জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ

Hajj

0
439

জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ
মাওলানা জাফর আহমাদ

মিনার তিনটি জায়গায় শয়তানকে পাথর মারতে হয়। যাকে রমি বলা হয়। রমির শাব্দিক অর্থ কঙ্কর নিক্ষেপ করা। তিনটি জামরা রয়েছে। এটি হজের দ্বিতীয় ওয়াজিব। মসজিদে খায়েফের দিক থেকে মক্কার দিকে আসার সময় প্রথমে ছোটো জামরা পড়ে। ছোটো শয়তান এবং জামরা আকাবার মাঝে জামরা ওস্তা বা মধ্যম জামরা অবস্থিত। এরপরই হচ্ছে জামরা আকাবা। জামরা আকাবা অন্য দুটি জামরার তুলনায় মক্কার বেশী নিকটবর্তী। মিনায় অবস্থানের সময় ওই সব জামরায় সাতটি করে পাথর নক্ষেপ করতে হয়।
রসূল (স.) বলেছেন, জামরায় পাথর নিক্ষেপেরে মাধ্যমে বান্দাহ আলাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তার আনুগত্য করলে শয়তান ব্যথিত হয়। মক্কা শরীফের ইতিকথায় বলা হয়েছে যে, মুসিরুল গারামে ইবনে জাওজি থেকে বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইবরাহীম (আ.) কাবা নির্মাণ শেষ করেন তখন জিবরাঈল (আ.) এবে তাকে তওয়াফের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। তারপর তাকে জামরাতুল আকাবায় নিয়ে আসেন। তখন শয়তান হাজির হয়। জিবরাঈল (আ.) সাতটি পাথরের টুকরা হাতে নেন। জিবরাঈল ইবরাহীম (আ.)-কে তাকবীরসহ পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। অতপর তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাথর মারে এবং তাকবরি বলেন।

তারপর তারা মেঝো জামরাহর কাছে আসেন। সেখানেও শয়তান হাজির হয়। তারা দুজন জামরা আকাবার অনুরুপ করেন। তারপর ছোটো জামরাহর কাছে এলে সেখানেও শয়তান হাজির হয়। ফলে তারা দুজনেই শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তাকবির বলেন।

কার প্রতি এই কঙ্কর বা পাথর নিক্ষেপ করা হয়? কেন এবং কী উদ্দ্যেশ্যে এমনটি করা হয়? পাথর নিক্ষেপে আমাদের মাঝে কি কোনো চেতনাবোধ সৃষ্টি হয়? এর ইতিবাচক কোনো প্রভাব কি আমাদের চরিত্রকে আন্দোলিত করে?
জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে মূলত আমরা আমাদের চিরশত্রু শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে থাকি। যেই শয়তান আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব স্তরে তাগুদ সেজে জবরদখল করে আছে। যেই শয়তান প্রতিনিয়ত আমাদের মহাকল্যাণের পথ থেকে সরিয়ে অকল্যাণের পথে ধাবিত করছে। আমরা তার তৈরী কৃত্রিম রঙ্গিন পৃথিবীর ঘূর্ণাবর্তের ধাঁধায় পড়ে হকের পথ থেকে সিটকে পড়েছি। কতো মানুষ যে তার অসংখ্য তাবেদারদের মাধ্যমে বিপদের গর্তে নিমজ্জিত হচ্ছে তার কি কোনো হিসাব আছে?

আমরা প্রতি বছর জামরায় এই সেই শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে আমাদের প্রকৃত চেতনাবোধকে কি জাগ্রত করতে পেরেছি? একবারের জন্যে কি আমাদের মনের মধ্যে এ চিন্তা নিয়ে এসেছি যে, হে শয়তান! তুই আমাদের বহু ক্ষতি করেছিস, আজ পাথর মেরে তোকে আমার সব কর্মকা- থেকে বিদায় করলাম। মানব জীবনের যেখানে যেখানে তুই কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি হিসেবে বসে আছিস, সেখান থেকেও তোকে পাথর মেরে মেরে সরিয়ে দিলাম। আজ থেকে ওই সব জায়গায় তোর আর কোনো স্থান নেই। অথবা এ পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে আজ থেকে এই শপথ নিলাম যে, মৃত্যু অবধি তোর বিরুদ্ধে চির সংগ্রাম বা অনবরত আন্দোলন চলবে।

সালেম বিন আবু জাদ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূল (স.) বলেন, যখন ইবরাহীম (আ.) হজ্জের হুকুম পালন করতে আসেন তখন জামরাহ আকাবার কাছে শয়তানে এসে হাজির হয়। তিনি তার প্রতি সাতটি পাথরখ- নিক্ষেপ করায় সে মাটিতে কুপোকাত হয়ে পড়ে। তারপর মেঝো জামরায় হাজির হলে সেখানেও তাকে পাথর মেরে চিতপটাং করে দেন। অনুরুপভাবে ছোটো জামরায় পুনরায় শয়তান আবির্ভূত হলে সেখানেও শয়তানকে পাথর মেরে কাবু করেন এবং ধরাশায়ী করে ফেলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, শয়তানকে পাথর মেরে মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করো। (বায়হাকী)
শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে মূলত আল্লাহর গোলামীর বহিপ্রকাশ ঘটে। প্রতারণার মাধ্যমে শয়তান আল্লাহর বান্দার তথা মানুষের যেই জায়গাগুলো জবরদখল করেছিলো, সেই জায়গাগুলোর মূল মালিক তো মহান আল্লাহ তায়ালা। বান্দাহর যখন উপলব্ধি হলো যে, প্রকৃত মালিকের গোলামী করার পরিবর্তে সে তো শয়তানের গোলামী করছে। সেই উপলব্ধির কারণে সে পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে সেসব জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর প্রভূত্ব, আল্লাহর গোলামী ও আল্লাহর আনুগত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। পাথর নিক্ষেপের এটিই মূল শিক্ষা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, হজ মৌসুমে এই উপলব্ধি কিঞ্চিত জেগে উঠলেও পরবর্তীকালে তা আর পরিলক্ষিত হয় না। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মুসলিম প্রতিনিধি আল্লাহর সম্মানিত মেহমান হিসেবে বিশ^ মুসলিমের এ সম্মেলন কেন্দ্রে এসে হাজির হন।
লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো, এখান থেকে তাগুত ও শয়তান উৎখাতের বিশেষ দীক্ষা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় এসে সর্বক্ষেত্রে শয়তানকে উচ্ছেদের সংগ্রাম চালাবে। কিন্তু কই? কোথাও তো পরিলক্ষিত হয় না। হজের আগে যেখানটায় ছিলো, সেখানটায় অনেককে ফিরে যেতেই দেখেছি। বরং ব্যক্তিবিশেষকে দেখা যায় যে, জেনে হোক বা না জেনে হোক তার মধ্যে তাগুত বা শয়তানকে আরো অধিক হারে সাহায্য সহযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ব্যক্তিরা জামরায় পাথর নিক্ষেপের চেতনার অনুধাবন করতে পারেননি। সার্বিকভাবে তারা হজ্জেরও মূল শিক্ষা আত্মস্থ করতে পারেননি। হজকে তিনি সাধারণ ও মামুলি একটি ইবাদাত মনে করেছেন। হজ্জ গতানুগতিক কোনো ইবাদাত  নয়; বরং এটি একটি ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ইবাদাত । হজ্জের প্রতিটি হুকুম আহকামের সাথে এক একটি গৌরবময় ইতিহাস সম্পৃক্ত। তাই ঐতিহাসিক চেতনাকে সামনে নিয়ে তা পালন করতে হবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY