প্রশ্নোত্তরে: রোযা এবং সদকাতুল ফিতর, সেহরীর বিধান
ড. ইউসুফ আল তারদাওয়ী

প্রশ্ন: সেহেরী সম্পর্কে আমাদের বলুন। রোযা কবুল হওয়ার জন্যে সেহেরী খাওয়ার প্রয়োজন কিনা?
উত্তর: রোযা কবুল হওয়ার জন্যে সেহেরী খাওয়া শর্ত নয়। বরং সেহেরী খাওয়া সুন্নত। রসূল (স.) খেয়েছেন, আমল করেছেন এবং লোকদেরকে তাকিদ দিয়েছেন। হাদীসে রয়েছে, তোমরা সেহেরী খাও, কেননা সেহেরীতে বরকত রয়েছে। (বোখারী ও মুসলিম)
সেহেরী দেরী করে খাওয়াও সুন্নত। ইফতার তাড়াতাড়ি করাও সুন্নত। কারণ তাড়াতাড়ি ইফতার করা হলে ক্ষুধা পিপাসার কষ্ট কিছুটা কমে এবং রোযার কষ্টও অনেকটা লাঘব হয়। নি:সন্দেহে দ্বীন ইসলামে এবাদাতকে সহজ করেছে, যেন মানুষের মন এবাদাতের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হয়। সেই সহজ আমলসমূহের একটি হড়ে–, রসূল (স.)-এর এই তাকিদ যে, সেহেরী দেরী করে খাবে এবং ইফতার তাড়াতাড়ি করবে। রসূল (স.) এর অনুসরণে ফজরের আগে জাগ্রত হওয়া সওয়াবের কাজ। একটি খেজুর খেয়ে বা এক চুমুক পানি পান করলেও রসূল (স.)-এর সুন্নত আদায় করতে হবে।
সেহেরীতে একটি রুহানী ফায়দাও রয়েছে। ফজরের আগে ঘুম থেকে ওঠা। এই সময় অত্যন্ত মোবারক সময়। এই সময় আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের সন্নিকটে অবস্থান করেন। এই সময়ে নিজেদের খালেক ও মালেকের কাছে মোনাজাত করা, মাগফেরাতের দোয়া করা। এসব আমল কি বিছানায় শুয়ে কাটানোর সমান হতে পারে? আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি উল্লেখিত দুটি অবস্থার মধ্যে যমীন ও আসমানের মতো পার্থক্য বিদ্যমান।

রোযা রাখা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হওয়া
প্রশ্ন: রোযা রাখা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে কি রোযা ভেংগে যায়?
উত্তর: রোযা রাখা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভংগ হয় না। কারণ স্বপ্নদোষ এমন বিষয় যার ওপর বান্দার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই এমন কাজের জন্যে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দায়ী করেন না। রোযা অবস্থায় গোসল করা হলেও রোযা ভংগ হয় না। অনিচ্চাকৃতভাবে পানি যদি কানের ভেতর দিয়ে গলায় পৌঁছে যায় বা কুলি করার সময় যদি পানি গলায় পৌঁছে যায় তাতেও কিছু হয়না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
এ ব্যাপারে (আগে) যদি তোমাদের কোনো ভুল হয়ে থাকে তাহলে তাতে তোমাদের জন্যে কোনো স্পনাহ নেই, তবে যদি কেউ ইচ্চা করে এমন কিছু করে (তাহলে সে গোনাহগার হবে)। (সূরা আল আহযাব, আয়াত ৫)

বৃদ্ধ ব্যক্তি এবং গর্ভবতী মহিলার ক্ষেত্রে রোযার রোখছত
প্রশ্ন: কোনো বৃদ্ধ ব্যক্তির জন্যে কি রোযা না রাখা জায়েয? গর্ভবতী মহিলা রোযার রাখার কারণে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হবে এ রকম আশংকা করলে কি রোযা না রাখার সুযোগ পাবে? রোযা ভংগ করতে পারবে? রোযা রাখা অবস্থায় কি সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েয?
উত্তর: এ রকম বৃদ্ধ যাদের রোযা রাখা কষ্টকর তাদের জন্যে রোযা না রাখা জায়েয। যে রোগীর রোগ রোযার কারণে নিরাময় হওয়ার আশংকা থাকবে তার জন্যেও রোযা না রাখা জায়েয। তবে এ রকম রোগ হতে হবে যে, রোগে আক্রান্ত হলে রোযা রাখতে কষ্ট হয়। অথবা রোযা রাখার কারণে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা থাকে। এ রকম রোখছতের ভিত্তি হচ্চে কোরআনের নি¤েœাক্ত আয়াত। যে আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (জীবনকে) আসান করে দিতে চান। আল্লাহ পাক কখনোই তোমাদের (জীবনকে) কঠোর করে দিতে চান না। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আল্টাস (রা.) বলেন, বৃদ্ধ এবং মাযুর ব্যক্তিদের জন্যে নি¤েœাক্ত আয়াত নাযিল হয়েছে,
এরপরও যাদের ওপর (রোযা) একান্ত কষ্টকর হবে তাদের জন্যে এর বিনিময় (ফিদিয়া থাকবে এবং তা) হড়ে– একজন গরীব ব্যক্তিকে (ত™£প্তি ভরে) খাবার দেয়া, অবশ্য যদি কোনো ব্যক্তি (এর চাইতে বেশী) ভালো কাজ করতে চায় তাহলে সে যেন জেনে রাখে, এই (অতিরিক্ত) কাজ তার জন্যে ভালো, (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৪)
রোযা মাফ হওয়ার কারণে তাদের জন্যে ওয়াজেব হড়ে– যে, তারা প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একজন মেসকীনকে পেট পূর্ণ করে আহার করাবে।
গর্ভবতী মহিলা রোযা রাখলে যদি গর্ভের সন্তানের আশংকা দেখা দেয় তবে রোযা না রাখলেও চলবে। কারণ তার পেটে রয়েছে একটি মানব শিশু, সেই শিশুর হেফাযত করা মা হিসেবে তার কর্তব্য। এ রকম গর্ভবতী মহিলা একটি রোযার পরিবর্তে পরবর্তী সময় একটি রোযা কাযা করবে। কাজা করার পাশাপাশি মেসকীনকে খাবার খাওয়াতে হবে কি-না এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ওলামায়ে জমহুরের মতে, শুধুমাত্র রোযার কাযা আদায় করবে।
আমি মনে করি, যে মহিলা অল্পদিনের ব্যবধানে গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তার ক্ষেত্রে কাজা করার প্রয়োজন নেই, কেননা বাস্তব কারণে কাযা হওয়া সব রোযা পালন করা তার জন্যে কষ্টসাধ্য কাজ। কাজেই তার জন্যে কাযা হওয়ার প্রতিটি রোযার বিপরীতে একজন করে মেসকীনকে খাবার খাওয়ালেই চলবে। সুগন্ধি ব্যবহার সম্পর্কে সকল ফকীহরা ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, রোযা রাখা অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েয।
অপারেশন করার কারণে রোযা না রাখা
প্রশ্ন: আমার নানা রকম অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার আমাকে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। অপারেশনের দুই বছর পর আমি রোযা রাখতে শুষ্প করেছি। সেই রোযার কারণে আমার যথেষ্ট কষ্ট হয়েছে। আমি একজন সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। আমি কি রোযা না রেখে রোযার পরিবর্তে সদকা দিতে পারি?
উত্তর: সকল ফকীহ ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, রোগীর জন্যে রোযা মাফ। সুস্থ হওয়ার পর কাযা হওয়া রোযাসমূহের কাযা তার জন্যে ওয়াজেব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
যে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তী (কোনো সময়ে) স্পণে স্পণে সেই পরিমাণ দিন আদায় করে নেবে। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫)
তবে সকল রকম রোগের ক্ষেত্রে এই অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ এমন কিছু রোগ রয়েছে, যে রোগে রোযা রাখা হলে রোগীর ক্ষতি হয় না। যেমন কোমরে বা আংস্পলে ব্যথা ইত্যাদি। কিছু এমন রোগ রয়েছে, যেসব রোগে রোযা রাখা উপকারী। যেমন পেটের পীড়া।
এ রকম রোগে রোযা ভংগ করা জায়েয নয় বরং শুধু এমন রোগেই রোযা না রাখা জায়েয যে রোগের কারণে রোযা রাখা হলে রোগীর কষ্ট হয় অথবা রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা থাকে। এ রকম অবস্থায় রোযা না রাখা উত্তম। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও তীবন্দ কষ্ট সহ্য করে রোগাক্রান্ত অবস্থায় রোযা রাখা অপছন্দনীয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা এ রকম ব্যক্তির জন্যে সহজ উপায় জানিয়ে দিয়েছেন। তার উচিত আল্লাহর দেয়া সুযোগ গ্রহণ করা। রোগের কষ্টের কারণে যদি কোনো অঘটন ঘটে যায় তবে সে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
এবং (অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ গ্রাস করে) তোমাদের নিজেদের হত্যা করো না, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি মেহেরবান। (সূরা আন নেসা, আয়াত ২৯)
যেসব রোযা রাখা হয়নি সেসব রোযার ক্ষেত্রে করতে হবে? এর জবাব হড়ে– যে, রোগ দুই প্রকারের হয়ে থাকে। এক প্রকার রোগ হড়ে– সাময়িক। যে রোগ এক পর্যায়ে ভালো হয়ে যায়। এ রকম রোগের ক্ষেত্রে রোযা ভংগ করা হলে শুধুমাত্র কাফফারা করা যথেষ্ট হবে না, বরং রোযার কাযা করাও ওয়াজেব হবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
সে পরবর্তী (কোনো সময়ে) স্পণে স্পণে সেই পরিমাণ দিন আদায় করে নেবে। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫)
দ্ভিতীয়ত এমন রোগ যে রোগ সহসা আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ রকম দুরারোগ্য রোগের ক্ষেত্রে প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন করে মেসকীনকে খাবার খাওয়াতে হবে। কোনো কোনো ফকীহ যেমন ইমাম আবু হানিফার মতে খাদ্য খাওয়ানোর পরিবর্তে কোন মেসকীনকে আর্থিক সাহায্যও করা যাবে।
বেনামাযীর রোযা পালন
প্রশ্ন: বেনামাযীর রোযা কি পালিত হবে। নাকি সকল এবাদাত একটি অন্যটির সাথে সংযুক্ত, একটি আদায় করা না হলে অন্যটি কবুল হবে না?
উত্তর: প্রত্যেক মুসলমানের জন্যেই সকল এবাদাত বাধ্যতামূলক। যে কোনো একটি এবাদাত বাদ দেয়া হলে সেজন্যে মহান আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে হবে। একটি এবাদাত বাদ দেয়া হলে অন্য এবাদাত কবুল হবে কি-না এ বিষয়ে ফোকাহাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
১. কেউ বলেন, কেউ যদি একটি এবাদাত তরক করে তবে সে কাফের হয়ে যাবে। তার অন্য কোনো এবাদাত কবুল হবে না।
২. কেউ বলেন, শুধুমাত্র নামায রোযা ত্যাগ করা ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।
৩. কারো মতে, শুধুমাত্র নামায ত্যাগ করা ব্যক্তিই কাফের হবে, কেননা রসূল (স.) বলেছেন, বান্দার এবং কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হড়ে– নামায। (মুসলিম)
এই শেন্দণীর ফকীহদের মতে, যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করে তার রোযাও কবুল হবে না। কারণ সে কাফের। কাফেরের এবাদাত কবুল হয় না।
৪. কোনো কোনো ফকীহ বলেন, মুসলমান যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর একত্ব এবং রসূল (স.)-এর রেসালাতের ওপর পূর্ণ বিশ^াস পোষণ করে, ততোক্ষন পর্যন্ত কোনো এবাদাত তরক করা হলে সে কাফের হবে না। তবে শর্ত হড়ে– সে এবাদাত সম্পর্কে ঠাট্টা বিদন্দ∆প করতে পারবে না এবং এবাদাত অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই একটি এবাদাত তরক করার কারণে অন্য এবাদাত কিছুতেই নষ্ট হতে পারে না।
আমি মনে করি শেষোক্ত অভিমতই গ্রহণযোগ্য। কাজেই যে ব্যক্তি অলসতার কারণে কোনো একটি এবাদাত পালন করে না, তার অন্যান্য এবাদাত ইনশাআল্লাহ কবুল হবে। তবে তার ঈমান অসম্পূর্ণ এবং তার ঈমান দুর্বল বলতে হবে।
যে এবাদাত সে পালন করেনি সেই এবাদাত পালন না করার কারণে সে স্পনাহগার হবে। আল্লাহর কাছে তাকে শাস্তি পেতে হবে। মোটকথা একটি নেকী না করার কারণে অন্য নেকী নষ্ট হবে না। যে নেকী সে করেছে, তার উত্তম বিনিময় পাবে, আর যে পাপ করেছে সে জন্যে মন্দ বিনিময় পাবে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
অতএব যে ব্যক্তি একটি অণু পরিমাণও কোনো ভালো কাজ করবে (সেদিন) তাও সে দেখতে পাবে, (ঠিক তেমনি) কোনো মানুষ যদি অণূ পরিমাণ খারাপ কাজও করে, তাকেও সে (তার চোখের সামনে) দেখতে পারে। (সূরা আযৎ যেলযাল, আয়াত ৭-৮)
রোযার ওপর স্পনাহর প্রভাব
প্রশ্ন: যে রোযা পালনকারী রোযা রেখে গীবত করে, মিথ্যা কথা বলে, অথবা গায়রে মোহরেম নারীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকায় তার জন্যে শরীয়তের বিধান কি?
উত্তর: রোযা কল্যাণকর এবং বিনিময়যোগ্য আমল। রোযা মানুষকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং ভালো কাজে আগ্রহী করে। অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
হে মানুষ তোমরা যারা ঈমান এনেছো তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা (আল্লাহ তায়ালাকে) ভয় করে চলতে পারো। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৩)
রোযাদারের জন্যে জষ্পরী হড়ে– নিজের রোযাকে সকল প্রকারের পাপের কলুষ কালিমা থেকে মুক্ত। এর ফলে রোযার মাধ্যমে শুধুমাত্র ক্ষুধা পিপাসায় কষ্টই তার স¤œল হবে না এবং রোযার বিনিময় থেকে সে বঞ্চিত হবে না। রসূল (স.) বলেছেন, অনেক রোযাদার এমন রয়েছে, যারা রোযা রাখার কারণে শুধু ক্ষুধা ত™£ড়–াই পেয়ে থাকে। (নাসাঈ, ইবনে মাজা ও হাকেম)
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আমল করা ত্যাগ করে না তার খানাপিনা ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বোখারী, আহমদ, আসহাবে সুনান)
এ কারণে ইমাম ইবনে হাযাম বলেছেন, মিথ্যা কথা বললে, গীবত করলে এবং এ জাতীয় অন্যান্য পাপ করা হলে রোযা ভেংগে যায়। আর এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম, সালফে সালেহীন তাদের রোযার হেফাযতের জন্যে সর্তক থাকতেন। পানাহার ত্যাগ করার পাশাপাশি পাপ কাজ থেকেও তারা নিজেদেরকে বিরত রাখতেন। হযরত ওমর (রা.) বলেন, শুধু পানাহার ত্যাগ করার নামই রোযা নয়, বরং মিথ্যা বলা, মন্দ কাজ এবং বাতুল আচরণ থেকে দূরে থাকার নামই হড়ে– রোযা।
আমরা মনে করি যে, বাহুল্য কথা বলা হলে রোযা যদিও ভংগ হয় না, তবে রোযার উষ্কেশ্য বিনষ্ট হয় এবং রোযাদার রোযার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ রোযার জায়গায় রোযা থাকে, পাপের কাজের জায়গায় পাপের কাজ থাকে। একটি নেকী অন্যটি মন্দ। কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষ নিজের ভালো কাজের এবং মন্দ কাজের হিসাব দেবে। এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্যে নি¤েœাক্ত হাদীসের প্রতি মনযোগ দিন।
হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন, একজন সাহাবী রসূল (স.)-এর কাছে এসে বলেন, আমার কাছে কয়েকজন ক্রীতদাস আছে, তারা আমার কথা শোনে না, আমার অবাধ্যতা করে। আমি তাদেরকে গালাগাল করি এবং প্রহার করি। কেয়ামতের দিন তাদের সাথে আমার হিসাব কিতাব কেমন হবে? রসূল (স.) বলেন, সেই ক্রীতদাসেরা তোমার সাথে কতোটা নাফরমানী করেছে এবং তোমার কতোটা খেয়ানত করেছে, আর তুমি তাদেরকে যতোটা শাস্তি দিয়েছো তার সব কিছুরই হিসাব করা হবে। যদি তাদেরকে অবাধ্যতার তুলনায় তোমার শাস্তি কম হয়ে থাকে তবে সেটা তোমার জন্যে ভালো হবে, যদি তাদের অবাধ্যতা এবং তোমার শাস্তি সমান হয়ে থাকে তবে হিসাব কিতাব সমান সমান হবে। তবে যদি তাদের অবাধ্যতার মোকাবেলায় তোমার শাস্তি বেশী হয় তবে সেই অনুপাতে তোমার নেকী সেই ক্রীতদাসদের দেয়া হবে। এ কথা শুনে সেই সাহাবী কাঁদতে লাগলেন। রসূল (স.) তাকে বললেন, তুমি কোরআনের এই আয়াত পাঠ করো,
কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের জন্যে একটি মানদস্ক স্থাপন করবো, অতপর (সেদিন) কারো ওপরই কোনো রকম যুলুম করা হবে না। যদি (ওযন করার মতো) সামান্য শষ্যদানা পরিমাণ (আমলও কারো কাছে) থাকে তাকেও আমি (ওযনের পাল্লায়) এনে হাযির করবো। হিসাব নেয়ার জন্যে আমিই যথেষ্ট। (সূরা আল আ¤িœয়া, আয়াত ৪৭)
এই আয়াত শোনার পর সাহাবী তার সকল ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দিলেন।
ফজরের আযান শুনেও সেহেরী খেতে থাকা
প্রশ্ন: বিশেষ কোনো কারণে কেউ যদি দেরীতে খেতে বসে এবং তখন যদি ফজরের আযান শোনা যায় তবে কি আহার বন্ধ করে দেবে নাকি আযান শেষ হওয়া পর্যন্ত পানাহার করতে পারবে?
উত্তর: আযান সঠিক সময়ে হড়ে– এ কথা বোঝার সাথে সাথে সেহেরী খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। এমনকি যদি খাদ্যের লোকমা মুখে থাকে তবে লোকমা ফেলে দিতে হবে। এর ফলে নিশ্চিন্তভাবে তার রোযা সহীহ হবে। তবে যদি নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায় যে, আযান সঠিক সময়ের আগে দেয়া শুষ্প হয়েছে, তবে আযান শোনার পরও পানাহার চালিয়ে যাবে। আযানের সঠিক সময় নিষ্পপণের জন্যে ঘড়ি ক্যালেস্কার বা সেহেরীর সময়সূচী দেখা যেতে পারে। বর্তমানে এসব কিছুই অত্যন্ত সহজলভ্য।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আল্টাস (রা.)কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলো যে, সেহেরী খাওয়ার সময়ে যদি সন্দেহ দেখা দেয় যে, ফজরের সময় হয়ে গেছে, তবে কি আমি সেহেরী খাওয়া ছেড়ে দেবো? তিনি জবাবে বলেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত সন্দেহ থাকে যে, ফজরের সময় হয়েছে নাকি হয় নি, ততোক্ষণ পর্যন্ত খেতে থাকো। যখন নিশ্চিত হবে যে, ফজরের সময় হয়ে গেছে তখন খাওয়া বন্ধ করবে। ইমাম আহমদ বিন হা¤œলও একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
ইমাম নযদী বলেন, শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারীরা সন্দেহজনক সময়েও পানাহার চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা কোরআনের নি¤েœাক্ত আয়াত থেকে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
তোমরা পানাহার অব্যাহত রাখতে পারো যতোক্ষণ পর্যন্ত রাতের অন্ধকার রেখার ভেতর থেকে ভোরের শুভ্র আলোক রেখা পরিষ্কার হয়ে না আসে। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৭)
এই আয়াতে নিশ্চিত বিশ^াসের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হড়ে– নিশ্চিতভাবে যখন কোনো বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাচ্ঞ যখন কোনো প্রকার সন্দেহ থাকবে না, বরং নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যাবে যে, ফজরের সময় হয়ে গেছে।
সদকায়ে ফেতের কোথায় দেবো
প্রশ্ন: আমার প্রশ্ন সদকায়ে ফেতের সম্পর্কে। কেউ রমযানের দুই ত™£তীয়াংশ রোযা একটি শহরে পালন করেছে। তারপর ঈদের কয়েকদিন আগে অন্য শহরে চলে গেছে। সেই শহরে সে ঈদও পালন করেছে। এমতাবস্থায় সে কোন শহরে সদকায়ে ফেতের আদায় করবে?
উত্তর: সদকায়ে ফেতের সেই শহরে দিতে হবে যে, শহরে ঈদের চাঁদ রাত পেয়েছে। কারণ সদকায়ে ফেতেরের কারণ রমযানের রোযা নয় বরং রোযা শেষ হওয়া। সেই কারণেই একে সদকায়ে ফেতের বলা হয়। যে ব্যক্তি রমযানের শেষ রোযার দিন সন্ধ্যার আগে মৃত্যুবরণ করে তার উপর সদকায়ে ফেতের ওয়াজেব হবে না। যদি ঈদের চাঁদ উদয় হওয়ার পর অর্থাচ্ঞ ঈদের আগের রাতে কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে তার জন্যে সদকায়ে ফেতের ওয়াজেব। অথচ সেই শিশু রমযানের একটি দিনও পায়নি। এ বিষয়ে সকল ফেকাহবিদ একমত। সদকায়ে ফেতেরের সম্পর্ক ঈদ এবং ঈদের খুশীর সাথে। এই সদকার উষ্কেশ্য হড়ে– গরীব মেসকীনরা যেন ঈদের খুশীতে অংশগ্রহণ করতে পারে। হাদীসে রয়েছে, রসূল (স.) বলেছেন, সেদিন ওদেরকে অর্থাচ্ঞ গরীব মেসকীনদেরও ধনী বানিয়ে দাও।
মসজিদে মহিলাদের তারাবীহ নামায আদায়
প্রশ্ন: কতিপয় মহিলা নিয়মিত মাসজিদে তারাবীহর নামায আদায় করেন। তাদের মধ্যে কিছু বিবাহিত মহিলা এমনও রয়েছেন, যারা স্বামীদের অনুমতি না নিয়েই মাসজিদে তারাবীহ আদায়ের জন্যে বেরিয়ে যান। কোনো কোনো মহিলা মাসজিদে গিয়ে উ”স্বরে কথা বলেন, মাসজিদে গিয়ে মহিলাদের তারাবীহ নামায আদায় করা কি ওয়াজিব?
উত্তর: তারাবীহ নামায পুষ্পষ মহিলা কারো ওপরেই ওয়াজিব নয় বরং তাবারীহ নামায হড়ে– সুন্নত, আল্লাহ তায়ালা এই নামাযের বিনিময়ে অসামান্য পুরস্কার এবং সওয়াবের ব্যবস্থা রেখেছেন। হাদীসে নববীতে রয়েছে, হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি রমযানের রাতে ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে তারাবীহর নামায আদায় করবে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (বোখারী ও মুসলিম)
মহিলাদের জন্যে জন্যে নিজেদের ঘরেই রমযানের তারাবীহর নামায আদায় করা অধিক উত্তম। যদিও মাসজিদে গিয়ে মহিলারা শুধু তারাবীহর নামাযই আদায় করে না বরং অন্যান্য অনেক সওয়াবের কাজ যেমন ওয়ায ও যেকেরের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে অথবা দরসে কোরআন দরসে হাদীস দ্ভারা উপক™£ত হয় অথবা ভালো কোনো কারীর কোরআন পাঠ শন্দবণ করে। এ রকম অবস্থায় মহিলাদের মাসজিদে যাওয়া এবং নামায আদায় করা উত্তম। কারণ এ রকম ক্ষেত্রে নামায আদায় ছাড়াও অন্যান্য নেকী অর্জনও উষ্কেশ্য থাকে। এসব এ কারণেও প্রয়োজন যেহেতু বর্তমান যুগে স্বামীরা স্ত্রীদেরকে দ্ভীনী শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে মনযোগ দেয় না। কাজেই মহিলাদের মাসজিদে গিয়ে তারাবীহ নামায আদায় করার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা অধিক উত্তম। যদি ঘরে বসে থাকে তবে মাসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের যে রকম আগ্রহ থাকে, ঘরে থাকার কারণে সে রকম আগ্রহ থাকবে না।
তবে যে কোনো অবস্থায়ই স্বামীর অনুমতি নিয়েই মহিলাদের মাসজিদে যেতে হবে। স্বামীদের উচিত স্ত্রীদের মাসজিদে যেতে বাধা না দেয়া। তবে যদি শরীয়ত সম্মত ওযর থাকে তবে ভিন্ন কথা।
রসূল (স.) বলেছেন, আল্লাহর দাসীদেরকে (মহিলাদের) মাসজিদে যেতে বাধা দিও না। (মুসলিম)
শরীয়সম্মত ওযর যেমন স্বামী অসুস্থ, স্ত্রীর সেবা যতœ তার প্রয়োজন। ঘরে ছোটো শিশু রয়েছে, তাদের একা ঘরে রেখে যাওয়া সমীচীন নয় ইত্যাদি।
শিশুরা যদি মাসজিদে গিয়ে হৈ চৈ করে এবং নামাযীদেরকে পেরেশানি করে তবে শিশুদেরকে তারাবীহ নামাযের জন্যে মাসজিদে নেয়া আদৌ সমীচীন নয়। কারণ তারাবীহ হড়ে– দীর্ঘ নামায, এতো দীর্ঘ সময় শিশুদের পক্ষে চুপচাপ থাকা মুশকিল। পক্ষান্তরে পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামাযের সময় লাগে কম। মহিলারা মাসজিদে গিয়ে কথা বললে এক্ষেত্রে পুষ্পষদের মতোই বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অর্থাচ্ঞ মাসজিদে গিয়ে উ”স্বরে কথা বলা পুষ্পষদের জন্যেও উচিত নয়, মহিলাদের জন্যেও উচিত নয়।
একটি বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এমন কিছু পুষ্পষ রয়েছেন যারা মহিলাদের ব্যাপারে অধিক কঠোর হয়ে ওঠেন। এমনকি মহিলাদের ওপর কষ্টদায়ক বিধিনিষেধ আরোপ করেন। মহিলাদের কোনো অবস্থায় মাসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেন না। অথচ বর্তমানে মাসজিদে মহিলাদের জন্যে নিরাপদ আলাদা নামাযের ব্যবস্থা রয়েছে। রসূল (স.)-এর সময় মহিলাদের জন্যে আলাদা নামাযের ব্যবস্থা ছিলো না। এ রকম কিছু পুষ্পষও রয়েছেন যারা মহিলাদের মাসজিদে ফিসফিস করে কথা বলারও অনুমতি দেন না, অথচ নিজেরা মাসজিদে উ”স্বরে কথা বলতে থাকে। আমি তাদের উষ্কেশ্যে বলতে চাই, ব্যক্তিত্ববোধ একটি ভালো স্পন, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করা মোটেই পছন্দনীয় কাজ নয়। রসূল (স.) বলেছেন, এমন কিছু আ—গমর্যাদাবোধ রয়েছে, যেসব আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূল (স.) অপছন্দ করেন।
বর্তমান যুগ নতুন মহিলাদের জন্যেও নতুন জীবনের দ্ভার খুলে দিয়েছে। বর্তমান যুগে মহিলারা ঘর থেকে বেরিয়ে স্কুল, কলেজ, বাজারে সর্বত্র যাতায়াত করে। কিন্তু আল্লাহর যমীনের সবচেয়ে উত্তম জায়গা মাসজিদে যাওয়া থেকে মহিলারা বঞ্চিত রয়েছে। তথাপি কোনো রকম দ্ভিধা না করেই বলতে চাই, মহিলাদের জন্যেও মাসজিদের দ্ভার প্রশস্ত করে দিন। তারাও যেন মাসজিদের দরসে কোরআন, দরসে হাদীস থেকে শিক্ষা অর্জন করতে পারে। আল্লাহর বরকত অর্জনের সুযোগ তাদেরকেও দিন। তবে শর্ত হড়ে– যে, মহিলারা মাসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই পর্দা ও শৃংখলা রক্ষা করে মাসজিদে যাবে।
রোযা রাখা অবস্থায় টেলিভিশন দেখা
প্রশ্ন: রমযানে রোযাদারের টেলিভিশন দেখা শরীয়তের দৃষ্টি বৈধ কিনা?
উত্তর: টেলিভিশন প্রক™£তপক্ষে অন্যতম প্রচার মাধ্যম। এর ভালো দিকও রয়েছে, মন্দ দিকও রয়েছে। এটা ভালোকাজে ব্যবহার হবে, না মন্দ কাজে তা নির্ভর করে এস্পলোর নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর উপর। অন্যান্য প্রচার মাধ্যম যথা সংবাদপত্র, সাময়িকী, রেডিও ইত্যাদির মধ্যে যেমন ভালো মন্দ দিক রয়েছে, টেলিভিশনও সেই রকম। মুসলমানদের উচিত এর ভালো দিক থেকে উপক™£ত হওয়া, মন্দ দিক থেকে দূরে থাকা। এটা রোযা না রাখা উভয় অবস্থায়ই করতে হবে। রোযাদারের জন্যে কর্তব্য হড়ে–, রমযান মাসের স্পষ্পত্বের কথা চিন্তা করে এই মাসে নিজেকে মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখার জন্যে বিশেষভাবে চেষ্টা করা। ভালো কাজের প্রতি যতোটা সম্ভব বিশেষ স্পষ্পত্ব দেয়া।
টেলিভিশন দেখা এমনিতে হারামও নয় আবার হালালও নয়। হারাম হওয়া এবং হালাল হওয়া নির্ভর করছে, আমরা কি ধরনের প্রোগ্রাম দেখছি তার ওপর। যদি প্রোগ্রাম ভালো জিনিসের হয় যেমন ধর্মীয় প্রোগ্রাম, নিউজ প্রোগ্রাম হয় অথবা কোনো কল্যাণকর তথ্যভিত্তিক প্রোগ্রাম, তবে দেখা সম্পূর্ণ জায়েয। কিন্তু যদি অশ্লীলতাযুক্ত প্রোগ্রাম হয় তবে দেখা নাজায়েয। রমযান মাসে এবং অন্য সময়েও। তবে রমযান মাসে অশ্লীলতাযুক্ত প্রোগ্রাম দেখা অধিক স্পনাহ হবে। তাছাড়া টেলিভিশন দেখার প্রতি কেউ যদি এতো বেশী মনোযোগী যে একারণে নামায বা অন্য এবাদাতে অমনোযোগীতা সৃষ্টি হয় তবে তার জন্যে টেলিভিশন দেখা জায়েয নয়। আল্লাহ তায়ালা মদ এবং জুয়া হারাম ঘোষণা করার সময় উল্লেখ করেছেন যে, এ দুটি জিনিস মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে অমনযোগী করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
শয়তান তো চায়ই এই মদ ও জুয়ার দ্ভারা তোমাদের মাঝে একটা শত্র∆তা ও বিদ্ভেষ সৃষ্টি করে দিতে এবং এভাবে (এ চক্করে ফেলে) সে তোমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও নামায থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, তোমরা কি এ কাজ থেকে ফিরে আসবে না? (সূরা আল মায়েদা, আয়াত ৯১)
তারাবীহ নামায তাড়াতাড়ি আদায় করা
প্রশ্ন: তারাবীহর নামায তাড়াতাড়ি এবং দন্দ∆তবেগে আদায় করা যায় কি?
উত্তর: আল্লাহ তায়ালা রমযানের দিনের বেলায় রোযা রাখা আমাদের জন্যে ফরয করেছেন এবং রাতে নফল নামায অর্থাচ্ঞ তারাবীহ নামায আদায় করার তাকীদ করেছেন। এ সকল এবাদাত যেন আমাদের পাপ মার্জনার কারণ হতে পারে সেজন্যই এ রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হড়ে–, কোন নামাযে পাপ মার্জনা হতে পারে? আমার বিশ^াস শুধু সেসব নামাযই পাপ মার্জনার উপায় হতে পারে, যে নামাযের আরকান, আদব এবং শর্তসমূহের প্রতি পুরোপুরি খেয়াল রাখা হয়। একথা সবাই জানে যে, শান্তমনে ধীরে সুস্থে নামায আদায় করাও নামাযের আরকানের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে রসূল (স.) বলেছেন, যাও পুনরায় নামায আদায় করো, কারণ তোমার নামায হয়নি।
রসূল (স.) এরপর সেই ব্যক্তিকে শিক্ষা দিয়েছেন কিভাবে ধীরে সুস্থে নামায আদায় করতে হয়।৩
নিসন্দেহে (সে সব) ঈমানদার মানুষরা মুক্তি পেয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে একান্ত বিনয়াবনত (থাকে), (সূরা আল মোমেনুন, আয়াত ১-২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, খুশুখুযু অর্থাচ্ঞ বিনয় ও নমন্দতার সাথে যে নামায আদায় করা হয় সেই নামাযই সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়। বিনয় ও নমন্দতা দুই প্রকার। একটি বিনয় হড়ে– অন্তরের। মনে মনে এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, আমি এমন সত্ত্বার সামনে দাঁড়িয়েছি, এমন এক সত্ত্বার সাথে কথা বলছি, যিনি আমার যাবতীয় কর্মতচ্ঞপরতা লক্ষ্য করছেন। আমরা যা কিছু পাঠ করবো সেসব বুঝে শুনে পাঠ করবো, এটাও অন্তরের বিনয় বা খুশুখুযু। এ রকম যেন না হয় যে, মুখে আল্লাহর কালাম পাঠ করা হড়ে– অথচ মন অন্য চিন্তায় বিভোর।
খুশুখুযু অর্থাচ্ঞ বিনয় ও নমন্দতার আরেকটি দিক হড়ে– দেহের খুশুখুযু। সেটি হড়ে– নামায আদায়ের সময় নামাযের সম্মান ও আদব রক্ষা করা। নামায আদায়ের সময় এদিক সেদিক দেখা, ঝটপট ষ্পকু সাজদা করা, বারবার দেহ চুলকানো, পোশাক নিয়ে খেলা করা এইসব নামাযের আদব এবং নামাযের সম্মানের পরিপন্থী।
সকল মুসলমান ভাইদের উষ্কেশ্যে আমি নসিহত করছি, আমরা যখন নামায আদায় করবো তখন যেন এ কথা খেয়াল রাখি যে, আমরা কার সামনে দাঁড়িয়েছি এবং কার সাথে কথা বলছি। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, তিনি আমাদেরকে দেখতে পাড়ে–ন। নামায এমনভাবে আদায় করা যে, একটি কঠিন সমস্যার সমাধান হয়েছে অথবা একটি ভারী বোঝা মাথায় ছিলো সেই বোঝা দুর করলাম, এ রকম চিন্তা করা নামাযের আদব এবং উষ্কেশ্যের পরিপন্থী। অনেক লোক রয়েছে, যারা রমযানের বিশ রাকাত তারাবীহর নামায সামান্য সময়ের মধ্যে শেষ করে। কোরআন খুব তাড়াতাড়ি পাঠ করে যেন কম সময়ে নামায শেষ করে দেয়া যায়। শান্তভাবে ধীরে সুস্থে ষ্পকু সাজদা করে না, খুশুখুযুর প্রতি লক্ষ্য রাখে না। এ রকম নামায সম্পর্কে রসূল (স.) বলেছেন, এই নামায আকাশের দিকে এবং অন্ধকার অবস্থায় যায়। নামায আদায়কারীকে সেই নামায বলে, আল্লাহ তোমাকে Ÿংস কষ্পন যেমন তুমি আমাকে Ÿংস করেছো।
খুশুখুযু বা বিনয় ও নমন্দতার সাথে যারা তারাবীহর নামায আদায় করে না তাদের উষ্কেশ্যে আমার নসিহত হড়ে– যে, খুশুখুযুর সাথে আদায় করা আট রাকাত নামায তাড়াহুড়ো করে আদায় করা বিশ রাকাতের চেয়ে হাজারো স্পনে উত্তম। যদি বিশ রাকাত আদায় করা কষ্টকর হয় তবে আট রাকাতই আদায় কষ্পন। তবুও খুশুখুযুর প্রতি যতœবান হোন। আল্লাহ তায়ালা এটা দেখেন না যে, কতো রাকাত আদায় করেছেন বরং তিনি খুশুখুযু দেখেন। আল্লাহর ক্ষমা এবং রহমত এই খুশুখুযুর কারণেই পাওয়া যায়।
হায়েয বিল¤িœত করার জন্যে পিল ব্যবহার
প্রশ্ন: রমযান মাসের বরকত ও কল্যাণ সম্পর্কে কে না জানে? এই বরকত ও কল্যাণ পুরোপুরি পাওয়ার আশায় আমাদের অর্থাচ্ঞ মহিলাদের ইড়–া হয় একটি রোযাও যেন কাযা না হয়। প্রতি মাসের এ রকম কয়েকটি দিন আসে, যখন আমরা মহিলারা নামায আদায় করতে পারি না, রোযাও রাখতে পারি না। আমাদের জন্যে কি জায়েয হবে যে, আমরা হায়েয কয়েকদিন বিল¤িœত করার জন্যে কোনো ওষুধ ব্যবহার করবো? এর ফলে আমাদের একটি রোযাও কাযা হবে না। কোনো কোনো মহিলা এ রকম ওষুধ ব্যবহার করেছেন এবং এতে তাদের কোনো ক্ষতিও হয়নি।
উত্তর: সকল ওলামাদের এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, হায়েযের দিনসমূহে রোযা, নামায দুটোই মাফ। তবে রোযা কাযা করতে হবে। এর কারণ হড়ে– হায়েযের সময়ে মহিলাদের শারীরিক দুর্বলতা অনুভূত হয় এবং তারা ক্লান্তি অনুভব করে। আল্লাহ তায়ালা হায়েযের সময়ে মহিলাদের প্রতি রহমতস্ব™£প তাদের কষ্টের বোঝা সহজ করে দিয়েছেন।
হায়েযের সময় বিল¤িœত করার জন্যে ওষুধ ব্যবহার সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হড়ে–, এটা প্রক™£তির সাথে যুদ্ধ করার শামিল। সকল বিষয় প্রক™£তিসম্মতভাবে সম্পন্ন হতে দেয়াই উত্তম। মহিলাদের হায়েয হওয়া একটি প্রক™£তিগত বিষয়। আল্লাহ তায়ালা সেই স্বভাবগত বিষয়ের ওপর মহিলাদের সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালাই হায়েযের সময়ে মহিলাদের জন্যে নামায ও রোযা মওকুফ করেছেন। কাজেই আমাদের উচিত হড়ে–, আল্লাহর সৃষ্ট ফিতরাতের বা স্বভাবপ্রক™£তির সামনে মাথা নত করে দেয়া। তবে এ রকম ওষুধ ব্যবহার করা আমি নাজায়েয বলতে চাই না। যদি এ রকম ওষুধ থেকে থাকে, যে ওষুধ সেবন করা হলে হায়েয বিল¤িœত করা যায়, তবে সে ওষুধ শর্ত সাপেক্ষে ব্যবহার করা যাবে। শর্ত হড়ে– যে, রোযা কাযা না করার নিয়ত থাকতে হবে এবং সে ওষুধ স্বাস্থের জন্যে ক্ষতিকর হলে চলবে না।
শাবান মাসে কাযা রোযা রাখা
প্রশ্ন: গত রমযানের ছয়টি রোযা আমি শাবান পালন করতে পারিনি। এবার শাবান মাসের শেষ দশকে আমি সেই কাজা রোযা পালন শুষ্প করেছি। দুই তিনটি রোযা রেখেছি এরই মধ্যে লোকজন বলাবলি করছে যে, শাবান মাসে কাযা রোযা রাখা জায়েয নয়। একথা কি সত্যি?
উত্তর: কাযা রোযা যে কোনো মাসেই রাখা যায়। এতে শাবান বা শাওয়ালের কোনো শর্ত নেই। হযরত আয়শা (রা.) অনেক সময় কাযা রোযা শাবান মাসে পালন করতেন এ রকম বর্ণনা রয়েছে। কাজেই আপনি শাবান মাসে কাযা রোযা রাখতে পারেন। ইনশাআল্লাহ আপনার রোযা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে।
রোযা অবস্থায় ইনজেকশন গ্রহণ
প্রশ্ন: রোযা রাখা অবস্থায় ইনজেকশন গ্রহণ করা কি জায়েয?
উত্তর: যে ইনজেকশান খাদ্যনালীতে পৌঁছে না অথবা বলা যায় যে ইনজেকশনের উষ্কেশ্য রোগীকে খাদ্য সরবরাহ করা নয়, সে রকম ইনজেকশন গ্রহণে রোযার ক্ষতি হয় না। এই বিষয়ে সকল আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে।
যেসব ইনজেকশনের উষ্কেশ্য হড়ে– রোগীকে খাদ্য সরবরাহ করা। যেমন গ্লুকোজ, ইনজেকশন, এস্পলো ব্যবহার সম্পর্কে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। রসূল (স.)-এর সময়ে এবং সালফে সালেহীনের সময়ে এ রকম ইনজেকশনের প্রচলন ছিলো না। ইনজেকশন হড়ে–, আধুনিক যুগের আবিষ্কার। একদল ওলামা মনে করেন, গ্লুকোজ স¤œলিত ইনজেকশন ব্যবহারে রোযা ভংগ হয়। অন্য একদল ওলামা রোগাক্রান্ত অবস্থায় রোগীর জন্যে এ রকম ইনজেকশন ব্যবহার জায়েয বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
উপরোক্ত মতামতের দ্ভিতীয় মতামতকে গ্রহণ করলেও আমার অভিমত হড়ে–, রোযা রাখা অবস্থায় এ রকম ইনজেকশন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। একান্ত বাধ্য হলে রমযানের রাত্রিকালে ওরকম ইনজেকশন গ্রহণ করা যেতে পারে। দিনের বেলায় ওরকম ইনজেকশন ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়া প্রসংগে আমার মতামত হড়ে– যে, এ রকমের রোগীদের জন্যেই আল্লাহ তায়ালা রমযানের রোযা মাফ করেছেন। এ রকম ইনজেকশন দ্ভারা খাদ্যনালীতে সরাসরি কোনো খাদ্য পৌঁছে না ঠিকই তবে দেহে সজীবতা এবং শক্তি তৈরী হয়। এটা রোযার মূল চেতনার পরিপন্থী। আল্লাহ তায়ালা যে উষ্কেশ্যে আমাদের ওপর রোযা ফরয করেছেন, তার মধ্যে একটি উষ্কেশ্য হড়ে–, আমরা যেন ক্ষুধাত™£ড়–ার কষ্ট অনুভব করতে পারি।
ও রকম ইনজেকশনের ঢালাও অনুমতি দেয়া হলে সংগতিসম্পন্ন লোকেরা ক্ষুধা ত™£ড়–া কমানোর উষ্কেশ্যে ব্যাপকভাবে ওরকম ইনজেকশন ব্যবহার করতে শুষ্প করবে। এর ফলে রোযার একটি উষ্কেশ্য ব্যহত হবে।
কানে তেল এবং চোখে সুরমা ব্যবহারের বিষয়ে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কট্টরপন্থী আলেমদের মতে ওসব জিনিস ব্যবহার করা হলে রোযা ভংগ হয়। মধ্যপন্থী আলেমদের মতে রোযা ভংগ হয় না। কারণ এসব জিনিস ব্যবহার করা হলে কোনো খাদ্য খাদ্যনালীতে পৌঁছেনা এবং কোনো শক্তিও দেহে সঞ্চারিত হয় না। আমার কাছে এই অভিমতই গ্রহণযোগ্য। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াও এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে তাইমিয়া বলেন, এসব ব্যবহারের কারণে রোযা ভংগ হলে রসূল (স.) অবশ্যই লোকদের বলতেন। কেননা এসব জিনিসের ব্যবহার রসূল (স.)-এর সময়েও ছিলো। কিন্তু রসূল (স.) এসব জিনিস ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, এ রকম তথ্য কোনো সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে একটি হাদীস রয়েছে, তবে সেই হাদীসটি সম্পূর্ণ যঈফ।
রোযা রাখা অবস্থায় মেসওয়াক ও পেম্ভ ব্যবহার
প্রশ্ন: রোযা রাখা অবস্থায় মেসওয়াক করা, বিশেষত পেষ্ট ব্যবহার করা জায়েয কিনা?
উত্তর: সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার আগে মেসওয়াক করা একটি পছন্দনীয় এবং মোস্তাহাব আমল। রোযার সময়েও এবং অন্যান্য সময়েও। তবে সূর্য-পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার পর মেসওয়াক করার বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো আলেমের মতে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার পর মেসওয়াক করা মাক™£হ। কেননা হাদীসে রয়েছে, রসূল (স.) বলেন, রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।৪ রোযাদারের উচিত এই গন্ধ বজায় রাখা। মেসওয়াক করে সেই গন্ধ দূর না করা। ঠিক যেমন শহীদদের রক্তেভেজা পোশাকসহ দাফন করতে বলা হয়েছে। কেননা, কেয়ামতের দিন শহীদদের রক্তেভেজা পোশাক থেকে মেশকের সুবাস বের হবে।
আমার অভিমত হড়ে–, রোযাদারের মুখের গন্ধকে মেশকের চেয়ে পছন্দনীয় আখ্যায়িত করার অর্থ এই নয় যে, সেই গন্ধ অক্ষুন্ন রাখতে হবে। কারণ একজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন, রসূল (স.)-কে আমি এতোবার মেসওয়াক করতে দেখেছি, যা গণনা করা যাবে না। অথচ সে সময় তিনি রোযা রেখেছিলেন।
মেসওয়াক করা একটি পছন্দনীয় আমল। রসূল (স.)-এর সুন্নত। রসূল (স.) বারবার এর জন্যে তাকিদ দিয়েছেন, রসূল (স.) বলেন, মেসওয়াক মুখের পরিড়–ন্নতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ।৫
দাঁতের পরিড়–ন্নতার জন্যে রোযা রাখা অবস্থায় পেষ্ট ব্যবহার করাও জায়েয। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে, যেন পেম্ভ এর সামান্য অংশও পেটে চলে না যায়। কারণ যে জিনিস পেটে যায় সে জিনিস রোযা ভংগের কারণ হয়। এ কারণে রোযা রাখা অবস্থায় পেম্ভ ব্যবহার না করাই উত্তম। তবে কেউ যদি একান্ত সতর্কতা সত্ত্বেও পেম্ভের কিছু অংশ পেটে চলে যায়, তবে আমার মতে তার রোযা ভংগ হবে না। কেননা সেই ব্যক্তি তো জেনে বুঝে সেই জিনিস পেটে ঢোকায়নি, বরং ভুলক্রমে পেটে গেছে। আল্লাহ তায়ালা বান্দার ভুলত্র∆টি মার্জনা করেন। হাদীসে রয়েছে, রসূল (স.) বলেন, আমার উম্মত ভুলত্র∆টির ক্ষেত্রে এবং জোরপূর্বক কোনো কাজ করানোর ক্ষেত্রে ক্ষমা লাভ করবে।
কি রকম সফরের সময় রোযা মাফ হবে?
প্রশ্ন: কতোটা দূরত্ব সম্পন্ন সফরের সময় রোযার কাযা করা জায়েয? এই দূরত্বের পরিমাণ কি ৮১ কিলোমিটার? যদি সফরে কোনো প্রকার কষ্ট না হয় তবে কি কাযা না করা জায়েয?
উত্তর: সকল আলেমদের এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, যে সফরের সময় রোযা কাযা করা জায়েয। কারণ এ বিষয়ে কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
যে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তী (কোনো সময়ে) স্পণে স্পণে সেই পরিমাণ দিন আদায় করে নেবে। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫)
তবে দূরত্বের যে পরিমাণে সফর হিসেবে বিবেচিত হবে সে বিষয়ে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আপনি যে পরিমাণ দূরত্বের কথা উল্লেখ করেছেন আমার ধারণা সকল ফেকাহবিদ এ ব্যাপারে একমত যে, নামায কছর করা এবং রোযা কাযা করার জন্যে অতোটা দূরত্বের সফর যথেষ্ট। কেননা, জমহুরে ফোকাহা ৮৪কিলোমিটার নির্ধারণ করেছেন। ৮১ এবং ৮৪ সংখ্যার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। রসূল (স.)-এর সাহাবারা সফরকে কিলোমিটারের হিসেবে নির্ণয় করেছেন এ রকম উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ কারণে কোনো কোনো ফকীহর মতে সফরের ক্ষেত্রে দূরত্বের কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি। তাদের মধ্যে যে দূরত্বের অতিক্রমকে সাধারণত সফর বলা হয় সেই সফরে নামায কসর করা এবং রোযা কাযা করা জায়েয।
সফরের সময়ে রোযা কাজা করা বা রোযা রাখা দুটোই জায়েয। হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে, সাহাবারা রসূল (স.)-এর সাথে সফরের মধ্যে থাকতেন, সেই সময় কেউ রোযা রাখতেন, কেউ রোযা রাখতেন না। রসূল (স.) এমতাবস্থায় কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিতেন না। অর্থাচ্ঞ উভয় বিধান মেনে চলা সাহাবারাই রসূল (স.)-এর দৃষ্টিতে সমান ছিলেন।
সফর যদি কষ্টদায়ক হয় এবং সেই সফরে রোযা রাখা কষ্টকর হয়, তবে এ রকম সফরের সময়ে রোযা রাখা মাক™£হ বরং সম্ভবত হারাম। কেননা রসূল (স.) এক সফরের সময় লক্ষ্য করলেন, এক ব্যক্তির ওপর অন্যরা ছায়া করে রয়েছে। সেই ব্যক্তি রোযাদার ছিলো এবং তার অবস্থা ছিলো খুব খারাপ। রসূল (স.) জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, লোকটি রোযাদার। রসূল (স.) তখন বললেন, সফরের সময় রোযা রাখা নেকীর কাজ নয়। (বোখারী)
সফর যদি কষ্টকর না হয় এবং রোযা রাখতে কষ্ট না হয়, তবে রোযা রাখা এবং রোযার কাযা করা দুটোই জায়েয। এ কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এই দুই রকম অবস্থার মধ্যে কোন অবস্থা উত্তম এ ব্যাপার ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, রোযা রাখা উত্তম, কেউ বলেছেন, রোযা না রাখা উত্তম। ওমর ইবনে আবদুল আযিয বলেন, এই দুই রকম অবস্থার মধ্যে যে অবস্থা সহজ সেটা উত্তম। বর্ণিত আছে, হযরত হামযা ইবনে আমর আসলামি রসূল (স.)-কে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি প্রায়ই সফরে থাকি। অনেক সময় রমযান মাসেও সফর করি। আমি যুবক মানুষ, সহজেই রোযা পালন করতে পারি। আমার জন্যে রোযা রাখা উত্তম নাকি রোযা কাযা করা উত্তম? রসূল (স.) বলেন, হে হামযা, এই দুটির মধ্যে তুমি যেটি ইড়–া গ্রহণ করো। (আবু দাউদ)
অর্থাচ্ঞ তোমার জন্যে যে কাজ সহজ হয় তুমি সেটাই করো। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূল (স.) বলেছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে সুযোগ দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি এই সুযোগ গ্রহণ করবে এবং উপকার লাভ করবে সেটা তার জন্যে উত্তম হবে। যে ব্যক্তি রোযা রাখবে তার জন্যে কোনো ক্ষতি নেই। (নাসাঈ)
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হড়ে– যে, আল্লাহ তায়ালা যে আয়াতে মোসাফেরের জন্যে রোযা কাযা করার অনুমতি দিয়েছেন, সেখানে সফরের কারণে অনুমতি দেয়া হয়েছে, সফরের কষ্টের কারণে নয়। সেই আয়াতে এ কথা বলা হয়নি যে, সফরে যদি কষ্ট হয় তবে রোযা ভাংগা জায়েয, অন্যথা জায়েয নয়। আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র সফরের কারণেই সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের উচিত আল্লাহর দেয়া সুযোগ গ্রহণ করা। অহেতুক কূটতর্কে পড়ে আল্লাহর দেয়া সুযোগ নষ্ট না করি। যারা প্রায়ই সফরে থাকে তারা জানে সফর একটি কষ্টদায়ক কাজ। গাড়ীর সফর হোক অথবা উড়োজাহাজের সফর হোক। নিজের দেশ থেকে দূরে অবস্থান করা মানুষের জন্যে একটি কষ্টকর অবস্থার সৃষ্টি করে। কারণ এর ফলে দৈননিদন জীবনের স্বাভাবিকতা মারা—গকভাবে বিঘিœত হয়। মানুষ মানসিকভাবে এ সময় থাকে অস্থির। আল্লাহ তায়ালা এই সফরের কারণেই আমাদেরকে এই সুযোগ দিয়েছেন এটা বিচিত্র নয়।
সদকায়ে ফেতেরের পরিমাণ
প্রশ্ন: সদকায়ে ফেতের এর পরিমাণ কি প্রতি বছর পরিবর্তন হতে থাকে?
উত্তর: সদকায়ে ফেতেরের পরিমাণ বছর বছর পরিবর্তন হয় না বরং এই পরিমাণ নির্দিষ্ট। রসূল (স.) এই পরিমাণ হড়ে– এক স্ াঅর্থাচ্ঞ প্রায় দুই কেজি খাদ্য শস্য। আমার মতে সদকায়ে ফেতের খাদ্য শস্যে নির্ধারণ করার মধ্যে দুটি কারণ রয়েছে।
১. প্রথম কারণ হড়ে– সেই সময়ে আরবে বিশেষত গ্রামে বসবাসকারীদের জন্যে দিনার দেরহামের তুলনায় খাদ্যশস্য মজুদ থাকতো বেশী। অনেক এমন লোক ছিলো যাদের কাছে শুধু খাদ্যশস্যই থাকতো, নগদ অর্থ থাকতো না।৬ এমতাবস্থায় সদকায়ে ফেতের যদি অর্থমূল্য পরিশোধের বিধান দেয়া হয়, তাহলে বহুলোকের জন্যে সমস্যা দেখা দেবে।
২. আরেকটি কারণ হড়ে–, টাকার ক্রয়ক্ষমতা সব সময় পরিবর্তন হতে থাকে। আজ যদি এক কেজি চাল পাঁচ টাকায় পাওয়া যায় কাল হয়তো তার দাম দশ টাকা হয়ে যাবে। এ কারণে রসূল (স.) সদকায়ে ফেতের খাদ্যশস্যে নির্ধারণ করেছেন। যাতে করে নির্ধারিত খাদ্যশস্যের পুরো পরিমাণ গরীবদের কাছে পৌঁছে যায়।
হানাফী মাযহাবের লোকদের মতে নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্যশস্যের মূল্যও পরিশোধ করা যাবে। রসূল (স.) খাদ্যশস্যের শেন্দণী উল্লেখ করেছেন। এ কথার অর্থ এই নয় যে, এ রকমই পরিশোধ করতে হবে, অন্য কোনো রকম পরিশোধ করা যাবে না। ওলামাদের মতে যেখানে সদকায়ে ফেতের আদায় করা হবে সেখানে খাদ্যশস্যের যতো রকম রয়েছে, তার মধ্যে যে কোনো রকমের জিনিসই সদকায়ে ফেতেরের জন্যে আদায় করা যাবে। সেই জিনিস গম হোক, চাল হোক, খেজুর হোক, যব হোক বা অন্য যে কোনো দন্দব্য হোক।
সদকায়ে ফেতের আদায়কারী যদি সংগতিসম্পন্ন এবং স্বড়–ল মানুষ হন, তবে নির্ধারিত খাদ্যশস্যের সাথে কিছু নগদ টাকাও তার পরিশোধ করা উচিত। কেননা বর্তমান যুগে শুধু চাল বা ষ্পটি হলেই খাওয়া যায় না বরং তার সাথে তরকারী হিসেবে অন্য উপকরণেরও প্রয়োজন দেখা দেয়।
পরবর্তী রমযান আসার আগেই কাযা রোযা পালন
প্রশ্ন ” বিশেষ ওযরের কারণে যদি রমযান মাসের কয়েকটি রোযা কাযা হয়ে যায় এবং পরবর্তী রমযান আসার আগেই যদি সেই কাযা আদায় না করা হয়, তবে সেই কাযা কিভাবে আদায় করতে হবে? কাযার সাথে সাথে কি ফিদিয়াও দিতে হবে? যদি কয়টি রোযা ভংগ করা হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে তবে এ রকম অবস্থায় কি করা কর্তব্য?
উত্তর: শাফেয়ী এবং হা¤œলী মাযহাব অনুযায়ী ছুটে যাওয়া রোযা যদি পরের রমযানের আগেই কাযা না করা হয় তবে তবে কাযার পাশাপাশি ফিদিয়া দেয়াও ওয়াজেব। তারা যুক্তি দেখান যে, কোনো কোনো সাহাবী থেকে এরকম কথাই বর্ণিত হয়েছে। ফিদিয়া হড়ে– প্রতি দিনের রোযার পরিবর্তে একজন মেসকীনকে খাবার খাওয়াতে হবে। জমহুরে ওলামাদের মতে শুধুমাত্র কাযা ওয়াজেব ফিদিয়া ওয়াজেব নয়।
আমার মতে ছুটে যাওয়া রোযাসমূহের কাযা তো অবশ্যই আদায় করতে হবে, তা থেকে নিষ্ক™£তি নেই। তবে ফিদিয়া আদায় করাও উত্তম বিবেচিত হবে। ফিদিয়া আদায় না করলেও ক্ষতি নেই। কেননা ফিদিয়াও আদায় করতে হবে এ রকম কোনো হাদীস রসূল (স.) থেকে কেউ বর্ণনা করেননি। সন্দেহজনক অবস্থায় মানুষকে সেই বিষয়ের ওপর আমল করতে হবে, যে বিষয়ে তার নিশ্চিত বিশ^াস রয়েছে অথবা পারতপক্ষে যথেষ্ট ধারণা রয়েছে। তবে ধারণার কিছু বেশী সংখ্যা রোযা রাখাই উত্তম।
রোযার জন্যে শাবানের নির্দিষ্ট কয়েকদিন নির্ধারণ করা
প্রশ্ন: শাবান মাসে কি এমন কিছু নির্দিষ্ট দিন রয়েছে, যে সব দিনে রোযা রাখা মোস্তাহাব?
উত্তর: রমযান মাস ব্যতীত একমাত্র শাবান মাসেই রসূল (স.) রোযার ক্ষেত্রে অধিক স্পষ্পত্ব আরোপ করতেন। তবে হযরত আয়শা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী একমাত্র রমযান মাসই রসূল (স.) পুরো রোযা পালন করতেন। কোনো কোনো আরব দেশে এ রকম মানুষ রয়েছে, যারা রজব, শাবান এবং রমযান এই তিনমাস লাগাতার রোযা পালন করে। অথচ রসূল (স.) এ রকম আমল করেছেন এরকম প্রমাণ পাওয়া যায় না। একইভাবে দেখা যায় যে, কিছু লোক শাবান মাসের নির্দিষ্ট কয়েকদিন নিয়মিত রোযা পালন করে থাকে।৭
ইসলামী শরীয়তে এটা অনুমোদন নেই যে, শরয়ী দলীল প্রমাণ ব্যতীত কোনো দিন বা মাসকে রোযা বা অন্য কোনো এবাদাতের জন্যে নির্দিষ্ট করে নেয়া হবে।
কোনো দিনকে কোনো এবাদাতের জন্যে নির্ধারিত করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনিই সেটা নির্ধারণ করতে পারেন। কোনো বান্দা পারে না। কাজেই রোযার জন্যে আমরা সে সকল দিনই নির্ধারণ করতে পারি, যেসব দিনে রসূল (স.)-এর হাদীস বা আমল থেকে প্রমাণিত। যেমন হযরত আয়শা (রা.) বলেন, রসূল (স.) যখন রোযা পালন করতে শুষ্প করতেন তখন মনে হতো তিনি সব সময় রোযা পালন করবেন। আবার যখন রোযা পালন করতেন না তখন মনে হতো তিনি আর কখনোই বুঝি রোযা পালন করবেন না। রসূল (স.) সোমবার এবং শুক্রবার রোযা পালনের প্রতি স্পষ্পত্ব আরোপ করতেন। প্রতি মাসে তিনদিন তিনি রোযা পালনে মনযোগী ছিলেন। সাবান মাসে তিনি বেশী বেশী রোযা রাখতেন। সম্ভবত রমযান মাসের প্রস্তুতির জন্যেই শাবান মাসে তিনি বেশী রোযা রাখতেন। তবে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, শাবান মাসের নির্দিষ্ট কোনো তারিখকে তিনি রোযা পালনের জন্যে নির্ধারণ করেছেন।
তথ্যসূত্র”
১. হাকেম ও দারে কুতনীর বর্ণনা রয়েছে। এই হাদীসকে সহীহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
২. তিরমিযী, মোসনাদে আহমদ।
৩. বোখারী, মুসলিম এবং আসহাবে সুনানের বর্ণনা রয়েছে।
৪. বোখারীর বর্ণনা রয়েছে।
৫. বোখারী, নাসাঈ, ইবনে খোযায়মা ও ইবনে হাল্টান-এর বর্ণনা রয়েছে।
৬. এখনো গ্রাম এলাকায় এ রকম অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
৭. (ভারত) উপমহাদেশের লোকেরা পনেরই শাবান তারিখে রোযা পালনের প্রতি গুরুত্ব দেয়। অথচ রসূল (স.) থেকে এরকম কোনো আমল প্রমাণিত হয়নি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY