হজ্জের কিছু বিধিবিধান ও তার তাৎপর্য

0
199

হজ্জের কিছু বিধিবিধান ও তার তাৎপর্য
তাফসীর ফি যিলালি কোরআন থেকে

এখানে সংশ্লিষ্ট আয়াতস্পলোতে হজ্জের কিছু কিছু নিয়ম-বিধি ও তার উদ্দেশ্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে,
‘‘তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত কিছু পশু কোরবানী করবে।্ ………. এটা কোরবানীর ঈদের দিনে ও তার পরবর্তী তাশরীকের তিন দিনের পশু কোরবানীর দিকে ইংগিত। কোরআন পশু কোরবানীর সাথে আল্লাহর নাম উ”ারণের বিষয়টা প্রথমে উল্লেখ করেছে। কারণ পরিবেশ ও পটভূমিটা হচ্ছে এবাদাতের এবং মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভ। তাই কোরবানীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো যবাই করার সময় আল্লাহর নাম উ”ারণ, যেন এটাই কোরবানীর আসল উদ্দেশ্য, শুধু যবাই করা ও গোশত খাওয়া নয়।
কোরবানী যদিও একটা গুরুত্বপূর্ণ সদকা এবং ফকীর মেসকীনকে খাওয়ানোর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। তথাপি এটা হযরত ইসমাঈলের পরিবর্তে পশু কোরবানীর স্মৃতি, আল্লাহর একটা নিদর্শনের স্মৃতি এবং আল্লাহর দুই বান্দা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাঈলের আনুগত্যের স্মৃতিও বটে।
আয়াতে ‘‘বাহীমাতুল আনয়াম’’ অর্থাৎ চতুস্পদ জন্তুর উল্লেখ রয়েছে তা দ্ভারা উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া বুঝানো হয়েছে।
‘‘অতপর, তোমরা তা থেকে নিজেরাও খাও এবং বিপন্ন অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও।’’
‘‘কোরবানীর গোশত নিজেরাও খাও্ এই নির্দেশ দানের অর্থ হলো, কোরবানী দাতার পক্ষে সে গোশত খাওয়া হালাল, বৈধ ও উত্তম। এ আদেশের উদ্দেশ্য সম্ভবত এই যে, দরিদ্র মেসকীনরা যেন মনে করে, সে গোশত ভালো। আর দরিদ্রদেরকে খাওয়ানের নির্দেশের অর্থ হলো, তাদেরকে খাওয়ানো অবশ্য কর্তব্য ও ওয়াজেব।
হজ্জের সময় কোরবানীর মাধ্যমে এহরামের সমাপ্তি ঘটে। এরপর হাজীরা চুল কামাতে বা ছাঁটতে পারেন, বোগলের পশম কামাতে পারেন, নখ কাটতে পারেন ও গোসল করতে পারেন, যা এহরামের সময় তার জন্যে হারাম ছিলো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
‘‘তারপর তারা যেন দূর করে ফেলে নিজেদের শরীরের অপরিড়–ন্নতা এবং নিজেদের মান্নত যেন পূর্ণ করে।’’
অর্থাৎ হজ্জের অপরিহার্য অংগ যে কোরবানী, তার অতিরিক্ত কোনো মান্নত যদি করে থাকে, তা যেন পূর্ণ করে’’
‘‘এবং তারা সুরক্ষিত ঘরটির তওয়াফ করে।’’
এটাকে ‘‘তওয়াফে এফাযা’’ বলা হয়, যা আরাফার ময়দানে অবস্থানের পরেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর দ্বারাই হজ্জের এবাদাতটি সমাপ্ত হয় ‘‘তওয়াফে এফাযা’’  ‘‘তওয়াফে বিদা’’ বা বিদায়ী তওয়াফ থেকে ভিন্ন।
‘‘আল বাইতুল আতীক’’ বা সুরক্ষিত গৃহ বলতে মাসজিদুল হারামকে বুঝানো হয়েছে। এ ঘরকে আল্লাহ তায়ালা যে কোনো আগ্রাসী শক্তির দখল থেকে চিরদিন মুক্ত রেখেছেন। অনু™£পভাবে আল্লাহ তায়ালা এ ঘরকে ধ্বংস হওয়া থেকেও রক্ষা করেছেন। তাই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সময় থেকেই মাঝে মাঝে এ ঘরের সংস্কার হয়ে এসেছে।
এতো গেলো আল্লাহর ঘরের নির্মাণের কাহিনী ও তার ভিত্তি বিষয়ক বক্তব্য, আল্লাহ তায়ালা তার বন্ধু ইবরাহীম (আ.)-কে আদেশ দিয়েছিলেন এ ঘরকে তাওহীদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে শেরক থেকে পবিত্র করতে, এই ঘরে হজ্জ করার জন্যে মানুষকে আল্ডান জানাতে, এখানে হজ্জের সময় আল্লাহর নামে পশু কোরবানী করতেÑ তথাকথিত দেব-দেবীর নামে নয় এবং সেই পশুর গোশত খেতে ও খাওয়াতে। এই সম্মানিত ও পবিত্র গৃহে আল্লাহর যাবতীয় পবিত্র বিধি-বিধান সুরক্ষিতÑ তন্মধ্যে সর্বপ্রথম বিধানটা হলো তাওহীদ এবং এর দরজা একমাত্র ইসলামী পন্থায় তওয়াফকারী ও নামায আদায়কারীদের জন্যে উন্মুক্ত। এ ছাড়া এ ঘরের চতুর্সীমায় রক্তের পবিত্রতা, ওয়াদা ও অংগীকারের অলংঘনীয়তা এবং শান্তি ও সন্ধির অলংঘনীয়তা সুরক্ষিত। (আয়াত ৩০-৩১)
বস্তুত আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসগুলোর সম্মান করার অর্থ এই যে, তার নিষিদ্ধতা লংঘন করা যাবে না। এটা আল্লাহর কাছে উত্তম কাজ। এটা সাধারণ বিবেক ও অনুভূতির কাছে এবং বাস্তবতার দৃষ্টিতেও উত্তম। যে মানুষের বিবেকনিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে এড়িয়ে চলে, সে পবিত্রতাকামী বিবেকবান মানুষ। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসকে মেনে চলে তাকেই মানব সমাজ নিরাপদ, ঝুঁকিহীন, ও অনাগ্রাসী ব্যক্তি মনে করে। এ ধরনের লোকেরা যেখানে কতৃত্ব চালায় সেটা হয়ে থাকে শান্তি, নিরাপত্তাপূর্ণ স্থান।
আরবের মোশরেকরা নিজেদের মনগড়া কিছু জিনিসকে নিষিদ্ধ ও পবিত্র ঘোষণা করেছিলো। অথচ সেগুলো আল্লাহ তায়ালা কতৃক নিষিদ্ধ ছিলো না। পক্ষান্তরে আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসগুলোকে তারা অকাতরে লংঘন করতো। কোরআন আল্লাহর নিষিদ্ধ করা প্রাণী ছাড়া অন্যসব পশুকে হালাল ঘোষণা করেছেÑ যেমন মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের গোশত এবং হালাল করা হয়েছে কেবল যেস্পলোর কথা তোমাদেরকে জানানো হয় তা ছাড়া।্ এর উষ্কেশ্য এই যে, আল্লাহর নিষিদ্ধ করা জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যেন নিষিদ্ধ না থাকে, কেউ যেন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কোনো আইন রচনা না করতে পারে এবং আল্লাহর বিধান ছাড়া শাসন না চালাতে পারে।
চতুস্পদ জন্তুর হালাল হওয়ার প্রসংগে পৌত্তলিকতা পরিহার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মোশরেকরা বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে পশু যবাই করতো। অথচ এসব দেব-দেবী হচ্ছে ‘‘রিজৎস’’ বা অপবিত্রতা। এখানে ‘‘অপবিত্রত্ াদ্বারা মনের অপবিত্রতা বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর সাথে শেরক করা এমন এক অপবিত্রতা ও নোংরামি, যা বিবেক ও মনকে নোংরা ও কলুষিত করে, যেমন কোনো নাপাক জিনিস শরীর ও পোশাককে অপবিত্র করে।
আর যেহেতু শেরক আল্লাহর প্রতি এক ধরনের অপবাদ আরোপ ও মিথ্যাচারের নামান্তর, তাই আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের মিথ্যাচার পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
‘‘অতএব তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা পরিহার করো এবং মিথ্যাচার পরিহার করো।’’
কোরআন ও হাদীসে মিথ্যাচারকে পৌত্তলিকতার পর্যায়ভুক্ত করে এর জঘন্যতাকে পরিস্ফূট করা হয়েছে। ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন যে, রসূল (স.) একবার ফজরের নামাযের পর দাঁড়িয়ে বলেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দান আল্লাহর সাথে শরীক করার সমপর্যায়ের অপরাধ। ’’  অতপর তিনি আলোচ্য আয়াত পাঠ করেন।
আসলে আল্লাহ তায়ালা চান মানুষ সব ধরনের শেরক এবং সব ধরনের মিথ্যাচারকে পরিহার করুক এবং পরিপূর্ণ ও নির্ভেজাল তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হোক। ‘‘যারা আল্লাহর প্রতি একাগ্র চিত্ত, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে না।’’  (আয়াত ৩১)
৩১ নং আয়াতের পরবর্তী অংশে সেই ব্যক্তির ভয়াবহ পরিণতির চিত্র অংকন করা হয়েছে যে তাওহীদের শীর্ষস্থান থেকে পা পিছলে শেরকের গভীর খাদে পতিত হয়েছে। ফলে সে এমনভাবে Ÿংস ও নিশ্চিহ্ন হয়েছে যেন ধরাপৃষ্ঠে তার অস্তিত্ব কখনো ছিলো না।
‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়লো, অতপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো অথবা বাতাস তাকে কোনো দূরবর্তী স্থানে ফেলে দিলো।’’
এখানে উ” স্থান থেকে নীচে পতিত মানুষের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘‘সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়লো। আর এক নিমিষেই সে যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। এজন্যেই পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে,ফলে পাখিরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো।্ অথবা ‘‘বাতাস তাকে উড়িয়ে দৃষ্টির আড়ালে দূরে কোথাও নিয়ে ফেলে দিলো। ’’  অর্থাৎ তার কোনো স্থীতি নেই।
এখানে ‘‘ফা’’ অব্যয়টি বারবার ব্যবহার করে শব্দের মধ্যে দ্রুততা ও প্রচন্ডতা আর দৃশ্যের ভেতরে দ্রুততা উধাও হয়ে যাওয়ার ভাবটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটা কোরআনের শৈল্পিক বাচনভংগির অন্তর্ভুক্ত, যাতে সংশ্লিষ্ট দৃশ্যের ছবি ভাষার মাধ্যমে চিত্রিত করা হয়।
এটা আসলে আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্তকারীদের নিখুঁত চিত্র। তারা ঈমানের সুউচ্চ অবস্থান থেকে Ÿংসের অতল গল্ডরে নিক্ষিপ্ত হয়। কেননা তাওহীদের যে ভিত্তির ওপর মানুষ পরম নিশ্চিন্তে অবস্থান করতে পারে এবং যাকে নিরাপদ আশন্দয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, একজন মোশরেক তা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে তার অসংযত কামনা বাসনাগুলো তাকে শিকারী পাখীর মতো ছোঁ মেরে নিয়ে যায় ও কুরে কুরে খায় এবং নানারকমের ভিত্তিহীন কল্পনা তাকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ায়। অথচ সে কোনো অটুট বন্ধনের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখে না যা তাকে তার আবাসস্থল এই পৃথিবীর সাথে বেঁধে রাখে।
মূল: তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন
বাংলা অনুবাদ: আল কোরআন একাডেমী পাবলিকেশন্স।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY