রসূল (স.) অনন্য মানবীয় গুনের আধার

0
276

রসূল (স.) অনন্য মানবীয় গুনের আধার

সঙকলিত রচনা

১.    রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শারীরিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন।

২.    রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম প্রাঞ্জল ও অলংকারপূর্ণ ভাষায় কথা বলতেন।

৩.    তাঁকে দুর্লভ প্রজ্ঞা, কর্মকৌশল এবং আরবের সকল ভাষার জ্ঞান দান করা হয়েছিলো। তিনি প্রত্যেক গোত্রের সাথে সেই গোত্রের ভাষায় এবং বাকরীতিতে কথা বলতেন।

৪.    আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ধৈর্য সহিষ্ণুতা, ক্ষমাশীলতা ও স্পণবৈশিষ্ট দ্ভারা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।

৫.    তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমন উন্নত ও সুন্দর ছিলো যে, তাঁকে কষ্ট দেয়া, তাঁকে দুর্বৃত্তদের উত্ত্যক্ত ও বাড়াবাড়ি যতো বৃদ্ধি পেয়েছে, তাঁর ধৈর্যও ততো বেড়েছে।

৬.    তিনি কখনো নিজের জন্যে কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
৭.    তিনি রোষ ক্রোধ থেকে সবচেয়ে বেশী দূরে ছিলেন। সকলের প্রতি সহজেই তিনি রাযি হয়ে যেতেন। তাঁর দান ও দয়াশীলতা পরিমাপ করা ছিলো অসম্ভব।
৮.    দারিদেন্দর আশংকা থেকে মুক্ত মানসিকতা নিয়ে তিনি দান খয়রাত করতেন।
৯.     বীরত্ব বাহাদুরীতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের স্থান ছিলো সবার ওপরে। তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে শেন্দষ্ঠ বীর।

১০.    নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সর্বাধিক লাজুক প্রকৃতির এবং নিন্মদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন

১১.    লজ্জাশীলতা ও আত্মসম্মানবোধ এতো প্রবল ছিলো যে, কারো মুখের ওপর সরাসরি অপ্রিয় কথা বলতেন না।

১২.    কারো ব্যাপারে কোন অপ্রিয় কথা তাঁর কাছে পৌঁছলে সে লোকের নাম উল্লেখ করে তাকে বিবন্দত করতেন না; বরং এভাবে বলতেন, কিছু লোক এভাবে বলাবলি করছে।

১৩.    তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশী ন্যায়পরায়ণ, পাক পবিত্র, সত্যবাদী এবং বিশিষ্ট আমানতদার। বন্ধু শত্রু সকলেই এটা স্বীকার করতেন। নবুয়তলাভের আগে তাঁকে ‘‘আল আমিন্’’ উপাধি দেয়া হয়েছিলো।

১৪.    আইয়ামে জাহেলিয়াতে তাঁর কাছে বিচার-ফয়সালার জন্যে বাদী বিবাদী উভয় পক্ষই হাযির হতো।

১৫.    নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ছিলেন অতি বিনয়ী, নিরহংকার। বাদশাহদের সম্মানে তাদের সেবক পাশর্^সহচর যে রকম বিনয়াবনত ভংগিতে দাঁড়িয়ে থাকে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্মানে সাহাবীদের সেভাবে দাঁড়াতে নিষেধ করতেন।

১৬.    তিনি গরীব মিসকিনদের অসুস্থতার খোঁজ খবর নিতেন। গরীবদের সাথে ওঠাবসা করতেন। ক্রীতদাসদের দাওয়াত গ্রহণ করতেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সাধারণ মানুষের মতোই বসতেন।

১৭.    তিনি নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন। তিনি নিজ হাতে তেমনি কাজকর্ম করতেন যেমন তোমাদের কেউ ঘরের সাধারণ কাজকর্ম করে।

১৮.    নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম অংগীকার পালনে ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রণী, তিনি আত্মীয়স্বজনের প্রতি খুব বেশী খেয়াল রাখতেন।

১৯.    সবার চেয়ে বেশী সহৃদয়তা ও আন্তরিকতার সাথে নিজেকে উত্থাপন করতেন। বিনয়ী জীবন যাপনে এবং সৌজন্য শালীনতায় ছিলেন সবচেয়ে ভালো।

২০.    অস”রিত্রতা তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘৃণার বিষয় ছিলো, এ থেকে তিনি দূরে থাকতেন।

২১.     স্বভাবগতভাবে বা অনিচ্চাকৃতভাবেও তিনি কখনো অশালীন কথা বলতেন না। কাউকে কখনো অভিশাপ দিতেন না।

২২.     বাজারে উ” স্বরে চিল্লাচিল্লি করতেন না।

২৩.    মন্দের বদলা মন্দ দিয়ে দিতেন না; বরং তিনি মন্দের বিনিময়ে ক্ষমার রীতি অবলম্বন করতেন।

২৪.    কেউ তাঁর পেছনে আসতে শুষ্প করলে তাকে পেছনে ফেলে চলে আসতেন না। পানাহারে দাসীবাঁদীদের চেয়ে উচ্চমান অবলম্বন করতেন না।

২৫.    তিনি তাঁর খাদেমের কাজও করে দিতেন। কোনো কাজ করা না করা প্রসংগে কখনো খাদেমের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেননি।

তিনি গরীব মিসকিনদের ভালোবাসতেন। তাদের সাথে ওঠাবসা করতেন এবং জানাযায় হাযির হতেন। কোনো গরীবকে তার দারিদেন্দর কারণে তুচ্চতাচ্চিল্য করতেন না।

২৬.    রসূল (স.) গভীর চিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। সব সময় চিন্তা-ভাবনা করতেন। আরাম আয়েশের চিন্তা করতেন না। অপ্রয়োজনে কথা বলতেন না। দীর্ঘ সময় যাবত নীরব থাকতেন। কথার শুষ্প ও শেষ সুস্পষ্টভাবে উ”ারণ করতেন। অস্পষ্ট উ”ারণে কোনো কথা বলতেন না। অর্থবহ দ্ভ্যর্থহীন কথা বলতেন, সে কথায় কোন বাহুল্য থাকতো না। তিনি ছিলেন নরম মেযাজের অধিকারী।
২৭.    মামুলি নেয়ামত হলেও তার অমর্যাদা করতেন না। কোন কিছুর নিন্দা সমালোচনা করতেন না। পানাহার দন্দব্যের সমালোচনা করতেন না।
২৮.    . কারো থেকে সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী কোনো আচরণ প্রকাশিত হলে তার প্রতি তিনি বিরক্ত হতেন। সে লোকের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করা পর্যন্ত নিবৃত্ত হতেন না। তবে তাঁর মন ছিলো উদার। নিজের জন্যে কারো ওপর ক্রুদ্ধ হতেন না, কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না।
২৯.    কারো প্রতি ইশারা করতে হাতের পুরো তালু ব্যবহার করতেন। বিস্ময়ের সময় হাত ওঠাতেন। ক্রুদ্ধ হলে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, খুশী হলে দৃষ্টি নীচু করতেন। অধিকাংশ সময়েই তিনি মৃদু হাসতেন। মৃদু হাসির সময় দাঁতের কিয়দংশ মুক্তার মতো ঝকমক করতো।

৩০.    তিনি অর্থহীন কথা বলতেন না। সাথীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতেন, তাদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করতেন না। সকল সম্পন্দদায়ের সম্মানিত লোকদের সম্মান করতেন। সম্মানিত লোককেই নেতা নিযুক্ত করতেন।
৩১.    মানুষের অনিষ্ট, দুষ্কৃতি থেকে সাবধান থাকতেন এবং তাদের থেকে আ—গরক্ষার ব্যবস্থা অবলম্বন করতেন, কিন্তু এ জন্যে কারো থেকে মুখ গোমরা করে রাখতেন না।
৩২.    সাহাবীদের খবরাখবর নিতেন, তাদের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। ভালো বিষয়ের প্রশংসা এবং খারাপ বিষয়ের সমালোচনা করতেন।
৩৩.    ব বিষয়েই মধ্যপন্থা পছন্দ করতেন। কোনো বিষয়ে অমনোযোগী থাকা তাঁর অপছন্দ ছিলো। যে কোনো অবস্থার জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতেন।
৩৪.    সত্য ও ন্যায় থেকে দূরে থাকা পছন্দ করতেন না। অসত্য থেকে দূরে থাকতেন। তাঁর কাছে যারা থাকতেন, তারা ছিলেন সবচেয়ে ভালো মানুষ। তাদের মধ্যেও তারাই ছিলেন তাঁর কাছে অধিক ভালো, যারা ছিলেন কল্যাণকামী, পরোপকারী। তাঁর কাছে সে ব্যক্তির মর্যাদাই অধিক ছিলো, যে অন্যের দু:খে সমবেদনা সহমর্মিতা প্রকাশকারী এবং সাহায্যকারী হতো।
৩৫.    তিনি ওঠতে বসতে সর্বদাই আল্লাহকে স্মরণ করতেন।
৩৬.    তাঁর বসার জন্যে নির্ধারিত কোনো জায়গা ছিলো না। কোনো জনসমাবেশে গেলে যেখানে জায়গা খালি পেতেন সেখানেই বসতেন। অন্যদেরও এ রকম করার নির্দেশ দিতেন।
৩৭.    উপস্থিত সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতেন। কারো মনে একথা জাগত না, অমুককে আমার চেয়ে বেশী মর্যাদা দেয়া হড়ে– না।
৩৮.    কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে বসলে বা দাঁড়ালে সে লোকের প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতেন, যতোক্ষণ না সে ফিরে যেতো। এতে তার ধৈর্যের কোনো বিচ্যুতি দেখা যেত না। কেউ তাঁর কাছে কোন কিছু চাইলে তিনি অকাতরে দান করতেন। প্রার্থিত বস্তু প্রদান অথবা ভালো কথা বলে তাকে খুশী না করা পর্যন্ত বিদায় করতেন না।
৩৯.    তিনি নিজের উন্নত চরিত্র বৈশিষ্ট্যে এবং হাসিমুখ দ্ভারা সবাইকে সন্তুষ্ট করতেন। তিনি ছিলেন সকলের জন্যে পিতৃতুল্য। তাঁর দৃষ্টিতে সবাই ছিলো সমান। কারো শেন্দষ্ঠত্ব বা মর্যাদার আধিক্য নির্ণীত হলে সেটা তাকওয়ার ভিত্তিতেই হতো।
৪০.    তাঁর চেহারায় সবসময় স্মিতভাব বিরাজ করতো। তিনি ছিলেন নরম মেযাজের। ষ্পºতা ছিলো তাঁর স্বভাববিষ্পদ্ধ। তিনি বেশী জোরে কথা বলতেন না। অশালীন কোনো কথা তাঁর মুখে উ”ারিত হতো না। কারো প্রতি ষ্পষ্ট হলেও তাকে ধমক দিয়ে কথা বলতেন না।
৪১.    কারো প্রশংসা করার সময় অতি মাত্রায় প্রশংসা করতেন না। যে জিনিসের প্রতি আগ্রহী না হতেন, সেটা সহজেই ভুলে থাকতেন। কোনো ব্যাপারেই কেউ তাঁর কাছে হতাশ হতো না।
৪২.    তিনটি বিষয় থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত রাখতেন। তা হচ্ছে (১) অহংকার, (২) কোন জিনিসের বাহুল্য এবং (৩) অর্থহীন কথা। আর তিনটি বিষয় থেকে লোকদের নিরাপদ রাখতেন। সেগুলো (১) পরের নিন্দা, (২) কাউকে লজ্জা দেয়া এবং (৩) অন্যের দোষ প্রকাশ করা।
৪৩.    তিনি এমন কথাই শুধু মুখে আনতেন যে কথায় সওয়াব লাভের আশা থাকতো।
৪৪.    অপরিচিত লোক কথা বলায় অসংযমী হলে তিনি ধৈর্য হারাতেন না। তিনি বলতেন, কাউকে পরমুখাপেক্ষী দেখলে তার প্রয়োজন পূরণ করে দাও। ইহসানের বিনিময় ছাড়া কোনো ব্যাপারেই অন্যের প্রশংসা তাঁর পছন্দনীয় ছিলো না।

৪৫.    পোশাক পরিধানে তিনি ছিলেন শালীন। অধিকাংশ সময় নীরবতা পালন করতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। যে ব্যক্তি অপ্রাসংগিক অপ্রয়োজনীয় কথা বলতো, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। তিনি যখন হাসতেন, মৃদু হাসতেন, সুস্পষ্টভাবে কথা বলতেন, অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। সাহাবীরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সামনে উচ্চস্বরে হাসতেন না, সাহাবায়ে কেরাম তাঁর উপস্থিতিতে হাসি সংযত রাখতেন এবং মৃদু হাসতেন। (সংক্ষেপিতি)

সূূত্র: আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স প্রকাশিত ‘‘ তিনি চাঁদেও চেয়ে সুন্দর’’ বই থেকে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY