ইউরোপীয় দেশসমুহে ইসলামী ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতি

মুসলিম ইতিহাসের গৌরবগাথা

0
425

ইউরোপীয় দেশসমুহে ইসলামী ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতি
মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শফি (র.)

ইসলাম যখন ইউরোপীয় দেশসমূহে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করে এবং গেুন ও পর্তুগাল ইসলামের প্রাথমিক অবস্থানস্থলে পরিণত হয়, তখন অর্ধ শতাব্দী অতিবাহিত না হতেই স্থানীয় বার্বার ভাষা বিদায় গ্রহণ করে। গেুন ও পর্তুগাল আরব দেশের একটি পরিবারে পরিণত হয়। শুধু ভাষার ক্ষেত্রেই নয়; বরং ইউরোপের সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাহ্যিক ধরন ধারণ, সভ্যতা সংস্কৃতি ও সামাজিকতায় মুসলমানদের অনুকরণকে গর্বের বিষয় বলে ভাবতে থাকে। শুধু এ দেশ দুটোই নয়; বরং আশপাশের ফ্রান্স প্রভ”তি দেশের সমাজ সভ্যতাও এর ন্িরত প্রভাব প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকেনি।

শায়খ মোহাম্মদ কুর্দ আলী মিসরী যিনি মিসরে মাজমায়ে এলমীর প্রধান, তিনি নিজের গেুন সফরের বৃত্তান্তে গেুন ও পর্তুগালে স্বচক্ষে দেখা ঘটনা এবং এ দুটি দেশের অতীত বর্তমানের একটি তুলনামূলক আলোচনা করে লেখেন
শুধু সেসব দেশই ইসলামী ভাষা ও সামাজিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়নি, যেগুলো ইসলামের অধীনস্থ হয়েছে; বরং পাশ্ববর্তী অঞ্চলের দেশসমূহও ইসলামী ভাষা এবং সামাজিকতার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। জালালুকা, লিউতিউন ও নারযারিউন এলাকার সমঝদার মানুষেরা রীতিমতো আরবী ভাষা শিখতো। তারা মুসলমানদের সভ্যতা সংস্কৃতি ও সামাজিকতার প্রতি এতোটাই আক”ষ্ট ছিলো যে, নিজেদের ধর্মীয় মূলনীতিসমূহ পরিহার করে মুসলমানদের বাহ্যিক বেশ ভূষা, অভ্যাস আচরণ, রীতিনীতি গ্রহণ করতে শুরু করে এরা মুসলমানদের মতো নিজেদের  মেয়েদেরও পর্দায় রাখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। (গাবেরুল আ্রালুস ওয়া হাযেরুহা, পৃষ্ঠা ৩৯)

দুখের বিষয়, আজ আমরা কি থেকে কি হয়ে গেলাম, কোথা থেকে কোথায় আমরা উপনীত হলাম! পূর্ববর্তীদের এ অযোগ্য অথর্ব উত্তরাধিকারীরা কিভাবে তাদের সম্মান মর্যাদার নিশানাটুকু পর্যন্ত মুছে ফেলে অন্যদের গোলামীর জিঞ্জির নিজেদের হাতে গলায় পরে নিলাম। অযোগ্য অথর্ব এ উত্তরসুরিরা তাদের পূর্বসূরিদের স্থাপিত ইমারতের এক একখানা ইট এবং তাদের লাগানো গাছের একেকটি করে শেকড় সমেত উৎপাটিত করেছে। শত আফসোস! যেসব জাতিগোষ্ঠী আমাদের অনুকরণকে নিজেদের জন্যে গর্বের ধন ভাবতো, আজ আমরা তাদের অনুকারী অনুসারীতে পরিণত হয়েছি। আজ আমরা ভিন জাতির বাহ্যিক আচরণ ও বেশভূষা গ্রহণ করেছি, তাদের ভাষা গ্রহণ করেছি। আজ আমরা ইংরেজী ভাষার শব্দো”ারণকে গর্বের বিষয় ভাবছি। শুদ্ধ হোক আর না হোক, ভাঙ্গাচোরা অশুদ্ধ উ”ারণ হলেও ইংরেজী ভাষার শব্দ বটে! সহেব বাহাদুরের অনুকরণের বিনিময় তো কখনো না কখনো মিলবেই! আজ আমরা ইউরোপীয়দের অনুকরণে আমাদের মেয়েদের ঘরের বের করে পুরুষের কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে দাঁড় করিয়েছি।

এ অবস্থা দৃষ্টে স্বাভাবিকভাবে মুখে কবিতার পংক্তি এসে যায়। কবিতার পংক্তিগুলো হচ্ছে
নাম লই আমরা সম্মানিতদের, অথচ সর্ববিষয়েই তাদের  বিপরীত।
তাদের স্বভাব চরিত্রের নাম নিশানা মিটিয়েছি, স্বহস্তে খুইয়েছি তাদের সব গুণ বৈশিষ্ট্য।
চেহারা সুরতে বেশভূষায় আমরা তাদের বিপরীত,
অথচ সম্মানিতদের উত্তরাধিকারী হবার দাবী করছি।
সবার দৃষ্টিতে তোমরা হীন অপমানিত,
ভুল করেছো তো তোমাদের অপরাধ ক্ষমা হবে?
ইনসাফের সাথে বলো, তোমরাই কি সে সব পূর্বসূরির উত্তরসুরি?
যাদের নামে জগত ছিলো আলোকিত, বিশ^ময় যাদের করুণা ছিলো ব্যাপক।
যাদের অনুকরণকে অন্যেরা জানতো মর্যাদাকর, তারা ছিলো জগদ্ভাসীর পছ্রনীয় সম্মানিত।
আজও অপমান অপদস্থতা থেকে যদি তোমাদের থাকে কোনো আশ্রয়,
তা হচ্ছে একমাত্র পূর্বসূরিদের আদর্শের অনুসরণ।

আমরা মুসলমানরা প্রথমে ভিন জাতির বিশেষত ইউরোপীয়দের ভাষা ও বাহ্যিক বেশ ভূষা গ্রহণ করেছি এবং মনে করেছি, ঈমান ইসলামের সম্পর্ক তো অন্তরের সাথে। পোশাক আশাকের সাথে এর কি সম্পর্ক? বাহ্যিক বেশভূষা গ্রহণে সমস্যা কোথায়? কিন্তু অভিজ্ঞতা জানিয়ে দিয়ে গেছে, এটা ছিলো বিজলীর এক প্রবাহ, যা অন্তর ও মস্তিদ্দের ওপর মারা—গকভাবে ছেয়ে গেছে এবং এরই মাধ্যমে ইংরেজীপনা ও খস্টীয় স্বভাব আচরণ আমাদের অন্তরের অন্তস্তলে আসন পেতেছে।

একজন মানুষ প্রথমে শুধু ইংরেজী জুতা ব্যবহার করে এবং ভাবে, এতে তো আমি ইংরেজ বনে যাইনি, কিন্তু স্বল্প কালের ব্যবধানে সে দেখতে পাবে, এ ইংরেজী জুতাই তার দেহ থেকে ইসলামী পোশাক পাজামা নামিয়ে টাখনুর নীচ পর্যন্ত প্যন্ট মার্কা পাজামা পরতে তাকে বাধ্য করবে। অতপর এ ইসলাম বিরোধী পাজামা তার দেহ থেকে ইসলামী জামা এবং আবা নামিয়ে দেবে।

যখন দেখবে, দেহের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গসহ পার্লামেন্টর সদস্যরা পাশ্চাত্য রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে গেছে, তখন তার রাজার শিরমুকুটকেও বাধ্য হয়ে পার্লামেন্টর অধীনস্থ হতে হবে। ইংরেজী টুপি ইসলামী পাগড়ির স্থান দখল করবে। এবার যখন নিজেই বানোয়াট সাহেব বনে গেলো, তখন আর ঘরোয়া জীবনে প্রচলিত প্রাচীন রীতিনীতি ও রেওয়াজ প্রথা অবশিষ্ট রাখার কোনো দরকার নেই। এ কৃত্রিম সাহেব বাহাদুর এখন আর কোনো বিছানায় বসতে পারে না, দস্তরখানে বসে খেতে পারে না, বার বার নামাযের জন্য অযু করতে পারে না, নামাযে রুকু সাজদা করতে পারে না। ঘরের পুরনো ফার্নিচার বিদায়, পুরনো বেশভূষা বিদায়, রসম রেওয়াজ বিদায়, পবিত্রতা ও এবাদত বিদায়। দেখলেন তো! সামান্য এক জোড়া ইংরেজী জুতার আপদ কোথা থেকে কোথায় আপনাকে উপনীত করেছে এবং কিভাবে তা দ্ভীন দুনিয়া সব কিছু বরবাদ করে ছেড়েছে।

প্রক”তপক্ষে গোনাহের একটা ধারাক্রম রয়েছে। যখন মানুষ একটা গোনাহ করে, তখন দ্ভিতীয় আরেকটি গোনাহ আপনা আপনি আগের গোনাহের পিছু নেয়। এক হাদীসে এসেছে, নেক কাজের তাৎক্ষণিক বিনিময় হলো, একটা নেক কাজের পর আরেকটা নেক কাজের তাওফীক মেলে। পক্ষান্তরে গোনাহের তাৎক্ষণিক শাস্তি হলো, এক গোনাহের পর আরেকটি গোনাহে জড়িয়ে পড়তে হয়। (আদ দাওয়াউস সানী লি-ইবনে কাইয়েম)

আমরা আজ ইংরেজদের যুলুম অত্যাচার এবং অহংকারপূর্ণ আচরণের অভিযোগ করি। তাদের ম্র ভাবি এবং ম্র বলি। তাদের বিরোধিতাও প্রকাশ করি, কিন্তু আফসোস! যেসব অভ্যাস আচরণ, স্বভাব চরিত্র, নৈতিকতা ও সামাজিকতার কারণে তারা ঘৃণার যোগ্য, তা আমাদের রগরেশায় সংক্রমিত হয়ে গেছে। ইংরেজদের হ্রিুস্তানের মাটি থেকে তাড়াতে অনেককেই কর্মতৎপর দেখা যায়, কিন্তু অন্তর ও মস্তিদ্দ থেকে ইংরেজীপনা, হাবভাব, আচার আচরণ এবং হাত ও গলা থেকে তাদের গোলামীর জিঞ্জির নামানোর জন্য কাউকেই তেমন আগ্রহী দেখা যায় না। অথচ ইংরেজকে হ্রিুস্তান থেকে বিতাড়নের চাইতে ইংরেজীপনা পরিত্যাগ কোনো অংশে কম গুুত্বপূর্ণ ছিলো না।

প্রক”তই যদি আমাদের খস্টান ইংরেজদের প্রতি ঘৃণাবোধ থাকে, তা হলে আমাদের সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত আজই ইংরেজদের সর্বপ্রকার বেশভূষা, সামাজিক আচার আচরণ পরিত্যাগ করা, তাদের ভাষার ব্যবহারও প্রয়োজন এবং বাধ্যবাধকতার সীমা পর্যন্তই সীমিত রাখা, অত্যন্ত প্রয়োজন ব্যতীত ইংরেজী শব্দ ও ভাষা ব্যবহার না করা।

যেসব স্থানে ইংরেজদের পলিসি আমাদের ইংরেজী ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে বাধ্য করে রেখেছে, সেসব ক্ষেত্রেও এ প্রচেষ্টা থাকা কর্তব্য, যেন কোনো হ্রিুস্তানী লোক ইংরেজের পলিসি গ্রহণে বাধ্য হয়ে না পড়ে। প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে যেন রেলওয়ে ও ডাকটিকেট এবং যাবতীয় কাজকারবার আমাদের দেশীয় ভাষায় সাধিত হয়, হ্রিুস্তানী বিচারালয়ের সিদ্ধান্তসমূহ যেন স্থানীয় ভাষায় লিখিত হয়, যাতে আমাদের অন্তর ও মস্তিদ্দ খস্টানদের প্রভাব প্রতিপত্তি থেকে পবিত্র থাকে।

হাফেযে হাদীস আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র.) ষ্ক্রইকতিদাউস সেরাতিল মুস্তাকীম্ নামক স্বরচিত পুস্তিকায় ভাষার প্রভাব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যা বলেছেন তার মর্মার্থ হলোÑ
কোনো জাতির ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষের জ্ঞান বিবেক, নৈতিকতা ও দ্ভীনের ওপর সুগুষ্ট প্রভাব ফেলে।

দু”খের বিষয়! আজ মুসলমানদের দৃষ্টি এতোটাই ভাসাভাসা হয়ে গেছে যে, নিজেদের সম্মানিত পূর্বপুরুষের পরীক্ষিত অভিজ্ঞতালব্ধ মূলনীতি এবং তাদের বাতলানো রহস্য তাৎপর্য তাদের বুঝে আসে না। কোরআন হাদীসের বাণী শোনানো হলে মুসলমানদের অন্তর তা গ্রহণের জন্য অবারিত হয় না। পূর্বসূরি পুণ্যশীলদের প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তি ও মূলনীতি বাতলানো হলে তা তাদের দৃষ্টিতে গুরুত্ব বহন করে না। তারা ওলামায়ে কেরামকে পরামর্শ দিচ্ছে, আরবী ভাষার যা কিছু প্রভাব প্রতিক্রিয়া এখনও বেঁচে আছে তাও মিটিয়ে ফেলা হোক, জুমুয়ার খোতবা স্থানীয় ভাষায় পড়া হোক। আরবী ভাষার নামও যেন কারো মুখে না আসে। তাই সর্বশেষ আমরা সে জাতির কতিপয় ঘটনা উপস্থাপন করছি, যে জাতির অন্ধ অনুকরণ আমাদের ভাইদের নানা বিপদ মসিবত, অপমান অপদস্থতা ও হীনমন্যতার শিকারে পরিণত করে রেখেছে।

বলতে পারেন, ব্যাপক প্রচার প্রচারণা সত্ত্বেও হ্রিুস্তানে শতকরা কয় জন লোক ইংরেজী জানে? অথচ ইংরেজ নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকৌশলের ভিত্তিতে সব অফিস আদালতের কাগজপত্র, রেলওয়ে ও ডাকটিকেট এবং সব কাজকারবারে ইংরেজী ভাষার প্রচলন করে রেখেছে। তাই স্বদেশী ভাষায় বিজ্ঞ হ্রিুস্তানীরাও আজ ইংরেজদের অফিসসমূহে অন্ধের মতো ঘুরে বেড়ায়।

আপনি কি ভেবে দেখেছেন? কেন ইংরেজ এ কৌশল গ্রহণ করেছে? হ্রিুস্তানীদের ইংরেজী ভাষা শিক্ষায় বাধ্যকরণে তাদের উদ্দেশ্য কি ছিলো? চিন্তাশক্তিকে কিছুটা কাজে খাটালে এ কর্মকৌশল গ্রহণের পেছনে ইংরেজদের আসল উদ্দেশ্য একেবারে খোলামেলা হয়ে দেখা দেবে। সে উদ্দেশ্য ছিলো, সাধারণ হ্রিুস্তানী, বিশেষত মুসলমানরা একটা দ্ভীনী স্বভাব প্রকৃতির ধারক।

মুসলমান কোনো কাফেরের দাসত্ব বরণ করবে, ইসলাম কখনো তাদের এ অনুমতি প্রদান করে না। ইসলাম তো মুসলমানদের কাফের জাতিগোষ্ঠীর বেশভূষা এবং তাদের সামাজিকতা গ্রহণেরও অনুমতি দেয় না। এ কারণেই বর্তমান রাষ্ট্রশক্তি (ইংরেজ) নিজেদের এ কৌশল জাল বিস্তার করে মুসলমানদের ইংরেজী ভাষা শিক্ষায় বাধ্য করেছে। ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করতেই মুসলমানদের সভ্যতা সংস্কৃতি, সামাজিকতা আপনা আপনি বদলে গেছে। সামাজিকতা বদলে যাবার সাথে সাথে মুসলমানদের কাছে তাদের নিজেদের জাতীয় ও দ্ভীনী মানমর্যাদা অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হতে থাকে এবং ইংরেজদের সামাজিকতার বেড়ি গলায় পরাকে তারা এখন নিজেদের স্রৌর্য ভেবে চলেছে।
সূত্র ” মুসলিম ইতিহাসের গৌরবগাথা

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY