রোযার হেকমত

0
447

রোযার হেকমত

ফয়সাল বিন আলী বাদানী

ইসলাম অর্থ আল্লাহর কাছে আত্বসমর্পণ। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর
নির্দেশের কাছে নিজেকে সন্তুষ্ট চিত্তে সঁপে দেয়া। তার প্রতি ঈমান রাখা,
তার কাছে প্রতিদানের আশা করা এবং বিশ^াস করা যে আল্লাহর বিধান
অনুযায়ী জীবনযাপনের মাঝে রয়েছে কল্যাণ ও সফলতা। এটাও বিশ^াস করতে হবে যেআল্লাহ তায়ালা হলেন হাকিম বা মহাজ্ঞানী। তার বিধানই পূর্ণাঙ্গ ও সবচেয়ে শেন্দষ্ঠ এবংসুন্দর। তার প্রতিটি বিধানে রয়েছে হেকমত বা কল্যাণকর মহা উদ্দেশ্য। অনেক সময়মানুষ তার বিধানের কল্যাণকর দিক ও হেকমত যথার্থভাবে অনুধাবন করতে পারে না।এটা মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। আল্লাহ তায়ালা বলেনষ্ক্রতোমাদেরখুব অল্পই জ্ঞান দেয়া হয়েছে।্ (সূরা আল-ইসরা-৮৫) মানুষেরকর্তব্য হলো সর্বদা আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নির্দেশ পালন করা। এ আদেশ-নির্দেশসমূহের হেকমত তথা বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও উপকারিতা অনুধাবন করতেপারা যাক বা না যাক। যদি এমন হয় যে আল্লাহর যে সকল বিধানের উপকারিতা আমাদের কাছে স্পষ্ট সেস্পলোই আমরা বাস্তবায়ন করবো, আর অন্যস্পলোর প্রতি স্পরুত্ব দেবো না তাহলে তো আল্লাহর দাসত্ব করা হলো না। বরং নিজের মনের দাসত্ব করা হলো। এরকম কেউ করলে এটা তার ঈমান ও বিশ^াসের দুর্বলতার পরিচয় দিলো। আবার এর অর্থ এটাও নয় যে আমরা আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধানের বৈজ্ঞানিক লাভ-ক্ষতি, উপকারিতা সৃঋর্কে আলোচনা করতে পারবো না। অবশ্যই পারবো, কারণ এটা আমাদের ঈমানকে আরো শক্তিশালী করবে, তাঁর প্রতি বিশ^াসকে মজবুত করবে। তাই আমরা এখন রোযার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তার কল্যান ও উপকারিতার
দিকস্পলো তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

(১) তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি
এটা আল্লাহ রাল্টুল আলামিন নিজেই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। রোযার
একটা লক্ষ্য হলো মানুষ তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি অর্জন করবে। তিনি বলেন, হে বিশ^াসীরা! তোমাদের জন্য রোযার বিধান দেয়া হয়, যেমন বিধান তোমাদের পরবর্তীদের দেয়া হয়েছিলো, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।¤œ সূরা
বাকারা-১৮৩

তাকওয়া কী? তাকওয়া হলো, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পালন করা
,আর যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা। এটা করা হবে আল্লাহর পক্ষ থেকেপ্রতিদান লাভ ও তার শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়। রোযা পালনকারী আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্বসমর্পণ করে যখন বৈধ পানাহার ও যৌন আচরণ বর্জন করতে পারে তখন সে অবশ্যই অবৈধ আচার-আচরণ,
কথা ও কাজ এবং ভোগ- বিলাস থেকে বেঁচে থাকতে পারবে।

(২) শয়তান ও কু-প্রবৃত্তির ক্ষমতা দুর্বল করাশয়
তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করতে পারে মানুষের কু-প্রবৃত্তি যদি
যখন যা ইচ্ছা তা করতে থাকে তখন সে উদ্ধত ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকে এবং সে তার আরো চাহিদা মিটানোর জন্য চাপ অব্যাহত রাখে। এমতাবস্থায় শয়তান ক্ষুধা ও পিপাসা দিয়ে এর সাথে যুদ্ধ করে। এ যুদ্ধে রোযা পালনকারী আল্লাহর সাহায্যে শয়তান ও কু-প্রবৃত্তিকে পরাজিত করে। এ কারণে কু-প্রবৃত্তিকে দমন করার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম রোযা নামক চিকিৎসা দিয়েছিলেন। কেননা নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ সকল প্রকারের পাপাচারে লিপ্ত হয়। যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেনΠ হে যুবকেরা! তোমাদের মাঝে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা দেয়, আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা পালন করে। কারণ এটা তার রক্ষা কবচ। বর্ণনায়- বোখারী ও মুসলিম। রোযার বিধানের এটা একটা হেকমত। এভাবেই রোযা মানুষকে তাকওয়ার পথে নিয়ে যায়। মোটকথা রোযা যাবতীয় জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও তা বৈধ পথে পরিচালিত করার প্রশিক্ষণ দেয়।
(৩) রোযা আল্লাহর কাছে আত্বসমর্পণ ও তার দাসত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশিক্ষণমানুষ
যখন তার প্রবৃত্তির গোলামী ও শয়তানের আগ্রাসন থেকে মুক্তি লাভ করবে
তখনই সে আল্লাহ রাল্টুল আলামিনের বান্দা বা দাস হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ব্যতীত তার সামনে আর কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। তাই সে আল্লাহ রাল্টুল আলামিনের আদেশ-নিষেধকে নিজের প্রবৃত্তির দাবির ওপর অগ্রাধিকার দেয়। এতে যতো কষ্ট হোক, যত ধৈর্যের প্রয়োজন হোক, যতো ত্যাগের দরকার হোক সব কিছু করতে সে প্রস্তুত হয়ে যায়। তাই রোযা পালনকারীকে দেখবেন সে দিনের বেলা খাচ্ছে না, খাচ্ছে রাতে, রাতে নিদন্দা যাচ্ছে না, রাত জেগে সে সালাত আদায় করছে। মিথ্যা কথা ও কাজ এবং সব ধরনের অসদাচরণ সে পরিহার করে চলছে। অথচ তার মন ও প্রবৃত্তি নির্দেশ দিচ্ছে দিনের বেলায় খাওয়া-দাওয়া করতে, রাতের
বেলা বিশন্দাম নিতে, মিথ্যা কথা বলতে ইত্যাদি। এমনিভাবে রোযা ও এ সৃঋর্কিত কাজ স্পলো আদায় করার মাধ্যমে রোযা পালনকারী প্রবৃত্তিসহ সকল মানুষের দাসত্ব অস্বীকার করে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করে।

ৎ(৪) ঈমানকে দৃঢ় করা, মোরাকাবা ও আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করাআল্লাহ
রাল্টুল আলামিনের নির্ধারণ করা সময়ে তারই সন্তুষ্টি লাভের জন্য
সকল প্রকার পানাহার পরিহার করা, আল্লাহকে ভয় করা ও তার মোরাকাবার একটি বলিষ্ঠ প্রমাণ বহন করে। এটাই প্রকরুত ঈমান। রোযা পালনকারী যদি লোক চক্ষুর আড়ালে পানাহার করে আর মানুষের কাছে প্রকাশ করলো সে রোযা অবস্থায় আছে
তাহলে সে রোযা পালনকারী বলে গণ্য হবে না। এমনিভাবে সে দিনের বেলা ও পানাহার ও যৌন আচরণ ত্যাগ করলো বটে কিন্তু রোযার নিয়ত ছিলো না তাহলে সে রোযা আদায় করেছে বলে ধরা হবে না। রোযা পালনকারীর এ অনুভূতি আল্লাহকে
ভয় করা ও তার মোরাকাবার প্রমাণ দিতে শিখায়। (মোরাকাবা হলো- সর্বদা আল্লাহ আমাকে ও আমি যা করছি তা দেখছেন এ ধরনের দৃঢ় অনুভূতি ধারণ করা) তাই রোযা মুসলিমকে ঈমানের সত্যতার প্রমাণ দিতে প্রশিক্ষণ দেয়। তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মোমিন হিসেবে তার কর্তব্য হলো সর্বদা আল্লাহর মোরাকাবা করা অর্থাৎ
এ দৃঢ় বিশ^াস পোষণ করা যে আমার প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিটি কাজ আল্লাহ রাল্টুল আলামিন পর্যবেক্ষণ করছেন তাই আমাকে কোনো কাজে তার অবাধ্য হওয়া চলবে না। তিনি যাতে সন্তুষ্ট হন শুধু তা-ই আমাকে করতে হবে। যদি এ রকম মোরাকাবার সাথে রোযা আদায় করা যায় তাহলে তার জন্য রয়েছে যা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেনΠ

মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত স্পণ পর্যন্ত
বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু রোযার বিষয়টা ভিন্ন। কেননা রোযার শুধু আমার জন্য আমিই তার প্রতিদান দেব। আমার জন্যই সে পানাহার ত্যাগ করে থাকে। বর্ণনায়-বোখারী ও মুসলিম।
আর এ বিষয়টা সকল প্রকার এবাদত-বন্দেগীতে থাকতে হয়। যখন মানুষ
বিশ^াস করবে আল্লাহ আমাকে সর্বদা দেখছেন তখন সে বিনা অযুতে

সালাত আদায়
করে না। ঠিক তেমনি কোনো কাজে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করবে না। সকল প্রকা কাজ-কর্ম যথাযথ ও সুন্দরভাবে সৃঋাদন করবে।

(৫) ধৈর্য, সবর ও দৃঢ় সংকল্পের প্রশিক্ষণ
রোযার মাস মূলত ধৈর্য ও সবরের মাস। রোযা মনের চাহিদা পূরণে বাধা
দেয়ার মাধ্যমে সংকল্পের দৃঢ়তার প্রশিক্ষণ দেয়। আল্লাহ রাল্টুল আলামিন কতর্রুক নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন না করে তা মেনে চলার অভ্যাস গড়তে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলে। কখনো তাঁর সীমা লঙ্ঘনের কথা চিন্তা করে না। আল্লাহ তায়ালা রোযার বিধান বর্ণনা করার পর বলেছেন, ষ্ক্রএস্পলো আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং এস্পলোর নিকটবর্তী হইও না।ল্গ সূরা-বাকারা-১৮৭ এর মাধ্যমে মানুষ নিজের মন ও বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা লাভ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধরুন কোনো ব্যক্তি একটি খারাপ অভ্যাসে লিপ্ত। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে এর থেকে বিরত থাকতে পারছে না। রমযান মাসের রোযা তার বদ অভ্যাস উৎপাটন করতে একটা বিরল সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।এরপর সে যেনো,আর বলতে না পারে যে আমি পারি না।

(৬) আখেরাতমুখী করার প্রশিক্ষণ
রোযা পালনকারী পার্থিব সকল ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে দুনিয়ার প্রতি বিমুখ
হয়ে আখেরাতমুখী হওয়ার দীক্ষা নিয়ে থাকে। তার এ ত্যাগ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অজর্নের মাধ্যমে আখেরাতে জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে ব্যতীত অন্য কিছুর জন্যে নয়। এ আধ্যাত্বিক শিক্ষার মাধ্যমে দুনিয়ার সাথে সৃঋর্ক কমিয়ে আখেরাতের সৃঋর্ককে প্রধান্য দেয়ায় সবক নিয়ে থাকে,আর এ লক্ষ্য অর্জনে সে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত-বন্দেগী ও সৎকর্ম সৃঋাদন ক্ষেত্র প্রশস্ত করতে চেষ্টা করে।

(৭) আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি শুকরিয়া ও সৃষ্টি জীবের সেবা করার দায়িত্ব
স্মরণ করিয়ে দেয়া
¬¬

(৮) রোযা সমাজ সংস্কারের একটি বিদ্যাপীঠ
রোযার যে সকল হেকমত রয়েছে যা ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করে, এ সকল হেকমত সমাজকেও পরিশুদ্ধিকরণ ও সংস্কারে ভূমিকা রাখে। কেননা ব্যক্তির পরিশুদ্ধতা হলো সমাজ শুদ্ধির প্রথম ধাপ। ব্যক্তি সংশোধন হয়ে গেলে সমাজ সংশোধন হয়ে যায়। তাইতো আমরা দেখি, রোযাকে সামাজিকভাবে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ একই সাথে একই সময়ে। কিন্তু নফল রোযা সকলকে এক সময়ে এক সাথে আদায় করতে হবে বলে কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই। রমযান আমাদেরকে সমাজ সংস্কারের পথে উদ্বুদ্ধ করে, সমাজ যতোই কলুষিত হয়ে যাক না কেন। রমযান ইসলামী শরীয়া বাস্তবায়নের আন্দোলনের এক অনুকূল সময়। এ সময় যেমন শয়তানের সৃষ্টি প্রতিকূলতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনিভাবে মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতি আগ্রহ অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি দেখা যায়। তাই সমাজ সংস্কারের উদ্যোগের এটাই
উপযুক্ত সময়। মানুষকে বুঝানোর এটা উত্তম সময় যে ইসলামী শরীয়ার বাস্তবায়ন সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।
(৯) শারীরিক শক্তি ও সুস্থতা অর্জন
এক ন¤œর থেকে আট পর্যন্ত রোযার যে সকল কল্যাণকর দিক আলোচিত হলো তাছাড়াও রোযার একটি কল্যাণকর দিক হলো স্বাস্থ্যের উন্নতি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে
খাবার গ্রহণ,পরিমিত আহার,ঠিক একই সময় পানাহার আবার ঠিক একই সময় বিরতি দেয়া ইত্যাদি পাকস্থলীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশন্দাম দেয় ফলে পাকস্থলী শক্তিশালী হয়। এমনিভাবে ইসলাম প্রবর্তিত প্রত্যেকটি এবাদত-বন্দেগীতে রয়েছে হেকমত ও মানুষের জন্য অসংখ্য পার্থিব কল্যান।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY