ঈদ – একাল ও সেকাল

0
895

ঈদ – একাল ও সেকাল
খাদিজা আখতার রেজায়ী

রমযানের বিদায় মানেই ঈদের  আগমন। ঈদের  আগমন মানেই রমযানের বিদায়। ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথে মনটা যেমনি আনন্দে নেচে ওঠে তেমনি মোমেনের হৃদয়  বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায় রমযানকে বিদায় দিতে। এ এক মিশ্র অনুভুতি। মানুষ যখন হজ্জ্ব,ওমরা শেষ করে মদীনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় তখন মাসজিদে নববীতে নামায পড়ার ও রসূলের রওজা যেয়ারতের খুশিতে মন যেমনি উদ্ভেল হয়ে ওঠে তেমনি কাবাঘর ছেড়ে যাবার ব্যদনায় হৃদয়ে আঘাতের ঢেউ আছরে পড়তে থাকে এটাও একটা মিশ্র অনুভব। রমযানের বিদায়ের সাথে ঈদুল ফিতরের আগমনটাও ঠিক তেমনি একটা ব্যপার যা প্রতিটি মোমেনের হৃদয়ে জাগে।
আমরা সবাই জানি ঈদ মানেই আনন্দ অনেকেই আবার এই আনন্দ করতে গিয়ে ভূলে যাই ঈদ মানে এবাদতও। বৎসরে  যে পাঁচটি গুরুত্বপুর্ন রাতে মানুষের মোনাজাত কবুল হয় তার মধ্যে রয়েছে দ্ঈুদের দু ্ঈদের রাত। ঈদ এলে আমরা এতো বেশী আনন্দে মেতে ওঠি যে আমরা বিলকুল ভুলেই যাই এ রাতে দোয়া কবুল হয়। এ রাতের এবাদতে অনেক অনেক স্পন বেশী সওয়াব মেলে।

আজকাল ঈদে আনন্দ করার উপকরন হিসেবে যেসব প্রোগ্রাম রাখা হয় তা অনেকটা পুঁজা-পার্বনের অনুষ্ঠানগুলোকে অনুসরন করেই করা হয়। তাই দু:খ হয় যখন পাশের বাড়ীর হৈ হল্লা আর হাই ভলিওমে হিন্দি গানের কর্কষ আওয়াযে নামাযের সূরায় বা রাকাতে ভুল হয়ে যায়। দু:খ হয় এ ভেবে যে এটা কি আমাদের  কালচার!

আমাদের  ছোট বেলায় যখন ঈদ আসতো সে ঈদ ছিলো সর্ম্পুন অন্যরকম। সে সময় ঈদের আনন্দ ছিলো নিষপাপ আনন্দ। সে সব দিনস্পলোর কথা ভাবলে দীর্ঘ শ্বাস গুলো যেনো বাষ্ট হয়ে বেরোয়।

ঈদের  দু  একদিন আগেই শুরু হতো শহর থেকে গ্রামে ফেরার পালা। চাচা-চাচী,   ভাই-ভাবীরা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে স্বপরিবারে  আসতেন শুরু থেকে গ্রামে। শুরুহতো চাঁদ দেখার হৈ চৈ। সুচিকন চাঁদ লুকোচুরি খেলতো পশ্চিম আকাশে। একজন দেখতে পেলেই চিৎকার করে  বলে উঠতো  ‘‘আল্লাহ আকবর’’ বলে আঙ্গুলে সবাইকে দেখিয়ে খুশীতে হাততালি দিতো। এমনি প্রতিটি বাড়ী থেকেই হাত তালি আর ‘‘আল্লাহ আকবর’ শোনা যেতো। আমাদের বাড়ীর সামনে ছিলো ধু ধু খোলা মাঠ, প্রসস্ত খোলা আকাশ। সবার আগে আমাদের বাড়ী থেকেই তাই আল্লাহ আকবার আওয়ায উঠতে।

আমার সবচাইতে আনন্দ লাগতো যে, আব্বা আজ এতেকাফ থেকে ঘরে ফিরবেন।রমযান শুরু হবার পর থেকেই প্রতি রমযানের শেষ দশদিন আব্বাকে বাড়ীর মসজিদে এতেকাফ করতে দেখেছি। ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথেই আমাদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যেতো আল্টার সামানাপত্রগুলো মাসজিদ  থেকে ঘরে নেয়ার। আব্বার ছোটখাটো জিনিস বহন করতে গিয়েও আমি আছাড় খেয়ে পড়তাম আমার তিন বছরের বড়বোন শব্দ করে হেসে উঠতো আর বড় ভাই ধমকে বলতেন তুই তো সব খানে আছাড় খাস- কদু ! আমি লজ্জা পেয়ে কেদেঁ উঠতাম তখন  যে আ কতো  আদর করতেন আজো আমি সে আদর অনুভব করি। আজো সে কথা মনে পড়লেই চোখের পাতা ভিজে ওঠে। আর তক্ষুনি হৃদয় থেকে আওয়ায আসে ‘‘রাবাবীর হামহুমা কামা রাব্বাাইয়ানী ছগীরা।’’

ঈদে আমাদের বাড়ীতে মানুষ গমগম করতো। আল্টা বাড়ীতে সবচাইতে বয়োজেষ্ট্য হওয়ার কারনে সবাই আসতো আল্টার সাথে দেখা করার জন্যে ।এ কারনে সেদিন সকালেই আম্মা পিঠে বানিয়ে রাখতেন।আমার সেজোভাই তখন পাঞ্জাব ইউনিভাসির্টিতে মাষ্টার্স করছিলেন, ঈদে তিনিও বাড়ী আসতেন, আর আমাদের জন্যে ঈদের উপহার ওয়েষ্ট পাকিস্থান থেকে নিয়ে আসতেন।এ ছাড়াও তিনি সীডলেস, আঙ্গুর, মালটা, নাশপাতি, আখরোট, এবং উত্তম জাতের খেজুর আনতেন। নানান জাতের বাদাম আনতেন। আল্টার চায়ের জন্যে কনডেন্স মিল্ক আনতেন। আম্মা ঈদের দিনে সেমাই রান্না করতেন। সেমাইর ঘ্রাণই ছিলো আন্যরকম। দুধের সর দিয়ে ঘি বানাতেন। আম্মা আর সেই ঘিয়ে ভাজা সেমাইর ঘ্রান অন্যরকম হবারই কথা। ভাজা চাল দিয়ে পায়েস বানাতেন আম্মা সেই পায়েসে পশ্চিম পাকিস্থান থেকে ভাইর আনা বাদাম ছেড়ে দিতেন। সেমাই ঢেলে তার ওপর খোরমা সাজিয়ে দিতেন।

সকালে উঠে সারি বেধেঁ পুকুরে নেমে গোসল করতো সবাই। শুধু আব্বাই গোসলখানায় গোসল করতেন। আব্বা পুকুরে নেমে কোনোদিন গোসল করেননি। তিনি পানিতে ডুব দিতে জানতেননা। সাঁতার কাটতেও জানতেননা। যতো গরম মওসুমই হোক আল্টা সবসময় হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করতেন। এরপর সুগন্ধি লাগিয়ে নতুন পোশাক পরে আল্লাহু আকবর বলে বড় রাস্তায় উঠতেন। তারপর পেছনে বেল বাজাতে বাজাতে আব্দুর  রহমান এগিয়ে যেতো। ছেলেটি বডিগার্ডের মতো সবসময় আব্বার সাথে থাকতো। তখন দেখা যেতো নতুন পোষাক পরে আমাদের বাড়ী থেকে ও অন্যান্যে সব বাড়ী  থেকে দলে দলে লোক ঈদগাঁর দিকে যাড়ে–।

এখানে একটা কথা রয়ে গেছে আমরা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম আমাদের উঠোন ভর্তি মানুষ। দলে দলে মহিলারা এসে বসে আছে। বর্হিবাড়িতে ভিড় করছে পুষ্পষ মানুষরা। আব্বা ঘরের সিড়িঁতে দাড়িঁয়ে সবাইকে টাকা পয়সা দিয়ে বিদায় করতেন এরপর বাইরের কাচারী ঘরে গিয়ে পুরুষ মানুষদের টাকা পয়সা দিতেন। এই মানুষগুলো অনেকেই আবার ছোট ছোট বা”া নিয়ে ঈদগাঁ গিয়ে হাযির হতো। সবাই খুশি হয়ে যে যা পারতো তাদের হাতে দিতো।

ঈদের নামাযের পর আব্বা ছোট রাস্তা ধরে বাড়ী অপর পাশ দিয়ে বাড়ীতে ঢুকতেন। সাথে থাকতো অনেক মানুষ। আম্মা আগেই খাবার রেডী রাখতেন। হালকা সেমাই, পায়েশ, ভূনা খিচুড়ী, দিয়ে হতো ঈদের সকালের আপ্যায়ন। এরপর দুপুরে হতো পোলাও, কোর্মা, জর্দা এসব। বিকেলে আসতো এ বাড়ী ও বাড়ী বলতে তা-ও নিজেদেরই বাড়ী ছিলো। আমাদের মুল বাড়ীটাকে আমরা বলতাম পুরনো বাড়ী লোকসংখ্যা বেড়ে গেলে আশে পাশে বাড়ী তৈরী করে কিছু কিছু লোক নতুন নতুন বাড়ীতে গিয়ে উঠে। এভাবে একটা বাড়ী থেকে পাঁচটা বাড়ী হয়ে যায়। আমার আব্বাও নতুন বাড়ীতে নেমে এসে এ বাড়ীতে মসজিদ তৈরী করেন। গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বাড়ীর সামনে পুকুর কাটেন এবং খেলাধুৃলার জন্যে খোলা মাঠ বানিয়ে দেন।আর আল্টা বৃটিশ সরকারের চাকুরী ছেড়ে দিলে আমাদের বাড়ীতে বিশাল কাচারীতে সরকার  কোর্ট স্থাপন করতেন এবং রায় শোনাতেন।

এই পাচঁ বাড়ীতে লোক ঈদের  দিন বিকেলে আমাদের স্কুলের সামনে একত্রিত হতো খেলাধুলা হতো হাসি আনন্দ হতো। আমরা মেয়েরাও গোসল করে নতুন পোষাক পড়ে দ্রুাকাত নফল নামায ঘরে পড়ে নিতাম। ঈদগাঁহ থেকে যখন উ”কণ্ঠে আল্লাহু আকবর বলে নামাযে ঈমাম সাহেবের আওয়ায শোনা যেতো এরপরই ঘরে  আমরা নামায পড়তাম দুরাকাত নফল নামায।
এর পর শুরুহতো সাজগোজ । সবাই নতুন কাপড় পরতাম আমাদের কাজের মানুষরাও নতুন কাপড় পরে ঈদের সেমাই খেতো। প্রসাধনীর কেনোটাই বাদ যেতোনা। আমরা হাতের বানানো কাজল ব্যবহার করতাম। সরসের তেলে সলতে চুরিদা সলতের এক মাথায় আস্পন দিয়ে তার ওপর কাজলদানী ধরে রাখতাম। চোখে সেই কাজলই ছোটবেলায় ব্যবহার করেছি। সেই কাজল পেন্সিলের মাথা লাগিয়ে তা দিয়ে কপালে টিপ পরতাম। একবার কপালে লাল রংয়ের টিপ লাগাতে সেজোভাই আমাদের  দু বোনকে ডেকে বললেনÑ লাল টিপ কোনো লাগিয়েছো ‘‘তোমরাকি বসন্ত বাবুর বাড়ীর বৌ ’’।

আম্মা বুঝিয়ে বললেন লাল টিপ কপালে দিতে নেই। মানুষকে আল্লাহ বানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কপাল বানিয়েছেন তাকেঁ সাজদাহ করার জন্যে। এই কপাল তারঁ জন্যেই খালি থাকবে।এরপর আমরা আর লাল টিপ কোনোদিনই পরিনি। আনেকটা লম্বা সময় পেরিয়ে এসেছি আজ এতো বছর পর পুরোনো দিনের সেই আনন্দের কথা মনে পড়ে যেখানে আনন্দে শরীক হতাম মা-বাবা-ভাই-বোন-চাচা-মামার, বাড়ীর ছোটোবড়ো সব মানুষদের।

অনেকেই চলে গেছেন দুনিয়া থেকে আল্লাহর মেহমান হয়ে। অনেকেই আছেন  দেশের বাইরে  আমি নিজেও এখন দেশের মাটি থেকে দেশের মানুষ থেকে বহু দুরে। কিন্তু আমার দেশ আমার দেশের মানুষ আমার হৃদয়ের সবখানি অবশ্যই জুড়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই যেনো  স্মৃতিতে সব দেখতে পাই । আমার দেশের মানুষের কথা সব সময় ভাবি। আমার সুখের মুহুর্তে তাদের  দুঃখের কথা ভাবি , তাদের  মধ্যে কিছু অসহায়-অর্থহীন দুঃস্থ মানুষের কথা ভাবিÑ ভাবি তাদের  ঈদ কেমন হয়। তারা কি নতুন কাপড় কিনে ঈদের  দিনে পরতে  পেরেছে। তাদের  ঘরে  কি চাল সেমাই চিনি আছে হৃ আমি অনেক দুরে  তাদের  জন্যে দোয়া করি।
আল্লাহ তায়ালার কাছে কষ্পন মিনতি জানাইÑ হে আল্লাহ ! তুমি আমাদের  দেশের মানুষের পাশে থেকো, তাদের  সব ধরনের সমস্যা দুর করে  দাও। তাদের  মনের সব নেক আশা পুরন  করো। হে রহমানুর রাহীমÑ ঈদের  দিনে আনন্দ করার তওফীক তাদের  দাও !!

পঞ্চাশ বছর আগের ঈদের  সাথে আজকের ঈদের  কোনো তুলনা করা যায়না। সেই ঈদেও পবিত্রতা এখন ধরা ছোঁয়ার বাইরে এখন ঈদকে নিয়ে চলে ব্যবসা। ঈদের দিনে চলে নানা রকম অন্যায় ও নীতিবিরোধী আনুষ্ঠানিকতাÑ ঈদ এখন আর নিষপাপ আনন্দে মোড়ানো নেই। নাচানাচি আর হিন্দি গানের কানফাটা চীৎকারে  ভেসে গেছে সব কিছু। রয়ে গেছে শুধুমাত্র আনন্দের ঈদ। এবাদতের ঈদ নয়, গুনাহ থেকে মাফ চেয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে নাজাত চেয়ে তার সন্তুষ্টি চেয়ে মোনাজাতের ঈদ নয়Ñ শুধুমাত্র হৈ চৈ আনন্দের ঈদ !

আল্লাহ তায়ালা আমাদের  সবাইকে ঈদেও সঠিক মর্যাদা বুঝে ঈদের রাতকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল কওে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করার তওফীক দান কষ্পন। আমীন ! ছুম্মা আমীন !!

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY