সেই সে নবী (স)

0
499

সেই সে নবী (স)
হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহ

আপনাদের সকলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, বর্ষিত হোক আল্লাহ তায়ালার অপার করুণা ও তাঁর অগণিত কল্যাণ।
নবী মোহাম্মদের নামে নিবেদন করছি শত কোটি দরুদ ও সালাম।

হাজার হাজার কোটি বছর আগের কথা, আল্লাহ তায়ালা এই পৃথিবীটাকে স্রুর করে সাজানোর জন্যে একে শান্তি ও নিরাপত্তার আধার বানানোর জন্যে মানুষ বানানোর সিদ্ধান্ত করলেন। একদিন আরশে আযীমের পাশে তিনি ফেরেশতাদের ডেকে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানালেন।

ফেরেশতারা ভবিষ্যতের এই মানুষদের নিয়ে তাদের নানা আশংকার কথা বললো। মনে হয় তাদের কাছে এ যমীনের আগের বাস্রিাদের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিলো। সম্ভবত সে অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তারা বলেছিলো, হে আমাদের রব! যমীনে তুমি আবার মানুষ নামের নতুন একটা প্রজাতি বানাতে চাও কেন? এরা তো তোমার যমীনে নানা অশান্তি ও ম্যালা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে। তোমার সাজানো বাগানটাকে এরা তছনছ করে দেবে। সার্থোদ্ধারে এরা এখানে রক্তারক্তি ও হানাহানি করবে। কেনÑ তোমার প্রশংসা করার জন্যে আমরাই তো রয়েছি।

আল্লাহ তায়ালা সেদিন ফেরেশতাদের সামনে এই মানুষদের নিয়ে তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা খুলে বলেননি। তাদের তিনি শুধু এ টুকুই বললেন, অবশ্যই আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

আসলেই আল্লাহ তায়ালা যা জানেন তা তাঁর অন্য কেউই জানে না।

ইতিমধ্যে আরো হাজার হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো। জান্নাত থেকে মানুষকে যমীনে পাঠিয়ে দেয়া হলো। পাঠানোর সময় তিনি তাদের হাতে এখানে শান্তি স্থাপনের কর্মস‚চী স¤œলিত হেদায়াত তুলে দিলেন। সেই কর্মস‚চীর ভিত্তিতেই হাজার হাজার বছর ধরে মানুষদের সর্দার সোয়া লাখ নবী রস‚লরা এ যমীনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে আসছেন। এই মহামানবদের তালিকার শেষ নামটি ছিলো মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
তাঁকে পাঠানোর সময় আল্লাহ তায়ালা বললেনÑ
ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল লিল আলামীন্।

অর্থাৎ আমি তোমাকে সৃষ্টিকূলের জন্যে শান্তি ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে পাঠিয়েছি।

মোহাম্মদ শুধু শান্তির প্রবর্তক-ই ছিলো না, তিনি ছিলেন সৃষ্টিকূলের শ্রেষ্ঠতম মর্যাদাবান মানুষ।
শুধু মানুষদের মধ্যেই নয়Ñ তিনি শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে এসেছেন সকলের জন্যে।

৫৭০ সালে এই মহা মানবের আগমন হলো।

অসংখ্য নবী রস‚লÑ বিশেষ করে নবী ইবরাহীম (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক মক্কা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করলেন। শৈশবে বনু স্দা গোত্রের শান্তিময় পরিবেশে রেখে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রতিপালন করলেন। কিছু বয়েস হলে তিনি তাঁর চার দিকের পরিবেশের দিকে তাকালেন। চার দিকে তখন একটি ঘুমোট আবহাওয়া। মনে হলো কোনো বড়ো Ÿংসের যেন মহা প্রস্তুতি চলছে। কিছু দিন পর দেখা গেলো, এ তো সত্যি সত্যিই মহা যুদ্ধের প্রস্তুতি। তারই জন্মভূমির দুটো শক্তিশালী গোত্র এক গোত্র আরেক গোত্রকে নির্মুল করে দিতে চায়। বয়স্কদের মুখে তিনি শুনলেন, এ যুদ্ধ একদিন ও এক বছরের নয়, যুদ্ধ চলছে দলে দলে, গোত্রে গোত্রে, এ যুদ্ধের যেন শেষ নেই। আল্লাহর গোটা যমীনটাই যেন এক বিশাল রণ পরিণত হয়ে গেছে। চার দিকে রক্তের নেশা, মানুষরা যেন মানুষ মারার এক আদিম নেশায় মেতে উঠেছে, আর এ ভয়াবহ যুদ্ধের শিকার হচ্ছে নিরীহ শিশু ও অবলা নারী। বংশানুক্রমে চলে আসা যুদ্ধের তারাই হচ্ছে প্রথম বলি।

কিশোর মোহাম্মদ ভাবলেন, আরো ভাবলেন। ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে তিনি শুনলেন বিভিন্ন গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকেরা জড়ো হলো। তিনি তাদের কাছে তাঁর উদ্বেগের কথা বললেন। সবার চোখে মুখে একই প্রশ্ন কিভাবে যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে মানুষদের মুক্তি দেয়া যায়! কিভাবে হাজার হাজার শিশু নারীদের যুদ্ধের দাবানল থেকে উদ্ধার করা যায়। দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর জন্ম হলো একটি প্রতিবাদধর্মী প্রতিষ্ঠান হেলফুল ফুয‚ল্।

হেলফুল ফুয‚ল-এর প্রতিষ্ঠালগ্নের এই স্পরুত্বপ‚র্ণ বৈঠকে কিশোর মোহাম্মদ শুধু যে অংশ গ্রহণ করেছেন তাই নয় তিনি এ নবগঠিত সংগঠনের নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও ম‚ল্যবান ভূমিকা পালন করেছেন।

হেলফুল ফুয‚ল-এর সাথীরা অংগীকার করলো, মক্কা নগরীতে সংঘটিত যে কোনো যুলুম অত্যাচারের তারা প্রতিরোধ করবে, অত্যাচারিত ব্যক্তি মক্কার অধিবাসী হোক, কিংবা বাইরের হোকÑ সবাই মিলে তাকে সাহায্য করবে, তার অধিকার তারা তাকে ফিরিয়ে দেবে।
একবার আরব নেতারা সবাই মিলে কাবা শরীফ সংস্কারে হাত দিলে কর্মস‚চীর অংশ হিসেবে কাবার এক কোণে অবস্থিত “হাজরে আসওয়াদ্-কে অন্যত্র সরানোর প্রয়োজন দেখা দিলো। সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পর ম‚ল্যবান এই পাথরটিকে যথাস্থানে রাখা নিয়ে কোরায়শ নেতাদের মধ্যে তুমুল মতবিরোধ দেখা দিলো। প্রত্যেক গোত্রই এই সম্মানের কাজটি নিজেরা করতে চাইলো। এই মতবিরোধ এক সময়ে এসে তীব্র রক্তারক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যাবার উপক্রম হলো। চারদিন পর্যন্তও যখন তারা কোনো সমাধানে পৌঁছোতে পারলো না, তখন নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিলো, আগামীকাল সকাল বেলায় সবার আগে যে ব্যক্তি কাবার চত্তরে এসে হাযির হবে সেই সিদ্ধান্ত করবে হাজরে আসওয়াদ সরাবার কাজটি কে করবে। পরবর্তী খবর আমরা সবাই জানি। আল্লাহ তায়ালা যাবতীয় ঝগড়া ফ্যাসাদ দ‚র করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যাকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন অবশেষে তিনিই তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও বুদ্ধি প্রয়োগ করে খুনাখুনির পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া বিষয়টির স্রুর সুরাহা করে দিলেন।
মক্কা নগরীতে শান্তি স্থাপনের আরেকটি মাইল ফলক স্থাপিত হলো।
৬১০ সালের রমযানুল মোবারক। আল্লাহ তায়ালার তাঁর যমীনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে হেরা পাহাড়ের নিবৃত্ত স্পহায় মোহাম্মদের হাতে তুলে দিলেন বিশ^ শান্তি প্রতিষ্ঠার অমোঘ ঘোষণা পত্র ষ্ক্রকোরআনুল কারীম্।
মহাকবি ইকবালের ভাষায়
উতার কর হেরা সে স‚য়ে কওম আয়া
আওর এক নুসখায়ে কিমিয়া সাথ লায়া।
হেরা স্পহা থেকে বেরিয়ে তিনি সোজা তার জাতির কাছে এলেন। আসার সময় সাথে করে একটি পরশ পাথর নিয়ে এলেন। এমন একটি পরশ পাথর, যার সান্নিধ্যে যমীনের সম‚দয় মাটি সোনায় রুপান্তরিত হতে পারে।
শান্তির এ স্থায়ী ঘোষণা পত্রে ¯^া¶র করার জন্যে তিনি তাঁর জাতিকে ডাক দিলেন, সাফা পাহাড়ের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তিনি তাদের সবাইকে একটি মহা দুর্যোগের কথা বললেন। বললেন, একটি  মহা দুর্যোগ তেড়ে আসছে তোমাদের দিকে, এখনও সময় আছে তোমরা সাবধান হও। আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর পাঠানো একজন নবী। তোমরা আমার কথা শুনো, আমার কথা শুনলে তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতের বড়ো দুর্যোগ থেকে রেহাই পাবে, কিন্তু সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ¯^ার্থের সুবিধাভোগীরা তাঁর কথায় কর্ণপাত করলো না, তারা বরং এগিয়ে এলো তাকে নানাভাবে বাধা দিতে। তাঁর শান্তি মিশনে তারা অশান্তির পায়তারা করতে শুরু করলো। যুলুম অত্যাচার নিপীড়ন নির্যাতনের কোনোটাই তারা বাকি রাখলো না।
কঠিন ধৈর্য্যরে প্রতীক আল্লাহর নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অভীষ্টের দিকে দ্র∆ত এগিয়ে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন যাবতীয় বাধা উপে¶া করে আল্লাহর যমীনে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে এগিয়ে আসতে। প্রতিটি বনী আদমের কাছে আল্লাহর প¶ থেকে শান্তির এ বার্তা পৌঁছে দিতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আদেশ দিলেন। দাওয়াতে দ্বীনের বার্তা নিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন, এস্পতে এস্পতে এক সময় দেখলেন, তাঁর নবুওত জীবনের ১৩টি বছর তিনি পার করে এসেছেন। অবশ্য মক্কার কিছু আলোকিত মানুষ ইতিমধ্যেই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাদের নিয়ে তিনি একটি নিবেদিত কর্মীবাহিনী বানালেন। তাঁর এই ডাকে গোলামরা এলো, এলো তাদের মনিবরাও, এলো গরীবরা, এলো ধনীরাও। সবাই আজ কিছু একটা গড়ার প্রেরণায় উজ্জীবিত।
অতপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর রস‚লকে আদেশ দিলেন, নতুন সভ্যতা ও সংস্করুতির ভিত্তি স্থাপনের জন্যে মক্কা থেকে ৪০০ কিলোমিটার দ‚রের জনপদ ইয়াসরেবের দিকে হিজরত করতে। সাথীদের সবাইকে একে একে পার করিয়ে দিয়ে অবশেষে তিনিও একদিন মদীনায় এসে হাযির হলেন। ষ্ক্রতালায়াল বাদরু আলাইন্ াবলে মদীনার আবাল বৃদ্ধ বনিতা তাঁকে অভিন্রন জানালো। ভিটে মাটি ছেড়ে নি”¯^ অবস্থায় যারা এলোÑ পরম যতেœ তাদের আশ্রয় দিলো ইয়াসরেবের সর্বস্তরের জনগণ। নবী মোহাম্মদ এই দেশত্যাগী মোহাজের ও তাদের সাহায্যকারী আশ্রয়দাতা আনসারদের নিয়ে আগামী কালের পৃথিবী গড়ার কাজে এগিয়ে এলেন। দুনিয়ার মানুষ ভ্রাতরুত্ব বন্ধনের এক নতুন সংজ্ঞার সাথে পরিচিত হলো।
শুরু হলো তাঁর জীবনের দ্বিতীয় এবং সর্বাধিক স্পরুত্বপ‚র্ণ কর্মস‚চী বাস্তবায়নের পালা। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে যে শান্তির বাণী তিনি প্রচার করে আসছিলেন আল্লাহ তায়ালা চাইলেন নতুন ভূখণ্ডে তিনি যেন সেই বাণী অনুযায়ী শান্তি ও নিরাপদ একটি জনপদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে মদীনার বুকে স্থাপিত হলো একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার প্রথম খুঁটি তিনি বসালেন মদীনায় বসবাসরত ইহুদী ও বড়ো দুটো আরব গোত্রের সাথে শান্তি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহর যমীনের যে টুকরাটাকে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার জনপদ বানাতে  চানÑ সেখানেই যদি শান্তি না থাকে, তাহলে শান্তির এ মিশনের পতাকা তিনি খাড়া করবেন কোথায়? মদীনার অধিবাসীদের সাথে সম্পাদিত এই ষ্ক্রশান্তি চুক্ত্ িতাকে সমগ্র আরব ভূখণ্ডে কাজ করার একটা বড়ো সুযোগ এনে দিলো। বলার অপে¶া রাখে না আল্লাহর নবী এই সুযোগকে ঠিক মতোই কাজে লাগিয়েছেন।
কিন্তু আরবের সমাজ মোড়লরা তাকে এখানেও নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করলো। নতুন এ ভূখণ্ডের ওপর তারা সামাজিক আগ্রাসন শুরু করলো। বছর দেড়েকের মাথায়ই নবগঠিত এই রাষ্ট্রটিকে নিমর্‚ল করে দেয়ার জন্যে তারা বদরের মাঠে একত্রিত হলো। আল্লাহ তায়ালা তাদের দম্ভ ও অহমিকা চ‚র্ণ করে দিলেন। কোরায়শদের বড়ো নেতাদের বলতে গেলে সবাই এতে মারা পড়লো; কিন্তু জয়ের এই মুহূর্তেও মহানবী শান্তি ও করুণার জীবন্ত নযীর স্থাপন করতে ভুলেননি। ঘোষণা দিলেনÑ কোনো নারী ও শিশুর ওপর কেউ আঘাত করবে না, কোনো জীবন্ত ও ফসলের গাছ কাটা যাবে না, মৃত দেহের কোনো অংগচ্ছেদ করা যাবে না।

এ যুদ্ধে তাঁর হাতে আরব সর্দারদের যারা বন্দী হলো তাদের প্রতি আচরণের ¶েত্রেও তিনি দুনিয়ার মানুষদের সামনে এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। বললেন, বন্দীরা তোমাদেরই ভাই, তোমরা যা খাবে তাদের তাই খাওয়াবে, নিজেরা যা পরবে, তাদেরও তাই পরাবে। উপরন্তু কোনো বন্দী যদি ১০ জন সাধারণ মুসলমানকে লেখা পড়া শেখাতে পারে, তাহলে তাই তার মুক্তিপণ হিসেবে গ্রহণ করে তাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। এ ব্যবস্থার ফলে এক সময় প্রায় সকল বন্দীই মুক্তি পেয়ে গেলো। এমনি এক রক্ত¶য়ী সংঘর্ষÑ যার উদ্দেশ্যই ছিলো মুসলমানদের এই সদ্য প্রতিষ্ঠিত সমাজটাকেই উপড়ে ফেলা, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই নতুনদের হাতেই পুরাতনদের নিমর্‚ল করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
বদরের এতো বড়ো বিপর্যয় থেকেও কিন্তু মক্কার দাম্ভিক কোরায়শ ও মদীনার বর্ণচোরা ইহুদীরা কোনো শি¶া গ্রহণ করেনি। কিছু দিনের মাথায় তারা পুনরায় একত্রিত হলোÑ ওহুদ পাহাড়ের পাশে ও ¯^য়ং মদীনা শহরে; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বিশ^ময় শান্তির বাণীকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে যাকে পাঠিয়েছেন তাঁর পথ রোধ করবে কে?

অবশেষে যখন শান্তির এই মিছিলে আরো হাজার হাজার নিবেদিত প্রাণ মানুষেরা এসে যোগ দিলো, তখন আল্লাহর নবী সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর জন্মভূমি মক্কাÑ যাকে শান্তির নগরী বানানোর জন্যে আদি পিতা ইবরাহীম (আ.) ৫ হাজার বছর আগেই দোয়া করেছিলেন সেই নগরীর আদি গৃহ খানায়ে কাবায় তিনি যাবেন। একদিন সত্য সত্যই তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে বেরুলেন। যে কোনো সময় শত্রæরা আক্রমণ করতে পারে এই আশংকা করে তিনি তরবারী সাথে নিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির মারাত্বক অবনতি না হলে সবাইকে এই তরবারীকে কোষবদ্ধ রাখতে বললেন। তিনি মনে মনে চেয়েছিলেন কোনো রকম একটা সমোঝতা হয়ে যাক। এমন এক সমঝোতাÑ যাতে করে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলা যাবে।

অবশেষে এক সময় সত্য সত্যই কোরায়শদের প¶ থেকে সন্ধির প্রস্তাবটি এলো। অনেক ছাড় দিয়ে প্রিয়নবী কাফের ও মোশরেকদের সাথে ১০ বছর মেয়াদী হোদায়বিয়ার সন্ধি চুক্ত্ ি¯^া¶র করলেন। তাঁর সমগ্র দাওয়াতের ম‚লমন্ত্র ষ্ক্রমোহাম্মদ রস‚লুল্লাহ্ শব্দটির সাথে আপোষ করে ষ্ক্রমোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ লিখে চুক্তিপত্রে ¯^া¶র করলেন। আগামী ১০ বছর আর কোনো যুদ্ধ হবে না, আগামী ১০ বছরে একজন আদম সন্তানেরও রক্ত ঝরবে না, একজন নারীও বিধবা হবেন না। আরব উপদীপের একটি শিশুও আর ইয়াতীম হবে নাÑ এটাই ছিলো তাঁর কাছে বড়ো পাওয়া। শান্তির এ সময়কে তিনি আরব ভূখণ্ডের প্রতিটি ঘরে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজে লাগাতে পারবেনÑ এটাই ছিলো তাঁর বড়ো অভীষ্ট।

এই অভীষ্টে পৌঁছার জন্যেই শান্তির এ পরিবেশটাকে তিনি ঠিকমতোই কাজে লাগালেন। তিনি এ সুযোগে ইসলামের বাণীকে বিশে^র অন্যান্য দেশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। পরিকল্পনা মতো তিনি আরব উপদীপের বাইরের রাষ্ট্র প্রধানদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্যে সরাসরি দাওয়াত দিলেন। মাত্র ১/২ জন ছাড়া বলতে গেলে সবাই তাঁর দাওয়াতের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই তদান্তিন পৃথিবীর সকল কোণে শান্তির এই বাণী ছড়িয়ে গেলো।

কিন্তু আবারও ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন করে প্রতারণার জাল বিছাতে শুরু করলো। হোদায়বিয়া সন্ধির শর্ত ভংগ করে তারা রাতের আঁধারে সাহাবীদের একটি দাওয়াতী কাফেলার ওপর আক্রমণ করে তাদের হত্যা করলো। মুসলমানদের মাঝে তখন প্রচণ্ড দ্রোহ, প্রচণ্ড ক্রোধ, প্রতিশোধের অদম্য এ শক্তি, কিন্তু আল্লাহর নবী এ সাময়িক প্রতিশোধের দিকে না গিয়ে চ‚ড়ান্ত বিজয়ের কৌশল হিসেবে শান্তিপ‚র্ণভাবে শান্তির শহর মক্কা অভিযানে বের হবার সিদ্ধান্ত করলেন। দেশ জয় ও সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় যারা দেশে দেশে অভিযান চালায়, তাদের সাথে এ অভিযানের আকাশ পাতাল তফাৎ রয়েছে।

আজ সকল অস্ত্র তাদের কোষবদ্ধ, সকল মুখ তাদের আল্লাহর যেকেরে লিপ্ত, এ যেন সাদা পোষাক পরিহিত দুনিয়া বিরাগী হাজার হাজার মানুষের মিছিল। আল্লাহু আকবার যেকেরে আকাশ বাতাস মুখরিত করে এক সময় তিনি হাজার হাজার সাথীদের নিয়ে যমীনের আদি গৃহ নবী ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর বানানো ঘর কাবায় এসে পৌঁছলেন। মক্কার কাফের ও মুর্তির প‚জারীরা প্রমোদ স্পনলো। মাত্র কয়েক বছর আগে তারা মোহাম্মদ ও তাঁর সাথীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। তপ্ত মরুর বুকে শুইয়ে বেলালের বুকে পাথর চাপা দিয়েছে। আল্লাহর নাম উ”ারণ করার অপরাধে সুমাইয়াকে বর্ষার আঘাতে হত্যা করেছে। জলন্ত অংগার বসিয়ে খব্বাাবের শরীরকে ¶ত বি¶ত করেছে। এক মাবুদের প¶ে কথা বলায় ইয়াসারকে সন্তানের চোখের সামনে খুন করা হয়েছেÑ এর সব কিছুই আজ তাদের মনে জাগে। শুয়াবে আবী তালেবে ৩ বছর অবরোধ করে কিভাবে তাদের গাছের শুকনো পাতা খেতে বাধ্য করা হয়েছে এ কথাও তারা ভুলে যায়নি। কিভাবে কাবা ঘরের সামনে নামাযরত অবস্থায় মোহাম্মদের গলায় মৃত জন্তুর ভূড়ি তুলে দিয়েছে, তার যখন শ^াস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো, তখন তার কিশোরী কন্যা ফাতেমা (রা.) বাবার গলা থেকে তা জোর করে সরিয়ে দিলোÑ এসব কিছুই আজ ছবির ফিতায় তাদের সামনে ভেসে উঠছে। সে মোহাম্মদ, হ্যাঁ সে মোহাম্মদই আজ বিজয়ীর বেশে তাদের সামনে দাঁড়ানো। তাদের সবার চোখে মুখেই উৎকণ্ঠা। সবার মুখেই আজ আশংকা ও ভয়। আজ মক্কায় রক্তের নদী বইয়ে মোহাম্মদ নিশ্চয়ই তাঁর সাথীদের ওপর অব্যাহতভাবে ১৩ বছরের হাজার ঘটনার প্রতিশোধ নেবেন। এখনই তিনি তাঁর ১৪ হাজার সাথীদের গণহত্যার আদেশ দেবেন।

চারদিকে এক মোট নিস্তব্দতা। শত শত অসহায় দৃষ্টি আজ মোহাম্মদের দিকে। মোহাম্মদ ধীরে ধীরে আল্লাহর ঘরের দিকে এস্পলেন। কাবা থেকে সব ম‚র্তি একে একে তিনি অপসারণ করলেন। বেলাল এসে কাবায় আযান দিলেনÑ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আল্লাহর নবী সবাইকে ডেকে বললেন, আসলেই আল্লাহ মহান। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিশ্র∆তি রেখেছেন। তিনি একাই তাঁর নবীকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে মানুষকে মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দেয়ার জন্যে শান্তির দ‚ত মোহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে যেসব পদ¶েপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন, বলতে গেলে তাই গত দেড় হাজার বছর ধরে মানবাধিকারের মহা সনদ হিসেবে ¯^ীকরুতি পেয়ে আসছে। ১২ শতকের ষ্ক্রমেঘনাকাট্ াও ২০ শতকের জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদের সাথে একে মিলিয়ে দেখলে সবাই একথা ¯^ীকার করবে যে, এস্পলোর কোনোটাই কিন্তু ষষ্ঠ শতকে ঘোষিত হযরত মোহাম্মদ (সা.) ঘোষিত সনদের চেয়ে উন্নত নয়। আজ প্রয়োজন মহামানব ঘোষিত এ নীতিমালার ভিত্তিতে সবাই মিলে একটি নতুন পৃথিবী নির্মাণ করা।

আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মোহাম্মদ ওয়া আলা আলে মোহাম্মদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলে ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY