কোরআনে উপস্থাপিত কিছু জীবন্ত চিত্র

কোরআন ভাবনা

0
723

কোরআনে উপস্থাপিত কিছু জীবন্ত চিত্র

seths-pic1

মহাগ্রন্থ আল কোরআনের একটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো তা যে কোনো দৃশ্যের জীবন্ত চিত্রায়ন, যে কোনো চরিত্রের সার্থক রূপায়ন করে। হাজার হাজার বছর পূর্বের ঘটনাগুলো পাঠকের সামনে কোরআন এমনভবে উপস্থাপন করে যেন ঠিক এক্ষুণি তা চোখের সামনে ঘটছে। সে যেন ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। মানুষের নাম ধাম উল্লেখ না করে বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন চিন্তা ধারার, বিভিন্ন চরিত্র বৈশিষ্ট্যের মানুষগুলোকে এমন সার্থকভাবে উপস্থাপন করে যে, লাখ লাখ মানুষের মধ্যে আপনি নির্দিষ্ট করে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবেন, ঠিক কোন মানুষটির কথা কোরআন এখানে বলতে চেয়েছে। কোরআনের দৃশ্য চিত্রায়নের ধারাবাহিকতায় আমরা এখানে সূরা বাকারার ৩২ নং রুকুতে আলোচিত বনী ইসরাঈলদের একটি ঘটনা তুলে ধরতে পারি। হাজার হাজার বছর পূর্বে সংঘটিত ঘটনাটি উপস্থাপন করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন।
‘তুমি কি দেখোনি ?’
আয়াতের সম্বোধনটিই এমন যে, শ্রোতা স্বয়ং যেন সেই ঘটনার সামনে উপস্থিত। সবকিছু যেন তার সামনেই ঘটছে। আয়াতের স্বাভাবিক বর্ণনাভংগিই শ্রোতার সামনে হাজার হাজার ভীতসন্তস্ত্র পলায়নপর মানুষের একটি প্রতিচ্ছবি জীবন্তরূপে তুলে ধরে। ‘তুমি কি দেখোনি?’ মাত্র এই শব্দ দুটির মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এমন সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। অন্য কোনো বর্ণনাভংগি মানুষের বিবেককে এতো জোরে নাড়া দিতে পারে না। পারে না হাজার হাজার বছর পূর্বের হাজার হাজার মানুষের ইতিহাস এমন সার্থকভাবে এতো স্বল্প শব্দে তুলে ধরতে, অথচ আল্লাহ তায়ালা মাত্র দুটি শব্দের মাধ্যমেই তা তুলে ধরেছেন।
আয়াতটি এক জীবন্ত দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরে। আমরা যেন দেখতে পাচ্ছি, হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুভয়ে ভীতসন্তস্ত হয়ে দিকবিদিক ছুটছে। তারা পালিয়ে মৃত্যু থেকে বাঁচতে চাইছে। এরপর হঠাৎ করে নিমেষেই দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে নতুন দৃশ্য সামনে হাযির। যে মৃত্যুভয়ে তারা পালাচ্ছিলো সেই সর্বগ্রাসী মৃত্যুই তাদের সামনে এসে হাযির হয়েছে। মাত্র একটি শব্দে এ দৃশ্যটি আল্লাহ তায়ালা চিত্রায়ন করেছেন ‘তোমরা মরে যাও ………..।
এই একটি শব্দই বলে দিচ্ছে , তাদের ভয়ভীতি, তাদের শংকা, মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্যে তাদের সকল প্রচেষ্টা সর্বতোভাবে ব্যর্থ, সম্পূর্ন নিষ্ফল, একেবারেই অর্থহীন ছিলো। ‘মরে যাও’ শব্দটি যে তথ্য আমাদের চেতনায় বদ্ধমূল করে দিতে চায় তা হলো, মৃত্যু থেকে বাঁচার চেষ্টা ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। আয়াতটি আমাদের আরো বুঝিয়ে দিচ্ছে, আল্লাহর ফয়সালা অবধারিতভাবে কার্যকর হবে, তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আল্লাহ তায়ালা চাইলে মুহূর্তেই তা বাস্তবায়িত হয়। ‘অতপর তিনি তাদের (পুনরায়) জীবিত করলেন।’
তাদের পুনর্জীবন দেয়ার কারণ কী ছিলো তা আল্লাহ তায়ালা এখানে বলেননি। এটা বলার কোনো প্রয়োজনও ছিলো না। আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি একেবারে ¯ক্সষ্ট করে তুলে ধরতে চান যে, মানুষ ভালো করে বুঝে নিক, এমন এক মহাপরাক্রমশালী সত্তা রয়েছেন, যাঁর কুদরতী হাতে তাদের জীবন মৃত্যু সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনিই বান্দার অবস্থার পরিবর্তন ঘটান। তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো ইচ্ছা বাস্তবায়নে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারো এমন ক্ষমতা নেই যে, তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়নে কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তিনি যা চান তা-ই হয়েছে, তা-ই হচ্ছে এবং চিরকাল তা-ই হবে। এ ব্যাখ্যাই মানুষের সামনে জীবন মৃত্যুর বাস্তব ও সার্থক চিত্র তুলে ধরে।
জীবন দেয়া মৃত্যু দেয়া, অন্য কথায় জান কবয করা এবং তা আবার ফিরিয়ে দেয়া, তথা জীবন মৃত্যুর বাস্তব দৃশ্য তুলে ধরার পর জীবনের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত বিষয় রেযেক প্রসংগেও এখানে কিছু আলোচনা রয়েছে। এ পর্যায়ে কোরআন বলছেÑ
‘আল্লাহই (রেযেক) সংকীর্ণ করে দেন এবং তিনি (যাকে চান তাকে) প্রাচুর্য দান করেন।’
‘কবয’ এবং ‘বাস্ত’ শব্দ ব্যবহার করে খুবই সংক্ষিপ্ত ও সূক্ষ্মভাবে আল্লাহ তায়ালা রূহ কবয ও তা পুনরায় সে রূহকে ফিরিয়ে দেয়ার অর্থের সাথে রেযেক দেয়া ও কেড়ে নেয়ার সামঞ্জস্য বিধান করেছেন।
শাব্দিক সাযুজ্যের মাধ্যমে বিষয় দুটির মধ্যে বাস্তব সাদৃশ্যের দিকে ইংগিত রয়েছে। দৃশ্য দুটির চিত্রায়নের মাঝে সূক্ষ্ম এক জীবন্ত মিল রাখা হয়েছে। সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দ চয়নের মাধ্যমে আলোচিত দুটি বিষয়ের এমন সাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে, যাতে পাঠকের হৃদয়ে এর অন্তর্নিহিত মিলের বিষয়টিও ষ্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে।
সূত্র: গ্রন্থ বিস্ময়কর গ্রন্থ আল কোরআন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY