আসুন কোরআনের সঙ্গেই থাকি

কোরআন ভাবনা

0
487

বাংলায় কোরআন অনুবাদের ২০০ বছরে
আসুন কোরআনের সঙ্গেই থাকি

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

আগামী ৫/১০ বছরের মধ্যে এদেশের জনসংখ্যা হয়তো ২০ কোটীতে পৌঁছবে। এই ২০ কোটী মানুষের সবার হাতে মোবাইল ফোন থাকবে, সবার ই-মেইল এড্রেস হবে, ঘরে ঘরে ই-কমার্সের মাধ্যমে দ্রব্যের বেচাকেনা চলবে। প্রত্যেকটি মানুষই হবে এক একটি ইনডিভিজ্যুয়্যাল সত্তা। প্রিন্ট মিডিয়া ও বই পুস্তকের যমানা অনেকটা সংকীর্ণ হয়ে যাবে। যাতায়াতের জন্যে সাইকেলের আকারে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার আসবে, জলে স্থলে তা একইভাবে চলবে। শর্ট ডিসটেন্সে তা স্বল্প উঁচু দিয়ে উড়তে থাকবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কাছে রক্ষিত একটি কার্ডের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্য, লেনদেন, বেচাকেনা, অফিস ও ঘর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধে পাবে। ঢাকা শহরে পাতাল ট্রেন, মনোরেল হবে। তারপরও যদি কোথাও জ্যামে আটকে যানÑ চিন্তা নেই, গাড়িতে বসেই ঘরে আলো জ্বালাতে পারবেন। রান্নাঘরের চুলা অন করতে পারবেন, ঘর ঠান্ডা করার জন্যে এসিটাও অন করতে পারবেন।
বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার উদ্ভাবনী ভবিষ্যতে তার হয়তো চরম উন্নতি হবেÑ না হয় তা সসম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। তার যদি কিছু অংশের এক্সপেরিমেন্টও সফল হয় তাহলে মানুষের চিরন্তন ঈমান আকীদার গায়ে যে প্রচন্ড ধাক্কা লাগবে তার মোকাবেলা করার জন্যে আমাদের বিজ্ঞানীদের এখন থেকেই প্র¯স্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এই প্রস্তুতির লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের কোরআন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। হাইলী স্কিলড্ কোরআনিক সাইন্টিস্টরা সেখানে দিবানিশি সাধনা করে কোরআনের কথাগুলো মানুষদের বলবেন। সত্যিকার অর্থে এমনি একটি সমনি¦ত সাধনাকর্মের ওপরই আগামী দিনের পৃথিবীর মুসলমানদের দ্বীন ঈমান নির্ভর করে।
আপনি শুনে আশ্চর্যানি¦ত হবেন, বিশ্বে বাইবেল অনুসারীদের বাইবেলের প্রতি কমিটমেন্ট কমে যাওয়া সত্ত্বেও তারা পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষাগুলোতে বাইবেলের বিভিন্ন স্টাইলের অনুবাদ প্রকাশ করেছে। বহু দেশের বহু লোকাল ডায়েলেক্টেও বাইবেল অনূদিত হয়েছে। এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই শতাধিক সংস্থা আছে, যাদের কাজই হচ্ছে শুধু বাইবেল প্রকাশ করা। এসব সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক খৃস্টান স¤ক্স্রদায়ের অনেক দাতা সংস্থা শত শত কোটী ডলার অনুদান পাঠায়। আবার এসব কাজের বিপরীতে ধনীরা সরকারের কাছ থেকে যথেষ্ট ট্যাক্স ইনসেনটিভ পায় বলে সহজেই তারা এসব কাজে পয়সা ব্যয় করতে এগিয়ে আসে।
পশ্চিমী দুনিয়ায় ধর্ম কর্মের প্রচলন কমে গেলেও বাইবেলের প্রচারে তারা কিন্তু মোটেই পেছনে নেই। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখন আপনি একটি হোটেল কক্ষও পাবেন না, যেখানে কোনো না কোনোভাবে বাইবেল রাখা হয় না। হাসপাতাল, ডাক্তারখানা ও জেলখানার প্রতিটি কক্ষে কমপক্ষে দুতিন কপি বাইবেল থাকবেই।
Delays
বিশ্বের পৌনে দু’শ কোটী বাইবেলের অনুসারী নিজেরাও জানে, বাইবেল আল্লাহর কিতাব নয়, এটা যে তাদের মতো কিছু মানুষেরই কথা, এটা তারা ভালো করে বুঝে বলেই এটা ধরতে, পড়তে ও নাড়াচাড়া করতে তাদের পাক পবিত্রতার প্রয়োজন হয় না। এ কারণেই ইংলন্ডের জেলখানাগুলোতে কয়েদীদের বাথরুমে টয়লেটেও বাইবেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমি লন্ডনে বৃটিশ হোম মিনিস্ট্রির পক্ষ থেকে মুসলিম কয়েদীদের দেখাশোনা করার জন্যে রীতিমতো প্রিজন ভিজিট করতাম। আমার ২৫ বছরের এ কর্মজীবনে অসংখ্যবার আমি জেলখানায় বাইবেলের ক্ষমাহীন অবমাননা দেখেছি। বাইবেলের পাতা ছিঁড়ে ময়লা জাতীয় কোনো কিছু ধরতেও তারা দ্বিধা করে না। কিংবা কোনো বস্তু উঠানো কিংবা নামানোর জন্যে ৫-৬টা বাইবেলের কপি একটা আরেকটার ওপর রেখে জুতা সহকারে তার ওপর দাঁড়াতেও তাদের বুক কাঁপে না।
লন্ডনে কয়েক বছর আমি বৃটিশ ইমিগ্রেশান কোর্টেও কাজ করেছি। একটি চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা আমার আজো মনে আছে। সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বাইবেলে হাত দিয়ে একজন খৃস্টান গডের নামে শপথ করছে, আমি ও আমার কলিগরা সবাই জানি লোকটি মিথ্যা বলছে। মামলার পারিপার্শ্বিকতাই বলছিলো, তার কথাগুলো মোটেই ঠিক নয়। শুনানি শেষে তাকে যখন বলা হলো, বাইবেল হাতে নিয়ে তুমি এতো বড়ো মিথ্যা বললে কিভাবে? লোকটি হাসতে হাসতে বললো, ‘ইজ ইট গডস ওয়ার্ড? ইউ মাস্ট বি জোকিং, ইফ আই হ্যাড বিলিভড দ্যাট, আই উড নট হ্যাভ টাচড্ দ্যাট বুক’।
এতেই তো আমরা বুঝতে পারি বাইবেলের অনুসারীদের বাইবেল প্রতি কমিটমেন্ট কতো ঠুনকো, কিন্তু এ সত্ত্বেও বাইবেল প্রচারের জন্যে তারা নতুন নতুন কর্মসূচী উদ্ভাবন করছে। তাদের সে বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনা ও কর্মকৌশলের কয়টার খবর আমরা রাখি।
আর আমরা মুসলমানÑ এ গ্রহে আমাদের সংখ্যাও সোয়াশ’ কোটীর ওপর। কোরআনের তার ওপর কোনো বই পুস্তক এমনকি হাদীস কিংবা রসূলের জীবনী গ্রন্থ পর্যন্ত আমরা মুসলমানরা রাখি না। মুসলমানরা সামান্য একটু অপবিত্র হলেও কোরআন ¯ক্সর্শ করে না। এমনি ভক্তি শ্রদ্ধা করা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী আমরা কোরআনের অনুসারীরা কোরআনের সাথে কি আচরণ করছি তার অল্পবিস্তর কথা আমরা সবাই জানি। ব্যক্তিজীবনের আমলের বিষয়টা বাদ দিলেও সামগ্রিকভাবে আমরা কোরআনের প্রচার প্রসারের সাথে অমার্জনীয় অপরাধ করে চলেছি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের লোকাল ডায়েলেক্ট দূরে থাকÑ বড়ো বড়ো ভাষাগুলোতেও আমরা এ যাবৎ কোরআন অনুবাদ করতে পারিনি।
আমাদের প্রতিবেশী ১০০ কোটী মানুষের দেশ ভারত। সেখানে লোকাল ডায়েলেক্ট সহ ভাষার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এ তিন হাজার আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি ভাষায় কোরআনের অনুবাদ হয়েছে কিনা সন্দেহ। শুনতে যতোই খারাপ লাগুক না কেনÑ আমাদের দিনাজপুর সীমান্ত থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরের দেশ নেপাল। সে দেশের ভাষায়ও আজ পর্যন্ত কোরআনের অনুবাদ হয়নি। বছর কয়েক আগে আমি যখন নেপালী মুসলমানদের একমাত্র দলÑ ‘ইসলামী সংঘ নেপাল’-এর আমন্ত্রণে তাদের বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়েছি, তখন তারা এ বেদনাদায়ক কথাটা আমাকে জানান। আলহামদু লিল্লাহ, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন তাদের নেপালী ভাষায় কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করার কাজে সামান্য কিছু হলেও সহযোগিতা করতে পেরেছে।
ইউরোপে ২০টি ভাষায়ও কোরআনের অনুবাদ হয়েছে কিনা সন্দেহ। সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকার মধ্যে সম্ভবত মাত্র ২টি ভাষায় কোরআনের অনুবাদ হয়েছে। পূর্ব ইউরোপে কোরআনের অনুবাদ হয়েছে তাও মনে হয় মাত্র ২-৩টি ভাষায়। পূর্ব ইউরোপ থেকে মংগোলিয়া চীন পর্যন্ত অনুবাদ আছে শুধু ২টি ভাষায়। চীনে প্রায় সোয়া’শ কোটী লোক বাস করে। এদের আঞ্চলিক ভাষার সংখ্যা কয়েক হাজার। সে কয়েক হাজার ভাষার কথা কিইবা বলবো। এদিকে আমাদের পার্শ্ববর্তী মায়ানমার থেকে সিংগাপুর জাপান পর্যন্ত এ বিশাল ভূখন্ডে কোরআনের অনুবাদের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩/৪টি ভাষায়। এ ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফুজির লোকেরা তো ইংরেজীতেই কথা বলে। আফ্রিকায় রয়েছে বিশাল অমুসলিম জনপদ। এদের প্রায় ১৫/২০টি দেশে সোহায়লী ভাষা সহ আরো ৮/১০টি ভাষায় কোরআনের কোনো অনুবাদ হয়েছে বলে আমার মনে হয়। পৃথিবীর সর্বত্র সব মানুষের হাতে কোরআন পৌঁছানোর এই যে সার্বিক করুণ চিত্র আমি আপনাদের সামনে পেশ করলাম, তা কি কোরআনের শিক্ষা প্রচারপ্রসারে আমাদের দুঃখজনক ও লজ্জাকর আচরণ প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট নয়?
৯০-এর দশকে যখন সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেংগে খান খান হয়ে গেলো, তখন এসটোনিয়া, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, রাশিয়া, বেলারুশ, জর্জিয়া, ইউক্রেনসহ যে নতুন প্রজাতন্ত্রগুলো জন্ম নিলো, তাতে মাত্র ১ বছর সময়ের মধ্যে খৃস্টানরা হাজার হাজার গির্জা পুণর্নির্মাণ করে ফেলে। বহু ভাষায় তারা বাইবেল অনুবাদ করিয়ে লক্ষ লক্ষ কপি এসব দেশে বিনামূল্যে বিতরণ করে। আর আমরা মুসলমানরা কি করেছি? পনেরো বছর পরও আমরা এসব দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত কোরআনের অনুবাদ পৌঁছাতে পারিনি।
সারা মুসলিম দুনিয়ার মধ্যে সৌদী আরবের মদীনা শহরে অবস্থিত বাদশাহ ফাহদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্সÑ একক একটি সংস্থা, যারা সারা পৃথিবীর অমুসলিম জনপদে মল কোরআনের কপি ও এর কিছু কিছু অনুবাদ পৌঁছাচ্ছেন। তার পাশাপাশি সৌদী আরবের এক দু’টো প্রতিষ্ঠান এমনও আছে যারা বিনামূল্যে দেয়া তো দরের কথাÑ একেকটি কোরআন কেন্দ্রিক বই চড়া মল্যে ইউরোপ আমেরিকায় বিক্রি করে কোটী কোটী ডলার কামাচ্ছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ মুসলিম দেশের এক দু’জন ব্যক্তি চাইলেও তারা প্রত্যেক দেশে এক একটি কোরআন কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে পারেন। আরব আমীরাতের যুবরাজের জন্মদিনে তার পিতা তাকে ১২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সোনার কোরআন উপহার দিলেনÑ অথচ এ পয়সায় ইউরোপের কয়েকটি দেশে কোরআন ও তার অনুবাদ ছেপে বিতরণ করা যেতো।
বাংলাদেশের ১৫ কোটী মানুষের মাঝে যারা পড়ালেখা জানেন তাদের সংখ্যা যদি ৬ কোটীও হয়ে থাকে, তাহলে একটু ভেবে দেখা দরকার এর মধ্যে কতো লোক কোরআন পড়তে জানে? অবশ্য তাদের সংখ্যা নির্ণয়ের কোনো উপায় দুঃখজনকভাবে আমাদের জানা নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রের আন্দায অনুমান মোতাবেক এ সংখ্যা যদি শতকরা ২৫ ভাগ, অর্থাৎ ২ কোটীও হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকবে, এদের মধ্যে কতো লোক কোরআনের অর্থ বুঝে? জানা কথা তাদের সংখ্যা ২৫/৩০ লাখের বেশী হবে না। এবার হিসাব করুন, আমাদের দেশে যতোগুলো কোরআন প্রচার প্রসার, প্রকাশনা ও মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান আছে, আল কোরআন একাডেমী লন্ডনসহ আমরা সবাই মিলে এদেশের কতো লোকের কাছে এ যাবৎ কোরআন, কোরআনের অনুবাদ, কোরআনের তাফসীর পৌঁছাতে পেরেছি?
হাঁ, এবার আমি আমার মল প্রশ্নে ফিরে আসি। তা হচ্ছে দেশের যে ৬-৭ কোটী লোক পড়ালেখা জানে তাদের মধ্যে থেকে এই ১০/১৫ লাখ বাদ দিলে বাকী প্রায় ৬ কোটী নরনারী এখানে এমন আছে যাদের কাছে আমরা এখনো কোরআন পৌঁছাতে পারিনি। ব্যর্থতার এ দায়ভার আমার মতো আপনাকেও ব্যথিত করে কি না জানি না। এ অনুভূতিটা এ জাতির আর কয়জনের হৃদয়কে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে তাও জানি না।
মুসলমানদের জাতীয় জীবনের বৃহত্তর অংশ তথা সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি থেকে যেভাবে কোরআন বিতাড়নের মহাপ্রস্তুতি চলছে। তাতে আগামী প্রজন্মকে কোরআনের কাছে ধরে রাখার জন্যে তাদের হাতে কোরআন তুলে দেয়ার কোনো বিকল্পও নেই। আমার মনে হয়, এ যমীনকে যারা কোরআনের ভূমি বানাতে চান, যারা এ যমীনে ভবিষ্যত ইসলামী আন্দোলনে কোরআনের কর্মী হতে চান, এ বিষয়টা তাদের ইমিডিয়েট এজেন্ডাভুক্ত করা দরকার। মনে রাখতে হবে, যতো বেশী মানুষকে আপনি কোরআনের কাছে আনতে পারবেন ততোই আপনার আন্দোলনের প্রচেষ্টা দ্রুত ফল দেবে।
আজ কালো টাকাওয়ালাদের কাছে দেশের শিশু-কিশোর, যুব প্রৌঢ ও নারী পুরুষ কারোরই দ্বীন ঈমান নীতি-নৈতিকতা নিরাপদ নয়। ডজন ডজন টিভি চ্যানেল ও বাহারী দৈনিকগুলোর সাথে আবার তথাকথিত গ্লোবালাইজেশন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির অভিশাপ নিয়ে এসেছে অগণিত আন্তরাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফোন কো¤ক্সানী ও তুখোড় এনজিও প্রতিষ্ঠান। এদের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় দেশের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের চাইতেও এরা বেশী শক্তিশালী, রাষ্ট্র যেন এদের ক্ষমতার কাছে একটি অসহায় পুতুল। এদের হাতে আজ পণবন্দী হয়ে আছে গোটা দেশের ব্যাংক ইনসিউরেন্স, ইউনিভার্সিটি, চলচ্চিত্র ও নাট্য আন্দোলনসহ সব কয়টি ইনস্টিটিউশন। অবস্থা দেখলে মনে হবে এই নেশাগ্রস্ত গোষ্ঠীটি যেন আজ এ ভূখন্ডের মানুষগুলো ঈমান আকীদা ও নৈতিক মূল্যবোধ লুট করার এক মহৌৎসবে মেতে উঠেছে। ধ্বংসের এ তাণ্ডবের মাঝেও একান্ত ব্যক্তিগত উদ্দোগে যে দু’ একটি প্রতিষ্ঠান নিতান্ত সীমিত আকারে মাঝে মাঝে কিছু কিছু গড়ার কাজের উদ্যোগ নিচ্ছে, সেই গড়ার কারিগরদের হাতে সামান্য কিছু মাল-মসলা তুলে দেয়ার জন্যেই মূলত আমাদের এই ক্ষুদ্র আয়োজন।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমি এ কোরআন এ জন্যে নাযিল করিনি যে, তুমি এর দ্বারা কষ্ট পাবে। (সূরা তাহা-১) আমাদের ইতিহাসও বার বার এ সত্য প্রমাণ করেছে যে, যখন মুসলমানরা দুর্দিনের অজুহাতে কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তখনই তারা পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছে। মিল্লাতের বিবেক বলে পরিচিত আল্লামা ইকবালের ভাষায়Ñ ‘হাম খার হুয়ে বরবাদ হুয়ে তারেকে কোরআঁ হো-কর।’ কোরআন ছেড়েছি তো আমরা অপমানিত হয়েছিÑ বরবাদ হয়ে গেছি। দার্শনিক ইমাম গাযালী ঠিকই বলেছেনÑ দুনিয়ায় তুমি কোরআনের পক্ষে থাকো, আখেরাতে কোরআন তোমার পক্ষে থাকবে। কোরআনকে কখনো নিজের দুশমন বানিয়ো না, কেননা যারাই কোরআনকে নিজের দুশমন বানিয়েছে, পৃথিবীতে তাদের অনিবার্য ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারেনি।
আরব ভূখন্ডে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে কোরআন নাযিল হলেও আমাদের দেশে কোরআন মাজীদের প্রথম বাংলা অনুবাদ শুরু হয়েছে মাত্র দু’শ বছর আগে। ফার্সি অনুবাদের প্রায় ৯শ বছর ও উর্দু অনুবাদের প্রায় দু’শ বছর পর। ১৮০৮ সালে রংপুরের একজন নিষ্ঠাবান কোরআনের সাধক মাওলানা আমিরুদ্দীন বসুনিয়ার আমপারার বাংলা অনুবাদ করেন।
২০০ বছর কোনো জাতির জন্যেই নিতান্ত কম সময় নয়। এ দু’শ বছরে এ জাতি পরপর ৩বার দেশের মানচিত্র বদল হতে দেখেছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ, দ্বন্ধ হানাহানি, রক্তপাত কোনোটাই কম দেখেনি; কিন্তু এসব রাজনৈতিক পালা বদলে কোরআনের সাথে আমাদের আচরণে কতোটুকু পরিবর্তন এসেছেÑ দু’শ বছর পথ পাড়ি দিয়ে আজ সে আÍ বিশ্লেষণের একান্ত প্রয়োজন। কোরআনের পক্ষে এখানে কতোটুকু কাজ করা হয়েছে, কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করাÑ সে তো অনেক বড়ো কথা, কিন্তু সে সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ যমীনের প্রায় ৮০ মিলিয়ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কতো লোককে আমরা এ যাবৎ আল্লাহর কিতাবের বাংলা অনুবাদ ও তাফসীরের সাথে পরিচিত করতে পেরেছি, তারও মনে হয় একটা পর্যালোচনা আজ প্রয়োজন।
এ দু’শ বছরের ব্যর্থতার আলোকেই কোরআন কর্মীরা তাদের আগামী শতকের সফলতার কর্মসূচী তৈরী করবে।
বিশ্বের ৩০০ মিলিয়নের অর্ধেকের চাইতে বেশী লোকই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই ক্ষুদ্র ভূখন্ডে বাস করে বলে কোরআন ভিত্তিক কর্মসূচীর সূচনা এখান থেকে শুরু হওয়া উচিত। এছাড়া আরো যেসব কাজের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে, এ যমীনে একটি ‘কোরআনিক মিউজিয়াম’ প্রতিষ্ঠা করা। সর্বশেষে বাংলা ভাষায় কোরআন কর্মে অসমান্য অবদানের জন্যে একটি স্থায়ী ‘কোরআন পদক’ চালু সময়ের দাবী হয়ে পড়েছে।
চতুর্দিকের এই অন্ধকারে আল্লাহ তায়ালা যেন সামনে চলার পথটুকু এ জাতিকে ভুলিয়ে না দেন, আমীন।
রচনাকাল : 2010

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY