বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও প্রচলিত কয়েকটি ধারণা

0
224

বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও প্রচলিত কয়েকটি ধারণা
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার জন্যে এদেশ ও এদেশের মানুষদের সম্পর্কে আমাদের কিছু বদ্ধমূল ধারণাÑ ‘মীথ’ আছেÑ এগুলো আগে ভাংতে হবে। এই মীথগুলো ভাংগার কথা আমি এ কারণেই বলছি যে, এগুলো সব সময় আমাদের মনে মিথ্যা আশা যোগায়। আমরা যখনি সমাজে ভালো কিছু প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা তখনই গর্বের সাথে বলি হাঁ, আমাদের কাছে এই বিশাল সম্পদ মজুদ আছে, এগুলো দিয়ে আমরা অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের ই¯ক্সীত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো। আমি আপনাকে ছোটো একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা বলতে চাই।

মনে করুন, আপনি দুশমনদের মোকাবেলা করার জন্যে কোনো বড়ো ধরনের পরিকল্পনা বানাচ্ছেন। এ অবস্থার আপনি অবশ্যই যুদ্ধে নামার আগে আপনার শক্তি সামর্থ সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা নির্ণয় করবেন যথাযথ যাচাই বাছাই করবেন। আপনি হিসেব করে দেখলেন আপনার কাছে ১০ হাজার সৈন্য আছে। আপনি এই ১০ হাজার সৈন্য আছে জেনেই একটা বড়ো পরিকল্পনার কথা চিন্তাা করলেন। কিন্তাু যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে দেখলেন, এই ১০ হাজার সৈন্যের অধিকাংশই অদক্ষ ও অনির্ভরযোগ্য। এ অবস্থায় যুদ্ধের পরিণতির জন্যে আপনি কাকে দায়ী করবেন। সেই ১০ হাজার সৈন্যদের না সে সৈন্যদের সম্পর্কে আপনার ‘মীথ’ তথা তাদের সংখ্যা ও সামর্থ সম্পর্কে আপনার বদ্ধমূল ধারণাকে দায়ী করবেন? এ কারণেই আমি বলতে চাই যে, আগামী দিনে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে আপনি যাদের ওপর নির্ভর করতে যাচ্ছেন তাদের প্রকৃত অবস্থাটা কি, তাদের সঠিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ না করে তাদের ওপর ভরসা করে কোনো বড়ো ধরনের পরিকল্পনা করলে অনিবার্য ব্যর্থতা থেকে আমরা কোনোদিনই বাঁচতে পারবো না।
এ কারণেই আজ সবার আগে এই ‘মীথ’গুলো আমাদের ভাংতে হবে। আমি জানি আমার এ কথাগুলোর আপনারদের অনেকেরই হয়তো পছন্দ হবে না। আপনি এর সাথে হয়তো একমতও হবেন না। তবু আমার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা যা তা আমি বলবো। একথাগুলো এর আগে আপনাকে কেউ বলেনি বলে মেহেরবানী করে একে উড়িয়ে দেবেন না।

আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ‘মীথ’ হচ্ছে, এ দেশের মাসজিদের ইমামদের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। মানুষ ইমামদের কথা শোনে, তারা মাসজিদে যা কিছু বলে জনসাধারণের ওপর তার একটা বিরাট প্রভাব পড়ে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় ব্যাপারটা আসলে কি তাই? বাংলাদেশে আমার গত ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতা কিন্তাু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথাই বলে। আমার কখনো একথা মনে হয়নি যে, বাংলাদেশের ৩ লাখ মাসজিদের ৩ লাখ ইমামের স্থানীয় বিষয়ে তথা এলাকার রাজনীতি, এলাকার এনজিওদের সূধী তৎপরতা, এলাকার অশ্লীল ও নির্লজ্জ কার্যক্রম, নারী নির্যাতন ও যৌতুক বিরোধী কার্যক্রম ইত্যাদিতে কোনো ভূমিকা আছে। প্রথম কথা হচ্ছে আমাদের ৩ লাখ ইমাম সাহেবদের ৩০০জন ইমামও বিষয়গুলো বিস্তারিত জানেন কি না, জানলেও এ বিষয়গুলো কখনো তিনি তার মাসজিদে বলেন কি না, কিংবা তাকে বলতে দেয়া হয় কি না, আমার কিন্তাু রীতিমতো সন্দেহ আছে।

কোরআনের সাথে কাজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের ইমামদের সব কয়টি সমিতির নেতৃবৃন্দ ও সাধারণভাবে ইমামদের সাথে আমার ব্যাপক উঠা বসার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি একথা দৃঢ়চিত্তে বলতে পারি যে, আজ থেকে ৫০ বছর আগে এদেশে ইমামদের যে ভূমিকা ছিলো এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা আর অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থার জন্যে কখনো আমি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ইমামদের দায়ী করি না। কথা হচ্ছে, যে শিক্ষাগত পরিবেশ থেকে বের হয়ে তিনি ইমাম হিসেবে কাজ করছেন, সেখানে তাকে এসব কিছু কখনো শেখানো হয়নি। তার সিলেবাসে যা ছিলো কর্মজগতে এসে তিনি দেখলেন যে, সমাজের অধিকাংশ বিষয়ের সাথেই তার কোনো সম্পর্ক নেই। এমতাবস্থায় তাকে এ সমাজের যা নিত্যদিনের সমস্যা, তা জানতে হলে ভিন্ন কোথায়ও থেকেই তা জানতে হবে। বিশ্বের বড়ো বড়ো ইসলামী চিন্তাাবিদদের কোরআনের অনুবাদ, কোরআনের তাফসীর ও আধুনিক বিষয়সমূহ নিয়ে লেখা ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক পড়াশোনা করতে হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, এই ব্যাপক পড়াশোনার পর তিনি যে যোগ্যতা অর্জন করলেন এবার দেখতে হবে সে কথাগুলো বলার জন্যে মাসজিদ কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কি না। এটা আমাদের দেশটির একটি বড়ো দূর্ভাগ্য যে, এখানে মাসজিদগুলোকে অধিকাংশ লোকই নামায আর কোরআন তেলাওয়াতের জায়গা বলেই মনে করে, এই কারণে তারা ইমাম সাহেবদের মুখ থেকে এর বাইরের কোনো কথা তেমন শুনতেও চায় না। সামাজিক বিষয়গুলোকে তারা রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার, এনজিও কর্মীদের জন্যেই নির্ধারিত করে রাখে। সুতরাং যে দু চারজন ইমাম সাহেব এসব সামাজিক ব্যাপারে আইনবিদ, কথাবার্তা বলার যোগ্যতা রাখেন তাদেরও কথা বলার ঠিকমতো অনুমতি দেয়া হয় না।
তৃতীয়ত আমাদের দেশের মাসজিদগুলো যেহেতু নামায ও কোরআন তেলাওয়াতেরই স্থান, তাই এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায়ও এমন লোকদের বসানো হয় যারা নিজেরা নামায রোযা ও কোরআন তেলাওয়াতের বাইরে মাসজিদের কোনো ভূমিকা আছে বলে বিশ্বাস করে না। এই চরম ‘ইসলামী ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীরাই’ বলতে গেলে বাংলাদেশের শতকরা ৭৫ ভাগ মাসজিদ পরিচালনা কমিটির নেতা। এই নেতাদের হাতেই আমাদের মাসজিদগুলো ও তার সম্মানিত ইমামরা জিম্মী হয়ে থাকেন। দেশের প্রধান জাতীয় মাসজিদ, মেট্টোপলিটন সিটির বড়ো বড়ো ২০/২৫টি মাসজিদ ও জেলা শহরের আরো শ’ খানেক মাসজিদ এক সময় এর ব্যতিক্রম ছিলো। এসব জায়গায় যোগ্য ইমাম সাহেবরা অন্তাত সীমিত পরিসরে কিছু কথা বলতে পারতেন। কিন্তাু ইদানিং সে পথগুলোকেও ভবিষ্যত বাংলাদেশের’ স্বার্থে চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার চিন্তাাভাবনা হচ্ছে। কিভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, আমি ৮ হাজার মাইল দূরে বসে যদ্দুর টের পাচ্ছি আপনি কাছে থেকে তো নিশ্চয়ই আরও বেশী টের পাচ্ছেন।
আমাদের সমাজে আরেকটি ‘মীথ’ তথা বদ্ধমূল কথা হচ্ছে, দেশের জনসাধারণ আলেমদের কথা শোনে। দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বাস্তবতার স্বার্থেই এ ‘মীথ’টাকেও আজ ভাংতে হবে। আসলে কি আমাদের দেশের মানুষ আলেমদের কথা শোনে?  আলেমরা যা বলেন তার প্রতি কি জনসাধারণের অকৃত্তিম বিশ্বাস ভক্তি আছে? আমাদের দেশে অবশ্যই এক সময় ছিলো যখন আলেমদের একটা সার্বজনীন নেতৃত্ব সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিলো, কিন্তাু সেদিন তো এখন আর নেই।
আজ থেকে ৬০/৬৫ বছর আগে যখন ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন তুংগে এখন এ আন্দোলনের নেতৃত্বই ছিলো বলতে গেলে এ দেশের আলেমদের হাতে, তখন সমাজে আলেমদের বিরাট একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিলো, জনসাধারণ তাদের কথা শুনতো, জনগণের প্রতিটি সমস্যায় তারাই আগে সাহায্যের হাত বাড়াতেন; কিন্তাু আজ ৬০ বছর পর দেশের অবস্থা বদলে গেছে। এখন সমাজে আলেমদের আগের মতো তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে আমার মনে হয় না। আমি এ জন্যে সমাজকে যেমন তার দ্বীন ধর্মের উদাসীনতার জন্যে দায়ী মনে করি, তেমনি নানা সামাজিক বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক বিবর্জিত আলেম ওলামারাও এ জন্যে কম দায়ী নন।

৪৭ সালে আমাদের উপমহাদেশটি যখন দুটো আলাদা দেশে বিভক্ত হলো তখন যেহেতু নতুন দেশটির নেতৃত্ব এলো স¤পূর্ণ ইংরেজী ভাষা ও সংস্কৃতির কোলে লালিত একদল দেশী ইংরেজদের হাতে। সাভাবিক ভাবেই এরা এখানকার আলেম ওলামা যাদের হাতে শত শত বছর এ জাতির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিলো তাদের যাবতীয় সামাজিক কাজকর্মকে এরা স¤পূর্ণ উচ্ছেদ করে দিলো। ধীরে ধীরে আলেম ওলামাদের মাসজিদ মকতব বিয়ে শাদী, জানাযা, মিলাদ, দোয়া দরূদের বাইরে আর কোনো ভূমিকাই রইলো না।

এর পাশাপাশি এই সমাজপতিরা এদের জন্যে সযতেœ যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে চালু রাখলো, তার মধ্যেও এদের জন্যে এর চাইতে বেশী কোনো কাজের বরাদ্দ রাখা হয়নি। এরপরও যে কতোটুকু ছিলো তাকেও নানা সময় সংস্কার ও আধুনিক বানানোর নামে এর আজব এক আধুনিক সংস্করণের জন্ম দেয়া হলো। এতে করে দ্বীনের সামান্য যে কতোটুকু ধ্বংসাবশেষ সমাজে বাকী ছিলো তাও শেষ করে দেয়া হলো, এ কাজটাই গত ২০/৩০ বছর ধরে ঠান্ডা মাথায় সম্পন্ন করেছেন। তারা যে এ দেশের ইসলামী শিক্ষার কতো বড়ো ক্ষতি সাধন করেছেন তারা আজ তাদের নিজেদের ঘরের চার দেয়ালের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন।
যারা মাদ্রাসা শিক্ষার জন্যে অনেক চোখের পানি ফেলেছেন তারা নিজেদের জীবনে এর কোনো প্রমাণ দেননি। আমি কারো নাম না নিয়েই একথাটা বলবো যে, এদেশে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করছেন তাদের নিজেদের ঘরেও এই শিক্ষার প্রতি তারা ক্ষমাহীন উদাসীনতা দেখিয়েছেন। মাদ্রাসার পড়ূয়া আলেম হোন কিংবা কলেজ পড়ূয়া আধুনিক হোন আন্দোলন সংগঠনের প্রথম সারির নেতারা তাদের ছেলেমেয়েকে মাদ্রাসায় পড়াননি। অথচ এই মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, তাকে আধুনিকতার লেবাস পরানোর চেষ্টা তো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম করা হয়নি। যদি মাদ্রাসা এতোই উপকারী হয় তাহলে এর প্রতি তাদের এতো উন¦াসিকতা কেন? আর যদি প্রগতিশীলদের মতো একে অপ্রয়োজনীয়ই মনে করা হয়, তাহলে এটা চালু রাখা সংস্কারের নামে এতো হৈ হুল্লোড় কেন করা হচ্ছে কেন?

যাক আমি বলতে চেয়েছিলাম এমনি নানা পারিপার্শ্বিক কারণে আমাদের দেশের মাদ্রাসাসমহে যারা পড়াশোনা করে এসেছেন, খারেজী কাওমী, সরকারী বেসরকারী, নির্বিশেষে অল্পবিস্তর সব মাদ্রাসার অবস্থাই এখানে বলতে গেলে এক। খারেজী ও কাওমী মাদ্রাসা পাশ করা আলেম ওলামারা তো ধরেই নিয়েছেন যুগ যমানার সাথে সম্পর্কহীন কতিপয় দ্বীনী তত্ত্ব শিখে নিলেই দ্বীনের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালিত হবে। তাই তারা দুনিয়ার ব্যাপারে তেমন একটা সচেতনও নন, আর আমাদের সরকারী মাদ্রাসাগুলো থেকে বের হয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বৃহত্তর সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্যে তাদের এতো পরিমাণ সময় ব্যয় করতে হয় যে, দ্বীন শিক্ষার ছোটোখাটো বিষয়ের কথা কারোই তেমন মনে থাকার কথা নয়। এসব কারণেই আজ আমাদের দেশে আলেম সমাজের হাতে সমাজের তেমন কোনো সামাজিক কাজ কর্ম, দায় দায়িত্ব নেই, আর যাদের হাতে সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা বলুন, জনপ্রিয়তা বলুনÑ এর কোনোটিই তো তেমন থাকার কথা নয়।
আমাদের দেশে আরেকটি ‘মীথ’ আছে, অর্থাৎ আরেকটি বদ্ধমূল কথা আছে যে, এদেশের মানুষ নাকি ধর্ম পরায়ন, তাদের অধিকাংশ লোকের সাপোর্ট নাকি ইসলামের পক্ষে। একথাটা বেশীর ভাগ সময়ই কিন্তাু বলেন আমাদের রাজনৈতিক নেতারা। তারা ইসলামের পক্ষে হোন বিপক্ষে হোন একথা দিয়েই তারা তাদের ভোট বাণিজ্য শুরু করেন। কিন্তাু এ কথাটি যে কতো বড়ো ভুল, কতো বড়ো মরিচিকাÑ এতোবার প্রতারিত হয়েও আমাদের কি বুঝার সময় আসেনি? ৭০ সালে ‘ইসলাম খতরে মে হায়’ বলেও কি ইসলামের পক্ষশক্তি নিজেদের ‘খতরা’ থেকে বাঁচাতে পেরেছে। তারপর স্বয়ং সে পাকিস্তানের যমীনে গত ৩০ বছর ধরে এই একই প্রতারণার কারণে স্বয়ং ইসলামপন্থীরাই বারবার ‘খতরার’ মধ্যে ডুবে গেছে। আমাদের এ দেশটির কথা আমি আপনাদের কি বলবো। এখানেও ‘ইসলাম বড়ো দর্যোগের কবলে পড়েছে’ বলে যেমন ইসলামের কোনো উপকার করা যায়নি তেমনি একটি বিশেষ দলের হাতে ইসলামী শিক্ষা, ইসলাম ও মুসলমান কেউই নিরাপদ নয় ইত্যাদি বলে আমরাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম প্রতারিত হয়নি।

আমার মনে হয় এবার সময় এসেছে যারা আগামীকাল এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে এগিয়ে আসবেন তাদের এ ৩টি ‘মীথ’Ñ প্রচলিত এ ৩টি কথাÑ ৩টি বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাসজিদের ইমামদের কথা লোকেরা শোনে, আলেম ওলামাদের কথা জনসাধারণ শোনে, সর্বশেষে এদেশের মানুষ ইসলাম প্রিয়Ñ এগুলো রাজনৈতিক কথা হিসেবে হয়তো খুবই ভালো; কিন্তাু এগুলোর ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিকল্পনা নেয়া যাবে না।আল বাছায়ের৫৪যে যমীনে আগামীকাল কোনো দল কিংবা সংগঠন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন তাদের এ যমীনের আগাছা পরগাছা সম্পর্কেও মোটামুটি একটা ধারণা থাকা দরকার। তার সাথে প্রয়োজন এ যমীনের সম্ভাবনাসমহের ব্যাপারে একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা রাখা। একই সময়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতো এ যমীনে বৃষ্টি কিংবা রোদের ব্যাপারেও ভবিষ্যতের একটা মোটামুটি ধারণা নিয়েই ফসল বুনার পরিকল্পনায় হাত দিতে হবে। এসব ব্যাপারে বিস্তারিত জ্ঞান না থাকলে মওসুমের শেষে হতাশ চাষীর মতো খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হবে।

আমরা আগের পরিচ্ছেদগুলোতে এসব কথাই বলার চেষ্টা করেছি। এর সাথে ১২ বছর পর ডিজিট্যাল বাংলাদেশের ‘এনালগ’ সমস্যাগুলোও যথাসম্ভব আপনাদের বলার চেষ্টা করেছি। যারাই আমাদের বর্তমান পুস্তকটি পড়বেন তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা এ সিরিজের বাকী বই দুটো ‘সাহস করে কিছু সত্য বলা প্রয়োজন’ ও ‘দিন বদলের ইসলামী কর্মসচী’ মেহেরবানী করে পড়ে নেবেন। তাহলে বিষয়টা সম্পর্কে একটা কালেকটিভ ধারণা সম্ভব হবে।
আমরা আমাদের আলোচনার শেষের দিকে এসে গেছি। আলহমাদু লিল্লাহ এ যমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রায় ৫টি দশকের এ দীর্ঘ সময়ে কোনো না কোনো পর্যায়ে আমার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো। এ কথাটা আমি এ জন্যেই বললাম যেন কেউ আমার এ লেখাটা পড়ে একে ‘ড্রাই থিউরী’ বলে মন্তাব্য না করেন।
গত অর্ধ শতক ধরে দুনিয়ার বহু দেশেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছে। কিছু কিছু আন্দোলন বৈষয়িক দিক থেকে সফলতার দ্বারপ্রান্তো পৌঁছেও পুরোপুরি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আবার কিছু কিছু আন্দোলন বৈষয়িক দিক থেকে সফলতার ধারে কাছে পৌঁছতে না পারলেও নিজস্ব কর্মসচী কর্মনীতির কারণে পরবর্তিকালের মানুষদের জন্যে অনেক মুল্যবান আদর্শ রেখে গেছে।

আমাদের সময়ের ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এদের উভয়ের উত্তরাধিকারকেই আমাদের জন্যে মূল্যবান সম্পদ মনে করতে হবে। এদের উভয়ের কাছ থেকেই আমাদের নিজেদের চলার পথের পাথেয় যোগাড় করতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর থেকে আজ পর্যন্তা এ সাড়ে চৌদ্দশ বছর সময়ের মধ্যে আরব আজমে অনেক কয়টি ইসলামী আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। এদের সবার ব্যর্থতা সফলতার ওপর ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতার পর্যালোচনামূলক মূল্যবান একটি পুস্তক আছে। আমি আপনাদের সবাইকে পুনরায় এটি পড়তে অনুরোধ করবো। এই বই থেকে আমি আমার সচেতন পাঠকদের মাত্র ৩টি আন্দোলনকে ভালো করে পড়তে অনুরোধ করবো। এই ৩টি আন্দোলন ইতিহাসের ৩টি স্বতন্ত্র ভূখন্ডে ৩টি ভিন্নধর্মী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।

এর প্রথমটি হচ্ছে সপ্তম শতকের ইমাম তাইমিয়া, দ্বিতীয় হচ্ছে চতুর্দশ শতকের মোজাদ্দেদে আলফেসানী ও সর্বশেষে ঊনবিংশ শতকের বদিউয যামান নূরসীর ঐতিহাসিক আন্দোলন।

আমার সচেতন পাঠকরা এতোক্ষণে নিশ্চয়ই ভাবতে শুরু করেছেন উম্মতের এই দীর্ঘ ইতিহাস থেকে মাত্র ৩টি আন্দোলনের কথা আমি কেন বললাম। এই বইয়ের পরিবর্তি পৃষ্ঠাগুলো পড়তে পড়তে আশাকরি তা পাঠকদের কাছে এমনিই পরিস্কার হয়ে যাবে। আমার বর্তমান এ পুস্তকের পরিসর নিতান্তা সীমিত। এই পরিসরে বিশ্বের এই ৩টি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের বিস্তারিত পর্যালোচনা করা এখানে সম্ভব নয়। এ কারণেই আমি পাঠকদের বড়ো বইটি পড়তে অনুরোধ করেছি। এর সাথে আরেকটি জিনিস আমি আমার পাঠকদের সম্ভব হলে পড়তে বলবো, অবশ্য এ বিষয়ের ওপর সম্ভবত এখনো তেমন কোনো বই পুস্তক রচিত হয়নি। এগুলো জানার জন্যে বিজ্ঞ পাঠকদের সাম্প্রতিক কালের পত্র পত্রিকার সাহায্যই বেশী নিতে হবে।

এই সাম্প্রতিক বিষয়টি হচ্ছে ফিলিস্তিনের হামাছ ও লেবাননের হেযবুল্লাহর কর্মতৎপরতা। এ দুটো সংগঠন আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে যথেষ্ট আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ইসরাঈলসহ পশ্চিমা নিউজ মিডিয়ায় এদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার, আরেকটিকে এদের ব্যাপারে মুসলিম রাজা বাদশাহ আমীর ওমারা প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীদের অবহেলাজনিত লজ্জাজনক ভূমিকাÑ এ দুটো সংগঠনকে আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে পরিণত করেছে।
দোস্ত দুশমন সবাই এখন এদের উভয়কে ভূমন্ডলের ওপর থেকে নিশ্চিন্ন করে দিতে চায়। অপরদিকে তাদের আপনজনদের এদের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসাও সবাইকেই বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। চোখের সামনে বুকের মানিক শিশু পুত্রের দেহটিকে ইসরাইলী শেল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিলো, ইসরাইলী দস্যুরা যাবার সময় হামাছকেই এ জন্যে দায়ী করলো। তারা বললো হামাছকে যতোক্ষণ পর্যন্তা তোমরা তোমাদের আংগিনায় আশ্রয় দেবে ততোক্ষণ পর্যন্তা তোমাদের নারী পুরুষ, শিশু কিশোর কেউই আমাদের বোমা থেকে নিরাপদ নয়। বুকের মানিক শিশুটির লাশ জড়িয়ে মা হামাছের জন্যে দোয়া করছেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি হামাছকে কামিয়াব করো। তার শিশুর তাজা রক্ত তখনও তার বুকে ঝরছে, কিন্তাু হামাছের বিরুদ্ধে তার মনে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ক্ষোভ নেই।
লোকেরা আমাদের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন। হামাছও নিজের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। আমাদের এখানকার তুলনায় সেখানে মৃত্যুর ঝুকি লক্ষ গুণ বেশী।
প্রতিটি সন্ধায় যেখানে মৃত্যুর আধার নামে, প্রতিটি সকালে যেখানে নতুন ধ্বংসের হাতছানি আসে, সেখানে হামাছের প্রতি লক্ষ লক্ষ মানুষের এই ভালোবাসা কেন? কেন সেখানকার মা বোনেরা নিজেদের জীবনের সব হাসি খুশীর বিনিময়েও হামাছের সামান্য কোনো ক্ষতি হোক এটা চায় না। আমাদের দেশে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে চেষ্টা সাধনা করতে চান তাদের সবাইকে জনে জনে আমি অনুরোধ করবোÑ হামাছ এবং হেযবুল্লাহর সাংগঠনিক কাঠামো, তাদের গঠনতাšিক বিধান ও তাদের কর্ম কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করুন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY