আল্লাহর ঘরের প্রথম তাওয়াফ

0
175

আল্লাহর ঘরের প্রথম তাওয়াফ
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

এহরাম বেঁধে মক্কায় আসার পর একজন হাজীর প্রথম কাজ হড়ে– যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করা। এই তাওয়াফ হজ্জের প্রকার ভেদে এক এক ব্যক্তির এক এক ধরনের গুরুত্বের অধিকারী। আমরা হজ্জের তামাত্তুর নিয়াত করেছিলাম, তাই নিয়ম অনুযায়ী আমাদেরকে প্রথম খানায়ে কাবায় তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সায়ী করার পর এহরাম খুলে ফেলার কথা।

২৭ শে জুন বুধবার দুপুরের দিকে আমরা প্রিয় নবীর শহর মক্কা শরীফে এসে হাযির হয়েছি। মোয়াল্লেম অফিসের ঝামেলা শেষ করে আমরা সেদিন ওমরা করার সিদ্ধান্ত করেছি। দুপুর বেলার প্রচন্ড রোদের সময় সামান্য বিশ্রাম করে আমরা খানায়ে কাবায় মাগরিবের জামাতে শামিল হতে পেরেছি। মাগরিবের নামায আমরা কাবার চত্বরের বাইরে পড়েছি বলে খানায়ে কাবা তখনো আমাদের দৃষ্টি সীমার ভেতরে পড়েনি। নামায শেষ করে ভেতরে যাবার জন্যে প্রচন্ড ভীড় অতিক্রম করে আমাদের এগুতে হয়েছে। কাবার চত্বরে ঢুকতেই প্রথম নযরে পড়লো পৃথিবীর সবচাইতে পুরনো, সম্মান ও গৌরবের অধিকারী বহু নবী-রসূলের স্মৃতি বিজড়িত ঘর ঐতিহাসিক খানায়ে কাবা। মোমেন হৃদয়ের দীর্ঘকালের সঞ্চিত কামনা বাসনা যে ঘর দেখার, যে ঘর তাওয়াফ করার জন্যে লাখ লাখ প্রেমিক হৃদয় হাজার হাজার মাইল দূর থেকে লাল্টায়ক লাল্টায়ক বলে পতংগের মতো ছুটে আসে আজ আমি সে ঘরের সামনে স্বশরীরে উপস্থিত। আল্লাহু আকবার বলে আল্লাহর ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। যতোই দেখি, তৃপ্তি যেনো মেটে না। মনের মাঝে জেগে ওঠে হাজারো ধরনের ঘটনা।

এই তো সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে নবী ইবরাহীম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাঈল (আ.) এই ঘর নির্মাণ করেছেন। এখানেই তিনি তার প্রিয় পুত্রকে রেখে গেছেন। পরবর্তী সময়ে এখানেই ঐতিহাসিক জমজম সৃষ্টি হয়েছে। মনে পড়লো, এই কাবার চত্বরেই প্রিয় নবীর দাদা আব্দুল মোত্তালেব কোরায়শদের সাথে কথা বলছিলেন এমন সময় তার কাছে খবর এলো, মা আমেনার কোলে শিশু মোহাম্মাদের জন্ম হয়েছে। আব্দুল মোত্তালেব এ স্থানে বসেই নবাগত শিশুর নাম রাখলেন। বললেন, তাই আমি এর নাম রাখলাম ‘‘মোহাম্মাদ’’ (প্রশংসিত)। এই কাবার চত্বরে দাদা আব্দুল মোত্তালেবের কোলেই দিনে দিনে বড়ো হলেন। এখানেই রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ‘‘হাজরে আসওয়াদ, যা সরাতে গিয়ে তিনি কোরাইশদের গোত্রীয় বিবাদ মিটিয়েছেন। এই সময় তারা তাকে নাম দিয়েছিলো ‘‘আল আমীন’’। পরবর্তী পর্যায়ে এখানে বসেই তিনি পৃথিবীর মানুষদের ন্যায় ও ইনসাফের ডাক দিয়েছিলেন। এখানেই মক্কার কাফের মোশরেকরা তাঁর ওপর, তাঁর সাথীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে। পৃথিবীর আদিকাল থেকে নবী-রসূলদের হাজারো কার্যকলাপের নীরব সাক্ষী হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর ঘর খানায়ে কাবা। পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কোটি কোটি মানুষ যে ঘরের দিকে তাকিয়ে নামাযের সাজদা করে, এই তো সেই ঘর। এখানেই আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি। বড়োই ভাগ্যবান মনে হলো আজ নিজেকে। পুনরায় আল্লাহর শোকর আদায় করলাম।

রাত ৮টার দিকে নিয়ম অনুযায়ী আমরা হাজরে আসওয়াদের পাশ থেকে তাওয়াফ শুরু করলাম। অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে কাবার চারদিকে ৭ বার ঘুরতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। হাজার হাজার লোক একত্রে এই ঘরের চারদিকে ঘুরছে। সৃষ্টির আদি থেকে এই যে তাওয়াফের নিয়ম চলছে, মুহূর্তের জন্যেও তার কোনো বিরতি নেই। বলা হয় যে, হযরত ইবরাহীম (আ.) যখন দুনিয়ার মানুষদের ডেকে বললেন তোমরা যে যেখানে আছো, এসো এই পুণ্যময় ঘরের তাওয়াফ করো। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত একটি মুহূর্তের জন্যেও এই তাওয়াফে কোনো বিরতি ঘটেনি। রাতে দিনে, সকালে দুপুরে, সব সময়ই এখানে দেখা যায় হাজার হাজার লোক তাওয়াফ করছেই। একমাত্র এই ঘরের মালিক আল্লাহই জানেন সর্বক্ষণ কোথা থেকে এসব মানুষ এসে ভীড় করে। তাওয়াফ শেষ করার পর মাকাকে ইবরাহীমের পাশে (যেখানে আজো হযরত ইবরাহীমের পদযুগলের চিহ্ন অবিকল অবস্থায় মজুদ রয়েছে) দ্রুাকাত নামায আদায় করে ক্লান্তি দূর করার জন্যে জমজমের পানি পান করলাম।

হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত এই সেই জমজম। এ যেনো এক জীবন্ত অলৌকিক ব্যাপার! ৪ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালন পানি এ কূপ থেকে উঠাচ্ছে, এতেও এর পানি একটুও কমছে না। কোথা থেকে এ পানি আসছে, কেউ বলতে পারে না। এ পানির স্বাদ দুনিয়ার অন্য সব পানির চাইতে আলাদা। দুনিয়ার অন্যসব পানির ন্যায় এটা শুধু দ্রুততার সাথে পিপাসাই মেটায় না এটা মানুষের আহারও বটে মহানবীর ভাষায় এই পানি শুধু ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটায় না, রোগ নিবারণও করে। আমরা একেকবারে যখন একাধারে ১৮-১৯ ঘন্টা খানায়ে কাবার চত্বরে কাটিয়েছি, তখন এই পানিই ছিলো আমাদের একমাত্র আহার। বাস্তব অভিজ্ঞতা না হলে রসূলের এই বাণীর সত্যতা আমরা কিছুতেই উপলব্ধি করতে পারতাম না।

গ্রন্থ: লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক, আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY