বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজা

0
466

বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজা
আবু সালেহ

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা ইয়াসরিব বা মদিনাতে হিজরতের দুই বছর পর অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরি থেকে রোজা মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয় বিধান হিসেবে প্রচলন হয়। ‘হে মোমিনরা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।

আয়াত নাজিল হলে মহানবী (সা.) তার সাহাবিদের রোজা পালন বিষয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে অবহিত করেন। তবে রোজা পালনের নির্দেশ মহানবী (সা.) এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম মানব জাতির জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন বিষয়টি এমন নয়। এর আগেও ওই ইবাদত মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিল। সূরা বাকারার ওই আয়াতে সেই বিষয়টিও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, মানব সভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতির মানুষও রোজা পালন করতেন। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই উপবাসব্রত উদযাপন বা রোজা পালনের বিধান রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ উদ্ভূত হিন্দু ধর্মে যেমন রয়েছে; তেমনি প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ধর্মীয় অনুশাসন হিসেবে রোজা পালনের বিধান বলবৎ ছিল। যোদ্ধা জাতি গ্রিক ও রোমান সভ্যতায়, হাম্মুরাবির আইন কোড খ্যাত ব্যবিলনীয় সভ্যতায়, আসুরউবলি্লতে প্রতিষ্ঠিত এসেরীয় সভ্যতায়, জরত্থুস্থ মতবাদের পীঠস্থান পারস্য সভ্যতায় রোজার প্রচলন ছিল। মহাবীর প্রবর্তিত জৈন ধর্মেও উপবাসব্রত পালনের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া প্রাচীন স্ক্যানডিনেভিয়া অঞ্চল, প্রাচ্য অঞ্চল, চীন ও তিব্বতের সভ্য মানুষ রোজা পালন করত। সভ্যতার ইতিহাসে খ্যাতিমান চিকিৎসক পেরিক্লাস ও হিপোক্রাটস বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় আগত রোগীদের চিকিৎসাপত্রে রোজা পালনের নির্দেশ দিতেন। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জন্মলগ্ন থেকেই রোজ বা উপবাসব্রতকে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। পিথাগোরাস পর্যায়ক্রমে ৪০ দিন রোজ বা উপবাস পালন করতেন এবং তিনি তার ছাত্রদেরও অনুরূপ আদেশ দেন। ছাত্রদের তার ক্লাসে প্রবেশের আগে রোজা পালন করতে হতো। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস ও প্লেটো ১০ দিন রোজা বা উপবাস পালন করতেন। প্লুটার্ককের রোজা বা উপবাস ছিল একদিনের।

ষোড়শ শতাব্দীর দিকে সুইডেনের খ্যাতিমান চিকিৎসক Paracelsus বলেন,Fasting is the greatest remedy। সতের শতকের বিখ্যাত চিকিৎসক ড. হোফম্যানের ্Description of the Magnificent Results Obtained Through Fasting in all Diseases গ্রন্থ মতে, প্রায় সব রোগের চিকিৎসায় রোজা বেশ কার্যকর সুফল দেয়। জার্মানির চিকিৎসক Dr. Adolph Mayer প্রায় অনুরূপ মন্তব্য করেন। তার মতে, ‘Fasting is the most efficient means of correcting any disease অষ্টাদশ শতকের রাশিয়ার খ্যাতনামা চিকিৎসক Dr. Von Seeland বলেন, ‘Fasting is a therapeutic of the highest degree possible অন্যদিকে Dr. Moeller মনে করেন, ‘Fasting is the only natural evolutionary method whereby through a systemic cleansing you can restore yourself by degrees to physiological normality প্রকৃতপক্ষে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি যুগেই খ্যতিমান ব্যক্তিরা রোজা পালনকে উৎসাহিত করেছে এবং তারা নিজেও রোজা পালন করেছেন।

রোজার প্রচলন প্রায় সব ঐশী ধর্মের বিধানাবলিতে পরিলক্ষিত হয়। ঐশী ধর্মের প্রবর্তক ও অনুসারীরা যে রোজা পালন করতেন সেই বিষয়ে অল্প-বিস্তর ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণও পাওয়া যায়। হজরত মুসা (আ.) ও তার উম্মতরা (পরে ইহুদি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে) রোজা পালন করতেন। তারা একটানা ৪০ দিন রোজা পালন করতেন। উম্মতে মুসা কলিমুল্লাহর মধ্যে মহররমের ১০ তারিখেও রোজা রাখার প্রচলন ছিল। ইহুদিরা এখনও দুঃখ বা শোকের চিহ্ন হিসেবে রোজা পালন করেন। মুসা (আ.) এর মতো দাউদ (আ.) কর্তৃক রোজা পালনের কথা জানা যায়। তিনি তার শিশুপুত্রের অসুস্থতার সময় সাত দিন রোজা পালন করেন। ঈসা (আ.)ও রোজা পালন করতেন। তিনি ৪০ দিন রোজা পালনের পর তার অনুসারীদের (বর্তমানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়) রোজা পালনের নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধও রোজা বা উপবাসব্রত পালন করতেন। পাকিস্তানের লাহোর জাদুঘরে উপবাস বা রোজা পালনরত বুদ্ধের একটি মূর্তি থেকে গৌতম বুদ্ধের উপবাস পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। জাহেলিয়া যুগে আরবের মানুষদের আল্লাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলেও তারা যে সব ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতি অনুসরণ করত, ওই ধর্মীয় বিধানাবলিতে রোজা পালনের প্রথাও প্রচলিত ছিল। রোজার বিধান সম্পর্কিত আল কোরআনের আয়াত নাজিল হওয়ার আগে উম্মতে মুহাম্মদি জাহেলিয়া যুগের অনুরূপ তিন দিন রোজা পালন করতেন।

তবে মহানবী (সা.) এর জন্মের আগে আরব উপদ্বীপের অধিবাসীরা ধর্মীয় অনুশাসন হিসেবে যে রোজা পালন করতেন, ওই রোজা পালনের ধরন ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রবর্তিত রোজার বিধানের বহু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। জাহেলিয়া যুগের অবাধ স্বাধীনতা রোজার ভাবমূর্তি ও প্রাণশক্তি সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করেছিল। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে মানুষের চেতনা ও ধর্মীয় রীতিনীতি তার মৌলিকত্ব হারালে অন্যান্য বিষয়ের মতো রোজাও নিছক একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ফলে রোজা পালনের মাধ্যমে যে আল্লাহর নৈকট্য লাভ, চারিত্রিক মহত্ত্ব অর্জন, নৈতিক পরিচ্ছন্নতা, চিন্তার বিশুদ্ধতা, আত্মিক পবিত্রতা প্রভৃতি বিষয়গুলো অন্তঃসারশূন্যতায় পরিণত হয়। বস্তুত, হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসারীদের জন্য রোজা পালনের তিনটি মহৎ উদ্দেশ্য [ক. তাকওয়া (খোদাভীতি) অর্জন, খ. আল্লাহর মাহাত্ম্যের প্রতি বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং মহান আল্লাহর শোকর আদায় করা] থাকলেও জাহেলিয়া যুগে রোজা পালনের মাধ্যমে ওইসব উদ্দেশ্য পূরণ একেবারেই অসম্ভব ছিল।

জাহেলিয়া যুগে আরবরা রমজান মাসকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করত। ইসলাম ধর্মেও রমজান মাসকে মহিমান্বিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘রমজান মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল। কোরআন মানুষের পথপ্রদর্শক এবং ধর্মপথ ও ন্যায়-অন্যায় বিচারের সুস্পষ্ট নিয়ামক।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

জাহেলিয়া যুগে বা প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে রোজা পালন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ প্রতিজন মুসলিমের ওপর ফরজ করা হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে জানা যায় না। তবে মহানবী (সা.) এর উম্মতের জন্য যে রোজার বিধান বলবৎ আছে তা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ মুসলিমের জন্য প্রজোয্য এবং ওই রোজা পালনের ওপর ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের যে এ মাসটি পায় সে যেন অবশ্যই রোজা পালন করে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

এছাড়া অন্য ঐশী গ্রন্থের অনুসারীরা নির্দিষ্ট সময় ছাড়াও অন্য সময়ে রোজা পালন করতেন কিনা সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে অনুপস্থিত। তবে উম্মতে মুহাম্মদি রমজান মাসের একমাস রোজা পালন ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে রোজা পালন করেন, শবেবরাত উপলক্ষে রোজা, দুই ঈদ-পরবর্তী রোজা প্রভৃতি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও তাঁর উম্মতকে রমজানের রোজা ছাড়াও অন্য মাসে রোজা পালনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘সবরের মাসের (রমজানের মাস) রোজা এবং প্রতি মাসের তিনদিনের (আইয়্যামে বীজ) রোজা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমদ)। উল্লেখ্য, মহানবী (সা.) প্রবর্তিত রোজার অনুশাসন সারা বিশ্বের মুসলিমরা মনে-প্রাণে মেনে চলে। তবে রোজা সংশ্লিষ্ট রীতিনীতিগুলো ইসলামের সম্প্রসারণ ও পরবর্তী মুসলিম বিশ্বের ঐক্য-সংহতি বজায় রাখতে খোলাফায়ে রাশেদিনের কোনো কোনো খলিফা প্রয়োজনবোধে সংস্কার করেছেন। যেমন_ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুখ (রা.) (৬৩২-৬৪৪ খ্রি.) ২০ রাকাত তারাবি নামাজ প্রবর্তন করেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মানব সভ্যতায় সত্যান্বেষী মানুষ যুগে যুগে রোজা পালন করেছেন; তাদের আত্মিক উন্নয়ন ও স্রষ্টার সানি্নধ্য লাভের আশায়। কখনও তারা ঐশী নির্দেশ অনুযায়ী রোজা পালন করে নিজের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর অন্যান্য আদেশ-নিষেধ পালন ও সুসংগঠিত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। আবার কখনও শয়তানের ধোঁকায় পথ হারিয়ে কেবল সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য সার হয়েছে। তবে যাই ঘটুক না কেন, রোজা এমন একটি ইবাদত; যা পৃথিবীর প্রথম মানব থেকে অদ্যাবধি পালন করা হচ্ছে। আর ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে যার তাৎপর্য, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব অপরিসীম।

– See more at: http://www.alokitobangladesh.com/culture/2014/06/29/81887#sthash.X1REd7K9.dpuf

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY