প্রিয় নবী (স) এর দাওয়াতের বিভিন্ন যুগ ও পর্যায়

0
267
SONY DSC

প্রিয় নবী (স) এর দাওয়াতের বিভিন্ন যুগ ও পর্যায়

অনুবাদ: খাদিজা আখতার রেজায়ী

মোহাম্মদ (স.)-এর নবুয়ত জীবনকে আমরা দ্ভুাগে ভাগ করতে পারি। তার এক ভাগ অন্যভাগ থেকে পুরোপুরি সমুজ্জ্বল এবং বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এ দুভাগ হড়ে–Ñ
মক্কী জীবন Ñ প্রায় তেরো বছর।
মাদানী জীবনÑ দশ বছর।
উল্লিখিত দুভাগ আবার কয়েক পর্যায়ে বিভক্ত এবং এ পর্যায়স্পলোও স্বীয় বৈশিষ্ট্যে একটি আরেকটি থেকে ভিন্ন এবং বৈশিষ্ট্যমস্কিত। নবীজীবনের উভয় অংশে সংঘটিত বিভিন্ন পরিস্থিতির গভীর পর্যালোচনার পর আপনি তা অনুমান করতে পারবেন।
রসূল (স.)-এর মক্কী জীবন তিন পর্যায়ে বিভক্ত।
১. গোপন দাওয়াতের পর্যায়Ñ তিন বছর।
২. মক্কাবাসীর মাঝে প্রকাশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের পর্যায়Ñ এ পর্যায় নবুয়তের চতুর্থ বছর থেকে দশম বছরের শেষ পর্যন্ত ব্যাপ্ত।

মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াতের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিস্তারে
সময়:
নবুয়তের দশম সালের শেষ ভাগ থেকে মদীনায় হিজরত পর্যন্ত
হেরা স্পহার অভ্যন্তরে:
হেরা স্পহা:
এটি একটি ছোটো স্পহা, এর দৈর্ঘ চার গজ এবং প্রস্থ পৌনে দুই গজ। নীচের দিক গভীর নয়। ছোটো একটি পথের পাশে ওপর প্রান্তরের সঙ্গমস্থলে এ স্পহা অবস্থিত।

ওহী নিয়ে জিবরাঈলের আগমন

যুক্তি-প্রমাণ এবং বিভিন্ন ইঙ্গিতের ওপর সামগ্রিক দৃষ্টিপাত করে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর প্রথম ওহী নিয়ে আগমনের দিন তারিখ নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। আমাদের গবেষনা পর্যালোচনা মোতাবেক, প্রথম ওহী এসেছিলো রমযান মাসের ২১ তারিখ সোমবার রাতে। এ দিনটা ছিলো ৬১০ খৃম্ভাব্দের ১০ আগম্ভ সোমবার। চান্দন্দমাসের হিসাব মোতাবেক এ সময় রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স হয়েছিলো ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন এবং সৌর বছরের হিসাব অনুযায়ী ৩৯ বছর ৩ মাস ২২ দিন। ৪
ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁকে বলেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এমন জোরে চাপ দেন, যেন আমার সব শক্তি নিংড়ে নেয়া হয়েছে। এরপর ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। পুনরায় ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন।
ত™£তীয়বার ফেরেশতা আমাকে বুজে জড়িয়ে ধরে তার ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো, ষ্ক্রইকরা বে-ইসমে রাল্টিকাল্লাযী খালাক্,৫ অর্থাচ্ঞ পড়ো তোমার সেই প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো তোমার অতি দয়ালু প্রভুর নামে।

নি¤œ™£পÑ
ওহীর আলোচনা প্রসংগে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর মখলুকের মধ্যে কবি এবং পাগল ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। প্রচস্ক ঘৃণার কারণে এদের প্রতি চোখ তুলে তাকাতেও আমার ইড়–া হতো না। ওহী আসার পর আমি মনে মনে বললাম, কোরায়শরা আমার ব্যাপারে এমন কথা বলতে পারবে না। আমি পাহাড় চূড়ায় উঠে নীচে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়ে চিরকালের জন্যে শান্তি পেয়ে যাবো। আমি এ™£প চিন্তা করে বের হই। পাহাড়ের মাঝামাঝি ওঠার পর আসমান থেকে আওয়ায এলো, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আর আমি জিবরাঈল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এ আওয়ায শোনার পর আমি আকাশের প্রতি মাথা তুলে দেখি, জিবরাঈল (আ.) মানুষের আক™£তি ধরে দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলছেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আর আমি জিবরাঈল ফেরেশতা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে জিবরাঈলকে দেখতে থাকি। যে ইড়–ায় এসেছিলাম তা ভুলে যাই। আমি তখন সামনেও যেতে পারছিলাম না, পেছনেও না। আকাশের যেদিকেই তাকাড়ি–লাম, সেদিকেই জিবরাঈলকে দেখতে পাড়ি–লাম। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এর মধ্যে খাদিজা আমার খোঁজে লোক পাঠান। তারা মক্কা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু আমি নিজের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে থাকি।
সাময়িকভাবে ওহীর আগমন স্থগিত
ওহীর আগমন কতোদিন যাবত স্থগিত ছিলো এ সম্পর্কে ইবনে স্দা হযরত ইবনে আল্টাসের একটি বর্ণনা উদ্ধ™£ত করেছেন। এতে উল্লেখ রয়েছে, ওহী কয়েকদিনের জন্যে স্থগিত ছিলো। সবদিক বিবেচনা করলে এ বর্ণনাই অগ্রগণ্য এবং নিশ্চিত মনে হয়। একটা কথা বিখ্যাত রয়েছে, আড়াই বা তিন বছর ওহী স্থগিত ছিলো, তা একেবারেই অসত্য। তবে এখানে এ সম্পর্কিত যুক্তি প্রমাণ আলোচনার অবকাশ নেই।৮
ওহী নিয়ে পুনরায় জিবরাঈলের আগমন
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (র.) লিখেছেন, ওহী কিছুকাল স্থগিত থাকার কারণ ছিলো, তিনি যে ভয় পেয়েছিলেন সেই ভয় যেন কেটে যায় এবং পুনরায় ওহীপ্রাপ্তির আগ্রহ এবং প্রতীক্ষা তাঁর মনে জাগে।১০

ওহীর বিভিন্ন রকম
এক. সত্য স্বপ্নÑ যার মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের সূচনা হয়।
দুই. ফেরেশতা তাঁকে দেখা না দিয়ে তাঁর মনে কথা প্রক্ষেপ করতেন। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ষ্পহুল কুদুস আমার মনে একথা বসিয়ে দিলেন যে, কোনো মানুষ তার জন্যে নির্ধারিত রেযেক পুরোপুরি পাওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করো এবং ভালো পন্থায় রেযেক তালাশ করো। রেযেক পেতে বিল¤œ যেন তোমাদের আল্লাহর নাফরমানীর মাধ্যমে রেযেক তালাশে উদ্ভুদ্ধ না করো। কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে, সেটা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া যায় না।
তিন. ফেরেশতা মানুষের আক™£তি ধরে এসে রসূল (স.)-কে স¤েœাধন করতেন। ফেরেশতা যা কিছু বলতেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুখস্থ করে নিতেন। এ সময় কখনো কখনো সাহাবায়ে কেরামও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।
চার. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ন্টাŸনির মতো টন টন শব্দে ওহী আসতো, এটি ছিলো ওহীর সবচেয়ে কঠোর অবস্থা। এ অবস্থায় ফেরেশতা তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং প্রচস্ক শীতের মওসুমেও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়তো। তিনি উটের ওপর সওয়ার থাকলে সেটি মাটিতে বসে পড়তো। একবার হযরত যায়দ ইবনে সাবেতের ঊষ্পর ওপর তাঁর ঊষ্প থাকা অবস্থায় ওহী আসে। হযরত যায়েদ এতো ভার বোধ করলেন যেন তার ঊষ্প থেঁতলে যাবে।
পাঁচ. তিনি ফেরেশতাকে তার প্রক™£ত চেহারায় দেখতেন। সে অবস্থায়ই ফেরেশতা আল্লাহর ইড়–ায় তাঁর ওপর ওহী নাযিল করতেন। দ্বুার এ™£প হয়েছিলো। কোরআনের সূরা নাজমে আল্লাহ তায়ালা যার উল্লেখ করেছেন।
ছয়. মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা নামায ফরয হওয়া এবং অন্যান্য বিষয়ের ওহী নাযিল করেন। যখন রসূল (স.) আকাশে ছিলেন।
সাত. ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ তায়ালার সরাসরি রসূল (স.)-এর সাথে কথা বলা, যেমন হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে বলেছিলেন। মূসা (আ.)-এর ওহীর এ প্রকার কোরআন মজীদের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত রয়েছে। নবী করীম (স.)-এর এ প্রকারের ওহীর প্রমাণ (কোরআন মাজীদের পরিবর্তে) ম্রোজের হাদীসে রয়েছে।
আট. কেউ কেউ আর এক প্রকার ওহীর উল্লেখ করেছেন। তা হড়ে–, আল্লাহ তায়ালার পর্দাবিহীন মুখোমুখি অবস্থায় কথা বলা, ওহীর এ প্রকার সম্পর্কে পূর্ববর্তীদের থেকে নিয়ে পরবর্তীদের পর্যন্ত মতভেদ চলে আসছে।

তাবলীগের নির্দেশ

এক. ভয় প্রদর্শন করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এ নির্দেশের শেষ মনযিল হড়ে–, বিশে^ আল্লাহর ইড়–ার বিষ্পদ্ধে যেসব কাজ হড়ে–, তার মারা—গক পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। সে ভয় এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে আল্লাহর আযাবের ভয়ে মানুষের মনে মগজে শোরগোল এবং উথাল পাথাল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
দুই. রব-এর শেন্দষ্ঠত্ব বড়োত্ব কার্যকর করার শেষ মনযিল হড়ে–, যমীনে যেন শুধু তাঁরই শেন্দষ্ঠত্ব বড়োত্ব বহাল থাকে, অন্য কারো শেন্দষ্ঠত্ব বহাল থাকতে দেয়া যাবে না; বরং অন্য সব কিছুর আধিপত্য নস্যাচ্ঞ করে উfiিয়ে রেখে দিতে হবে। ফলে আল্লাহর যমীনে একমাত্র তাঁর শেন্দষ্ঠত্ব ও মহিমাই যেন অবশিষ্ট থাকে।
তিন. পোশাকের পবিত্রতা পরিড়–ন্নতার শেষ মনযিল হড়ে–, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পবিত্রতা পরিড়–ন্নতা অর্জন এবং সর্বপ্রকার অপরিড়–ন্নতা অপবিত্রতার কলুষতা থেকে পূর্ণতার সে সীমায় উন্নীত হতে হবে, যা আল্লাহর রহমতের ঘন ছায়ায় তাঁর হেফাযত ও সংরক্ষণে এবং হেদায়াত ও নূরের অধীনে সম্ভব হয়। উল্লিখিত রকমের পবিত্রতা পরিড়–ন্নতা অর্জনের পর মানবসমাজের এমন উত্তম ও নমুনা সৃষ্টি হয়, যেন সকল সুস্থ নীরোগ অন্তর রসূল (স.)-এর প্রতি আক™£ষ্ট হয় এবং সব বক্র অন্তকরণে ঁতার ভীতি প্রভাব ও সম্মান মর্যাদার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তাঁর মহিমাই অন্তরে জাগ্রত হয়। এভাবে সমগ্র বিশ^ বিরোধিতা বা আনুগত্যে তাঁর আশেপাশে দৃঢ়ভাবে স্থির হয়ে যায়।
চার. কারো প্রতি দয়া অনুগ্রহ করার পর অধিক বিনিময় প্রত্যাশা না করার শেষ মনযিল হড়ে–, নিজের কাজকর্মকে শেন্দষ্ঠ মনে করবে না, স্পষ্পত্ব দেবে না; বরং একটির পর অন্য একটি কাজের জন্যে চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে। বড়ো রকমের কোরবানী করেও সেটাকে এ অর্থে তুড়– ভাবতে থাকবে যে, এটা আমার কোনো ক™£তিত্ব নয়। আল্লাহ তায়ালার স্মরণ এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির অনুভূতি যেন নিজের চেষ্টা সাধনার অনুভূতির ওপর প্রবল থাকে।
পাঁচ. শেষ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের কাজ শুষ্প করার পর শত্র∆দের তরফ থেকে বিরোধিতা, হাসিঠাট্টা, উপহাস বিদন্দƒপ থেকে আপনি এবং আপনার সঙ্গীদের হত্যা করার এবং আপনার আশেপাশে সমবেত হওয়া ঈমানদারদের নিশ্চি€ করার সর্বা—গক চেষ্টা প্রচেষ্টা হবে। বীরত্ব এবং দৃঢ়তার সাথে আপনাকে এসব কিছুতে ধৈর্যধারণ করতে হবে। আপনার এসব কিছুরই মুখোমুখি হতে হবে। এ ধৈর্য মনের শান্তির জন্যে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দ্ভীন প্রচার প্রসারের জন্যে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ষ্ক্রওয়া লিরাল্টেকা ফাছর্বে, অর্থাচ্ঞ তোমার প্রতিপালকের জন্যে ধৈর্য ধারণ করো।

ক, তাওহীদ। খ, পরকালের প্রতি বিশ^াস। গ. তাযকিয়ায়ে নফৎসের ওপর স্পষ্পত্বারোপ। অর্থাচ্ঞ অশুভ পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাবে এমন কলুষ অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকা, ফযীলত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নেক আমলে তচ্ঞপর থাকার চেষ্টা সাধনা করা। ঘ. নিজের সকল কাজ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। ঙ. এসব কিছু প্রিয় নবীর নবুয়ত রেসালাতের ওপর বিশ^াস স্থাপন, মাহা—গ্যপূর্ণ নেত™£ত্বের অনুসরণ এবং তার হেফাযাত ও সচ্ঞপথ প্রদর্শনে পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আলোকে সম্পন্ন করা।

প্রথম পর্যায়
তাবলীগের কাজে কষ্ট শন্দম
গোপন দাওয়াতের তিন বছর
মক্কা ছিলো আরববাসীর দ্ভীনী কেন্দন্দ। এখানে কাবা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং সেসব দেবমূর্তির তত্ত্বাবধায়কও ছিলো, যাদের সমগ্র আরবের লোকেরা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতো। এ কারণে কোনো দূরবর্তী স্থানের চেয়ে সংস্কার সংশোধন কার্যক্রম চালিয়ে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া ছিলো অধিক কঠিন এবং কষ্টকর। এখানে এমন দৃঢ়চিত্ততার প্রয়োজন ছিলো, যাতে কোনো প্রকার দু”খ কষ্ট এবং বিপদ বাধার ঝটকা স্বস্থান থেকে সরাতে না পারে । এ অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রজ্ঞা কর্মকুশলতার দাবী ছিলো,  প্রথম প্রথম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন করা, যাতে মক্কাবাসীদের সামনে হঠাচ্ঞ কোনো অস্থির চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি এসে না পড়ে।
ইসলামের অগ্রপথিক
রসূল (স.) সর্বপ্রথম তাদেরই দ্ভীনের দাওয়াত দেবেন, যাদের সাথে রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক, এটাই স্বাভাবিক। এসব মানুষ হলেন তাঁর পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধব। অতএব নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে তাঁর পরিবারের লোকজন এবং বন্ধু বান্ধবদেরই ইসলামের দাওয়াত দেন। অনু™£প চেনা পরিচিত লোকদের মধ্যে তাদেরই তিনি শুষ্পতে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, যাদের চেহারায় তিনি কল্যাণ মঙ্গলের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন এবং জানতে পেরেছিলেন, তারা সত্য এবং কল্যাণ মংগলকে পছন্দ করে, তাঁর সত্যবাদিতা ও পুণ্যকর্মশীলতা সম্পর্কে অবগত।
অতপর তিনি যাদের ইসলামের দাওয়াত দেন, তাদের মধ্য থেকে এমন এক দল মানুষ তাঁর দাওয়াত কবুল করেন, যাদের মনে কখনোই রসূল (স.)-এর সম্মান মর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা সম্পর্কে কোন প্রকার সন্দেহ জাগেনি। ইসলামের ইতিহাসে এরা ষ্ক্রসাবেকীনে আউয়ালীন্Ñ প্রথম অগ্রবর্তী দল নামে প্রসিদ্ধ। তাদের মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন রসূলের সহধর্মিনী উম্মুল মোমেনীন খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ, তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়দ ইবনে সাবেত ইবনে শোরাহবিল কালবী,১ তাঁর চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালেব, যিনি ছিলেন সে সময় তাঁর পরিবারে প্রতিপালিত বালক এবং  হিজরতকালে তাঁর স্পহার সাথী ঘনিষ্ঠ সুহৃদ হযরত আবু বকর সিষ্কিক (রা.)। তারা সবাই প্রথম দিনেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।২
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু বকর সিষ্কিক (রা.) প্রচারে আ—গনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সর্বজনপ্রিয়, নরম মেজায, উত্তম চরিত্র এবং উদার মনের মানুষ। মানবীয় সৌজন্য, দূরদর্শিতা, ব্যবসায় বাণিজ্য এবং চমচ্ঞকার ব্যবহারের কারণে সব সময় তাঁর কাছে মানুষ যাওয়া আসা করতো। এ সময় তিরি তাঁর কাছে যাতায়াতকারী লোকদের মধ্যে যাদের বিশ^স্ত ও নির্ভরযোগ্য পেয়েছেন তাদের দ্ভীন ইসলামের দাওয়াত দিতে শুষ্প করেন। তার চেষ্টায় হযরত ওসমান (রা.), হযরত যোবায়র (রা.), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), হযরত স্দা ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.), হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা ছিলেন ইমামদের অগ্রবর্তী দল।
হযরত বেলাল হাবশী (রা.)ও প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন। তার পরে উম্মতের আমীন (আমানতদার) খ্যাত হযরত আবু ওবায়দা আমের ইবনে জাররাহ, আবু সালামা ইবনে আবদুল আছাদ, আরকাম ইবনে আবুল আরকাম, ওসমান ইবনে মাযউন এবং তাঁর দুই ভাই কোদামা ও আবদুল্লাহ, ওবায়দা ইবনে হারেস, মোত্তালেব ইবনে আবদে মানাফ, সাঈদ ইবনে যায়দ এবং তাঁর স্ত্রী ওমরের বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব, খাল্টাব ইবনে আরাত, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং অন্য কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা সামগ্রিকভাবে কোরায়শ বংশের বিভিন্ন শাখার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ইবনে হেশাম তাদের সংখ্যা চল্লিশের বেশি বলেছেন। (দেখুন, ইবনে হেশাম, ১ম খস্ক, পৃ. ২৪৫-২৬২)।
তাদের কয়েকজনকেও ষ্ক্রসাবেকীনে আউয়ালীর্নে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উল্লিখিত ভাগ্যবানদের ইসলাম গ্রহণের পর দলে দলে লোক ইসলামের শীতল ছায়ায় আশন্দয় গ্রহণ করেন। মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলোচনা চলতে থাকে এবং দিন দিন ব্যাপকতা লাভ করে।৩ তারা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের ইসলাম শিক্ষা এবং পথনির্দেশ দেয়ার জন্যে গোপনে গোপনে দেখা করতেন। কেননা তাবলীগের কাজ তখনো ব্যক্তি পর্যায়ে গোপনে চলছিলো। সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল হওয়ার পর ঘন ঘন ওহী নাযিল হতে থাকে। এ সময় ছোটো ছোটো আয়াত নাযিল হড়ি–লো। আয়াতস্পলো প্রায় একই ধরনের আকর্ষণীয় শব্দে শেষ হতো। এসব আয়াতে থাকতো স্বস্তি শান্তিদায়ক চিত্তাকর্ষক গীতিময়তা। যা শান্তি স্বস্তিপূর্ণ কোমল পরিবেশ অনুযায়ী হতো। এসব আয়াতে তাযকিয়ায়ে নফস (আ—গশুদ্ধি)-এর সৌন্দর্য, কল্যাণ মংগল এবং দুনিয়ার মায়াজালে জড়িয়ে যাওয়ার কুফল সম্পর্কে আলোকপাত করা হতো এবং আয়াতে জান্নাত জাহান্নামের চিত্র এমনভাবে অংকন করা হতো, যেন তা চোখের সামনে দেখা যাড়ে–। এ সকল আয়াত ঈমানদারদের সমকালীন মানব সমাজ থেকে আলাদা ভিন্ন এক পরিবেশে পরিভ্রমণ করতো।
নামাযের আদেশ
প্রথমে যা কিছু নাযিল হয় তাতে নামাযের আদেশও ছিলো। মোকাতেল ইবনে সোলায়মান বলেন, ইসলামের শুষ্পতে আল্লাহ তায়ালা সকালে দ্রুাকাত এবং সন্ধ্যায় দ্রুাকাত নামায ফরয করেছিলেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন, ষ্ক্রসকাল সন্ধ্যায় তুমি প্রশংসার সাথে তোমার প্রতিপালকের তাসবীহ পাঠ করো।্
ইবনে হাজার (রা.) বলেন, রসূল (স.) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ম্রোজের আগে থেকেই নামায আদায় করতেন। তবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আগে অন্য কোনো নামায ফরয ছিলো কিনা। কেউ কেউ বলেন, সূর্য উদয় হওয়ার এবং অস্ত যাওয়ার আগে এক এক নামায ফরয ছিলো।
হারেস ইবনে ওসামা (রা.) ইবনে লাহিয়ার সূত্রে অবিড়ি–ন্নভাবে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) থেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, রসূল (স.)-এর কাছে যখন প্রথম ওহী আসে, তখন জিবরাঈল এসে তাঁকে ওযুর নিয়ম শিক্ষা দেন। ওযু শেষ করার পর তিনি এক আঁজলা পানি নিয়ে লজ্জাস্থানে ছিটিয়ে দেন। ইবনে মাজাও এ অর্থবোধক হাদীস বর্ণনা করেছেন। বার্ াইবনে আযেব এবং ইবনে আল্টাস (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ইবনে আল্টাসের হাদীসে এও বর্ণিত রয়েছে, এ নামায ছিলো প্রথম দিকের ফরযসমূহের অন্তর্ভুক্ত।৪
ইবনে হেশাম বর্ণনা করেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম নামাযের সময় পাহাড়ে চলে যেতেন এবং গোপনে নামায আদায় করতেন। একবার আবু তালেব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আলী (রা.)-কে নামায আদায় করতে দেখে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। নামাযের মূলতত্ত্ব জানার পর তিনি বলেন, এ অভ্যাস অব্যাহত রেখো।৫
কোরায়শদের ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি অবগতি লাভ
বিভিন্ন ঘটনা থেকে বুঝা যায়, এ সময় তাবলীগের কাজ যদিও ব্যক্তি পর্যায়ে গোপনভাবে করা হড়ি–লো, কিন্তু কোরায়শরা বিষয়টা জানতে পারছিলো। তবে তারা একে কোনো স্পষ্পত্ব দেয়নি।
মোহাম্মদ গাযালী লেখেন, কোরায়শরা গোপনে ইসলাম প্রচারের খবর পেয়েছিলো, কিন্তু তারা এর প্রতি কোন স্পষ্পত্ব দেয়নি। সম্ভবত তারা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও এমন কোন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেছিলো, যিনি ইলাহ এবং ইলাহের অধিকার সম্পর্কে কথাবার্তা বলেন। আরব সমাজে আগেও এ ধরনের লোক ছিলো। যেমন, উমাইয়া ইবনে আবুস সালত, কুস ইবনে স্ােয়দাহ, আমর ইবনে নোফায়ল প্রমুখ। তবে কোরায়শরা তাঁর প্রচারিত ইসলামের প্রসার এবং প্রভাব বৃদ্ধিতে কিছুটা শংকা অবশ্যই অনুভব করেছিলো। তাই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের দৃষ্টি রসূল (স.) এবং তাঁর তাবলীগের ওপর নিবদ্ধ থেকে ছিলো।৬
তিন বছর যাবত তাবলীগের কাজ ব্যক্তিগত পর্যায়ে গোপনভাবে চলতে থাকে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY