মাসজিদে হারামে অবাধ যাতায়াত ও সেখানে অবস্থান

hajj হজ্জ

0
128

মাসজিদে হারামে অবাধ যাতায়াত ও সেখানে অবস্থান

তাফসীর ফি যিলালি কোরআন থেকে

‘‘যারা কুফরী করে এবং আল্লাহর পথ থেকে ও সেই মাসজিদুল হারাম থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করে যাকে আমি সকল মানুষের জন্যে তৈরী করেছি এবং যার ভেতরে স্থানীয় ও প্রবাসী সমান যারা সেখানে ……….. তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তির স্বাদ ভোগ করাবো।্ (আয়াত ২৫)
এটা ছিলো কোরায়শ বংশীয় পৌত্তলিকদের কাজ যে, মানুষকে আল্লাহর দ্বীন থেকে ফেরাতো। অথচ এটাই আল্লাহকে পাওয়ার এক মাত্র পথ এবং মানব জাতির জন্যে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র বিধান। তারা মুসলমানদেরকে হজ্জ ও ওমরা করতে মাসজিদুল হারামে যেতে দিতো না, যেমন হোদায়বিয়ার বছর দেয়নি। অথচ এই মাসজিদুল হারামকে আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষের জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তার স্থান বানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মক্কার স্থানীয় অধিবাসী ও বিদেশী মুসলমানদের অধিকার সমান। সুতরাং ক্বাা শরীফ হচ্ছে আল্লাহর সেই ঘর, যেখানে আল্লাহর বান্দারা সবাই সমান। কেউ তার মালিক হবে না, কেউ কোনো বৈষম্যের শিকার হবে না।
মানব জাতি নিরাপত্তার নির্দিষ্ট এলাকা গড়ার যতো চেষ্টা চালিয়েছে, তন্মধ্যে ক্বাা শরীফকে সকলের নিরাপত্তার এলাকা রুপে নির্দিষ্ট করার ঘোষণা ছিলো সর্ব প্রথম ও সবার আগের পদক্ষেপ। এখানে অস্ত্র ফেলে দেয়া হয়, বিবদমান লোকেরা নিরাপদে পাশাপাশি অবস্থান করে। এখানে রক্তপাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সকলের জন্যে এটা আশ্রয় স্থল। এটা কারো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নয়, বরং সমানাধিকারের ভিত্তিতে স্থিরীকৃত।
মক্কার যে সব বাড়ী ঘরে মক্কার লোক বাস করে না, সেগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পর্কে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ ঘটেছে। অনুরুপভাবে যারা এগুলোর মালিকানা বৈধ মনে করেন, এ সব ঘর ভাড়া দেয়ার ব্যাপারেও তাদের মতান্তর রয়েছে। ইমাম শাফেয়ীর মতে, এসব ঘরের ব্যক্তিগত মালিকানা বৈধ। ভাড়া দেয়া বৈধ এবং উত্তরাধির সূত্রে হস্তান্তরও বৈধ। তার দলীল হলো, হযরত ওমর (রা.) হযরত সাফওয়ান বিন উমাইয়ার কাছ থেকে চার হাজার দিরহাম দিয়ে মক্কার একটা বাড়ী ক্রয় করেন এবং তাকে কারাগারে রুপান্তরিত করেন। ইসহাক বিন রহিওয়ের মতে ভাড়া দেয়া ও উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তর জায়েয নয়। তিনি বলেন, রসূল (স.) আবু বকর ওমর (রা.) যখন ইন্তিকাল করেন, তখন মক্কার ভূমি ও গৃহগুলো উন্মুক্ত স্থান বলে বিবেচিত হতো। যার প্রয়োজন হতো, এগুলোতে বাস করতো। আর যার প্রয়োজন হতো না সে অন্যকে থাকতে দিতো। আব্দুর রাযযাক আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেন যে, মক্কার বাড়ী ঘর কেনা-বেচা ও ভাড়া দেয়া বৈধ নয়। তিনি ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেন যে, হারাম শরীফে কোনো ভাড়া দেয়া নেয়া চলে না। ওমর ইবনে খাত্তার (রা.) মক্কার ঘরগুলোতে দরজা বানাতে নিষেধ করতেন, যাতে হাজীরা তার ভেতরে হজ্জের সময় বসবাস করতে পারে। সর্ব প্রথম সোহায়েল বিন আমর দরজা বানালে হযরত ওমর আপত্তি জানান। সোহায়েল বলেন, হে আমীরুল মোমেনীন, আমাকে অনুমতি দিন। আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি চাই, আমার ঘোড়াগুলো যেন ভেতরে থাকতে পারে। তখন হযরত ওমর (রা.) অনুমতি দিলেন। হযরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, হে মক্কাবাসী, তোমরা তোমাদের বাড়ীতে দরজা বানিও না যাতে বহিরাগতরা যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারে। ইমাম আহমাদ বলেছেন, মালিকানা ও উত্তরাধিকার বৈধ, কিন্তু ভাড়া দেয়া বৈধ নয়।
মোটকথা, একটা শান্তি ও নিরাপত্তার উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত স্থান সৃষ্টিতে ইসলাম সবাইকে হার মানিয়েছে এবং তা বহু আগেই দেয়া হয়েছে। যারা এ ব্যাপারে কোনো বক্রতা সৃষ্টির চেষ্টা করে, কোরআন তাদেরকে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছে।
‘‘ যে ব্যক্তি এতে কোনো যুলুম করতে ইচ্ছা করবে, তাকে কঠিন শাস্তির স্বাদ ভোগ করাবো।’’
শুধু অন্যায়ের ইচ্ছা করলেই যেখানে এই হুমকি, সেখানে কেউ যদি অন্যায় করেই বসে, তবে তার কী পরিণাম হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কেবল ইচ্ছাতেই হুমকি দান এমন এক সূক্ষ্ম বাচন ভংগী যে, দ্বারা অধিকতর সতর্কীকরণ করা হয়েছে ও শান্তি ভংগের চেষ্টার বিষ্পদ্ধে তীবন্দতর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে।
আরো একটা সূক্ষ্ম ও তাৎপর্যময় বাচনভংগি এ আয়াতে লক্ষণীয়। সেটা এই যে, এতে উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু বিধেয় উহ্য রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে,
‘‘যারা কুফরী করে এবং আল্লাহর পথ থেকে ও সেই মাসজিদুল হারাম থেকে মানুষকে নিবৃত করে, যাকে আমি সকল মানুষের কল্যাণের জন্যে তৈরী করেছি, যেখানে স্থানীয় ও বহিরাগত সবাই সমান. . .।
যারা এই অপকর্ম করে তাদের কী পরিণাম হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। যেন তাদের এই অপকর্মের বিবরণ দেয়াই যথেষ্ট। এরপর তাদের সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন থাকে না। এই অপকর্মই যেন তাদের পরিণাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

মূল : সাইয়েদ কুতুব শহীদ

অনুবাদ সম্পাদনা: হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY