কোরআনের জন্য নিবেদন

0
168

কোরআনের জন্য নিবেদন
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের ১২ কোটি শিক্ষিত মানুষের কাছে অনুবাদসহ বিনামূল্যে কোরআন শরীফ বিতরণের একটি দু”সাহসিক পরিকল্পনা । ২০ রমযানুল মোবারক (২০০৮) জুমাবারে প্যান প্যাসিফি হোটেল সোনারগাঁও-এ অনুষ্ঠিত  মতবিনিময় সন্ধ্যা ও ইফতার মাহফিলে আল কোরআন একাডেমী ণরএনর এর চেয়ারম্যান এর বক্তব্যের নিবান্ধত ষ্পপ।

যেদিন আমরা প্রথম কোরআনের বর্ণমালা হাতে নিয়েছি সেদিনের অনুভূতি কি আমাদের কারো মনে আছে? শিশুর কোরআনের বর্ণমালা হাতে নেয়ার দিনটি ছিলো পরিবারে খুশীর দিন। নতুন জামা পরে মিষ্টি মুখ করে সন্তানের মুখে একে একে আল্লাহর কিতাবের অক্ষরগুলো তুলে দিতেন হাফেজ সাহেব। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করা হতো। শিক্ষককে নতুন জামা কাপড় দেয়ার সাথে সন্তানের পিতা মাতারা আরো কতো কি উপহার দিতেন!

কিন্তু আজ দিন বদলে গেছে, কোরআনের বদলে শিশুর হাতে আমরা তবল্ াতুলে দিয়েছি। কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াতের বদলে তার কণ্ঠে আমরা ‘‘সারে গামা’’ ঠেসে দিয়েছি। এভাবেই সবার অজান্তে শৈশবেই সন্তানের জীবনে কোরআন উড়ে–দের একটা প্রক্রিয়া শুষ্প হয়ে গেলো এবং তা অব্যাহত থাকলো তার মৃত্যু পর্যন্ত। তার ন্ডুল কলেজ, তার শিক্ষা সং¯কৃতি, তার রাজনীতি অর্থনীতিÑ সবখানেই নির্মমভাবে কোরআন তার কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেলো। পরপর দুটো স্বাধীনতার সুদীর্ঘ ৬২ বছরের এই ক্রমাগত উপেক্ষার পর আবার আমরা কোরআন নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাই। কোরআনের বাহকরা কিভাবে কোরআন নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় সেকথাটাই আজ আমি আপনাদের বলবো।

আল কোরআন একাডেমী লন্ডন এ জাতিকে কিভাবে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের ২০০ বছর পূর্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে সে কথা তো মোটামুটি সবারই জানা আছে। ১৮০৮ সালে বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদ শুষ্প এ কথাটা সময়মতো আল্লাহ তায়ালা আমাদের যদি স্মরণ করিয়ে না দিতেন, তাহলে এ দিনটির জন্যে আমাদের আরো ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হতো। আজ বাংলা ভাষায় কোরআন অনুবাদের কথা বলতে গিয়েÑ যাদের জন্যে গত ২০০ বছরে বাংলা ভাষায় কোরআনের কয়েক শ্ অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে সে ২৫ কোটী মানুষের শতকরা কতোজন লোকের হাতে এই অনুবাদ পৌঁছানো হয়েছে সেটাও আমরা বারবার অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি।

অনুসন্ধান জরিপের ফলাফল অনুযায়ী দেখা গেছে, বাংলাদেশের জন্মলাভের পর গত ৩৮ বছরে এখনো ১ কোটী মানুষের হাতে বাংলা অনুবাদসহ কোরআন পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই হতাশাব্যাঞ্চক পরিসংখ্যানই আমাদের মনে পুনরায় কোরআন নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা যুগিয়েছে। ধীরে ধীরে এই বিতরণ  প্রক্রিয়াটাই একটি মহা পরিকল্পনা রুপ ধারণ করেছে। সে মহা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে এ যমীনে আগামীকাল কোরআনের যে প্রাসাদ নির্মিত হতে যাচ্ছে, আপনারাই হচ্ছেন সেই প্রাসাদের এক একজন স্থপতি।

আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত দয়া ও অনুগ্রহে শুরুতেই অনুবাদসহ আমরা ৭৫ হাজারের মতো কোরআন বিতরণ করেছি।  আমি জানি, প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের আয়োজন মোটেই পর্যাপ্ত ছিলো না। তারপরও এ ভূখন্ডে বিনামূল্যে কোরআন বিতরণের কর্মসূচীর সূচনাপর্বে আল্লাহ তায়ালা যে আমাদের মতো কতিপয় স্পনাহগার ব্রাার নাম শামিল করেছেন সেটাই আমাদের সবচাইতে বড়ো পাওনা। কেয়ামতের মহাবিচারের দিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের নামগুলোকে বাংলা ভাষায় কোরআন বিতরণ কর্মসূচীর এক একজন ‘‘আস সাবেকূনাল আউয়ালূন’’ তথা প্রথমদিকের কর্মী হিসেবে কবুল করুন।

রমযানুল মোবারকের যে তারিখে কোরআন নাযিল হয়েছিলো ঠিক সে বরকতময় সন্ধ্যায় এই হোটেলের এই কক্ষেই আমরা সবাই ইফতারের আয়োজনে সমবেত হয়েছিলাম। সে মোবারক সন্ধ্যায় আল কোরআন একাডেমী লন্ডন-এর পক্ষ থেকে আমরা আপনাদের সামনে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বিশে^র বাংলাভাষী অঞ্চলের প্রতিটি শিক্ষিত নর নারীর হাতে বাংলা অনুবাদসহ কোরআন পৌঁছানোর একটি দু”সাহসিক পরিকল্পনার কথা বলেছিলাম। আজ সে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কিছু ধাপ নিয়ে আমি আপনাদের সাথে কিছু পরামর্শ করতে চাই। কারণ এই মহাপরিকল্পনার কখনো এক ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আমাদের হাতে শতাধিক চ্যারিটি অর্গানাইজেশানের শত কোটি ডলারের কোনো তহবিল নেই, গরীব দু:খী মানুষদের ধর্মান্তরিত করার কাজে যারা মদদ যোগায় তাদের

আমাদের কাছে শত শত কোটি টাকার অনুদান নেই, নেই কোনো একটি মুসলিম জনপদের রাষ্ট›্রীয় আনুকল্য। হাঁ, যদি এই ৩টি বিষয়ের ১টিও আজ আমাদের নাগালের মধ্যে থাকতো, তাহলে আমরা বৃহদাকারের ছাপাখানা বসিয়ে মাত্র ২/৩ বছর সময়ের ভেতরই ১৩ কোটি আদম সন্তানের হাতে অনুবাদসহ হেদায়াতের এই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি তুলে দিতে পারতাম। তাই নিজেদের সীমাবদ্ধ মেধা ও অর্থের যোগানের ওপর দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। আমাদের আয়োজন সীমাবদ্ধ হলেও কোরআনের মালিক আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ তো সীমাবদ্ধ নয়।

আমরা আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার সে অসীম দয়া ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করেই আমাদের ”ি¢তীয় ধাপের বিতরণ কর্মসূচী আপনাদের কাছে পেশ করছি। দেশের লক্ষ লক্ষ মাদরাসা মক্তব, ন্ডুল কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে যে ২ কোটির মতো ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে তাদের নিয়ে আমি জানি আপনাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অনেক।

দেশের শিক্ষা সংন্ডৃতির পরিমন্ডল যে হারে দিনে দিনে কোরআন বিমূখ হয়ে পড়েছে তাতে আমাদের ভাবী প্রজন্ম কতোটুকু কোরআনের ছায়াতলে জীবন কাটাতে পারবে তার নানা আলামত ইতিমধ্যেই সুধীজনদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে।

এ ২ কোটি ছাত্রছাত্রীর মাঝে প্রথম ধাপে আমরা মাত্র ৭৫ হাজার ছাত্রছাত্রীকে বেছে নিয়েছি, এরা হচ্ছে আমাদের সমাজের সর্বাধিক মেধাবী ও প্রতিভাবান ন্ডুল মাদ্রাসার জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রী। আগামী ২৫ বছর ধরে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হাতে যদি আমরা এভাবে অনুবাদসহ এক কপি কোরআন মাজীদ পৌঁছে দিতে পারি তাহলে এই গ্রন্থ তাদের দিন বদলে অবশ্যই বিরাট একটা ভূমিকা রাখবে।
আগামী ২৫ বছরের এই ২৫ লাখ ছাত্রছাত্রীরাই এ জাতির কান্ডারীর ভূমিকা পালন করবে। আগামী দিনের বাংলাদেশের এরাই হবে রাষ্ট্রধান, সরকার প্রধান, সেনা প্রধানসহ যাবতীয় দপ্তর অধিদপ্তরের পরিচালক। দেশের শিক্ষা সংন্ডৃতির এরাই হবে ভাবী কর্ণধার। আগামীকালের বাংলাদেশকে কোরআনের ভূখন্ড বানাতে হলে তাই সবার আগে এদের কোরআনের পাশে এনে বসাতে হবে।

আগামী জুলাই মাসে এই সেরাদের সের্ াছাত্রছাত্রীদের হাতে কোরআনের এই শ্রেষ্ঠ উপহারটি তুলে দেয়ার পাশাপাশি আমরা দেশের কারাগারগুলোর দিকেও এ বছর দৃষ্টি দিতে চাই।
আপনারা সবাই জানেন, ইউরোপ আমেরিকার কারাগারগুলোতে প্রতিটি কয়েদীর জন্যে একাধিক কপি বাইবেল দেয়া হয়। এ ব্যাপারে আমরা মুসলমানরাই হচ্ছি সবচাইতে হতভাগ্য। আমাদের দেশের কারাগার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, বড়ো বড়ো হোটেলÑ কোথায়ও এক কপি কোরআন সংরক্ষিত নেই। কয়েক মাস আগে আমরা এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনের সাথে। তিনি আমাদের জানালেন, (সে সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) বাংলাদেশের কারাগারসমূহে প্রায় ৯৭ হাজার বন্দী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো কোনো সংস্থাই আজ পর্যন্ত তাদের হাতে ধর্ম গ্রন্থ হিসেবে কোরআন মাজীদ তুলে দেয়নি। অথচ জেলখানায় মানুষের মনে সাধারণত অনুশোচনা ও সংশোধনের একটা মানসিকতা বিদ্যমান থাকে, থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সময়।

পশ্চিমী দুনিয়ায় জেলখানাসমূহে যে হারে অমুসলিমরা কোরআনের সংস্পর্শে
এসে ইসলাম গ্রহণ করছে তাতে স্বয়ং মুসলমানরা যেন তাদের আপন ভূখন্ডে আপন জেলখানায় বসে সে গ্রন্থ থেকে বঞ্চিত না থেকে যায় সে জন্যে আমরা বিতরণ কর্মসূচীর আগামী ধাপে প্রায় ১ লাখ বন্দীকে শামিল করতে চাই।
এই ধাপের সর্বশেষ খাত হচ্ছেÑ পশ্চিমবংগের হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান মিলে ৩০ হাজার বিশ^বিদ্যালয় কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষক। এদের হাতে বাংলা অনুবাদসহ মানব জাতির মুক্তির সনদ আল্লাহ তায়ালার আখেরী কিতাব কোরআন মাজীদ পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত জরুরী। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি শিক্ষিত বাংলাভাষী নাগরিকের হাতে কোরআন পৌঁছানোর ঐতিহাসিক অভিযান শুরু করার পর আমরা কলকাতার সুশীল সমাজের সাথেও একাধিকবার কথা বলেছি। এই মহা প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওখানকার সুধী সমাজ বিশেষ করে আমাদের অমুসলিম চিন্তাশীল ভাইয়েরা যে উদ্যোগ ও আগ্রহ দেখিয়েছেনÑ তা যে কোনো মুসলমানের মনেই ভারত ভূখন্ডে কোরআনের ভবিষ্যত সম্পর্কে একটা ব্যাপক আশাবাদ জাগ্রত করবে। তাদের এ আগ্রহই আমাদের কোরআন ও তার অনুবাদ নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের হাতে কোরআন তুলে দেয়ার কথা যখন আমরা ভাবছিলাম, তখন পত্র পত্রিকায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল দেখলাম। দেখলাম প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ পরীক্ষায় সাড়ে ৭ লাখ বালক বালিকা প্রথম শ্রেণীর সম্মাননা পেলো। এই বাছাই প্রক্রিয়ায় যারা মেধা ও প্রতিভার বলিষ্ঠ স্বাক্ষর রেখেছেÑ জীবনের শুরুতে তাদের হাতে তাদের ভবিষ্যত জীবনের কর্মসূচী হিসেবেÑ কিশোরদের উপযোগী করে লেখা ‘‘কোরআনের একটি সহজ সরল বাংলা অনুবাদ্ তুলে দিতে পারলেÑ কোরআন বুঝা ও কোরআন দিয়ে জীবন গড়ার প্রতি তারা আরো বেশী উৎসাহী হবে।

আমাদের দেশে যেখানে বড়োদের জন্যেই কোরআনের সহজবোধ্য অনুবাদ তেমন একটা পাওয়া যায় না, সেখানে কিশোরদের উপযোগী অনুবাদের চিন্তা তো অনেকটা স্বপ্নের মতো। অনেকেই বলেন, কোরআন হড়ে– বড়োদের জন্যে, কিশোর কিশোরীরা এটা বুঝবে কি করে? যারা একথা বলেন তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, আল্লাহ তায়ালা এই কোরআনকে মানুষের বিশেষ কোনো বয়সের জন্যে নাযিল করেননি। কিশোর বয়সে আলী, যায়েদ ও আনাস এই কোরআন শুনে ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন তাহলে দুনিয়ার অন্যান্য কিশোররা তা পারবে না কেন।

আমি আপনাদের দোয়ার জন্যেই কথাটা এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, দেশের ১ কোটীর ওপর কিশোর কিশোরীদের উপযোগী করে আমরা অচিরেই কোরআনের একটি সহজ সরল অনুবাদ পেশ করতে যাচ্ছি। তেমনি কোনো অনুবাদ গ্রন্থ বেরুলে তা হবে আমাদের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। সম্ভবত পৃথিবীর কোনো ভাষায়ই আজ পর্যন্ত কিশোরদের উপযোগী কোরআনের কোনো অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। আগামী বছর এ সময়টি আসার আগেই যদি আল্লাহর তায়ালার দয়ায় এ কাজটি শেষ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর প্রায় ৮/৯ লাখ মেধাবী কিশোর কিশোরীদের কথাও আমরা ভাবতে পারবো।

এ যমীনের বাছাই করা আল্লাহর এমন কিছু ব্রাাহÑ যারা এ জাতির ভবিষ্যত কারিগর, এদের হাতে আনুবাদসহ আল্লাহর কিতাবটি পৌঁছে দেয়ার একটি কর্মসূচী আমরা আপনাদের কাছে পেশ করলাম। আমি জানি আপনারা সবাই কোরআনকে ভালোবাসেন, কোরআনই হচ্ছে আপনার আমার সবার জীবন। এই কোরআন নিয়েই আমরা দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি চাই, আর সত্যিকার অর্থে কোরআনের এ অকৃত্তিম ভালোবাসাই আমাদের সবাইকে এই ছোটো কক্ষটিতে আজ সমবেত করেছে।

আপনি যদি চান আপনার কলজের টুকরো সন্তানটি কোরআনের আলোয় বেড়ে উঠুক, কোরআনের জন্যে নিবেদিত হোক তার জীবন, এ যমীনে কোরআন প্রতিষ্ঠার মহান কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার মাথায় কোরআনের তাজ পরিয়ে দেন, সর্বোপরি এই কোরআন দিয়ে আল্লাহ তায়ালা তার এ  দেহটিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন, তাহলে এদের হাতে কোরআন তুলে দেয়ার মহান কাজে আপনি নিজে শরীক হোন, অন্যদেরও শরীক হতে বলুন। আপনার পিতামাতা, আপনার ভাই বোন, আপনার দোস্ত দুশমন সবাইকে কোরআন বিতরণের এ আ্েরালনে শরীক হতে বলুন।

যারা প্রত্যেকে ১ হাজার কমপক্ষে ১০০ করে ‘‘কোরআন শরীফ ” সহজ সরল বাংলা অনুবাদ্ স্পন্সর করবেন, আমরা এই বরকতময় গ্রন্থের প্রথম পাতায় তাদের নাম লিখে তাদের জন্যে পাঠকের কাছে বিশেষ দোয়া চাইবো। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত তাদের একাউন্ট এই সদকায়ে জারিয়ার নেকী পৌঁছতে থাকবে। আজকাল মানুষ কতো কিছুই তো স্পন্সর করে। কেউ খেলাধুলা স্পন্সর করে, কেউ নাচগান ও নৈতিকতা ব্বিংসী নানা নোংরা জিনিস স্পন্সর করেÑ এই বহুমূখী বিনাশের মাঝে আমরা আপনাদের আগামী প্রজন্মের জন্যে কিছু কোরআন স্পন্সর করতে বলছি।

ব্যাপকভাবে কোরআন বিতরণের এই প্রথম ধাপের পরিকল্পনার কথা আমরা সাম্প্রতিক সময়গুলোকে আমাদের আজনদের বলেছি। সবাই আমাদের উৎসাহ যুগিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। প্রত্যেকেই আমাদের বলেছেন, ১০০০ কোরআন সম্পন্সর করতে পারবেন এমন হৃদয় ও সামর্থবান মাত্র ২০০জন লোক খুঁজে বের করা মোটেই কষ্টকর বিষয় নয়।

এই বিশাল কাজের যোগান দেয়া, এস্পলো রাখার ও পরিকল্পনা মতো যথাযথ কতৃপক্ষের হাতে তা পৌঁছে দেয়াÑ আপনিই বলুন এর কোন কাজটি সহজ? কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও কোনো বড়ো মাপের এনজিওÑ যাদের বাৎসরিক বাজেটই হচ্ছে ছোটো খাটো রাষ্ট্রের গোটা ব্যয়ের সমান, তাদের পক্ষে এ আয়োজন মোটেই দু:সাধ্য নয়; কিন্তু আমরা তো এ উভয় ভাগ্য থেকেই বঞ্চিত। আমাদের হাতে আজ না কোনো রাষ্ট্রশক্তি আছেÑ না আছে কোনো বড়ো এনজিওর ব্যানারে বাইরের কোনো অর্থনৈতিক আনুকল্য। এই সার্বিক হতাশায় আমাদের সীমিত সুযোগ সুবিধের ওপর নির্ভর করেই এগিয়ে যেতে হবে।

অতীতে আমরা যখনই বিশেষ কোনো গ্রুপ থেকে কোরআন দেয়ার পরিকল্পনা করেছি তখনই আমরা কোরআনের ভক্ত অনুরক্তদের এ কাজে আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে বলেছি। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা স্পন্সর করতে আমরা তাদের অনুরোধ করেছি। আলহামদু লিল্লাহ, অনেকেই আমাদের কোরআনের বিতরণের এ মহান কাজটি স্পন্সর করেছেন।

গেলোবারে আমাদের টার্গেট যা ছিলো তার পুরোটার জন্যে আমরা স্পন্সর যোগাড় করতে পারিনি। যতোটুকু পেয়েছি তার সাথে আরো কিছু নিজেদের থেকে মিলিয়ে আমরা ৭৫ হাজারের মতো বিতরণ করেছি।  এ পর্যায়ে কোরআন প্রেমীদের যে পরিমাণ সহযোগিতা আমরা পাবো সে পরিমাণ কোরআন আমরা ইনশাআল্লাহ বিতরণ করবো।

আমরা যে যেখানে আছি আমরা যদি এখন থেকে আমাদের সময় ও অর্থের কিছু কাটসাট করে ঘরে ঘরে কোরআন বিতরণের এই মহামিছিলে নিজেরা শরীক হতে পারি, তাহলে একদিন দেখা যাবে আপনার আমার সোনার ছেলেমেয়েরা এই কোরআনের আলোতেই নিজেরা বড়ো হয়ে উঠছে।

অনেকেই আমাকে বলেছেন মানুষের হাতে কোরআন দিয়ে কি হবে। আরবী কোরআনের পত্র পল্লব তো বহু ঘরেই অযতেœ অবহেলায় বিনষ্ট হয়ে আছে। হাঁ, আমিও এক সময় এমন কথা ভাবতাম, কিন্তু দুনিয়া জাহানের অবস্থা দেখে আজ আর তেমনভাবি না। আমরা যদি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষÑ সম্মানিত নবী রসূলদের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা স্পষ্টত দেখতে পাবো আগের উম্মতদের বড়ো বড়ো পাপস্পলো এখন আমাদের মাঝে এসে পুঞ্জিভূত হয়ে পড়েছে।

হযরত আদমের অনুসারীরা প্রথম নরহত্যা প্রচলন করলো, হযরত নূহের উম্মত প্রথম মূর্তির পূজা চালু করলো, হযরত লুতের লোকেরা সমকামীতার বিষাক্ত বীজ সমাজে বপন করলো, হযরত সোলায়মানের লোকেরা যাদু বিদ্যার প্রসার ঘটালো, হযরত শোয়াইবের লোকেরা ওযনে কম দেয়ার অভিনব প্রতারণা আবিষ্কার করলো, হযরত হুদ ও সালেহের লোকেরা সর্বপ্রথম নিজেদের শিল্পকর্ম ও প্রযুক্তির বাহাদুরী করলো।

সর্বশেষে হযরত মূসা ও ঈসার অনুসারীরা দুনিয়া জুড়ে সুদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আল্লাহর এ যমীনটাকে কলুষিত ও ক্ষত বিক্ষত করে দিলো। এই সব কয়টি উম্মতের সব কয়টি পাপের জীবন্ত প্রতিড়–বি হড়ে– আজকের মনুষ্য সম্প্রদায়। এই মনুষ্য সম্প্রদায়ের সামগ্রিক নিরাময়ের জন্যেই আল্লাহ তায়ালা প্রিয় নবীর ওপর কোরআন নাযিল করেছিলেন এবং এ কোরআন দিয়ে তিনি তাদের হাজার হাজার বছরের পুঞ্জিভূত আবর্জনা পরিন্ডারও করেছেন। আজ যদি আমরা সমাজের এতো দূর্নীতি, এতো অনাচার, এতো অবক্ষয়, এতো পাপ থেকে আমরা আমাদের সোনামণিদের বাঁচাতে চাই তাহলে তাদের হাতে আল্লাহর কোরআন তুলে দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

আল কোরআন একাডেমী লন্ডন যেদিন প্রথম এ যমীনে তার পথচলা শুষ্প করেছে সেদিন থেকেই আমরা এদেশের সুধী, চিন্তাবিদ ও সুশীলদের ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছি। আমার সামনে আজ যে স্পণীজনরা বসে আছেন তাদের অনেকেই আমাদের দীর্ঘ পথচলার সাথী। বিগত বছরস্পলোতে সময়ে সময়ে কোরআনের নানা অলিগলিতে আরো যাদের আমরা পেয়েছি তাদের সবাইকে নিয়ে আল কোরআন একাডেমী লন্ডন এর বাংলাদেশ চাপটারের বিশাল একটি পরিবার গড়ে উঠেছে। আজ এই পরিবারের সদস্যদের নিয়েই আমরা এ অঞ্চলের প্রত্যেকটি শিক্ষিত নরনারীর হাতে এক কপি অনুবাদসহ কোরআন মাজীদ পৌঁছে দিতে চাই।

কোরআনের জন্যে নিবেদিত একাডেমীর এ পরিবারটি কখনো এই দাবী করেনি যে, জনপদের মানুষদের হাতে কোরআন পৌঁছাতে পারলেই এখানে কোরআনের রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তবে হাঁ, যারা আল্লাহর এ যমীনে আল্লাহর কোরআনের রাজ প্রতিষ্ঠা করতে চানÑ সবার হাতে এক কপি কোরআন পৌঁছানোর কাজটি তাদের আ্েরালনকে এক কদম এগিয়ে দেবে।

আল্লাহ তায়ালা এই ভূখন্ডে কোরআনের প্রতিটি প্রতিকূল আবহাওয়াকে কোরআনের অনুকূল বানানোর মহান কাজে আল কোরআন একাডেমীর সংগী সাথীদের পরিবারটিকে কবুল কষ্পন। আল্লাহ তায়ালা হাশরের ময়দানে কোরআনের বাহক হিসেবে এদের সবার মাথায় সোনার মুকুট পরিয়ে দিনÑ এটাই আল্লাহ তায়ালার দরবারে আমরা দোয়া করি।

তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন-এর মহান প্রণেতা তার কালজয়ী তাফসীরের মুখব্ের যথার্থই বলেছেন, আমার জীবনের সে সময়স্পলোই হড়ে– সর্বাধিক সৌভাগ্যম-িত, যে সময়স্পলো আমি কোরআনের ছায়াতলে কাটিয়েছি। আসলে মানুষের জীবনের সে কয়টা মুহূর্তই হড়ে– সর্বাধিক অর্থবহ যে কয়টা বছর, মাস, দিন, ন্টা, মিনিট ও সেকেন্ড তার কোরআন নিয়ে কেটেছে। আমরা কেউই আবু বকর ওমর ওসমান আলীর মতো করে কোরআন পড়তে পারিনি। আবদুল্লাহ ইবনে আল্টাস, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের মতো কোরআন বুঝতেও পারিনি। তারপরও হে আল্লাহ, আমরা তোমার কোরআন নিয়ে দাঁড়িয়েছি। কোরআনের একটি বড়ো ধরনের পরিকল্পনা আমরা হাতে নিয়েছি। হে আল্লাহ! কোরআনের এই পরিকল্পনাটির যথার্থ বাস্তবায়নে তুমি আমাদের পাশে থেকো।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY