কোরআনের ডাক

0
397

কোরআনের ডাক
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

শায়খুল হিন্দ হযরত মওলানা মাহমুদুল হাসান গেলো শতকের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সিপাহসালার, বড়ো মাপের আলেমে দ্বীন ও ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রথম ছাত্র। তাঁকে দিয়েই ছাত্তা মাসজিদে দেওবন্দ মাদরাসার ক্লাস শুরু হয়। তিনি কোরআন কারীমের সফল অনুবাদক ও তাফসীরকার হিসেবে গোটা জীবনটাই কোরআন এবং কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত করেছেন।
শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানকে ইংরেজরা গ্রেফতার করে মাল্টায় পাঠিয়ে দেয়। মাল্টার কারাগারে বসেই ও¯াদ মাহমুদুল হাসান কোরআনের অনুবাদে তাফসীরের প্রয়োগ শুরু করেন। সরা আল মায়েদা পর্যš আসার পর কোরআনের মালিক তাকে আর এ সুযোগ দেননি। তার রেখে যাওয়া কাজটাই তার যোগ্য উত্তরসুরী শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী স¤ক্সন্ন করেন, এটাই আমাদের দেশে ‘তাফসীরে ওসমানী’ নামে পরিচিত। মাল্টার কারাগারে ইংরেজদের অত্যাচারে শায়খুল হিন্দ এক সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইংরেজরা ভাবলো, মাল্টার কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় যদি তিনি মারা যান তাহলে সারা ভারতে আগুন জ্বলবে। অনেক চিšা ভাবনা করে ইংরেজরা অবশেষে তাকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধাš করে।
মুক্তি পেয়ে শায়খুল হিন্দ তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান দেওবন্দে ফিরে এলেন। দেওবন্দে এসে তিনি ভারতের সব কয়টি মত ও পথের আলেম ওলামাদের তার কাছে ডাকেন। সম্মেলনে ভারতের সর্বমতের ওলামা মাশায়েখ পীর বুযর্গরা উপস্থিত ছিলেন। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা শাব্বীর আহমদ ওসমানী, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীসহ আলেম ওলামারা শায়খুল হিন্দের মল্যবান বক্তব্য শোনার জন্যে সে মজলিসে এসে হাযির হন। শায়খুল হিন্দ তার স্বভাবগত ভাব গাম্ভীর্যের সাথে নবীর উত্তরাধিকারী ওলামায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি আমার কয়েক বছরের মাল্টার বন্দী জীবনে আমাদের বর্তমান অবস্থার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক চিšাভাবনা করেছি। চিšাভাবনা করে আমি একটি সিদ্ধাšে পৌঁছেছি এবং সে কথা বলার জন্যেই আজ আমি আপনাদের আমার কাছে ডেকেছি।
ওলামায়ে কেরাম সবাই সে কথা শোনার জন্যে উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো তিনি বললেন, আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্যে আমি দুটো জিনিসকে দায়ী মনে করি। একটি হচ্ছে, কোরআনের সাথে আমাদের স¤ক্সর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমাদের মধ্যকার ঐক্য বিনষ্ট হয়ে গেছে। এ দুটো দুর্বলতা থেকে বাঁচতে পারলে আমরা পুনরায় ভারতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো। পাকি¯ানের মুফতীয়ে আযম মওলানা শফি এই অনুষ্ঠানে ছাত্র হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার ‘ওয়াহদাতে উম্মত’ বইতে এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, শায়খুল হিন্দ যে দুটো কারণের কথা বলছেন আসলে তা একটাই। কোরআনের সাথে স¤ক্সর্ক দর্বল হওয়ার কারণেই আমাদের মাঝে অনৈক্যের ফেৎনা সৃষ্টি হয়েছে।
শায়খুল হিন্দ ও¯াদ মাহমুদুল হাসান কোরআনের সাথে আমাদের স¤ক্সর্কের যে অবনতির কথা বলেছেনÑ তা কি ছিলো? তিনি কি কোরআন তেলাওয়াতের কথা বলেছেনÑ না মনোযোগ দিয়ে তা শোনার কথা বলেছেন? কেননা তদানীšন ভারতবর্ষে কোরআনের সুললিত তেলাওয়াতের কোনো অভাব ছিলো না। দেশের হাজার হাজার মাসজিদে, মক্তবে মাদ্রাসায় কোরআনের সুন্দর তেলাওয়াতের শানদার ব্যবস্থা ছিলো।
স্বয়ং শায়খুল হিন্দের কোরআনের তেলাওয়াতের প্রতি গভীর মমত্ববোধের কথা শুনবেন? মাল্টার জেলে যেদিন তাকে প্রথম নেয়া হলো, তখনও রোযা শুরু হতে একদিন বাকী। জেলের সাথী মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীকে ডেকে আক্ষেপ করে বললেন, আমার জীবনের সম্ভবত এটাই হবে প্রথম রমযান, যখন তাবারীতে আমি কোরআন শুনতে পারবো না। শায়খুল হিন্দ কোরআনের হাফেজ ছিলেন না। মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীও হাফেজ ছিলেন না, কিšু ও¯াদের আক্ষেপ যেন তাকে নতুন এক প্রেরণায় উজ্জীবিত করে দিলো। রোযা শুরু হলে তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যš ১ পারা মুখস্থ করে তাবারীতে শায়খকে শোনাতেন। এভাবে রোযার মাস শেষ হতে হতে শায়খের পুরো কোরআন শোনার আরজু যেমন পর্ণ হলো, মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীরও পুরো কোরআন মুখস্থ হয়ে গেলো।
কোরআনের প্রতি যার এ অবিশ্বাস্য লগন, তিনি শুধু তেলাওয়াতের দুর্বলতাকেই জাতির অবনতির মৌলিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করবেন, তেমনটি তো হতে পারে না। শায়খুল হিন্দ এখানে যে কথা বলেছেন তা অবশ্যই আরো মৌলিক। আমাদের সময়ে এ কথা আরো অনেকেই বলেছেন। মুসলিম মিল্লাতের প্রাণপুরুষ আল্লামা ইকবাল কতো সুন্দর করেই না কথাগুলো বলেছেন। ইকবালের কথাগুলোকে যদি আমরা হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বর্ণিত সেই হাদীসের সাথে মিলিয়ে পড়ি তাহলে মনে হবে, ইকবাল মলত সেই হাদীসের ব্যাখ্যাই করেছেন মাত্র।
সেই হাদীসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোরআন হচ্ছে এমন এক গ্রন্থ, যা জাতিসমহকে যেমন অধপতনের নিুভূমি থেকে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়, তেমনি এ মহান গ্রন্থের সাথে ভিন্ন আচরণের কারণে জাতিসমহ আবার উন্নতির শীর্ষদেশ থেকে অবনতির নিুতম স্থানেও পৌঁছে যায়। আমি হাদীসটির হুবহু শাব্দিক অনুবাদ না করে ভাবার্থটাই শুধু আপনাদের কাছে পেশ করলাম।
প্রিয়নবীর হাদীস ও সমকালীন ২ জন শ্রেষ্ঠমানের চিšাবিদের সুরে আমরাও বলতে চাই, জাতি হিসেবে আজ আমাদের অধপতনের মল কারণ হচ্ছে কোরআনের সাথে আমাদের চরম উন্নাসিক আচরণ। কোরআন মাজীদে সম্ভবত এমন একটি জাতির চরিত্রই আল্লাহ তায়ালা এঁকেছেন সরা আন নমলের ৩০তম আয়াতে।
আল্লাহর নবী আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে বলবেন, হে আমার রব, অবশ্যই আমার জাতি কোরআনকে একটি পরিত্যাজ্য ব¯ুতে পরিণত করে ফেলেছিলো।
আসলে আল্লাহর কিতাবের সাথে জাতিসমহের আচরণের ব্যাপারে আহলে কিতাব আর মুসলমানদের মাঝে কোনোই তারতম্য নেই। কোনো জাতির কাছে যখন আল্লাহর কোনো কিতাব মওজুদ থাকে, তখন সে জাতির এ দুনিয়ার বাঁচা মরা, আয় উন্নতি স¤ক্সর্ণ সে কিতাবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। কোরআন কারীমে সরা আল মায়েদার ৬৬তম আয়াতের দিকে একবার লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তায়ালা বলছেনÑ
‘যদি তারা (আল্লাহর যমীনে) তাওরাত ও ইনজীল এবং যা তাদের ওপর তাদের মালিকের কাছ থেকে নাযিল করা হয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করতো, তাহলে তারা তাদের মাথার ওপরের (আসমান) থেকে ও তাদের পায়ের নীচের (যমীন) থেকে পাওয়া রেযেক ভোগ করতে পেতো; তাদের মধ্যে অবশ্য একদল (ন্যায় ও) মধ্যপন্থী লোক রয়েছে, তবে তাদের অধিকাংশই হচ্ছে এমন, যাদের কর্মকান্ড খুবই নিকৃষ্ট!’
বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও নিউ টেস্টামেন্টের অনুসারী ইহুদী খৃস্টানরা তাদের কাছে মজুদ আল্লাহর কিতাবকে কখনো প্রতিষ্ঠা করেনি, সুতরাং আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা মতো তারা কল্যাণও সেভাবে লাভ করতে পারেনি।
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান তার বাকী জীবনে সমগ্র হিন্দু¯ানে কোরআনের পক্ষে দুটো বড়ো কাজ নিজে যেমন করেছেন, তেমনি অন্যদের তা করতে বলেছেন। তার যুগাšকারী এ কাজ দুটো ছিলোÑ দেশের সর্বত্র আনাচে কানাচে, অলিতে গলিতে কোরআন পড়ার ক্লাস এবং সর্বত্র কোরআনের দরস চালু করা । শায়খুল হিন্দের ভাষায় এর প্রথমটি ছিলো নাযেরা কোরআন ও দ্বিতীয়টি ছিলো আওয়ামী দরসে কোরআন।
এ দুটো কর্মসচী কিভাবে গোটা হিন্দু¯ানে দীর্ঘ দিন ধরে কোরআনের শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং এ কোরআনের শিক্ষা কিভাবে ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামে মল্যবান অবদান যুগিয়েছে, ভারতীয় মুসলমানদের পরবর্তী সময়গুলোর ঘটনাপ্রবাহই আমাদের সে কথা বলে দেবে।

জাতির জীবনে হাজার সমস্যা, হাজার জঞ্জাল থাকতে শায়খুল হিন্দ ভারতের আলেমদের কেন কোরআন নিয়ে পড়ে থাকতে বললেন? তিনি নিজেই বা কেন কোরআন পড়া ও সাধারণ্যে কোরআন বুঝানোর কাজে সবাইকে আÍনিয়োগ করতে বললেন, একথাটার কিšু এখনো জবাব দেয়া হয়নি। হাঁ, এ কথাটার ওপর কিছু কথা বলেই আমরা আমাদের আলোচনার মোড় ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে নেবো ইনশাআল্লাহ

লেখকঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডনের ডাইরেক্টর জেনারেল।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY