অনাগত দিনের পূর্বাভাস

0
317

অনাগত দিনের পূর্বাভাস
হাফেজ মুিনর উদ্দীন আহমদ

আল্লাহ তায়ালা মানুষদের মাঝে কেন দিনের এই বিবর্তন ঘটান, কেন তিনি একই ধরনের মানুষদের হাতে একই ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক প্রভুত্ব ও সামাজিক কর্তৃত্ব বেশী দিন রাখেন না, সম্ভবত এই বাগানের মালিক একই মালি অনেক দিন ধরে তার বাগানের দেখাশোনা করুকÑ এটা পছন্দ করেন না। মালিক চান বাগানের শোভা বর্ধনের কাজটি বিভিন্ন মালি বিভিন্নভাবে আঞ্জাম দিক। কোনো মালি যদি নিজের অযোগ্যতার কারণে কখনো কোনো বাগান বিনষ্ট করে ফেলে, তাহলে নতুন মালি এসে তা শুধরে নেবে এবং সে অনুযায়ী ভাংগনের বদলে কিছুদিন বাগানে গড়ার কর্মকান্ড চলবেÑ এটাই সম্ভবত মালিক চান, আর চান বলেই এ বাগান সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যš মালি বদলের এই ভাংগা গড়া চলছে। এ বাগানে আসলে কারোই চিরস্থায়ী বন্দোব¯ নেই। আজ যাদের জমজমাট রাজঅভিষেক, কাল তাদেরই এই অভিষেক মঞ্চ থেকে অপমানকর বিদায়।
কিšু এ আগমন প্রস্থানের বিবর্তনে বাগানের নতুন মালি যদি পুরাতন মালির সাফল্য ব্যর্থতা থেকে কোনো রকম শিক্ষা গ্রহণ না করে, তাহলে অচিরেই তাকে সফলতার জয়মালার বদলে ব্যর্থতার গ্লানি বইতে হবে, আর এ ব্যাপারটাই হচ্ছে সম্ভবত ইতিহাসের সব কর্মকান্ডের মল দর্শন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হিল পর্যš সর্বত্রই এই দর্শন সমভাবে কার্যকর। এ জাতির ভবিষ্যত নিয়ে তারাও আমার মতো উদগ্রীব, উৎকণ্ঠিত, কিšু কেউই কোনো কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। বাঁচার আশায় যাদের কাছে তারা বার বার আশ্রয় নিচ্ছেন, তারা যেন তাদের আরো গভীরে ডুবিয়ে দিচ্ছে। সমস্যার এক চক্র থেকে বের হবার আগেই তারা আরেক চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এভাবেই গোটা জাতির মানুষগুলো যেন দিনে দিনে আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছে। সবার মুখে একই কথা, আসলেই কি আমাদের মুক্তির কোনো পথ নেই। আসলেই কি এই উদ্দেশ্যহীনতার অভিশাপ থেকে আমরা কোনোদিনই মুক্তি পাবো না।
মুক্তির সেদিনটি কবে আসবেÑ সে কথা আমি বলতে পারবো না; তবে কোনো জনগোষ্ঠী যখন এমনি এক যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়, তখন তাদের মুক্তির একটা পথ তাদের নিজেদেরই খুঁজে বার করে নিতে হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, আগামী দিনের সে রাজপথটির কিছু চড়াই উৎরাই ও সমস্যা সম্ভাবনার কথা বলার জন্যেই আমাদের এ প্রচেষ্টা, আর সামনের চড়াই উৎরাই পার হওয়ার জন্যে আমাদের পেছনের দিকেও ভালো করে তাকিয়ে দেখা দরকার। পেছনের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে তা আমাদের সামনের সফলতা নিশ্চিত করবে।
দেশের রাজনৈতিক দল আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে, তাদের নাম ধাম কর্মসচীতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে, কিšু আমাদের এ যমীনের ১৬ কোটি (২০ বছর পর হবে ২০ কোটি) মানুষের ভবিষ্যত তো আছে। তাদের সে ভবিষ্যত আমাদের কাছে আরো অনেক কিছুই দাবী করে। আগামী প্রজন্মের কোটি কোটি তরুণ তরুণী, যুবক যুবতীর জন্যে আমরা যে বাংলাদেশ রেখে যাবো, সে বাংলাদেশ নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে এবং ভাবতে হবে এখনি!
বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে সবার আগে প্রয়োজনÑ এ ময়দানে যারা যেখানে কাজ করছেন তাদের সবার কাজ কর্মের মাষে সমন¦য় সাধন করা। সমন¦য় সাধনের পর্ব শর্ত হচ্ছে, একে অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতির ভাব ফিরিয়ে আনা। শ্রদ্ধাভাব ফিরিয়ে আনতে না পারলেও ক্ষমাহীন তাচ্ছিল্যভাব পরিহার করা।
আমি এর আগেও বহুবার বলেছি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ যারা করছেন তাদের মনটাকে অন্যদের তুলনায় একটু বেশীই উদার করতে হবে। এই উদারতা না থাকলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা তো দরের কথা, কোনো কিছুই সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এ দেশে একমাত্র আমরাই ইসলামের কাজ করছিÑ এ ধারণা ইসলামের সার্বজনীন আবেদনকে যেমন ক্ষুণœ করে, তেমনি একই উদ্দেশে পরিচালিত অন্য কয়টি ইসলামী দল ও সংগঠনের সাথে আমাদের সহাবস্থানও কঠিন করে তোলে।
আবহাওয়া প্রযুক্তির বিপুল উন্নতির ফলে মানুষ এখন আগামী কয়দিনে পৃথিবীর কোথায় তাপমাত্রা কতো থাকবে, কোথায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে, কোথায় আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে, তা সহজেই বলে দিতে পারে। এ কাজের জন্যে কেউ আবহাওয়া বিভাগকে ‘ভবিষ্যত প্রবক্তা’ বলে না। কেননা আবহাওয়া বিভাগের এই ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপারে স্বয়ং তারাও একথা বলে না, এটা হবেই। তারাও জানে, ভবিষ্যতের এই নিশ্চয়তা কেউই দিতে পারে না। এ কারণেই তারা তাদের বুলেটিনে শুধু সম্ভাবনা ও আশংকার কথাই বলেন। তারপরও আবহাওয়া অফিস যদি বলে, আগামীকাল প্রবল ঝড় তুফানের আশংকা আছে, তাহলে আমরা যারা পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনে শুনিÑ সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই আগামীকাল ঘর থেকে বেরুবার আগে কিছুটা হলেও প্র¯ুতি নিয়েই বেরুবো। আবহাওয়াবিদদের আশংকা অনুযায়ী কোনো ঝড় তুফান না হলে কারোই কোনো ক্ষতি হবে না, কিšু তাদের কথানুযায়ী ঝড় তুফান হলে অসতর্ক অবস্থায় আমরা তার মোকাবেলা করবো কিভাবে?
স¤ক্স্রতি আমাদের দেশে যে বিরাট একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে গেলোÑ আগামী কয়েক বছর এর কি কি প্রভাব আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আশপাশের পরিমণ্ডলে পড়তে পারে, তার একটা ‘ফার ডিসটেন্ট রিডিং’ এখন যদি আমরা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী বছরগুলোতে এসব পরিস্থিতির মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। এ কাজটা যদি সংকীর্ণ দলীয় ভিত্তিতে বিবেচনা না করে জাতীয় ভিত্তিতে বিবেচনা করা হতো, তাহলে হয়তো বা আমাদের আজকের দিনটা গতকালের চাইতে একটু ভালো হতো।
বৃটিশদের শেষ সময়ের কথা বলছি। বিশেষ করে ১৯৩৬ সালে যখন ভারতীয় মুসলমানরা ব্যাপকভাবে মুসলিম লীগের পক্ষে তাদের ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে, সেদিন যদি মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের পরবর্তী ৩০/৪০ বছরের অবস্থা দেখার মতো দরদৃষ্টি থাকতো, তাহলে তারা আবেগতাড়িত না হয়ে ভবিষ্যতের ব্যাপারে আরো কিছু সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারতেন। একই অবস্থায় ভারত ভূখন্ডে যখন দুটো দেশ হয়েই গেলো, তখন এর স্থিতি, এর উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রচেষ্টার সাথে পরবর্তী ২০/২৫ বছরের সম্ভাব্য ঘটনাসমহের যদি কিছুটা হলেও আন্দায করা যেতো, তাহলে নিসন্দেহে আজ পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র আমরা দেখতে পেতাম। ২৫ বছর তো দরে থাক, ২৫ দিন কিংবা ২৫ ঘন্টা আগেও আমাদের অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেনি, এতো বড়ো একটি ঘটনা এ জাতির জন্যে অপেক্ষা করছে, কিšু আমরা না ভাবলে কি হবে, বিশ্বচরাচরে যা ঘটার তা ঘটেই যায়, কারো টের পাওয়া না পাওয়ার জন্যে দুনিয়ার ঘটনাপ্রবাহ অপেক্ষা করে না। তারপরও যখন এতো বড়ো ঘটনা ঘটলো, তখনও আমরা এই ঘটনা পরবর্তী ২০/২৫ বছরকে ইতিহাসের আয়নায় পড়তে পারিনি।
আজ আমাদের সামনে যে মহাঝড়ের পর্বাভাস রয়েছে, তা যেন আজ সময় থাকতেই আমরা ভালো করে পড়তে, পারি সে জন্যেই আমি পেছনের কথাগুলো বললাম। মনে রাখতে হবে, এবারও যদি আমরা ঝড়ের পর্বাভাস পড়তে ভুল করি, কিংবা সংকীর্ণ দলীয় গন্ডির বাইরের দিকে তাকাতে না চাই, অথবা যদি চাই গোটা দেশের মানুষ আমাদের দৃষ্টি দিয়ে জাতির ভবিষ্যত দেখতে শুরু করুক, তাহলে অচিরেই আমরা এক মহাপ্রলয়ের সম্মুখীন হবো। সে মহাপ্রলয়ের তান্ডবলীলা দেখার আগে আমার মনে হয় কিছুটা হলেও সতর্কতা প্রয়োজন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY