বইপড়া, বইভান্ডার ও আমাদের পিছিয়ে পড়া গ্রন্থ সংস্কৃতি

Recent Issue

0
562

বইপড়া, বইভান্ডার ও আমাদের পিছিয়ে পড়া গ্রন্থ সংস্কৃতি
ড. হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

আজ শুধু লন্ডন, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে কতো ইসলামী  বেরোয়, কতো  বেরোয় ইস্তাম্বুল থেকে আমরা কি জানি? কয়েক বছর আগে আমি তুরস্কের বিখ্যাত লেখক হারূন ইয়াহইয়ার আমন্ত্রণে ইস্তাম্বুল গিয়েছিলাম, সেখানে নতুন তথ্য প্রযুক্তির আলোকে ইসলামী  পুস্তক ও জ্ঞানের যে বিশাল খাযানা আমি দেখতে পেয়েছি, তাতে সত্যিই হতবাক হয়ে গেছি। সে সময় পর্যন্ত হারূন ইয়াহইয়ার  সংখ্যা ছিলো ৩০০ শ’র কাছাকাছি। একই সময়ে সেখানে ‘রাসায়েলে নূর’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ বদিউয যামান নূরসীর জ্ঞানভান্ডারের বিরাট সংগ্রহও আমি দেখেছি। সেখানে রয়েছে গুলেনের এক বিশাল কর্মকান্ড, সে কর্মকান্ডে প্রাইমারি স্কুল থেকে বিশ্ব বিদ্যালয়ে অজ¯্র মিডিয়া মিডিয়া সেন্টার থেকে ডজনে ডজনে টিভ চ্যানেলে বাসলামের প্রচার প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কাজ কওে যাচ্ছে। হারুন ইয়াহইয়ার যে গুলো সে সময় পর্যন্ত ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ একটি সেট তিনি আমাকে প্রেজেন্ট করেছিলেন। এর কয়েকটা  আমি ঢাকায় এনে ড. শমশের আলীকে দেখানোর পর তিনি গুলো দেখে এতোই উৎফুল্ল হলেন যে, সাথে সাথেই লন্ডন থেকে তার ইউনিভার্সিটির জন্যে এর একটা পুরো সেট আনিয়ে নেন, অথচ ড. শমশের আলী নিজেও ইসলাম ও বিজ্ঞানের ওপর কম লেখেন না!

ReadingRest2
কোরআন হাদীসের ওপর অনেক সমৃদ্ধ  বেরুচ্ছে বৈরুত, আল আযহার ও রিয়াদ থেকে। হাজার হাজার  পড়া তো দূরের কথাÑ এগুলোর নাম পর্যনাত আমরা শুনিনি, খবরও রাখিনা। সম্ভবত ইন্টারনেট, ওয়েভ না থাকলে আমাদের যুব কিশোরদের জন্যে সে সুযোগ কোনোদিনই থাকতো না।
বর্তমান পৃথিবীতে জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই তাদের এ লাখ লাখ নতুন প্রজন্মের জ্ঞানের বিকাশ সাধনের জন্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে পৃথিবীর যেখানে যে টি বের হয় তার অšত একটা কপি সংগ্রহ করে এখানে বড়ো আকারের একটা ‘সেন্ট্রাল বুক ব্যাংক’ তৈরী করা যেতে পারে। একবার উদ্যোগ নিলে সব  না হোকÑ দেখতে দেখতে কয়েক বছরের মধ্যে এই বুক ব্যাংক-এর মাধ্যমে র বিরাট সংগ্রহ আমরা তৈরী করে ফেলতে পারবো।

বাংলাদেশে কিংবা বিলেতে এই কাজের উদ্যোগ নিতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই, আর একবার উদ্যোগ নিলে বাইরের দেশগুলোতে আমাদের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আছে তারাও এ কাজে আন্তরিকতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে, তাও সত্য। এ মর্মে বাইরের কিছু ভাইদের সাথে আমাদেও কিছু কথাও হয়েছে। এমনি একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক বুক ব্যাংক’ কায়েম করতে পারলে এখানে যারা কোনো লেটেস্ট বিষয় নিয়ে রিচার্স করতে চান এ বুক ব্যাংক থেকে তারাও উপকৃত হতে পার।ে এই বিশাল সংগ্রহশালায় কয়েকজন সার্বক্ষণিক অনুবাদক থাক,ে যারা বিভিন্ন ভাষা থেকে একান্ত জরুরী পুস্তকগুলোর বাংলা অনুবাদ করবে। আব্বাসীয় খলীফা মামুনের মতো পান্ডুলিপির ওযনে তাদের সোনা না দিতে পারলেও কাগজের ওযন লোকাল কারেন্সীর সমান বিনিময় তো আমরা দিতে পারবো!
বাইরের পৃথিবীর ইসলামী জ্ঞানভান্ডার থেকে উপকৃত হতে না পারলে এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্যে সে সুযোগ করে না দিতে পারলে জ্ঞান বিজ্ঞান, মেধা ও প্রতিভার বিকাশে আমাদের এ লজ্জাকর স্থবিরতা কোনোদিনই কাটবে না। আমরাও মুসলিম বিশ্ববাজারে এই দীন হীন অবস্থায়ই থেকে যাবো। কথাটা আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে যে নির্দিষ্ট কোনো ছকবাঁধা নিয়মে পড়ে বিশেষ কোনো আন্দোলনের ভালো কর্মী হওয়া গেলেও জ্ঞান বিজ্ঞানে কোনোদিনই পারদর্শী হওয়া যায় না। আজ যখন লন্ডনে ড. ইউসুফ আল কারদাওয়ী, ড. যাকির নায়েক, হারূন ইয়াহইয়ার মতো বড়ো বড়ো ব্যক্তিদের কথা আলোচিত হয়, তখন বিশ্বসভায় হাযির করার মতো এমন একজন ব্যক্তিও আমরা পেশ করতে পারি না, যিনি এদের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানের লেটেস্ট বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পার।ে কয়েক বছর আগে ব¤েব  ১০ দিন ব্যাপী যে আন্তর্জাতিক পীস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে পৃথিবীর প্রায় সব কয়জন ইসলামী স্কলারই উপস্থিত ছিলেন। এ ওয়ার্ল্ড এ্যারেনায় আপনি কি একজনও বাংলাদেশী ইসলামী চিন্তাবিদ দেখেছেন?

আগামীকালের পৃথিবীতে জ্ঞানের যে প্রতিযোগিতা হবে সেখানে জেতার জন্যে তাদের আগামী ১০ বছরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ পরিকল্পনার আওতায় সংগী-সাথীদের সামনে জ্ঞানের দুয়ার অবারিত করে দিতে হবে। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে আন্তর্জাতিক মানের ‘বুক ব্যাংক’ স্থাপন করতে হবে। ইসলাম স¤ক্সর্কে পৃথিবীর যে প্রান্তে যে টি বেরোয় তা এ ব্যাংকে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ইরাক, ইরান সৌদী আরব, মিসর, বৈরুত, যে লক্ষ লক্ষ কোরআন কেন্দ্রিক সাহিত্য আছে, যথাসম্ভব তা যদি একই ছাদের নীচে পাওয়া যায় এবং তা যদি বিনামূল্যে আমাদের কিশোর কিশোরী যুবক যুবতীদের স্টাডি করার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে ‘আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছি’Ñ এ বদনামটুকু ইনশাআল্লাহ অচিরেই মুছে যাবে। বুক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এ কাজের দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে, যারা এ যমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। কারণ এদেশের আগামী প্রজন্ম জ্ঞানে গুণে বিশ্বের নেতৃত্ব দান করুক। যদি একবার কাজটির উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, দেশ বিদেশ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশকরা তাদের প্রকাশিত  ‘ডোনেট’ করতেও এগিয়ে আসবে। এই বুক ব্যাংক থেকে শুধু আন্দোলনের সংগী-সাথীরাই যে উপকৃত হবে তাই নয়Ñ বৃহত্তর পরিসরে এ জাতির একটি বিপুল অংশও এ থেকে নিজেদের জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে পারবে। যারা বিশেষ বিশেষ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করতে চান তারাও এ উদ্যোগ থেকে উপকৃত হতে পারবে।
বিশ্বের মাঝে আমরাই মনে হয় একটি ব্যতিক্রমধর্মী জাতি, যারা কোনো তথ্য ছাড়াই পরিকল্পনা গ্রহণ করি এবং যথাযথ তথ্যের অভাবে পরিকল্পনা বা¯বায়নে বার বার হোঁচট খাই। আমরা এই তথ্যভান্ডারের নাম দিতে পারি ‘ইনফরমেশন এন্ড ডাটা ব্যাংক’। আমাদের দেশে যদি সরকারী পর্যায়ে এসব প্রয়োজনীয় ডাটা সংগ্রহ করা থাকতো, কিংবা সে ডাটার ওপর ভরসা করা যেতো।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY