প্রথম সিরাতগ্রন্থ

0
415

প্রথম সিরাতগ্রন্থ
আতাউর রহমান খসরু
সিরাত শাস্ত্রের ওপর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রাচীন, প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য সীরাতগ্রন্থ- ‘আস সিরাতুন-নাবাবিয়্যাহ লি ইবনে ইসহাক’। বাংলা ভাষায় যা ‘সিরাতে ইবনে ইসহাক’ নামে খ্যাত। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার (রহ.) এ মহান গ্রন্থের রচয়িতা। তিনিই সর্বপ্রথম সিরাত শাস্ত্রের ওপর গ্রন্থ রচনা করেন। এ জন্য তাকে সিরাত শাস্ত্রের জনকও বলা হয়।
তার দাদা ইয়াসার কুফার পশ্চিমে বারিয়ার দিকে অবস্থিত শহর আইনুত তামারের বাসিন্দা ছিলেন। হজরত আবু বকর (রা.) এর যুগে ১২ হিজরি সনে হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) শহরটি জয় করলে তাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে মদিনায় উপস্থিত করা হয়। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রহ.) ৮৫ হিজরি সনে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। মদিনাতেই তিনি যৌবন কাটান। এরপর তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে বের হন। ১১৫ হিজরি সনে তিনি ইস্কান্দারিয়া গমন করেন। মিসরীয় একদল হাদিসবেত্তার কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ ও বর্ণনা করেন। তাদের অন্যতম হলেন- উবায়দুল্লাহ বিন মুগিরা, উবায়দুল্লাহ বিন আবি জাফর, ইয়াজিদ ইবনে হাবিব (রহ.) প্রমুখ।
মিসর থেকে তিনি আলজাজিরা, কুফা, রাই, বুহায়রা এবং সর্বশেষ বাগদাদ সফর করেন। এখানেই আব্বাসি খলিফা মানসুরের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি তাকে ছেলে মাহদির জন্য একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করতে বলেন। খলিফা নির্দেশ দেন-তিনি যেন এমন একটি গ্রন্থ রচনা করেন যেখানে হজরত আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া যাবতীয় বিষয়ের উল্লেখ থাকে। খলিফার নির্দেশ মতেই ইবনে ইসহাক (রহ.) তার অমর গ্রন্থখানি রচনা করেন। তার সিরাত গ্রন্থ সম্পর্কে ইবনে আদি বলেন- ‘সমসাময়িক শাসকদের অর্থহীন পুস্তকাদি প্রণয়ন থেকে বিমুখ করে রাসূল (সা.) এর সশস্ত্র সংগ্রাম, তার নবুয়ত প্রাপ্তি ও বিশ্ব সৃষ্টির ইতিহাস রচনার কাজে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করা যদি ইবনে ইসহাকের একমাত্র কৃতিত্বও হতো, তবুও এ কৃতিত্বে তিনিই অগ্রণী ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত হতেন।’ (রাওদুল আনিফ : ১/১২)।
ইমাম ইবনে ইসহাক (রহ.) তার জীবনের শেষ সময়টুকু বাগদাদেই অতিবাহিত করেন এবং এখানেই ১৫২ হিজরি সনে তার ইন্তেকাল হয়। হজরত ইবনে ইসহাক (রহ.) এর খ্যাতি, পান্ডিত্য ও জ্ঞান-প্রতিভার জন্যই গ্রন্থটি রচনাকাল থেকেই প্রামাণ্য গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করে। এ গ্রন্থে তিনি হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী এবং রাসূলের জীবন ও ইতিহাস একত্রিত করেছেন। আর তা করেছেন- কালের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে। পারতপক্ষে তিনি ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেননি। ইবনে হিশাম (রহ.) এর বিন্যাস ও সম্পাদনায় গ্রন্থটি আরও অনবদ্য হয়ে ওঠে। ইবনে হিশাম ও ইবনে জারির তাবারি (রহ.) প্রমুখের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইবনে ইসহাক (রহ.) তার গ্রন্থকে তিনভাগে ভাগ করেছিলেন- ক. সৃষ্টির সূচনা থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত, খ. মুহাম্মদ (সা.) এর মাক্কি ও মাদানি জীবন, গ. মুহাম্মদ (সা.) এর যুদ্ধ ও সংগ্রাম। কিন্তু বর্তমানে সিরাতে ইবনে ইসহাকের যে পান্ডুলিপি পাওয়া যায় তাতে সম্পূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় না। এই মূল্যবান গ্রন্থটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৮৭ সালে প্রথম দুই খন্ড এবং ১৯৯২ সালে তৃতীয় খন্ডের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করে। বহুদিন ধরে কোনো পুনর্মুদ্রণ না হওয়ায় বর্তমানে তা বাজারে পাওয়া যায় না। সিরাত গবেষকদের প্রত্যাশা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন গ্রন্থটির পুনর্মুদ্রণ করবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY