আধুনিক আবিষ্কার এবং মুসলমান

0
265

আধুনিক আবিষ্কার এবং মুসলমান
মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শফি (র.)

খৃস্টান ঐতিহাসিকরা যতোই বিভ্রান্তিকর বর্ণনার আশ্রয় নিক, কিন্তু ইতিহাস এবং ন্যায়পরায়ণ খৃস্টান ঐতিহাসিকদের সাক্ষ্যসমূহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায় না। মিসরবাসী খস্টান ঐতিহাসিক জুরযী যায়দান সর্বদা মুসলমানদের বৃহৎ বৃহৎ কীর্তিসমূহ এমনভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যাতে তার গুরুত্ব হ্রাস পায়, তিনিও এ সত্যের স্বীকৃতিদানে বাধ্য হন। তাই জুরযী যায়দান লেখেন, এটা নি:সন্দেহে, মুসলমানরাই হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিকর্তা। (তামাদ্দুনে আরব)
জুরযী যায়দান ছাড়া আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক ও গ্রন্থকার মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের আবিকর্তা বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। স্বয়ং জুরযী যায়দানই মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আলোচনায় সেসব আবিষ্কারকে মুসলমানদের র্কীর্তি বলে গণ্য করেছেন, যেগুলোর ওপর আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত। টেলিগ্রাম, টেলিফোন, ওয়্যারলেস, তোপ, বারুদ, হাওয়াই জাহাজ, তেজাব, সাবান প্রভৃতি। মূর্খতা এবং জ্ঞানের দৈন্যতাবশত যেসবকে লোকেরা ইউরোপের আবিষ্কার বলে থাকেন, এসব মুসলমানদেরই আবিস্কৃত। এসব আবিষ্কারে সফলতার মুকুট মুসলমানদের শিরেই সুশোভিত হয়ে আছে।
মুসলমানরা দেশের পর দেশ জয় করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে গ্রীসে উপনীত হলে গ্রীকদের সে জ্ঞান তাদের হস্তগত হয়, যা ছিলো রসায়নবিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত। গ্রীকদের ধারণা ছিলো, বিশেষ পদ্ধতিতে গন্ধক চূর্ণ এবং অন্যান্য দ্রব্যের সংমিশ্রণ থেকে স্বর্ণ রৌপ্য প্রস্তুত হয়েছে। প্রথম প্রথম মুসলমানরা এ বিস্ময়কর এবং দুর্লভ মতবাদ সম্পর্কে অবগত হয়ে তা অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার মাধ্যমে তাকে পূর্ণতা দানের উদ্দেশে সচেষ্ট হয়। তারা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং প্রমাণাদি এ প্রচেষ্টা সফল করতে কাজে লাগায়, কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যের মৌল উপাদান সম্পর্কিত গ্রীক মতবাদ বাস্তবে সঠিক প্রমাণিত হয়নি। এ কর্মধারায় মুসলমানরা যেসব অভিজ্ঞতার সহায়তা নেন, সেসব তাদের প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত সেসব গ্রন্থ আজ মুসলমানদের কাছে নেই। বর্তমানে সেগুলো রয়েছে ইউরোপের গ্রন্থাগারসমূহে।
রসায়নবিদ্যার ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং সুপ্রাচীন। তবে সংক্ষেপে এতোটুকু নিবেদন করার আছে যে, ইমাম জাফর, মোয়াবিয়া বিন ইয়াযীদ বিন মোয়াবিয়া, জাবের, খালেদ এবং হাকীম রাযী প্রমুখকে এ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ গণ্য করা হয়। জাবের বিন হাইয়ানকে ইউরোপবাসী এ শাস্ত্রের গুরু বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। রসায়ন শাস্ত্রের মৌলনীতিসমূহের বেশীর ভাগ তার অভিজ্ঞতা এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তিশীল। এ বিষয়ে জাবের বিন হাইয়ান অনেক পুস্তক রচনা করেছেন। যেগুলো আজও অনুসন্ধান করলে কোথাও কোথাও পাওয়া যায়। প্রখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক ডক্টর লেবান তার রচিত ‘‘তামাদ্দুনে আরব’’ নামক গ্রন্থে জাবের বিন হাইয়ানকে অষ্টম খৃস্ট শতাব্দীর লোক বলে মত প্রকাশ করেছেন। মুসলমানরা যখন রসায়নশাস্ত্রের প্রতি মনোনিবেশ করেন, তখন তারা এ শাস্ত্রকে উন্নতির সর্বো” শিখরে উপনীত করে একে একটি উন্নত শাস্ত্রে রুপান্তরিত করেন। এ বিষয়ে ডক্টর লেবান লেখেন
আরবরা রসায়নশাস্ত্র বিষয়ে গ্রীকদের থেকে যা কিছু পেয়েছিলেন তা ছিলো খুবই অপ্রতুল। গ্রীকরা যেসব বড়ো বড়ো যৌগিক পদার্থ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলো, আরবরাই সেগুলো আবিষ্কার করেন। (তামাদ্দুনে আরব)
ডক্টর লেবান মুসলিম বিজ্ঞানী জাবের বিন হাইয়ান সম্পর্কে লেখেনÑ
জাবের বিন হাইয়ানের গ্রন্থাদিতে এমন অনেক যৌগিক পদার্থের আলোচনা রয়েছে, ইতিপূর্বে সেগুলো দুনিয়ার মানুষদের অজ্ঞাত ছিলো। তার গ্রন্থসমূহেই প্রথম বাস্তব রাসায়নিক কর্মপদ্ধতি বিধৃত হয়েছে।
এ সূত্রসমূহ থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহে প্রমাণিত হয়, রাত দিন প্রচেষ্টা চালিয়ে মুসলমানরাই রসায়নশাস্ত্রে নব নব জ্ঞানার্জন করেন এবং এ শাস্ত্রকে সর্বনি¤œ থেকে উন্নতির সর্বো” স্তরে উপনীত করেন। মুসলমানরা প্রথম প্রথম এ শাস্ত্রের প্রতি মূলত এ উদ্দেশেই মনোযোগ আরোপ করেন যে, তারা এর দ্বাারা স্বর্ণ রৌপ্য প্রস্তুতে সফল হবেন। যদিও তারা স্বর্ণ-রৌপ্য তৈরীর অভীষ্টলাভে সফল হননি, কিন্তু প্রতিটি বস্তুর সংমিশ্রণ এবং যৌগ সৃষ্টিতে তারা নব নব মূলনীতি এবং রীতিনীতির ওপর জ্ঞান লাভ করেন। ডক্টর লেবান রসায়নশাস্ত্র বিষয়ক অনুসন্ধান ও গবেষণার আলোচনায় সেসব ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের বিভ্রান্তিকর বর্ণনাকে জোরালোভাবে খন্ডন করেন, যারা মুসলমানদের মর্যাদাকর বৃহৎ কীর্তিসমূহকে তুচ্ছ নগণ্য প্রতিপন্ন করার ভ্রান্ত প্রচেষ্টার আশ্রয় নিয়েছেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাস এবং আবিষ্কার সমূহের আলোচনায় রজার বেকনকে বারুদের আবিষ্কর্তা বলেছেন। ফরাসী ঐতিহাসিক লেবান ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের এ বর্ণনা ভুল প্রতিপন্ন করে প্রমাণ করেছেন, রজার বেকন বারুদের আবিষ্কর্তা নন; বরং তিনি বারুদের সংস্কারক ছিলেন। বারুদ সম্পর্কে মুসলমানদের রচিত প্রাচীন তালিকা রজার বেকনের হস্তগত হয়েছিলো এবং তিনি আরবদের প্রাচীন তালিকারই সংস্কার সংশোধন করেন। তিনি বারুদের আলোচনায় লেখেন
র‌্যানো ও ফাদের গবেষণা পর্যালোচনা এবং তাদের পূর্বসূরি ককেসরী, আঁন্দ্রে প্রমুখের বারুদ প্রভৃতি রাসায়নিক দ্রব্যের গবেষণা পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে, আরবরাই বারুদের প্রথম আবিষ্কারক। তোপ এবং ব্রুকও তারা আবিষ্কার করেছেন। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে ডক্টর লেবান বারুদ কখন কোথা থেকে কিভাবে ইউরোপীয়দের হস্তগত হয় এবং সর্বপ্রথম কখন ইউরোপীয়রা বারুদ ব্যবহার করেছে, সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি লেখেনÑ
ইউরোপীয়রা ১৩৪৬ খস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ক্রেসীর যুদ্ধে সর্বপ্রথম তোপ ব্যবহার করে, কিন্তু আরবদের রচিত বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়, এর অনেক আগে থেকেই সেখানে তোপের ব্যবহার ছিলো। সামনে অগ্রসর হয়ে প্রখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের সূত্রে ডক্টর লেবান লেখেন
১২৭৩ খস্টাব্দে মরক্কোর শাসক আবু ইউসুফ সেজেলমাসা এলাকা ঘেরাও করেন। তিনি ঘেরাওয়ের অস্ত্রশস্ত্র শহরের সম্মুখভাগে স্থাপন করেন। এসব অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিলো ছোটো মেনজানিক (তোপনিক্ষেপক যন্ত্র), যা দ্বারা লৌহকণা বর্ষণ করা হতো। এসব লৌহকণা পেছনের সিন্দুকে পোরা হতো, এর পেছনে থাকতো বারুদ, যাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হতো। এ ঘেরাওকালে ইংরেজ কান্ট ডারবী এবং সলেসরী সেখানে বিদ্যমান ছিলেন। তারা বারুদের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন এবং এ নবলব্ধ অভিজ্ঞতা স্বদেশে বহন করে নিয়ে যান। সেজেলমাসা ঘেরাও ঘটনার চার বছর পর অনুষ্ঠিত ক্রেসী যুদ্ধে ইউরোপীয়রা সর্বপ্রথম তোপ বারুদ ব্যবহার করেন।
এ প্রসংগে এটা বিশেষ আলোচনাযোগ্য বিষয় যে, আরবদের প্রাচীন গ্রন্থে বারুদ প্রস্তুত তালিকায় বিভিন্ন বস্তুর যে পরিমাণ সন্নিবেশিত হয়েছে, আজও ইউরোপে কমবেশী সে পরিমাণই ব্যবহৃত হচ্ছে। আজকাল ইউরোপে ব্যবহৃত বারুদের ওজন এবং বিভিন্ন একক উপাদানের সাযুজ্য থেকে মুসলমানরাই তোপবারুদের আবিষ্কারক এবং সর্বপ্রথম ব্যবহারকারী এ চিন্তাধারার সহায়তাই শুধু হয় না; বরং সত্যায়নও হয়ে যায়।

সূত্র ” মুসলিম ইতিহাসের গৌরবগাথা

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY