাহলে তোমার প্রজাদের গোনাহও তোমার উপর বর্তাবে।
তারিখে তাবারীতে ৬ষ্ট হিজরিতে রাসূল (সা.) এর লেখা দ্বিতীয় যে চিঠির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে হাবশার বাদশা নাজ্জাশীকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি। এই চিঠিটি আমর বিন আবি উমাইয়্যা যামরীর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছিল:
بسم الله الرحمن الرحیم
من رسول الله الى النجاشى الاصحم ملك الحبشه .
سلم انت . فانى احمد الیك الله الملك القدوس السلام المومن المهیمن و اشهد ان عیسى بن مریم روح الله و كلمته القاها الى مریم البتول الطیبه الحصینه فحملت ‏بعیسى فخلقه الله من روحه و نفخه كما خلق آدم بیده و نفخه . انى ادعوك الى الله وحده لاشریك له و الموالاة على طاعته و ان تتبعنى و تومن بالذى جاءنى، فانى رسول الله و بعثت الیك ابن عمى جعفر و نفرا معه من المسلمین . فذا جاءك فاقرهم، و دع التجبر. فانى ادعوك و جنودك الى الله، فقد بلغت و نصحت، فاقبلو نصحى . والسلام على من اتبع الهدى . (৪(
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবশার বাদশা নাজ্জাশি আসহামকে।
তুমি আমাদের সাথে আপোষে আছ। আমি মালিক, কুদস, সালাম, মুমিন এবং মুহাইমেন আল্লাহর প্রশংসা করে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা ইবনে মারিয়াম আল্লাহর রুহ এবং কালিমা। আল্লাহ হযরত ঈসাকে কুমারী মারিয়ামের গর্ভে দান করেছেন এবং আল্লাহ ঈসাকে তার রুহ থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেভাবে হযরত আদমকে তার রুহ থেকে সৃষ্টি করেছেন। আমি তোমাকে এক আল্লাহর প্রতি এবং তার আনুগত্যের দাওয়াত দিচ্ছি। আমার অনুসরণ করবে এবং বিশ্বাস করবে যে আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)। আমার চাচাত ভাই জাফরসহ কিছু মুসলমানদেরকে তোমার কাছে প্রেরণ করছি, তুমি তাদেরকে গ্রহণ করবে এবং কোন প্রকার অহংকার করবে না। আমি তোমাকে তোমার সকল রাজত্বসহ আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি। আমি আল্লাহর বাণী তোমার কাছে পৌঁছে দিলাম এবং তোমকে উপদেশ দিলাম। আমার উপদেশ গ্রহণ কর এবং তার উপর আল্লাহর দরুদ, যে হোদায়াতের পথ অনুসরণ করে।
তারিখে তাবারীতে ৬ষ্ট হিজরিতে রাসূল (সা.) এর লেখা তৃতীয় যে চিঠির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে ইরানের বাদশা খসরু পারভেজকে লেখা রাসূল (সা.) এর চিঠি। এই চিঠিটি আব্দুল্লাহ বিন হাযাফাহ সাহমীর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছিল:
بسم الله الرحمن الرحیم
من محمد رسول الله الى كسرى عظیم الفارس .
سلام على من اتبع الهدى و آمن بالله و رسوله و شهد ان لااله الا الله وحده لاشریك له و ان محمد عبده و رسوله. ادعوك بدعاء الله فانى رسول الله الى الناس كافة لانذر من كان حیا و یحق القول على الكافرین. فاسلم تسلم . فان ابیت فان اثم المجوس علیك . (৫)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে ইরানের বাদশা খসরু পারভেজকে। তার উপর দরুদ যে হেদায়েতের অনুসরণ করে এবং আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান আনে এবং বলে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মাবুদ নেই। আমি সবার জন্য আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং আমি সকল মানুষকে সতর্ক করার জন্য প্রেরিত হয়েছি। সুস্থ ও ভাল থাকতে হলে ইসলাম গ্রহণ কর। আর যদি ইসলাম গ্রহণ না কর তাহলে সকল অগ্নিপূজকদের গোনাহ তোমার উপর বর্তাবে।
চিঠিসমূহের পর্যালোচনা

প্রতিটি চিঠি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু হয়েছে। যদিও মুসলমানরা তাদের কাজ -কর্ম শুভ এবং বরকতময় হওয়ার জন্য তাদের সকল কাজ আল্লাহর নামে শুরু করে। (৬) কিন্তু রাসূল (সা.) কি প্রথম থেকেই তার সকল চিঠি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু করতেন কিনা এ বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে। তাফসীরে দুররুল মানসুরে বর্ণিত হয়েছে রাসূল (সা.) সূরা নামল অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নাজরানের জনগণের কাছে যে, চিঠি লিখতেন তা ্র بسم اله ابراهیم‏ গ্ধ বিসমিল্লাহি ইব্রাহীম দিয়ে শুরু করতেন। (৭) অনেকে মনে করেন রাসূল (সা.) এই আয়াত  ্র … و قال اركبوا فیها بسم الله مجراها و مرسیها গ্ধ  (৮) অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে তার চিঠিসমূহকে ্র باسمك اللهم‏ গ্ধ বিসমিকা আল্লাহুম্মা দিয়ে শুরু করতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে চিঠির শুরুতে ্র بسم الله‏ গ্ধ লিখতেন। এবং এই আয়াত ্র قل ادعو الله او ادعو الرحمن ‏গ্ধ (৯) অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে তিনি চিঠির শুরুতে ্র بسم الله الرحمن‏ গ্ধ লিখতেন। অবশেষে যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হল ্র انه من سلیمان و انه بسم الله الرحمن الرحیم ‏গ্ধ (১০) তিনি তার চিঠিগুলো ্র بسم الله الرحمن الرحیم ‏গ্ধ দিয়ে শুরু করতেন। (১১)
রাসূল (সা.) চিঠিগুলোতে প্রথমে প্রেরকের নাম (من محمد رسول الله الى) অত:পর প্রাপকের নাম অনুরূপভাবে  ্র سلم انت‏ গ্ধ অথবা  ্র سلام على من اتبع الهدى‏ গ্ধ দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে ভূমিকা লেখার পর চিঠির মূল বিষয়বস্তুর প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। তিনটি চিঠিই অতি সাধারণভাবে লেখা হয়েছে এবং তাতে কোন জটিলতা ও জড়তা নেই। তিনটি চিঠিতেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে তৌহিদ ও একত্ববাদের প্রতি দাওয়াত করা হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিকে যদি সরকার বা জাতিসমূহের মধ্যে তাদের সুবিধা -অসুবিধাকে লক্ষ্য করে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ককে বোঝায় তাহলে রাসূল (সা.) এর এ আচরণের উদ্দেশ্য কি ছিল ? নি:সন্দেহে রাসূল (সা.) চেয়েছিলেন তৌহিদের প্রসার ঘটাতে এবং অঙ্গ মূর্খদের অন্তরে শিরকের যে মরিচা ধরেছিল তৌহিদের বারিধারা দিয়ে তা ধুয়ে মুছে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করতে এবং তারা আদিতে যে ওয়াদা (আলাসতু বি রাব্বিকুম, কালু বালা) করেছিল তা মনে করিয়ে দিতে। কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী তিনি বাশির ও নাযির (সুসংবাদ দাতা এবং সতর্ককারী) ছিলেন আর সে কারণেই তিনি তাবলীগের ক্ষেত্রে এ দুই উপকরণকে সর্বদা কাজে লাগাতেন। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, তিনি তার চিঠির ক্ষেত্রে প্রথমে তাদেরকে সুসংবাদ দিয়েছেন (اسلم تسلم) ইসলাম গ্রহণ কর শান্তিতে ও নিরাপদে থাকবে। অত:পর সতর্ক করে বলেছেন: আর যদি ইসলাম গ্রহণ না কর তাহলে সকল অগ্নিপূজকদের গোনাহ তোমার উপর বর্তাবে। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন যে, যদি ইসলাম এবং তৌহিদকে তারা মেনে নেয় তাহলে খুব সহজেই তাদের মন জয় করা সম্ভব হবে। কেননা তৌহিদ মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা দান করে। মানুষকে স্বাধীন করে এবং তাদেরকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবার দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। এছাড়াও তৌহিদ এক দিকে যেমন: আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবার ইবাদতকে নিষেধ করে। অন্যদিকে তৌহিদ সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করে সমাজ থেকে সকল প্রকার গোত্র ও বংশগত শ্রেষ্ঠত্বকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতে মর্যাদা দান করে। এটা নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণের প্রাণে আশার আলো জাগায়। কেননা তারা সর্বদা শ্রেণী বৈষম্যের স্বীকার হয়ে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। একারণেই আমরা দেখতে পাই যে, এই ঘটনার মাত্র ৮ বছর পর ১৪’ ই হিজরিতে ইরানী সেনাপতি রুস্তাম ফাররুখ যাদ কাদিসিয়াতে মুসলমানদের প্রতিনিধি রাবয়ী ইবনে আমেরের কাছে প্রশ্ন করল: আপনাদের এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কি ? মুসলমানদের প্রতিনিধি জবাব দিল: আমরা দাসদেরকে দাসের ইবাদত করা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর বন্দেগি বা ইবাদতের দিকে দাওয়াত দিতে এসেছি।(لنخرج العباد من عبادة العباد الى عبادة الله .)   (১২)
তৌহিদী দৃষ্টি কোন থেকে তৌহিদকে মেনে নেয়া এবং ্র لا اله الا الله ‏গ্ধ কে স্বীকার করা প্রতিটি মানুষের সাধারণ অধিকার। আর যদি কখনো এই অধিকার বিপদের সম্মুখীন হয় অর্থাৎ মানুষের সার্বজনীন ও মানবিক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে কেউ বাধা সৃষ্টি করে তখন সেই অধিকার রক্ষা ও বাধাকে ভাঙ্গা জরুরী হয়ে পড়ে। এ কারণেই মুসলমানরা তাদের ইসলামী দাওয়াতের পথ সুগম করতে এবং সাধারণ মানুষকে অপমান, লাঞ্ছনা ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে জিহাদের পথ বেছে নিত। (১৩) তবে এটাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, জিহাদের (১৪) উদ্দেশ্য বাধ্য করা নয় কেননা কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা ইসলাম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোন জোর জবরদস্তি নেই। (১৫) ঈমান একটি আন্তরিক বিশ্বাস এবং একটি চেতনার প্রতি টান এবং তা গ্রহণ করা। এই গ্রহণ করা দুটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বিবেক এবং অন্তর আর এই দুটির কোনটিই জোর করে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেননা বিবেক যুক্তির উপর এবং রুহ বা অন্তর আবেগের উপর প্রতিষ্ঠিত আর এরা বাধ্য -বাধকতার সীমানার বাইরে। মূলত ইসলাম যে আকিদা বা বিশ্বাসের কথা বলে, তা কেবলমাত্র স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার মাধ্যমেই অর্জিত হয় পরাধীন চিন্তার মাধ্যমে ইসলামী বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব নয়। (১৬) সুতরাং যদি তৌহিদকে মানবিক অধিকার হিসাবে ধরি তাহলে সেটাকে কোন জাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য সে জাতির সাথে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। কেননা তৌহিদ ও ঈমান কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ার মত বিষয় নয়। তবে শিরকে উৎখাত করার জন্য মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করা যায়। এ ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ মানুষের ন্যায্য অধিকারকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ হিসাবে পরিগণিত হবে। (১৭)
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) খসরু এবং হেরকেলকে লেখা চিঠিতে এই বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে, যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ না কর তাহলে সকল অগ্নিপূজক ও গোনাহগারদের গোনাহ তোমাদের উপর বর্তাবে। এটাকে আমরা এভাবে অর্থ করতে পারি যে, যদি কোন সরকার স্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সৃষ্টি করে সমাজে সত্য প্রচার করতে বাধা দেয় এবং সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে মানুষকে চিন্তাগতভাবে দুর্বল করতে চায় তাহলে সে সরকার মস্ত বড় গোনাহ করেছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন আযাব ভোগ করবে। আমরা নাজ্জাশিকে লেখা মহানবীর চিঠির দিকে যদি লক্ষ্য করি দেখতে পাব যে তিনি নাজ্জাশিকে এক প্রকার সম্মান প্রদর্শন করেছেন। যেমন: তিনি লিখেছেন: ্র سلم انت ‏গ্ধ তুমি আমাদের সাথে আপোষে আছ বা তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। অনুরূপভাবে নিতি নাজ্জাশির চিঠিতে ্র اسلم تسلم ‏গ্ধ ইসলাম গ্রহণ কর তাহলে নিরাপদে ও শান্তিতে থাকবে শব্দটি ব্যবহার করেননি। রাসূল (সা.) এই চিঠিটি লেখার সময় মুসলমানদের সাথে নাজ্জাশির সদাচরণের প্রতি দৃষ্টি রেখেই চিঠিটি লিখেছেন। কেননা যখন মক্কায় মুসলমানরা নিরুপায় হয়ে পড়েছিল তখন নাজ্জাশি মুসলমানদেরকে হাবড়ায় আশ্রয় দিয়েছিল এবং মুশরিকরা তাদেরকে ফেরত আনতে গেলে তিনি তাদেরকে মুশরিকদের হাতে তুলে দেননি। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) চিঠিতে প্রথমে হযরত ঈসা মসিহর সঠিক চিত্র তুলে ধরে তারপর তাকে ও তার রাষ্ট্রের সকলকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং বলেন যে আমার উপদেশকে গ্রহণ কর। (১৮)
নাজ্জাশিকে লেখা চিঠিতে অপর যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হচ্ছে রাসূল (সা.) নাজ্জাশির কাছে আবেদন করেছিলেন যে, জাফর বিন আবি তালিব ও তার সঙ্গীদেরকে যেন সে গ্রহণ করে। ঐতিহাসিকগণ যেমনটি লিখেছেন যে, রাসূল (সা.) হিজরতের কয়েক বছর পূর্বেই মুসলমানরা (জাফর বিন আবি তালিব) হাবড়ায় হিজরত করেছিলেন। মনে হয় মুসলমানরা যখন হাবড়ায় হিজরত করেছিলেন তখনও রাসূল (সা.) নাজ্জাশির কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলেন এবং পুনরায় ৬ষ্ট হিজরিতে অপর একটি চিঠি পাঠান যাতে তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এর থেকে বোঝা যায় যে, রাবি এই দুটি চিঠির মধ্যে কিছুটা গুলিয়ে ফেলেছেন এবং দ্বিতীয় চিঠির মধ্যে প্রথম চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরেছেন। যাই হোক তাবারী কোন প্রকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ছাড়াই এই চিঠিটি তার ইতিহাস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুরূপভাবে তিনি, তিনটি চিঠিই ৬ষ্ঠ হিজরিতে উল্লেখ করেছেন এবং কোন নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেননি। যদি আমরা মেনে নেই যে, আরবরা দ্বিতীয় খলিফার পূর্বে (তখন থেকে সময় নির্ধারণের জন্য রাসূল (সা.) এর হিজরতকে মানদণ্ড হিসাবে ধরে নেয় হয়) তাদের চিঠিতে তারিখ উল্লেখ করত না তাহলে এখানে তাবারীর কোন দোষ নেই।
তিনটি চিঠিই লেখকের নাম এবং কোন প্রকার সিল মোহর ছাড়াই তারিখে তাবারীতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ রাসূল (সা.) এর আসল চিঠি দেখে বলেছেন যে, তিনি তার সকল চিঠিগুলোকে সিল মোহর দিয়ে শেষ করতেন যাতে লেখা থাকত ্র محمد رسول الله‏ গ্ধ। (১৯)
তথ্যসূত্র
– আহমাদী, আলী -মাকাতিবুর রাসূল (তেহরান, নাশরে ইয়াস -১৩৬৩)।
– হামিদুল্লাহ, মুহাম্মাদ -হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর রাজনৈতিক চিঠি ও চুক্তিসমূহ এবং ইসলামের প্রথম যুগের সনদসমূহ; অনুবাদক -সৈয়দ মুহাম্মাদ হোসাইনী (তেহরান, এনতেশারাতে সুরুশ -১৩৭৪)।
– তাবারী, মুহাম্মাদ বিন জারির -তারিখুর রাসূল ওয়াল মুলুক, গবেষণা মুহাম্মাদ আবুল ফাযল ইব্রাহীম; (বৈরুত, দারুত তুরাছ ১৩৭৮ হি: ) ৬ষ্ট হিজরির ঘটনায়।
– আল কোরআন -সূরা নামল -৩০, বাকারা -২৫৬, হুদ -৪১, ইসরা -১১ এবং সাবা -২৮।
– মুত্তাকী, আলী -কানযুল উম্মাল (বৈরুত, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪০৫ হি:)।
– মাসুদী, আলী বিন হুসাইন; আত তানবিহ ওয়াল আশরাফ, অনুবাদ আবুল কাসেম -পয়ান্দেহ (তেহরান, এনতেশারাতে এলমি ওয়া ফারহাঙ্গি ১৩৬৫)।
– মোতাহহারী, মোর্তজা -জিহাদ (শিরাজ, নাশরে নাভীদ ১৩৬৮)।

পাদটিকা
১। সূরা সাবা -২৮্র و ما ارسلناك الا كافة للناس بشیرا و نذیرا … গ্ধ؛  ।
২। আলী আহমাদী রচিত রাসূল (সা.) এর চিঠিসমূহ ্র مكاتیب الرسول‏ গ্ধ  নামে একটি গ্রন্থ ১৩৬৩ সালে ছাপা হয়েছে। ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহর ডক্টরেটের থিসিস রাসূল (সা.) এর চিঠিসমূহ এবং চুক্তিসমূহ যা ফার্সিতে অনুবাদ হয়েছে।
৩। তাবারী, মুহাম্মাদ বিন জারির -তারিখুর রাসূল ওয়াল মুলুক, গবেষণা মুহাম্মাদ আবুল ফাযল ইব্রাহীম; (বৈরুত, দারুত তুরাছ ১৩৭৮ হি: ) ৬ষ্ট হিজরির ঘটনায়।
৪। ঐ
৫। ঐ
৬। রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, যে সকল কাজ আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু হয় তা শুভ হয় না এবং অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মুত্তাকী, আলী -কানযুল উম্মাল (বৈরুত, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ ১৪০৫ হি:) ১ম খণ্ড, পৃ: ৫৫৫।
৭। আলী আহমাদী রচিত রাসূল (সা.) এর চিঠিসমূহ ্র مكاتیب الرسول ‏গ্ধ  নামে একটি গ্রন্থ ১৩৬৩ সালে ছাপা হয়েছে।
৮। সূরা হুদ -৪১।
৯। সূরা  ইসরা -১১।
১০। সূরা নামল -৩০।
১১। মাসুদী, আলী বিন হুসাইন; আত তানবিহ ওয়াল আশরাফ, অনুবাদ আবুল কাসেম -পয়ান্দেহ (হতহরান, এনতেশারাতে এলমি ওয়া ফারহাঙ্গি ১৩৬৫)।
১২। তাবারী, মুহাম্মাদ বিন জারির -তারিখুর রাসূল ওয়াল মুলুক, গবেষণা মুহাম্মাদ আবুল ফাযল ইব্রাহীম; (বৈরুত, দারুত তুরাছ ১৩৭৮ হি: ) ১৪ হিজরির ঘটনায়।
১৩। মোতাহহারী, মোর্তজা -জিহাদ (শিরাজ, নাশরে নাভীদ ১৩৬৮) পৃ:৬৪।
১৪। ফুতুহ দার ইসলাম -ফাসল নামেহ তারিখে ইসলাম সংখ্যা: ২, ১৩৭৯।
১৫। সূরা বাকারা -২৫৬ لااكراه فى الدین ।
১৬। মোতাহহারী, মোর্তজা -জিহাদ (শিরাজ, নাশরে নাভীদ ১৩৬৮) পৃ:৫০।
১৭। ঐ পৃ: ৫১।
১৮। নাজ্জাশিও রাসূল (সা.) এর নির্দেশ মেনে নেয় এবং তার ইসলাম গ্রহণকে রাসূল (সা.) এর কাছে ঘোষণা করেন। তাবারী, মুহাম্মাদ বিন জারির -তারিখুর রাসূল ওয়াল মুলুক, গবেষণা মুহাম্মাদ আবুল ফাযল ইব্রাহীম; (বৈরুত, দারুত তুরাছ ১৩৭৮ হি: ) ১৪ হিজরির ঘটনায়।
১৯। হামিদুল্লাহ, মুহাম্মাদ- হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর রাজনৈতিক চিঠি ও চুক্তিসমূহ এবং ইসলামের প্রথম যুগের সনদসমূহ; অনুবাদক -সৈয়দ মুহাম্মাদ হোসাইনী (তেহরান, এনতেশারাতে সুরুশ -১৩৭৪) নাশরিয়েহ তারিখে ইসলাম, সংখ্যা: ৭।

http://www.taqrib.info/bengali/index.php?option=com_content&view=article&id=543:2011-08-09-20-58-28&catid=35:2009-09-01-07-54-01&Itemid=63

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY