মদীনার চিঠি: একজন সৌভাগ্যবান

হাফেজ নেছার উদ্দীন আহমদ

0
440

মদীনার চিঠি: একজন সৌভাগ্যবান
খাদিজা আখতার রেজায়ী

আমার পড়ার ও লেখার অভ্যাস খুব ছোটবেলার, যখনই আম্মা বলতেন তার সাথে বেড়াতে যেতাম রাস্তার পাশ ও দেয়ালের লিখন কিছুৃই নাকি বাদ যেতোনা, সব এক নাগাড়ে পড়ে যেতাম। তখন আমার বয়স মাত্র চার সাড়ে চার। দশ এগারো বছর বয়সেই আমি ছড়া লিখতাম, আর এ বয়সেই শ’খানেক উপন্যাস আমার পড়া হয়ে গিয়েছিলো কারণ আমাদের বাড়ীর সামনেই ছিলো লাইব্রেরী। পড়ার প্রতি আমার ঝোঁক ও আগ্রহ দেখে আব্বা কিছু পত্রিকা ম্যাগাজিন নিয়মিত রাখতে শুরু করেন। আমাকে আর পায় কে? পত্রিকা ম্যাগাজিনের কোনো অংশ আমার পড়ার বাদ থাকতো না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কতোবার যে পড়তাম। একটা পত্রিকা ছিলো ‘‘সাপ্তাহিক জাহানে নও’’ পত্রিকাটা এনে প্রথমেই আমি পড়তাম মদীনার চিঠি। অত্যন্ত ভালো লাগতো মদীনার চিঠি পড়তে। এটা যে আমি শুধু নিজে পড়তাম তাই নয়, ঘরে সুবিধা মতো যাকে পেতাম তাকেই পড়ে শোনাতাম। এ বিশেষ লেখাটা আমি বার বার পড়তাম। একবার আমার চাচী আমাকে খুজছিলেন আম্মা বললেন ‘‘ ও মদীনার চিঠি পড়ছে’’ চাচী অবাক হয়ে বলেলন ‘‘ অ-মা! মদীনা থেকে কে আবার তাকে চিঠি লিখে! আম্মা বলেলন ‘‘ যাও তোমাকে পড়ে শোনাবে’’। আমি তাকে একটা অংশ পড়ে শোনালাম, তিনি শুনে এতা খুশি হলেন প্রায়ই এসে আমার কাছে মদীনার চিঠি শুনতে চাইতেন। আমি বলতাম পত্রিকা তো প্রতিদিন আসে না। সপ্তাহে একবার আসে, চাচী মদীনার চিঠির প্রতীক্ষায় থাকতেন।
মদীনায় বসে যিনি এই চিঠি লিখতেন যে লেখা পড়ে আমি তাকে মনে মনে শ্রদ্ধায় সালাম জানাতাম আর ভাবতাম কতো সৌভাগ্যবান এই মানুষটি যাকে আল্লাহ তায়ালা এতো জ্ঞান দান করেছেন। এতো প্রাঞ্জল ভাষায় এতো সহজ সরল সাবলীল ভাষায় তিনি লিখতে পারেন। তার লেখা আমাকে মোহাবিষ্ঠ করে রাখে, পড়তে পড়তে আমি যেন মদীনার রাস্তার অলিতে গলিতে হারিয়ে যেতাম। সেদিন আমি ভাবতে পারিনি মদীনার চিঠির যিনি লেখক তারই অতি ¯েœহের ছোটভাই একসময় আমার জীবন সঙ্গী হবে এবং তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে আমরা একে অন্যের পাশাপাশি থাকবো।
তারই ¯েœহের ছোটভাই আমার জীবন সাথী হাফেজ মুনির ইদ্দীন আহমদ তখন সাপ্তাহিক জাহানে নও এর সহকারী সম্পাদক। পরে তার ‘মদীনার চিঠি’র আরো কিছু পেছনের কথা তাদেও উভয়ের কাছে শুনেছি। ছোটো ভাইয়ের অনুরোধেই বড়োভাই সূদুর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশী পাঠকদের জন্য এই ‘মদীনার চিঠি’ লিখে পাঠাতেন।
profile with background
আমি তাকে ‘‘ভাইজান’’ ডাকতাম। তিনি আমাকে ছোটবোনের মতোই ¯েœহ করতেন। তিনি অত্যন্ত সুদর্শণ একজন মানুষ ছিলেন, মানুষের সাথে সুমধুর ভাষায় হাসিমুখে কথা বলতেন, কারো পেছনে কথা বলতেন না। কেউ তার কাছে কারো বদনাম করলে তিনি সেটা তাকে সামনা সামনিই জিজ্ঞেস করতেন সে কারণে কেউ তার কাছে অন্যের ব্যাপারে গীবত করতে সাহস বা উৎসাহ পেতোনা।
অত্যন্ত উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি, তার পাশে ছোট বড়ো বা গরীবের কদর ছিলো। ছোট যারা তারা যেমনি ¯েœহ পেতো, তেমনি বড়োরা পেতেন সম্মান। গরীবদের প্রতি উৎসাহ ছিলো খুব বেশী। কে খায়নি, কার পড়ার খরচ যোগাতে কষ্ট, কার মাথার ওপর ছায়া নেই, এদের খোজ রাখতেন তিনি এবং এদের পাশে এসে দাঁড়াতেন। এদিক থেকে তিনি ছিলেন পিতার স্বার্থক পূত্র। আমার শ্বশুরও এভাবে গরীবদের খবর রাখতেন এবং তাদের গোপনে পড়ার খরচ দিতেন, খাবার দিতেন। বিধবা এতিম অসহায় মানুষদের তিনি মুক্তহস্তে দান করতেন। আল্লাহ তায়ালা যেন এই পিতাপুত্রকে জান্নাতের খাস মেহমান বানিয়ে নেন।
ভাইজান অত্যন্ত মিশুক মানুষ ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মানুষকে বন্ধু বানিয়ে নিতে পারতেন। তার বন্ধুর তালিকা অনেক লম্বা। বাংলাদেশে, লন্ডনে, সৌদি আরবে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার বন্ধুবান্ধব অগনিত। এজন্য তার ঘরে হযরত ইব্রাহিমী কায়দায় সবসময় মেহমান থাকতো। ঘরে সবসময় ভালো ভালো রান্না হতো। মাশাআল্লাহ, ভাবীও অত্যন্ত গুণী মানুষ। যখনি যা রান্না করেন অমৃতের মতো সুস্বাদু হয়। তিনি দেশী বিদেশী অনেক ধরনের রান্না জানেন। তাই কেউ ঘরে আসলে নতুন করে রান্না না করলেও তাদের দারুন মেহমানদারী হয়ে যায়।
ভাইজান খরচ করতে কখনো দ্ধিধা করতেন না। টাকা পয়সা জমিয়ে রাখা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। আমার বড়ো মেয়ে সুমাইয়া একদিন আমাকে বলল ‘‘আমি একটা বড়ো অংক আল্লাহর রাস্তায় দান করতে চাই’’, আমি বললাম ‘‘এটাতো খুবই ভালো কথা এর চেয়ে উত্তম কোনো কাজ তো হতে পারে না। আল্লাহর রাস্তায় দান করলে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত খুশি হন এবং এর বিনিময় তিনি অনেকগুণ বাড়িয়ে ফেরত দেন’’। সে তখন বলল ‘‘এটাতো ঠিক, তবে চাচা মিয়া আরেকটা সুন্দর কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন কেউ যদি টাকা পয়সা খরচ না করে শুধু গুনে গুনে জমিয়ে রাখে আল্লাহ তায়ালা কখনো তাকে টাকা পয়সা দেন না। আল্লাহতো দেখেন তার কাে তো আছেই তাকে আর দেয়ার দরকার নেই। তুমি যত বেশী দান করবে খরচ করবে আল্লাহতায়ালা তোমাকে ততবেশী দেবেন। কাজেই জমিয়ে রেখোনা, আল্লাহর রাস্তায় প্রাণখুলে দান করে দাও আর নিজের সংসারে খোলা দিলে ব্যয় করো, কখনো কার্পণ্য করোনা।
ভাইজানের কোরআন তেলাওয়াত ছিলো অত্যন্ত সুমধূর, তিনি যখন কোরআন তেলাওয়াত করতেন, শুধু শুনতেই ইচ্ছে হতো, মনে হতো তিনি যেন কখনো না থামেন। একবার বাটারসী ইসলামিক সেন্টারের মসজিদে তিনি নামায পড়াচ্ছিলেন। এশার নামায। আমার ছোট ছেলে ইকবালকে পাশে বসিয়ে রাখলেন। মেয়েদের লাইনে আমিও দাঁড়ানো ছিলাম। তিনি সূরা ইয়াসিন পড়ছিলেন, কি যে সুমধুর কণ্ঠ! কি চমৎকার তেলাওয়াত! আমি বিমোহিত হয়ে শুনছিলাম। পড়তে পড়তে তিনি এগিয়ে গেলন ৫৮ নং আয়াতের দিকে সেখানে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতিদের সালাম জানাচ্ছেন। পরবতী আয়াতে গিয়ে তিনি জাহান্নামীদের উদ্দেশ্যে বলছেন ‘‘ হে অপরাধীরা আজ তোমরা ঈমানদোর বান্দাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাও। এরপর ভাইজান থেমে গেলেন এবং কেঁদে উঠলেন, আয়াতটি একাধিকবার পড়তে থাকলেন এবং কাঁদতে থাকলেন। এরপর পরবর্তী আয়াতে এগিয়ে গেলেন, ‘‘হে আদম সন্তান, আমি কি তোমাদের বলে দেইনি যে তোমরা শয়তানের গোলামী করোনা, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন’’ তিনি আরো শব্দ করে কেঁদে উঠলেন এবং আরো পড়লেন, আরো পড়লেন, আরো কাঁদতে থাকলেন। সাথে সাথে সমস্ত মাসজিদে কান্নার শব্দ গুঞ্জরিত হলো, ভাইজানের সাথে সাথে সবাই কাঁদছিলো। আমার মনে হয়েছিলো দয়াময় আল্লাহতায়ালা সেদিন সবারই চোখের পানি কবুল করেছিলেন। ভাইজানকেও আল্লাহতায়ালা সেই মুহুর্তে কবুল করে ফেলেছেন, কেনো যেনো সেই মুহুর্তে তা-ই আমার মনে হয়েছিলো।
তিনি অনেকগুলো ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। উর্দূ আরবি তো এমনভাবে বলতেন যেন এগুলো তার নিজস্ব ভাষা। এসব ভাষায় তিনি শুধু কথা বলতে পারতেন তা-ই নয় এসব ভাষায় তিনি লিখতে এবং পড়তে পারতেন। ছোটোবেলা থেকেই তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আমার শ্বশুরের দাদা মাওলানা আবদুল্যাহ মিয়াজীর যোগ্য বংশধর হিসেবে তিনি নিজেকে সমাজে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। যেসব কাজ তিনি করেছেন এবং যা তিনি পরবর্তী বংশধদের জন্য রেখে গেছেন, এর প্রতিটি কাজই আল্লাহর নির্দেশিত কাজ, আল্লাহ তায়ালার পছন্দনীয় কাজ। জান্নাতের রাস্তা কুসুমাস্তীর্ণ করার জন্য এসব কাজই হচ্ছে সাফল্যের মূল মন্ত্র।
50205-WA0000IMG-20150205-WA0001

যার লেখা মদীনার চিঠি পড়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ ছি। একদিন তারই উদ্দেশ্যে কিছু লিখতে হবে এটা আমি কখনো কল্পনা করিনি। হঠাৎ করে সবার মধ্য থেকে আল্লাহ তায়ালা তাকে তুলে নেবেন এটা তো কখনো ভাবিনি। যে মানুষ আল্লাহর বান্দাদের জন্য এতো কাজ করতে পারে, মানবতার জন্যে প্রাণ ঢেলে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে, তিনি আরো কিছুদিন থাকলে আরো কতো কাজ তাকে দিয়ে হয়তো হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার পছন্দ ও ইচ্ছা সবকিছুর ওপরে। তিনি যখন যা চান চান তা-ই করেন।

ভাষার এতো প্রাচুর্য, জ্ঞানের এতো সমাহার নিয়ে আজ ভাইজান মাটির ঘরে শুয়ে আছেন। তারই তৈরী মাদ্রাসা মসজিদ ও এতিমখানার পাশে। আমরা কখনো তাকে ভুলতে পরবোনা। মানুষ নাকি ভুলে যায়! কেউ মরে গেলে নাকি ধীরে ধীরে সবাই তাকে ভুলে যায়! আসলে একথা কি ঠিক? না সবাইকে ভোলা যায়না কেউ মানুষের হৃদয়ে বেচে থাকে গ্রন্থ হয়ে। মানুষ তাকে ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারেনা। মানুষের সামনে তার রেখে যাওয়া প্রতিটি কাজ তার উদাহরণ হিসেবে সজীব হয়ে দাঁড়ায়। এসব মানুষ কখেনা মরেনা, মানুষের হৃদয়ে তারা জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে। উনিশশ উনসত্তুর সনে আমি আমার আব্বাকে হারিয়েছি। আমি কি কখনো তাকে ভুলতে পেরেছি? না আমার এলাকার লোক তাকে ভুলতে পেরেছে!
ভাইজানের কাজ ভাইজানকে অমর করে রাখবে আর অমর করে রাখবে তার পরবর্তী বংশধরেরা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরবর্তী বংশধরদের আল্লাহর দ্বীনের পথে থেকে কোরআনের খেদমত করার তাওফীক দান করুন।
আমরা কেউ কোনোদিন ভাইজানকে ভুলবোনা। যে কাজ তিনি রেখে গেছেন সে কাজের মাধ্যমে আরো হাজারো হাফেজ নেছার উদ্দীন তৈরী হবে। মাওলানা আবদুল্যাহ মিয়াজীর বংশের প্রতি ঘরে ঘরে যেমনি হাফেজ তৈরী হয়েছে, আল্লাহর কিতাব কোরআনের অনুসারী তৈরী হয়েছে, তেমনি যেনো বাংলাদেশের প্রতি ঘরে ঘরে আরো লাখ লাখ হাফেজ তৈরী হয়, কোরআনের অনুসারী তৈরী হয়, ইসলামের খাদেম তৈরী হয়, সেটাই কামনা করি।
আল্লাহ তায়ালা ভাইজানের ছোটো বড়ো সব গুনাহ মাফ করে দিন, তার সমস্ত নেককাজগুলো কবুল করুন, তার করবকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করে দিন এবং জান্নাতে তার পাশে জায়গা করে দিন, আমাদের পরিবারের সবাইকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য কোরআনের জন্য কাজ করার তওফীক দান করুন। দুনিয়া ও আখেরাতে সার্বিক আমাদের সফলতা দান করুন। যেপথ তারা আমাদের জন্য খুলে দিয়ে গেছেন আমরা সবাই যেন আমাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্য সেপথটিই খুলে রেখে যেতে পারি। আলালাহ তায়ালা রহম ও করমের সাথে আমাদের সে তওফিক দান করুন। আমীন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY