আহলে কিতাবদের রোযা

রমযান মোবারক

0
152

আহলে কিতাবধারীদের রোযা
জহির উদ্দিন বাবর

রোজা মানুষের দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উত্কর্ষের চাবিকাঠি। রোজার দ্বারা মানুষ রহমতের অফুরন্ত বারিধারায় সিক্ত হয়। মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়। আল্লাহতায়ালা রোজাদারদের প্রতি এতই সন্তুষ্ট যে, তিনি রোজার প্রতিদান নিজ হাতে দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। অন্য কোনো আমলের ব্যাপারে এ ধরনের কথা বলা হয়নি। মুক্তি ও সফলতা যেহেতু মানবজীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত, এজন্য এর মাধ্যম হিসেবে রোজার প্রচলনও দীর্ঘতর।
প্রায় সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন ধর্মে ও জাতি-গোষ্ঠীতে রোজার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। রোজা যে শুধু আমাদের ওপরই ফরজ করা হয়নি সে কথা আল্লাহতায়ালাও কোরআনে বলেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর (রমজানের) রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পার।’ তাফসিরকারকদের মতে, পূর্ববর্তীদের দ্বারা আগের সব শরিয়তেই রোজা ফরজ ছিল বলে বোঝায়। তাদের ওপরও রোজা রাখার ব্যাপারে বাধ্য-বাধকতা ছিল।
হজরত আদম আ.-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোজার বিধান ছিল। হজরত নুহ আ.-এর সময়ে ওহির বিস্তৃতি ঘটে ও শরিয়ত প্রশস্ততা লাভ করে। তার শরিয়তেও প্রতি মাসে তিনটি রোজা ফরজ ছিল। হজরত মুসা আ. জিলকদ ও জিলহজ মাসের ১০ দিন রোজা পালন করে আল্লাহর দরবারে হাজির হন এবং তাওরাত লাভ করেন। তার শরিয়তেও রোজার সন্ধান পাওয়া যায়। হজরত দাউদ আ. একদিন পর একদিন রোজা রাখতেন। রাসুল সা. বলেন, ‘আল্লাহর কাছে যে রোজা উত্তম সেই রোজা রাখ, আর সেই রোজা হলো যে রোজা দাউদ আ. রেখেছেন। হজরত দানিয়েল আ. একাধারে এক সপ্তাহ পর্যন্ত রোজা রেখেছেন। হজরত ইলয়াস আ. একাধারে ৪০ দিন পর্যন্ত রোজা রেখেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। হজরত মরিয়ম আ. সম্পর্কে কোরআন শরীফে আছে, তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য রোজার নিয়ত করেছি।’
এভাবে প্রত্যেক নবির শরিয়তেই রোজার প্রচলন ছিল। অন্যান্য ধর্মেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইহুদিদের ওপর সপ্তম মাসের ১০ তারিখে কাফফারার রোজা রাখা ওয়াজিব ছিল। প্রাচীন খ্রিস্টানরাও সেই রোজা রাখতেন বলে প্রকাশ। খ্রিস্টান পাদ্রিরা স্বতন্ত্রভাবেও রোজা রাখতেন। প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোজা রাখত। তবে সবার রোজার প্রকৃতি ও ধরন এক ছিল না। যেমন হজরত মরিয়ম আ. যে রোজা রেখেছিলেন বলে প্রকাশ, তা ছিল লোকদের সঙ্গে কথা না বলার রোজা।
রোজার বিধানের ব্যাপারে ইসলাম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম হিসেবে ইসলামে দীর্ঘ সময় একাধারে রোজা রাখাও যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আর প্রতি বছর একাধারে এক মাস রোজা রাখার বিধান উম্মতে মোহাম্মদীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তবে ইসলামে এক মাস রোজা ফরজ হওয়ার আগে রোজা কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করেছে। ইসলাম আগমনের আগে থেকেই মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিনে রোজা ফরজ ছিল। ইসলামে রোজার বিধান নাজিল হওয়ার আগে এ রোজা পালন করা হতো।
রাসুল সা. হিজরত করে মদিনায় আসার পর প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখতেন। সেই সঙ্গে আশুরার রোজাও পালন করতেন। এরপর রোজা ফরজ করা হয়। রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরিতে। তবে কোন মাসে এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। অধিকাংশের মতে, শাবান মাসে।
রমজানের রোজা ফরজ করা হলে প্রথম দিকে মুসলমানদের এখতিয়ার দেয়া হয়, যার ইচ্ছা রাখবে-যার ইচ্ছা ফিদিয়া (রোজার পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ সদকা) দেবে। কিন্তু এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যারা গরিব শুধু তারাই রোজা রাখেন আর যাদের সম্পদ আছে তারা ফিদিয়া দিয়ে দেন। এতে রোজার আদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয় এবং উদ্দেশ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ফলে আল্লাহতায়ালা আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘যারা রমজান মাস পায় তারা অবশ্যই রোজা রাখবে।’ এ আদেশে মুসাফির ও পীড়িত নয় এমন প্রত্যেক নর-নারীর ওপর রোজা পালন আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। তবে যারা চরম বার্ধক্যে উপনীত তাদের প্রতি রোজার বদলে ফিদিয়া দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়।
আগে রাতে শোয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি ছিল। শুয়ে পড়ার পর সব কাজ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু এটা অনেকের ওপর কঠিন মনে হতে থাকে। এজন্য পরবর্তী সময়ে সুবহে সাদিকের আগপর্যন্ত এসব কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়।
ইসলামের রোজার বিধান সর্বজনীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অন্যান্য ধর্মে ও শরিয়তে যেখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর ওপর খণ্ডিতভাবে রোজার বিধান চালু করেছে সে ক্ষেত্রে একমাত্র ইসলামই রোজাকে সবার মুক্তির ধাপ হিসেবে নির্ণয় করেছে।
রমজানের এক মাস রোজা ফরজ করা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ করুণার দান। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. লিখেছেন দরোজা প্রবৃত্তির বিশুদ্ধতার জন্য এক নির্মল প্রতিষেধক ওষুধ।’ যদি রোজার জন্য দু’চারদিন নির্ধারিত হতো তাহলে ওই ওষুধের পরিপূর্ণ ক্রিয়া প্রকাশ পেতো না। আর যদি অনবরত অনেকদিন পর্যন্ত রোজা রাখার নির্দেশ দেয়া হতো তাহলে রোজার কারণে মানুষ শারীরিকভাবে একদম দুর্বল হয়ে পড়ত। তখন উপকারের পরিবর্তে অপকারই বেশি হতো।’
এ কারণেই রোজার সময় এক মাস নির্ধারিত হয়েছে। আবার সেই মাসটিকেও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এই মাস সেই মাস যে মাসে পবিত্র কোরআন মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য নাজিল হতে শুরু করে।

430x242_highlight-alumni

রোজার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সংযমের বিষয়টি মুখ্য হিসেবে ধরা পড়ে। মূলত সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য রোজার প্রচলন ছিল। ইসলামি শরিয়তে ফরজ করা রোজা সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক। (নতুনবার্তা ডট কম)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY