কাংখিত ইসলামী সমাজ ও বাস্তবমূখী কর্মসূচী

0
325

কাংখিত ইসলামী সমাজ ও বাস্তবমূখী কর্মসূচী
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

গত অর্ধ শতক ধরে দুনিয়ার বহু দেশেই ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছে। কিছু কিছু আন্দোলন বৈষয়িক দিক থেকে সফলতার দ্বারপ্রাšে পৌঁছেও পুরোপুরি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আবার কিছু কিছু আন্দোলন বৈষয়িক দিক থেকে সফলতার ধারে কাছে পৌঁছতে না পারলেও নিজস্ব কর্মসচী কর্মনীতির কারণে পরবর্তীকালের মানুষদের জন্যে অনেক মল্যবান আদর্শ রেখে গেছে।
আমাদের সময়ের ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এদের উভয়ের উত্তরাধিকারকেই আমাদের জন্যে মল্যবান স¤পদ মনে করতে হবে। এদের উভয়ের কাছ থেকেই আমাদের নিজেদের চলার পথের পাথেয় যোগাড় করতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর থেকে আজ পর্যš এ সাড়ে চৌদ্দশ বছর সময়ের মধ্যে আরব আজমে অনেক কয়টি ইসলামী আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। এদের সবার ব্যর্থতা সফলতার ওপর ভারত উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতার পর্যালোচনামলক মল্যবান একটি পু¯ক আছে। আমি আপনাদের সবাইকে পুনরায় সেটি পড়তে অনুরোধ করবো। এ বই থেকে আমি আমার সচেতন পাঠকদের মাত্র ৩টি আন্দোলন স¤পর্কে ভালো করে পড়তে অনুরোধ করবো। এ ৩টি আন্দোলন ইতিহাসের ৩টি স্বতš ভূখণ্ডে ৩টি ভিন্নধর্মী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
এর প্রথমটি হচ্ছে সপ্তম শতকের ইমাম ইবনে তাইমিয়া,
দ্বিতীয় হচ্ছে চতুর্দশ শতকের মোজাদ্দেদে আলফে সানী ও
সর্বশেষে ঊনবিংশ শতকের বদিউয যামান নরসীর ঐতিহাসিক আন্দোলন।
আমার সচেতন পাঠকরা এতোক্ষণে নিশ্চয়ই ভাবতে শুরু করেছেন, উম্মতের এ দীর্ঘ ইতিহাস থেকে মাত্র ৩টি আন্দোলনের কথা আমি কেন বললাম। এ বইয়ের পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলো পড়তে পড়তে আশাকরি তা পাঠকদের কাছে এমনিই পরিস্কার হয়ে যাবে। আমার বক্ষমাণ এ পু¯কের পরিসর নিতাš সীমিত। এই সীমিত পরিসরে বিশ্বের এ ৩টি গুরুত্বপর্ণ আন্দোলনের বি¯ারিত পর্যালোচনা করা সম্ভব নয়। এ কারণেই আমি পাঠকদের বড়ো বইটি পড়তে অনুরোধ করেছি। এর সাথে আরেকটি বিষয় আমি আমার পাঠকদের সম্ভব হলে পড়তে বলবো, অবশ্য এ বিষয়ের ওপর সম্ভবত এখনো তেমন কোনো বই পু¯ক রচিত হয়নি। এগুলো জানার জন্যে বিজ্ঞ পাঠকদের সা¤প্রতিক কালের পত্র পত্রিকার সাহায্যই বেশী নিতে হবে।
এ সা¤প্রতিক বিষয়টি হচ্ছে ফিলি¯িনের হামাস ও লেবাননের হেযবুল্লাহর কর্মতৎপরতা। এ দুটো সংগঠন আমাদের সা¤প্রতিক সময়ে যথেষ্ট আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ইসরাঈলসহ পশ্চিমা নিউজ মিডিয়ায় এদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার, আরেকদিকে এদের ব্যাপারে মুসলিম রাজা বাদশাহ আমীর ওমারা প্রেসিডেন্ট প্রধানমšীদের লজ্জাজনক অবহেলাজনিত ভূমিকাÑ এ দুটো সংগঠনকে আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে পরিণত করেছে। দো¯ দুশমন সবাই এখন এদের উভয়কে ভূমন্ডলের ওপর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। অপরদিকে তাদের আপনজনদের এদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাও সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। চোখের সামনে বুকের মানিক শিশু পুত্রের দেহ ইসরাইলী শেল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিলো, ইসরাইলী দস্যুরা যাবার সময় হামাসকেই এ জন্যে দায়ী করলো। তারা বললো, হামাসকে যতোক্ষণ পর্যš তোমরা তোমাদের আংগিনায় আশ্রয় দেবে, ততোক্ষণ পর্যš তোমাদের নারী পুরুষ, শিশু কিশোর কেউই আমাদের বোমা থেকে নিরাপদ নয়। বুকের মানিক শিশুটির লাশ জড়িয়ে মা হামাসের জন্যে দোয়া করছেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি হামাসকে কামিয়াব করো। তার শিশুর তাজা রক্ত তখনও তার বুকে ঝরছে, কিšু হামাসের বিরুদ্ধে তার মনে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ক্ষোভ নেই।
লোকেরা আমাদের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন। হামাসও নিজের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। আমাদের এখানকার তুলনায় সেখানে মৃত্যুর ঝুঁকি লক্ষ গুণ বেশী। প্রতি সন্ধ্যায় যেখানে মৃত্যুর আঁধার নামে। প্রতিটি সকালে যেখানে নতুন ধ্বংসের হাতছানি আসে, সেখানে হামাসের প্রতি লক্ষ লক্ষ মানুষের এই ভালোবাসা কেন? কেন সেখানকার মা বোনেরা নিজেদের জীবনের সব হাসি খুশীর বিনিময়েও হামাসের সামান্য কোনো ক্ষতি হোক এটা চায় না। আমাদের দেশে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে চেষ্টা সাধনা করতে চান তাদের সবাইকে জনে জনে আমি অনুরোধ করবোÑ হামাস এবং হেযবুল্লাহর সাংগঠনিক কাঠামো, তাদের গঠনতাšিক বিধান ও তাদের কর্মকৌশল স¤পর্কে বি¯ারিত জানার চেষ্টা করুন।
আমাদের ব্য¯ জীবনের কিছুটা সময় বের করতে হবে। বের করে কাগজ কলম নিয়ে চলুন আমরা কঠোর কিছু বা¯বতা নিয়ে কথা বলি। আমাদের ৫৪ হাজার বর্গমাইলের ১৬ কোটি মানুষের এই দেশটির কি কি সমস্যা আছে। তাদের কোন্ কোন্ সমস্যা সমাধানের জন্যে আপনি চান এ যমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোকÑ সেগুলো আমরা একে একে শনাক্ত করি।
আমাদের দেশের সমস্যাগুলো প্রধানত দু ধরনের,
এক ধরনের সমস্যা হচ্ছে আমাদের দ্বীন ঈমানের। আমরা যেহেতু মুসলমান। মুসলমান হিসেবে আমরা চাই আমাদের দেশের আইন কানুন, বিধি বিধান, সবকিছু ইসলামের নিয়ম মোতাবেক চলুক। মুসলমানদের দেশে মুসলমানরাই পরদেশী হবে, তাদের নিজেদের আইন কানুন, সভ্যতা সংস্কৃতি থেকে দরে রাখার ষড়যš করা হবে, আর মুসলমানরা নতজানু হয়ে দুশমনদের ষড়যš মাথা পেতে নেবে, এটা কখনো হতে পারে না। এই মুসলমানদের ইসলামের পথে চালানোর জন্যে দেশে অবিলম্বে একমুখী ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা, ন্যায়ানুগ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে কোরআন সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন রচনা করা হবে নাÑ একথা বলাই যথেষ্ট নয়, কোরআন সুন্নাহ দিয়েই দেশ ও রাস্ট্র পরিচালনা করতে হবে এবং এ পথের যাবতীয় বাধা বিপত্তি দর করে দেশে ইসলামের পক্ষে একটা ইতিবাচক পরিবেশ কায়েম করার চেষ্টা করতে হবে। মুসলমান হিসেবে এ কাজগুলো আমাদের করতেই হবে। এগুলো আমাদের করতে হবে মুসলমান হিসেবে এ যমীনে নিজেদের অ¯িত্ব বজায় রাখার স্বার্থেই। মুসলমান না হলে এ সমস্যাটা আমাদের থাকতো না।
দ্বিতীয় ধরনের সমস্যা হচ্ছে আমরা মানুষ, মানুষ হিসেবে অন্য মানুষদের মতো আমাদেরও কিছু প্রয়োজন আছে, আছে কিছু মৌলিক সমস্যা।
পৃথিবীতে যেদিন আল্লাহ তায়ালা প্রথম মানুষ পাঠিয়েছেন, সেদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যš প্রত্যেক মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো কিšু একই ধরনের। যুগে যুগে মানুষের সমস্যার ধরন হয়তো কিছুটা বদলেছে; কিšু সমস্যার মৌলিক চরিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সর্বকালের সব মানুষের মৌলিক সমস্যা যদি কয়েকটি শব্দে বর্ণনা করা যায় তাহলে বলতে হবেÑ মানুষকে ক্ষুধা নিবারণের জন্যে খেতে হবে, লজ্জা নিবারণের জন্যে কিছু পরিধান করতে হবে, মাথা গোঁজার জন্যে তাকে মাথার ওপর ছায়া হিসেবে একটু জায়গা দিতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা দিতে হবে। সর্ব শেষে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্যে শিক্ষা দিতে হবে। এ ৫টি হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এর বাইরে যেসব প্রয়োজন আছে তার তালিকা যতো বড়োই আপনি করুন না কেন, এর কোনোটাই মৌলিক প্রয়োজনে পড়ে না। এর কোনোটাই এমন নয় যা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না।
এ কারণেই সৃষ্টির শুরু থেকে প্রতি যুগেই নবী-রসলগণ, তাদের অনুসারী সমাজসংস্কারক ও রাজনৈতিক নেতারা মানুষের এ ৫টি প্রয়োজন পরণের জন্যে চেষ্টা সাধনা করেছেন। মানব জাতির পুরো ইতিহাসে আল্লাহ তায়ালা যতো নবী রসল পাঠিয়েছেন, তারা মানুষের এই মৌলিক সমস্যা সমাধান করার কথাই আগে বলেছেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মো¯ফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নিজেও মানুষের এসব সমস্যার প্রতি সবার আগে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তো প্রায়ই বলতেন, আমি সে ব্যক্তির অভিভাবকÑ যার কোনো অভিভাবক নেই। এখানে আল্লাহর রসল নিজের কথা বলে মলত ইসলামের রাষ্ট্র ও প্রশাসনকেই বুঝিয়েছেন। অপর কথায় ব্যক্তি মানুষের এ ৫টি মৌলিক প্রয়োজন পরণ করার জন্যেই ইসলামে, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রয়োজন। এখন কোনো সমাজে যতোক্ষণ পর্যš এই ৫টি মৌলিক প্রয়োজন পরণ করার মতো পুরোপুরি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততোক্ষণ পর্যš যারা সে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করবেন তাদের সাধ্যমতো এ কাজের চেষ্টা সাধনা করে যেতে হবে, আর এজন্যে আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারীমে ও প্রিয় নবী তাঁর হাদীসে মুসলমানদের জন্যে কিছু অপরিবর্তনীয় কর্মসচীও তৈরী করে দিয়েছেন।
ইসলাম প্রদর্শিত এই কর্মসচীটি এমন, কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা সমাজ ব্যবস্থা কায়েম হলে এটা যেমন হবে সে রাষ্ট্রযšের মাস্টার প্ল্যান, তেমনি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের আগ পর্যš ইসলামী আন্দোলনেরও এটা হবে ‘মাস্টার প্ল্যান’। এ কর্মসচী দিয়েই আল্লাহর নবী ও তাঁর প্রথম কাতারের সাথী খোলাফায়ে রাশেদীন একটি কল্যাণমলক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমাদের ইতিহাসের একটা বিরাট অংশ জুড়ে যখন নিবেদিতপ্রাণ মুসলমানরা তাদের স্ব স্ব সমাজে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন চালিয়েছিলেন, তখন তারাও এ কর্মসচী আঞ্জাম দিয়েছিলেন।
ইসলাম প্রদর্শিত এই যুগাšকরী ও বিপ্লবাত্তক কর্মসচীর নাম হচ্ছে ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’।
আমার পাঠকরা জীবনে হাজার বার এ শব্দটি শুনেছেন। এর ফযীলত সম্বলিত নেতা উপনেতাদের অসংখ্য বক্তৃতা শুনেছেন। বই পু¯কও কম পড়েননি। সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ফাউন্ডেশানের যাকাত সংগ্রহের সাথেও আপনার পরিচয় আছে। যাকাতের কথা বললেই আপনার আমার সামনে গ্রামের ও শহরের এমন শত শত দৃশ্য ভেসে ওঠে, যেখানে কিছু শাড়ী লুংগির জন্যে ছিন্নমুল নর নারীরা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। অথবা আপনার সামনে ভেসে ওঠবে কিছু মাদ্রাসার ছাত্র কিংবা শিক্ষকরা লিল্লাহ বোর্ডিং-এর রসিদ বই হাতে বড়ো লোকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অথবা কোরবানীর ঈদের সময় মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের গরু ছাগল যবাইর বড়ো বড়ো ছুরি, চাকু হাতে ঘুরতে দেখবেন। তারা আপনার কোরবানীর পশু যবাই করে চামড়া তাদের মাদ্রাসার জন্যে নিয়ে যাবেন, আবার পাড়ায় পাড়ায় এ মর্মে পোস্টারও দেখা যাবেÑ ‘আপনার চামড়া অমুক মাদরাসায় কিংবা অমুক এতিমখানায় দান করুন’।
এই পরিপার্শ্বিকতায় যখন আমি আপনাদের কাছে যাকাতের কথা বলবো তখন আপনার সামনে এ চিত্রগুলো ভেসে ওঠা মোটেই অসম্ভব নয়, কিšু কিছুক্ষণের জন্যে আমি সেসব দৃশ্য থেকে আপনার দৃষ্টি এদিকে নিবদ্ধ করতে অনুরোধ জানাবো।
ইসলামে যাকাত শুধু যে একটি গুরুত্বপর্ণ এবাদাত তাই নয়। এটা হচ্ছে মুসলিম সমাজের সোস্যাল ইনসিউরেন্সÑ আলটিমেট নিরাপত্তার গ্যারান্টি। এটা এমন এক ব্যবস্থা, যার যথাযথ ব্যবহার সমাজ থেকে সব ধরনের দারিদ্র দর করে একে একটি সুষ্ঠু ও মযবুত অর্থনৈতিক ভিত্তিমলের ওপর দাঁড় করাতে পারে। এ কারণেই বর্তমান সমাজ সংস্কৃতির আলোকে আমরা বিষয়টিকে একটি সমনি¦ত কর্মসচী হিসেবে পেশ করতে চাই। আমি আমার আগের পু¯কে (সাহস করে কিছু সত্য বলা প্রয়োজন) এ বিষয়ে কথা বলেছি। সেখানে বি¯ারিত পরিকল্পনা পেশ করা হয়নি। এ পর্যায়ে পরিকল্পনা পেশ করার আগে বৃহত্তর মানব সমাজের ৫টি মৌলিক সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের অতিরিক্ত যেসব সমস্যা আছেÑ আমাদের সম্মানিত পাঠকদের সেসব সমস্যা স¤পর্কেও সু¤পষ্ট কিছু ধারণা থাকা দরকার।
আমাদের দেশের অতিরিক্ত সমস্যাগুলো অধিকাংশই মহিলাদের সাথে স¤পর্কিত। আমাদের মহিলাদের এসব সমস্যাসমহ কিছুটা ইউনিক এই অর্থে, ভারত বাংলাদেশ ও পাকি¯ানের বাইরে অন্য কোনো দেশের মহিলারা মনে হয় এসব সমস্যা খুব কমই সাফার করেন। যৌতুকের অভিশাপের কথাই ধরুন না! আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্ম সংস্কৃতির প্রভাবেই যৌতুক নামের এই অভিশাপের সাথে পরিচিত হয়েছি।
আজ থেকে ৫০ বছর আগের বাংলাদেশটাকে একবার মনে করার চেষ্টা করুন। গ্রামে কোনো মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে মুরব্বীরা আগেই বিয়ের ‘ফর্দ’ লিখতে বসে যেতেন। দীর্ঘ ফর্দে কনের জন্যে সব ধরনের জিনিসের তালিকা থাকতো। মোহরের টাকার কতো পরিমাণ আদায়, কতো পরিমাণ অনাদায়ী, কতো ভরি সোনার অলংকার, মেহমানদের তালিকা সবই লেখা থাকতো। যা কিছু লেখা অলেখা সবই ছিলো কনের জন্যে। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকলো। বিশেষ করে ৭১ সালের দিকে যখন আমরা স্বাধীন হলাম, তখন কিছু বিজাতীয় রসম রেওয়াজ ও সংস্কৃতির এতো কাছাকাছি এসে গেলাম, এ কারণে তাদের সমাজের যৌতুকের অভিশাপসহ বিয়ের সানাই থেকে গায়ে হলুদ পর্যš অলমোস্ট সবকিছুতেই আমরা ইসলামী তরিকা বাদ দিয়ে তাদের নির্ভেজাল অনুকরণ করতে শুরু করলাম। দেখতে দেখতে যৌতুকের অভিশাপও আমাদের সমাজে চেপে বসলো।
এরপর আছে মহিলাদের ঘাড়ে তালাক নামক খড়গ। দরকারে বেদরকারে এক শ্রেণীর বাজে পুরুষরা নারীদের তালাক দিয়ে তাকে সমাজের অনুক¤পা ও দয়ার ব¯ুতে পরিণত করে দেয়। তালাকের ব্যাপারে ইসলাম প্রদর্শিত নিয়ম পদ্ধতি না মানার কারণে প্রতিবছর আমাদের হাজার হাজার নারী সমাজের নির্মম অবহেলার শিকারে পরিণত হয়। ইসলামের নিয়ম পদ্ধতি মেনে নিলে সমাজে তালাকের পরিমাণ যেমন অনেকাংশে কমে যাবে, তালাক ও তালাক পরবর্তী সময়ের জন্যে যেসব নিয়ম ইসলাম বানিয়ে দিয়েছে সেগুলো মেনে চললে, আমাদের দেশে তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের দুর্দশাও কমে আসবে
আমাদের মহিলাদের আরেকটি বড়ো সমস্যা হচ্ছে উত্তরাধিকার আইনের অপব্যবহার। এ পর্যায়ে মহিলাদের সাথে যেসব না ইনসাফী আজ করা হচ্ছে তা সর্বাংশে নির্মল করা যেতো, যদি ইসলাম আমাদের নারীদের স¤পত্তিতে যে অধিকার দিয়েছে তা আমরা নিশ্চিত করতে পারতাম। আপনি যে গ্রামে যে পরিবেশে বড়ো হয়েছেন, যে পরিবারে আপনি আরো ২/৪ জন ভাই বোন, চাচা চাচী, খালা খালু, ফুফা ফুফীর সাথে থেকে বড়ো হয়েছেন, আপনার জানামতে এদের একজনকেও কি আমাদের সমাজ স¤পত্তির সেই পরিমাণ অংশ প্রদান করেছে, ঠিক যে পরিমাণ অংশ ইসলাম তাকে দিয়েছে। ইসলাম যেখানে তাকে ভাইয়ের অর্ধেক দিতে বলেছে, সেখানে যখন সত্যিই সত্যিই দেয়ার পালা আসে তখন সে ভাই-ই নানা অজুহাত পেশ করে তাদের স¤পত্তি থেকে মাহরুম করার ষড়যš আঁটতে থাকে। এ ব্যাপারে আলেম ওলামা, ইংরেজী শিক্ষিত প্রায়ই সবা সমান। স¤পত্তি দেয়ার কথা উঠলে প্রথমে বলা হয়, মেয়েরা নাকি বাবার বাড়ির স¤পত্তি নেয় না। স¤পত্তি না দেয়ার জন্যে তাদের ১ লাখ টাকার স¤পত্তির জন্যে ৫/৭ হাজার টাকা ধরিয়ে দেয়া হয়। অন্যত্র স¤পত্তি বিক্রি করা হলে বাবার কষ্টার্জিত স¤পত্তিতে অন্য লোকেরা ভাগ বসাবেÑ এসব কথা বলে তাদের ইমোশনালী ব্ল্যাকমেইল করে অনেক ক্ষেত্রেই বিনামল্যে কিংবা নামমাত্র মল্যে তাদের কাছ থেকে যমীন লিখিয়ে নেয়া হয়। এক পর্যায়ে এ মহিলাদের মনেই ইসলামের ইনসাফপর্ণ ও ‘মোস্ট সাইন্টিফিক ল অব ইনহেরিটেন্স’-এর ব্যাপারে নানা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মহিলাদের সাথে এসব না-ইনসাফীর পাশাপাশি আমাদের পরিবারগুলোর ওপর আরো কিছু অপ্রত্যাশিত সমস্যা এসে আপতিত হয়। এর মধ্যে আছে সামান্য ব্যাপারেই থানা ও জেলা সদরে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গিয়ে মামলা ঠুকে দেয়া। একবার মামলা মোকদ্দমা শুরু হলে এর পেছনে উকিল মুহুরীর ফি, বাস রিকসা ভাড়া, বাদী বিবাদী ও সাক্ষীদের হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার বিল এবং মামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নানা উপরি খরচ।
ছেলে মেয়েদের বিয়ের খরচের পর পরিবারে, পেছনে রয়েছে পরিবার প্রধানের নানা দৌড়াদৌড়ি। সšান ও পরিবারের লোকদের পোশাক আশাকের পেছনেও অনেক অর্থ ব্যয় হয়। পরিবারে কোনো নতুন সদস্যের আগমন হলে তার কাপড় চোপড়, বেবী ফুড, বেবী পথ্য, ওষুধপত্র কিনতে হয়। আবার চাকরিরত হলে ট্রান্সফারজনিত ঝামেলায়ও মাঝে মধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়।
ছেয়ে মেয়ে বিশেষ করে মেয়ের বিয়ের পর জামাই ও তার আপনজনদের মেহমানদারীর একটা বাড়তি খরচও পরিবারের ওপর বিরাট বোঝা হয়ে দেখা দেয়। হঠাৎ করে পরিবারের কেউ একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পেছনেও অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়ে যায়। এসব কিছুর সাথে পরিবারের ওপর ইদানীং আরেকটা বড়ো খরচের চাপ পড়ে। কোনো না কোনো বছরে কারো না কারো বিদেশ যাবার বিরাট একটা খরচ এই পরিবারকেই যোগাতে হয়। তার সাথে আছে সড়ক, অগ্নি, লঞ্চসহ নানা দর্ঘটনা। আল্লাহ না করুন তেমনি কিছু ঘটলে তো একটি সম্ভাবনাময় পরিবারকে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
সব মানুষের ৫টি মৌলিক প্রয়োজনের সাথে মহিলাদের বিশেষ প্রয়োজনগুলো সামনে রাখুন। পরিবারের ওপর নেমে আসা কিছু অপ্রকাশ্য খরচের কথাও একবার ভাবুন। এবার আপনিই বলুন, আমাদের সমাজে একটি পরিবারের এসব মৌলিক প্রয়োজন পরণ করা, তার অন্যান্য অপ্রত্যাশিত খরচ ও বিপদ আপদ মোকাবেলা করার জন্যে যে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়Ñ সেফটি ও গ্যারান্টি নেট প্রয়োজন তা কি আছে। অথচ এমন একটি গ্যারান্টি নেট থাকা প্রতিটি মানুষের জন্যেই একাš প্রয়োজন। এমন একটি জায়গা প্রত্যেক মানুষের থাকা প্রয়োজন যেখানে যাতীয় দুর্যোগ ও বিপদ আপদে একজন মানুষ শেষ আশ্রয়ের জন্যে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। নাগরিকদের এই শেষ আশ্রয়ের স্থানটিই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র। আল্লাহর রসল একথাটাই তাঁর মোবারক যবান দিয়ে বলেছেনÑ যার কোনো অভিভাবক নেই আমিই তার অভিভাবক। এ কারণেই ইসলাম একথা বিশ্বাস করে, এমনি একটি রাষ্ট্র সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যš ইসলামী জীবন ব্যবস্থার কল্যাণ মানুষরা কখনোই লাভ করতে পারবে না, আর সত্যিকার অর্থে মানবজাতির আলটিমেট লক্ষ্য হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা না হলে এ দ্বীনের প্রতিষ্ঠাও পর্ণাংগ হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর নবী এ কাজটা কিভাবে করেছেন। তাঁর কাছে কোন্ আলাউদ্দীনের চেরাগ ছিলো, যা দিয়ে তিনি গোটা জাতির সব রকমের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হাঁ, আল্লাহর নবীর কাছে আল্লাহর দেয়া সে আলাউদ্দীনের চেরাগটির নাম ছিলো ‘ইসলামের যাকাত বিধান’।
আমি আগেই বলেছি, ইসলামের এই যাকাত বিধানে আমাদের ৫৪ হাজার বর্গমাইল এলাকার ১৬ কোটি মানুষের সব কয়টি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান রয়েছে, একে আমরা জাতির সব সমস্যার জন্যে ‘ওয়ান স্টপ সলিউশান’ বলে অভিহিত করতে পারি।
আমরা এই পরিকল্পনাটির নাম দিয়েছি ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’। প্রকল্পটির ধরন হবে এমন ঃ
মনে করুন আপনি রসলপুর উপজেলার নবীনগর ইউনিয়নে বাস করেন। আপনি আপনার ইউনিয়নের সাথে আরো ২/৩টি ইউনিয়ন মিলিয়ে একটি ‘যাকাত জোন’ গঠন করুন (এলাকার পরিধি ও সীমারেখা সুযোগ সুবিধামতো বড়ো কিংবা ছোটো হতে পারে)। এই জোনটার নামই হচ্ছে ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’। এবার আপনি আপনার নির্ধারিত জোনের বি¯ারিত ও নির্ভরযোগ্য একটা পরিসংখ্যান প্র¯ুত করুন। এই পরিসংখ্যানে এখানকার সর্বমোট জনসংখ্যা, নারী পুরুষ, শিক্ষিত অশিক্ষিত লোকের সংখ্যা, কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা, অসহায়, পংগু এতীম বিধবা তালাকী মহিলাদের সংখ্যা ইত্যাদিও নির্ণয় করতে হবে। এর সাথে এই জোনে যারা যাকাত দিতে সক্ষম তাদেরও বি¯ারিত তালিকা থাকবে। পরিসংখ্যান তৈরীর পর এই পুরো এলাকার ৭ থেকে ৯ জন উৎসাহী লোক নিয়ে একটা শক্তিশালী ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’ কমিটি গঠন করুন। মনে রাখতে হবে, এ কমিটিতে যেন বিভিন্ন পেশা ও গ্র“পের বিশেষ করে ইমাম, শিক্ষক, ডাক্তার ও গ্রামীণ অর্থনীতির মল কাঠামো বুঝে এমন লোকের অšর্ভুক্তি থাকে। ইসলাম প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের কর্মীদের স্থান-কাল-পাত্রভেদে এই কমিটিতে নিজেদের রোল ঠিক করতে হবে। এরপর সবাই মিলে এ অঞ্চলে কোন্ ধরনের ব্যবসায় লাভজনক হবে তার একটা সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। এলাকার প্রয়োজন ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এটা ঠিক করতে হবে। যে কোনো ধরনের ছোটো খাটো কারখানা, হাঁসমুরগীর খামার, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, ফিশারী, হেচারী, অবস্থাভেদে হাসপাতাল ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ইত্যাদি স্থাপিত হতে পারে।
কোনো প্রজেক্টে নামার আগে এক্সপার্টদের নিয়ে এর একটা ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরী করতে হবে। এবার এই ওয়েল প্রিপেয়ার্ড প্রজেক্ট প্রোফাইল দিয়ে সুন্দর একটি ব্রোশার তৈরী করে আপনার নির্দিষ্ট এলাকার এমন প্রতিটি ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দিনÑ যারা যাকাত দিতে পারেন। এলাকার সব প্রবাসীর কাছে এই ব্রোশার পৌঁছে দিন। ইতিমধ্যে আপনার এলাকায় মাসজিদ, মকতব, স্কুল, মাদ্রাসা, ক্লাব সোসাইটিতে এ নতুন আইডিয়ার পক্ষে ব্যাপক মতবিনিময় সভা, আলোচনা সভা ইত্যাদির ব্যবস্থা করুন। আপনার নির্দিষ্ট এলাকার প্রত্যেকটি মানুষকে একথা ব্যাখ্যা করুন। এ যাকাত ভিলেজ কিভাবে এলাকার মানুষদের সব রকমের অভাব দারিদ্র দর করতে পারে সেকথা তাদের বলুন। এ কাজগুলো আপনাদের এক বছর আগে থেকেই করতে হবে। মনে করুন, আপনি প্রজেক্ট শুরু করবেন ২০১০ সালে। এ অবস্থায় আপনাকে এ কাজগুলো শুরু করতে হবে এ বছরই।
‘মডেল যাকাত ভিলেজ’-এর প্রজেক্ট আপনাকে রমযানুল মোবারক সামনে রেখে শুরু করতে হবে। এক বছর থেকে চেষ্টা তদবীর করে আপনার এলাকা থেকে যাকাত কালেকশান করতে হবে। মনে করুন আপনি আপনার ‘যাকাত জোন’ থেকে ৫ লাখ টাকা যাকাত খাতে সংগ্রহ করলেন। এখন এ অর্থ কোনো বিশেষ খাতে বিনিয়োগ করার আগে কমিটি নিয়ে বসুন। এক্সপার্টদের মতামত নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে কাজে নেমে পড়ূন। এলাকার কর্মক্ষম বেকার নাগরিকদের যে তালিকা আগেই বানানো হয়েছিলো সেখান থেকে সম্ভব হলে কিছু লোককে বাছাই করে এই প্রজেক্টে চাকরি দিন। আমরা জানি, প্রথম বছরেই আপনার প্রজেক্ট লাভের মুখ দেখবে না, কিšু আল্লাহ আল্লাহ করে কোনো রকমে বছর শেষ হলেই আপনার কাছে আবার বেশী না হলেও কমপক্ষে আরো ৫ লাখ টাকা মলধন তো জমা হবে। আগে আপনার প্রজেক্ট ছিলো শুধু থিউরি। আপনি কাউকেই এর বা¯ব কল্যাণ দেখাতে পারেননি। শুধু আপনার কথার ওপর বিশ্বাস করেই লোকেরা ৫ লাখ টাকা যাকাত প্রদান করে, এবার তো আপনার ‘যাকাত ভিলেজ’ শুধু থিউরিই নয়Ñ এখন তো আপনার যাকাত ভিলেজ একটা বা¯ব প্রজেক্ট, লোকেরা ইচ্ছে করলে এখন এসে আপনার প্রজেক্টের কল্যাণকারিতা দেখতে পারে। দ্বিতীয় বছর এই ১০ লাখ টাকার পুঁজি দিয়ে আপনি আপনার প্রকল্প আরো বাড়াতে পারেন। দ্বিতীয় বছর থেকে আপনি আপনার সে নির্দিষ্ট এলাকার আরো কিছু কর্মক্ষম লোককে চাকরি দিতে পারেন। এটা যদি ধরেও নেয়া যায়, দ্বিতীয় বছরেও প্রকল্প কোনো লাভের মুখ দেখতে পারছে না, তবু দু বছর পর্যš প্রকল্পের নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারাটাই এর বড়ো সাফল্য বলে ধরে নেয়া হবে।
আল্লাহ আল্লাহ করে প্রজেক্ট তৃতীয় বছরে পৌঁছতেই আপনার মলধনে বেশী না হলেও কমপক্ষে আরো ৫ লাখ টাকা তো এড হবেই। এবার আশাকরি আপনার স্বপ্নের ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’ ‘ব্রেক ইভেনে’ পৌঁছুবে। তাই এবার আরো বেশী পরিমাণ কর্মক্ষম বেকার লোকদের চাকুরি দিতে পারবেন।
এ বছর থেকে কর্মক্ষম বেকার লোকদের চাকরি দেয়ার পাশাপাশি আপনাকে সমাজের অন্যান্য কল্যাণমলক কাজেও ভূমিকা রাখা শুরু করতে হবে। আপনার মনে আছে, প্রজেক্ট শুরু করার আগে আপনি আপনার নির্দিষ্ট এলাকার এতীম, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা অসহায় দারিদ্র ও বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত লোকদের একটা তালিকা বানিয়েছিলেন। এবার তৃতীয় বর্ষে যখন আপনার প্রজেক্ট লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে, তখন সে তালিকা থেকে আপনি এমন কয়জনের নাম বাছাই করুন যে কয়জনকে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃত্তি আপনি দেবেন। সংগতির ভিত্তিতেই এই তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। চতুর্থ বছর থেকে আপনারা এলাকার অন্যান্য সমস্যাÑ যেমন লোকদের অসখ বিসুখ, গরীব ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা, যৌতুকের অভিশাপে নিপীড়িত মহিলাদের পুনর্বাসন, সমাজ ও পরিবারে নিগৃহীত ভিকটিম মহিলাদের সাপোর্ট ও তাদের নিরাপত্তার জন্যে শেল্টার বানানো, সুদবিহীন ঋণ প্রদান কর্মসচীতে আপনারা অংশ নিতে পারলে পঞ্চম বছরে এসে আপনার এলাকার উন্নয়নমলক কাজকর্ম, রা¯াঘাট, ব্রিজ কালভার্ট, খালকাটা, নদী সংস্কার ইত্যাদি কাজেও মনোযোগী হতে পারবেন।
আপনার মনে রাখতে হবে, মডেল ডাকাত ভিলেজ হচ্ছে ১৫ বছর মেয়াদী প্রকল্প। এ প্রকল্পে প্রতি বছর একই পরিমাণ যাকাতের অর্থ মলধনের সাথে এসে জমা হবে। ১৫ বছর পর ৫ লাখ টাকার প্রকল্পটি এমনি কোটিখানেক টাকার প্রকল্পে পরিণত হবে। দারিদ্র বিমোচনের জন্যে এ যুগাšকারী কর্মসচী আসলেই একটি বিপ্লব। আমাদের দেশটির যেসব সমস্যার কথা আমি এ পরিচ্ছেদের শুরুতে বলেছি এবং যেসব সমস্যার কথা আমি আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে বলতে পারিনি, তার সব কয়টি সমস্যার এটা হচ্ছে ‘ওয়ান স্টপ সলিউশান’। এ যুগাšকারী প্রজেক্ট হচ্ছে একটি নীরব বিপ্লবের কর্মসচী। এতে মিছিল সমাবেশ মহাসমাবেশ ও কোটি টাকার রাজনৈতিক শো ডাউনের কোনো দরকার নেই। নির্বাচনের তোড়জোড়, অর্থের ছড়াছড়ি, কারচুপি দুর্নীতির কোনোই ঝামেলা নেই। ১৫ বছরে আপনার এলাকার চেহারাই ইনশাআল্লাহ বদলে যাবে। এ পরিসরে বিষয়টি নিয়ে আমরা আর বেশী আলাপ করতে চাই না।
আসলে এখানে আমি যা বলেছি তা আমাদের মতো কিছু ‘লে ম্যানদের’ পরিকল্পনা মাত্র। আমরা কেউই অর্থনীতিবিদ নই। বিষয়টি নিয়ে আরো যথেষ্ট আলোচনা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এনজিওদের যুলুম অত্যাচারের কারণে সমাজের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে যে অমানিশা নেমে এসেছে তাদের জন্যে নিসন্দেহে এতে কিছু আশার আলো থাকবে। মনে রাখতে হবে, যাকাত শুধু শাড়ি লুংগি বিলানোর প্রতিযোগিতা, এতীমখানা লিল্লাহ বোডিং ও কোরবানীর চামড়া কালেকশানেরই নাম নয়Ñ এটা হচ্ছে সমাজ বিপ্লবের একটি পর্ণাঙ্গ কর্মসচী। ইতিহাসের পরীক্ষিত এমন কর্মসচী যার সঠিক বা¯বায়নের ফলে বহু বছর ধরে পৃথিবীর এক বিরাট অংশে যাকাত নেয়ার মতো লোক পাওয়া যায়নি। এটা কোনো গল্প, নভেল, নাটক কিংবা এ্যাডভেঞ্চার উপকথা নয়। এটাই হচ্ছে যাকাতের ইতিহাস। আমি দেশের বড়ো বড়ো ইসলামী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বীমা, লিজিং কো¤পানী, হাউজিং কো¤পানীসহ ইসলামী ধ্যান ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত অগণিত প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ জানাবো, আই এম এফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ দেশী বিদেশী বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের অনেক ফর্মলা অনেক নোসখা আপনারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। আল্লাহর ওয়া¯ে আল্লাহ তায়ালার দেখানো এই মহৌষধ ‘মডেল যাকাত ভিলেজ’-এর প্ল্যানটিও একবার পরীক্ষা করুন। আপনাদের ব্যাংকিং ল’ ও টার্মে এর কোনোটা যদি অবা¯ব মনে হয় আপনারা আপনাদের মেধা ও প্রতিভা দিয়ে একে ঠিক করে নিন। তারপরও মেহেরবানী করে চলুন, সবাই মিলে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নবীর শেখানো এই ফর্মলা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করি। এটা আমাদের কারো আবিষ্কার নয়Ñ কারো উদ্ভাবনও নয়। এটা আল্লাহ তায়ালারই শেখানো পদ্ধতি। দেশের বড়ো বড়ো কয়েকটি ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে ৫০০ উপজেলায় এমন ৫০০টি মডেল যাকাত ভিলেজ চালানো কি আসলে অসম্ভব। বিশেষ করে যেখানে স¤পর্ণ পুঁজিটাই আসছে যাকাত দাতাদের কাছ থেকে। বিশ্বসভার বিভিন্ন পরিমন্ডলে যদি আমরা এ প্রকল্পটির কার্যকারিতা বুঝাতে পারি, তাহলে আমি জানি আইডিবিসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বড়ো বড়ো ব্যাংক ও লিজিং কো¤পানী এই যুগাšকারী প্রকল্প বা¯বায়নে এগিয়ে আসবে। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বাইরে কর্মরত প্রায় এক কোটী ‘ওয়েজ আর্নার’রাও সানন্দে তাদের যাকাতের অর্থ এখানে দেবেন। এই প্রকল্প বা¯বায়িত হলে মাইক্রোক্রেডিটের সদের অভিশাপ থেকেও আমাদের দেশের ১৬ কোটি মানুষ বেঁচে যাবে।
এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ইসলামী আন্দোলন চাইলে একটি পর্ণাংগ যাকাত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

লেখকঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডনের ডাইরেক্টর জেনারেল ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY