কোরআন সংকলনের ইতিহাস

0
2377

কোরআন সংকলনের ইতিহাস

 কোরআন লিপিবদ্ধকরণ

যখন থেকে কোরআন নাযিল শুরু হয়, সেদিন থেকেই আল্লাহর রসূল তা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য পারদর্শী সাহাবীদের নিযুক্ত করতে আরম্ভ করেন। হযরত যায়দ বিন সাবেত (রা.) ছাড়া আরো ৪২ জন সাহাবী এ কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এ সম্পর্কে রসূল (স.) বলেন, তোমরা কোরআন ছাড়া আমার কাছ থেকে অন্য কিছু লেখো না।

 কোরআনের ধারাবাহিকতা

কোরআনের ধারাবাহিকতা প্রসংগে একটি বর্ণনা এমন রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) রসূল (স.)-কে বলেছেন, অমুক আয়াতটি সূরা বাকারার ২৮০ নং আয়াতের পর লিপিবদ্ধ করুন। অন্য এক রেওয়ায়াতে তিনি রসূল (স.)-কে সূরা কাহফের প্রথম দশটি আয়াত তেলাওয়াত করার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। এ ধরনের আরো কিছু কিছু রেওয়ায়াত পাওয়া যায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে রসূল (সা.)-এর যুগে কোরআনের সূরা ও আয়াতের সংখ্যা সম্পর্কিত আর তেমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

 কোরআনের আয়াতের গণনা

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগেও কোরআনের আয়াতের গণনা হয়েছে এমন কোন রেওয়ায়াত পাওয়া যায় না। সম্ভবত সর্বপ্রথম হযরত ওমর (রা.)-এর যুগেই আয়াত গণনার কাজটি শুরু হয়েছে। হযরত ওমর (রা.) তারাবীর নামাযের প্রতি রাকা’তে তিরিশ আয়াত করে তেলাওয়াত করার একটা নিয়ম জারি করেছিলেন। অন্যান্য সাহাবাদের মধ্যে হযরত ওসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত আনাস (রা.), হযরত আবুদ্ দারদা (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) প্রমুখ সাহাবী কোরআনের আয়াত সংখ্যা নির্ণয় করেছেন।

 আয়াতের সংখ্যার তারতম্য

আয়াতের সংখ্যার মধ্যে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। এর কারণ, কিছু কিছু আয়াতের শেষে রসূল (স.) মাঝে মাঝে ওয়াকফ করেছেন, আবার কখনও ওয়াকফ না করে পরবর্তী আয়াতের সাথে মিলিয়ে তা তেলাওয়াত করেছেন। এমতাবস্থায় কেউ কেউ প্রথম অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখে এক ধরনের গণনা করেছেন। আবার কেউ কেউ পরবর্তী অবস্থার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে আয়াতের সংখ্যা নির্ণয় করেছেন। এতে করে কোরআনের আয়াতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তবে সাধারণত হযরত আয়েশার গণনাকে এ ব্যাপারে বেশী নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

 কোরআনের প্রথম মোফাসসের

কোরআনের প্রথম মোফাসসের হচ্ছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.),

  কোরআনের প্রথম সংকলক

কোরআনের প্রথম সংকলক হচ্ছেন হযরত ওসমান (রা.)।

কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক

কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক হচ্ছেন মাওলানা আমীর উদ্দীন বসুনিয়া।

 কোরআনের নাম

কোরআনে উল্লিখিত কোরআনের নাম ৫৫টি,

কোরআন প্রথম যাঁর মাধ্যমে এসেছে

কোরআন প্রথম যাঁর মাধ্যমে এসেছে তিনি হচ্ছেন হযরত জিবরাঈল (আ),

 কোরআনে যে ভাগ্যবান সাহাবীর নাম আছে

কোরআনে যে ভাগ্যবান সাহাবীর নাম আছে তিনি হচ্ছেন হযরত যায়দ (রা.)।

 কোরআনে তেলাওয়াতে সাজদার

কোরআনে তেলাওয়াতে সাজদার সংখ্যা সর্বসম্মত ১৪ (মতপার্থক্যে ১৫)

 কোরআনের মুদ্রণ ইতিহাস

 কোরআন শরীফ লিপিবদ্ধ করা।

মুদ্রণ যšের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কোরআন শরীফ হাতেই লেখা হতো। প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু নিবেদিতপ্রাণ কোরআনের ‘কাতেব’ মজুদ ছিলেন যাঁদের একমাত্র কাজ ছিলো কোরআন শরীফ লিপিবদ্ধ করা। কোরআনের প্রতিটি অক্ষরকে সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করার লক্ষ্যে এটি নিসন্দেহে এক নযীরবিহীন ঘটনা।

 কোরআনের সর্বপ্রথম মুদ্রণ

মুদ্রণ যš আবিস্কারের পর ইউরোপের হামবুর্গ নামক স্থানে হিজরী ১১১৩ সনে সর্বপ্রথম কোরআন শরীফ মুদ্রিত হয়। এরপর বিশ্বের এখানে সেখানে অনেকেই ছাপাখানার মাধ্যমে কোরআন শরীফ মুদ্রণ শুরু করেন, কিন্তু মুসলিম জাহানে নানা কারণে প্রথম দিকে মুদ্রিত কোরআন শরীফ তেমন একটা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

 মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম কোরআন মুদ্রণ

মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলানা ওসমান রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে কোরআন মূদ্রণের কাজ করেন। প্রায় একই সময় কাযান শহর থেকেও কোরআনের একটি নোসখা মুদ্রিত হয়।

লিথো মুদ্রণ যšে প্রথম কোরআন মুদ্রণ

১৭৮৭ খৃস্টাব্দে ইরানের তেহরানে লিথো মুদ্রণ যšে প্রথম কোরআন শরীফের একটি কপি মুদ্রিত হয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে দুনিয়ার অন্যান্য এলাকাতেও ব্যাপকভাবে ছাপাখানার মাধ্যমে কোরআন মুদ্রণের রেওয়াজ চালু হতে থাকে।

 মূদ্রণ যšের আবিষ্কারের আগে

মূদ্রণ যšের আবিষ্কারের আগে কোরআনের আয়াতসমূহ সাধারণত পাথর, শিলা, শুকনা চামড়া, খেজুর গাছের শাখা, বাঁশের টুকরা, গাছের পাতা এবং পশুর চামড়ার ওপর লেখা হতো।

 কোরআনে নোকতা সংযোজন

আরবদের মধ্যে আগে আরবী বর্ণমালায় নোকতা সংযোজন করার কোনো রীতি প্রচলিত ছিলো না। তারা নোকতাবিহীন অক্ষর লেখতো। এতে কোরআন শরীফ তেলাওয়াতের ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হতো না। কেননা কোরআনের তেলাওয়াত কোনদিনই অনুলিপিনির্ভর ছিলো না। হাফেযদের তেলাওয়াত থেকেই লোকেরা তেলাওয়াত শিক্ষা করতো। হযরত ওসমান (রা.) যখন মুসলিম জাহানের বিভিন্ন এলাকায় কোরআনের ‘মাসহাফ’ প্রেরণ করতেন, তখন তার সাথে তিনি বিশিষ্ট তেলাওয়াতকারী হাফেযদেরও পাঠাতেন। সে যুগে আরবী বর্ণমালায় নোকতা সংযোজন করা দূষণীয় কাজ মনে করা হতো। এ কারণেই ওসমানী মাসহাফেও প্রথম দিকে কোনো নোকতা ছিলো না। এতে করে প্রচলিত সব কয়টি কেরাতেই কোরআন তেলাওয়াত করা সহজ হতো, কিন্তু পরে অনারব লোকদের প্রয়োজনে আরবী বর্ণমালায় নোকতা সংযোজন একান্ত জরুরী হয়ে পড়ে।

কোরআনুল কারীমের হরফসমূহে কে সর্বপ্রথম নোকতার প্রচলন করেছিলেন এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো মতে বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ তাবেয়ী হযরত আবুল আসাদ দুয়েলী (র) এ কাজটি সর্বপ্রথম আনজাম দেন। অনেকে মনে করেন, আবুল আসাদ দুয়েলী এ কাজটি হযরত আলী (রা.)-এর নির্দেশেই স¤ক্সাদন করেছেন।

কারো মতে কুফার শাসনকর্তা যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ান আবুল আসাদের দ্বারা এ কাজটি সম্পন্ন করিয়েছেন। আবার অন্যদের মতে তিনি এ কাজ আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে স¤ক্সাদন করেছেন। অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এ কাজটি হযরত হাসান বসরী (র), হযরত ইয়াসের ইবনে ইয়ামার এবং নসর বিন আছেম লাইসীর দ্বারা সম্পন্ন করিয়েছিলেন।

অনেকে আবার এ অভিমতও প্রকাশ করেছেন যে, যিনি কোরআনের হরফসমূহে নোকতা সংযোজন করেছেন তিনি সর্বপ্রথম আরবী বর্ণমালায়ও নোকতার প্রচলন করেন। প্রখ্যাত বর্ণমালা বিশেষজ্ঞ ও সাহিত্যিক আল্লামা কলশন্দী এ অভিমতের প্রতিবাদ করে বলেছেন, মূলত এর বহু আগেই আরবদের মাঝে নোকতার আবিষ্কার হয়েছে। তাঁর মতে আরবী লিখন পদ্ধতির আবিষ্কারক ছিলেন মোয়ামের ইবনে মুরার, আসলাম ইবনে সোদরাহ এবং আমর ইবনে জাদারা নামক এ তিন ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে মোয়ামের হরফের আকৃতি আবিষ্কার করেন। পড়ার মাঝে থামা, শ্বাস নেয়া এবং একত্রে মিলিয়ে পড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহও তিনি আবিষ্কার করেন। আরেক বর্ণনায় হযরত আবু সুফিয়ানকে নোকতার আবিষ্কারক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁদের মতে তিনি নোকতার এ পদ্ধতি হীরাবাসীদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন, আর এ হীরাবাসীরা তা গ্রহণ করেছিলেন আম্বারবাসীদের কাছ থেকে। এতে বুঝা যায় পরবর্তীকালে যে ব্যক্তির মাধ্যমে কোরআনের নোকতার প্রচলন শুরু হয়, প্রকৃতপক্ষে তিনিই এই নোকতার মূল আবিষ্কারক নন; বরং তিনি ছিলেন কোরআনে সর্বপ্রথম নোকতার প্রচলনকারী মাত্র।

কোরআনের হারাকাত

নোকতার মতো প্রথম অবস্থায় কোরআনে কারীমে হরকত বা যের যবর পেশ ইত্যাদিও ছিলো না। সর্বপ্রথম কে হরকতের প্রবর্তন করলেন এ ব্যাপারেও মতপার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে সর্বপ্রথম হযরত আবুল আসাদ দুয়েলী কোরআনে হরকত প্রবর্তন করেন। আবার অনেকেরই অভিমত হচ্ছে যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এ কাজটি ইয়াহইয়া বিন ইয়াসার এবং নসর বিন আসেম লাইসীর দ্বারা সম্পন্ন করিয়েছিলেন। বিশ্বস্ত অভিমত হচ্ছে হযরত আবুল আসাদ দুয়েলীই সর্বপ্রথম কোরআন শরীফের জন্যে হারাকাত আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তার আবিকৃত হরকতসমূহ আজকাল প্রচলিত হারাকাতের মতো ছিলো না। তাঁর আবিষ্কৃত হারাকাতে যবরÑএর জন্যে হরফের উপরিভাগে একটা নোকতা এবং যেরÑএর জন্যে নীচে একটা নোকতা বসিয়ে দেয়া হতো। পেশের উচ্চারণ করার জন্য হরফের সামনে এক নোকতা এবং তানওয়ীনের জন্যে দুই নোকতা ব্যাবহার করা হতো। পরে খলীল বিন আহমদ হামযা-এর সাথে তাশদীদের চিহ্ন তৈরি করেন।

এরপর বাগদাদের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হযরত হাসান বসরী (র.) ইয়াহইয়া বিন ইয়াসার ও নসর বিন আছেম লাইসী প্রমুখকে কোরআন শরীফে নোকতা ও হারাকাত প্রদানের কাজে নিয়োজিত করেন। একে আরো সহজবোধ্য করার জন্যে উপরে, নীচে বা পাশে অতিরিক্ত বিন্দু ব্যবহার করার ব্যাপারে হযরত আবুল আসাদ দুয়েলী প্রবর্তিত পদ্ধতির জায়গায় বর্তমান আকারের হারাকাত প্রবর্তন করা হয়, যাতে করে হরফের নোকতার সংগে হারাকাত নোকতার মিশ্রণজনিত কোনো জটিলতার সৃষ্টি না হয়।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY