বায়াতে আকাবার ৩ শপথ

0
1471

প্রথম শপথ
আল্লাহ্ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নবুয়াত লাভের পর বিশ্ব নবী মোহাম্মদ (সাঃ) গোপনে ইসলামের দয়াত দিতেন এর তিন বছর পর আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে দয়াওয়াতের হুকুম আসলে প্রকাশ্যেই দাওয়াত দিতে থাকলেন। তখন সাধারণ মুসলমানের উপর নির্যাতন আসতে লাগল। তিনি চিন্তা করলেন ইসলামের এই দাওয়াত সকল গোত্রের মাঝে ছরিয়ে দিতে হবে। এই জন্য হজরাত মোহাম্মাদ (সাঃ) কোন এক হজ্জ মওসুমে আন্যান্য সময়ের মত আরব গোত্রসমূহের মাঝে ইসলামের বানী পোঁছে দেওয়ার উদ্দেশে বের হলেন। এই কর্মব্যস্ততা এক পর্যায়ে আকাবা নামক স্থানে একদল আনসারের সংগে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাদের আল্লাহ্র পথে দাওয়াত দিলেন। এবং তারা নবী করিম (সা:) এর কাছে ভাল ব্যবহার পেয়ে তাঁকে নবী হিসেবে চিনতে পারলেন এবং ঈমান গ্রহন করলেন। এরপর তারা নবী করিম (সাঃ) এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মদীনায় এসে নবী করিম (সাঃ) এর অমায়িক চরিত্র ও ইসলামের অমিয় বানী মদিনার ইথারে ইথারে ছড়িয়ে দিল। পরবর্তী বছর হজ্জ মওসুমে বারজন আনসার মক্কায় আকাবা নামক স্থানে এসে নবী করিম(সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে এই মর্মে বায়া’আত করেন যে আমরা আল্লাহ্র সাথে কোন শরীক স্থির করব না, চুরি করব না, ব্যভিচার করব না, সন্তান হত্যা করব না, সজ্ঞানে মিথ্যা রচনা করে রটাব না এবং সৎ কাজে বাধা দিব না। তখন নবী করিম (সাঃ) বললেনঃ যুদি তোমরা এ অংগীকার পূর্ণ কর, তবে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আর যদি তোমরা কোনটা লঙ্ঘন কর তবে তিনি চাইলে শাস্তি দেবেন নয় ক্ষমা করে দেবেন। এই বায়াতকে আঁকাবার প্রথম এবং বায়াতে নিসা বলা হয়।

প্রথম শপথের বিষয়বস্তু সমূহঃ
ক) আল্লাহ্র সাথে কোন শরীক স্থির না করা।
খ) চুরি না করা।
গ) ব্যভিচার না করা।
ঘ) কন্যা সন্তান হত্যা না করা।
ঙ) সজ্ঞানে মিথ্যা রচনা না রটানো এবং
চ) সৎ কাজে বাধা না দেয়া।

আকাবার দ্বিতীয় শপথ
এরপর প্রথম আকাবার শপথে অংশগ্রহণকারি সাহাবা আসআদ ইবন যুরারা (রাঃ) ও মুসআব ইবন উমায়ের (রা) এর একান্ত প্রচেষ্টায় সাদ ইবনে মুআয ও উসায়দ ইবন হুযায়র সহ মদিনায় আনসারদের মাঝে ইসলামের সুমহান আদর্শের কথা তোলে ধরে তাদেরকে ইসলামের পতাকা তলে শামিল করান। এমনকি মদিনার এমন কোন মহল্লা বাকী রাখেননি যেখানে মুসলিম নর নারীর একটা দল গড়ে তোলেননি। এদিকে মক্কায় সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) দের উপর নির্মম নির্যাতন আর বৃদ্দি পেতে লাগল। একপর্যায়ে এমন হল মক্কার কাফেরেরা নবীকরিম (সাঃ) এর উপরও নির্যাতনের করতে লাগল। তখনই নবী করিম (সাঃ) মদিনায় হিজরতের চিন্তা করলেন কিন্তু আল্লাহ্র আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। এর পরবর্তী হজ্জ মওসুমে মুসআব ইবন উমায়ের (রাঃ) সহ ৭৩ জন পুরুষ ২ জন মহিলা সহ মক্কায় আগমন করেন। এরপর হজ্জ উপলক্ষে বের হয়ে আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি এক রাতে এই দলটি নবী করিম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য আকাবায় মিলিত হল। তাদের উপস্থিতির কিছুক্ষণ পর নবী করিম (সাঃ) আব্বাস ইবন আব্দুল মত্তালিব (নবীজির চাচা) সহ আকাবায় উপস্থিত হলেন। যুদিও নবীজির চাচা তখনও ঈমান আনেননি কিন্তু ভ্রাতষ্পুত্রের এ আলোচনায় উপস্থিত থেকে তার নিরাপত্তার ব্যাপারে আনছারদের থেকে অংগীকার গ্রহণ করাকে জরুরি মনে করলেন। তাই সর্ব প্রথম আব্বাস ইবন মত্তালিব বলেনঃ হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা! আমাদের কাছে মোহাম্মদ (সাঃ) এর কি মর্যাদা, তা তোমাদের অজানা নেই। আমরা তাঁকে আমাদের সম্প্রদায়ের হাত থেকে এযাবৎ রক্ষা করে এসেছি। কাজেই তাঁর দেশ ও সম্প্রদায়ের মাঝে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত স্বরক্ষিত। কিন্ত তবু তিনি তোমরাদের কাছে চলে যেতে চান। এখন চিন্তা করে দেখ, তোমরা যদি তাঁকে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা করতে পার এবং শ্ত্রুর হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হও, তবে তোমরা এই দায়িত্ব গ্রহণ কর। পক্ষান্তরে যদি মনে কর তোমরা তাঁকে রক্ষা করতে পারবেনা, শত্রুর হাতে ছেরে দিতে বাধ্য হবে তাহলে বরং এখনই ছেড়ে দাও। করন তিনি স্বগোত্র ও স্বদেশে নিরাপদেই আছেন।

তখন মদিনার আনছারা আব্বাস (রাঃ) কে বললেনঃ আমরা আপনার বক্তব্য শুনলাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ) এখন আপনি কথা বলুন এবং আপনার নিজের ও আপনার রবের জন্য আমাদের থেকে যে অঙ্গীকার নেওয়া ভাল মনে করেন তা নিতে পারেন। তখন রাসুলল্লাহ (সাঃ) বললেন। আমি এই মর্মে তোমাদের থেকে বায়াত গ্রহণ করতে চাই যে তোমরা তোমাদের নারী ও শিশুদের যেভাবে রক্ষা কর, আমাকেও সে ভাবে রক্ষা করবে। তখন বারা ইবনে মারুর (রাঃ) নবী করিম (সাঃ) এর হাত মোবারক দরে বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ যিনি আপনাকে সত্যসহ নবীরুপে প্রেরন করেছেন তাঁর শপথ করে বলছি, আমরা তেমনি আপনাকে রক্ষা করব যেভাবে আমারা আমাদের পরিবারবর্গদের করে থাকি। অতএব ইয়া রাসুলল্লাহ (সাঃ) আপনি আমাদের বায়াত গ্রহণ করুন। এই কথার মাঝখানে আবুল হায়সাম ইবন তায়িহান (রাঃ) বলেন যে ইয়া রাসুলল্লাহ (সাঃ) ইয়াহদীদের সাথে আমাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে এখন আমরা তা ছিন্ন করতে যাচ্ছি। এমনত হবেনা যে, আমরা এরূপ করার পর আল্লাহ্ যখন আপনাকে বিজায় দান করবেন তখন আপনি আমাদেরকে ছেড়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসবেন। একথা শুনে নবী করিম (সাঃ) মৃধু হেসে বললেনঃ তোমাদের রক্ত আমার রক্ত। তোমাদের জীবন-মরণের একই সুত্রে গ্রথিত থাকবে আমার জীবন-মরণ। আমি তোমাদের আর তোমরাও আমার। তোমারা যাদের সাথে লড়বে আমিও তাদের সাথে লড়াই করব। তোমাদের সাথে যারা শান্তি স্থাপন করবে, আমিও তাদের সাথে শান্তি স্থাপন করব।

দ্বিতীয় শপথের বিশয়বস্তুসমূহঃ
এই শপথ দুই ভাগে বিভক্ত একভাগ নবীজির কাছে সাহাবীদের শপথ অন্যদিকে দ্বিতীয় ভাগ নবী করিম (সাঃ) কর্তিক ওয়াদা।

ক) কাফেরদের নির্যাতনে বিপরীতে নারী ও শিশুর ন্যয় নবী করিম (সাঃ) কে হেফাজাত করার শপথ।
খ) পক্ষ্যান্তরে ইসলামের বিজয় আসলে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে না আসার নবী (সাঃ) কর্তিক ওয়াদা।

আকাবায় তৃতীয় শপথ
সর্বশেষ মক্কার কাফেরেরা যখন সাহাবায়ে কেরামদের উপর নির্যাতন আরও বারিয়ে দিল এবং নবী করিম (সাঃ) কে হত্ত্যার নীলনকশা তৈরি করল আল্লাহপাক ঠিক তখনই নবী করিম (সাঃ) কে মদিনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন এবং বললেন।

“আল্লাহ্ তোমাদের আশ্রয় লাভের জন্য তোমাদের একটি ভ্রতৃ সমাজ এবং একটি বসতি সৃষ্টি করেছেন যেখানে তোমরা আশ্রয় লাভ করবে।“

পরে যখন করাইশরা আল্লাহ্র নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে নবী করিম (সাঃ) কে মিথ্যা আরুপ করল এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সহ আল্লাহ্র রাসুল (সা:) কেও দেশ ত্যগে বাদ্য করল তখন আল্লাহ্পাক নবী করিম (সাঃ) কে যুদ্বের অনুমতি দিলেন এবং বললেন

“যুদ্ধে অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।“

তখন নবী করিম (সাঃ) মদিনা থেকে আকাবায় আগত ৭৩ জন পরুষ এবং ২ জন মহিলা থেকে যুদ্বের বায়াত গ্রহন করলেন। এই শপথ নেয়ার পূর্বে নবী করিম (সাঃ) তাদের কাছ থেকে জাহিলিয়াতের বিরুদ্বে যুদ্বের অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। নিজের ব্যাপারেও নিরাপত্তার শর্তসহ বায়াত গ্রহণ করে অঙ্গীকার পূরণের বিনিময় জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন।

তৃতীয় শপথের বিষয়বস্তুসমূহঃ
ক) জাহিলিয়াতের বিরুদ্বে যুদ্বের অঙ্গীকার গ্রহণ।
খ) নিজের ব্যাপারেও নিরাপত্তার শর্তসহ বায়াত গ্রহণ করা।

সুতরাং এটা বলাযায় যে আকাবায় এই তিনটি শপথই নবী করিম (সাঃ) কে মক্কা থেকে নিরাপদে মদিনায় গমন এবং সেখানে অবস্থান করে একটি কল্যাণকর সমাজ গঠনের মধ্যদিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত শিরক, জাহিলিয়াত, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্দে অবাস্থান নিতে সাহায্য করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নবী করিম (সাঃ) মক্কা বিজয় করেন। আমরাও আঁকাবার শপথ এর বিষয় সমূহ সামনে রেখে একটি কল্যাণকর সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY