ইসলামের মধ্যপন্থার এক উদাহরণ

ইসলামের মধ্যপন্থা

0
134

ইসলামের মধ্যপন্থার এক উদাহরণ
মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শফি (র.)

অনারব বিশে^ ইসলাম ও আরবী ভাষা, আরবী পোশাক ও বাহ্যিক চালচলনের ব্যাপক প্রচার প্রসারে গৃহীত কর্মকৌশলেও প্রথম যুগের মুসলমানরা নিজেদের স্বতন্ত্র মর্যাদা বৈশিষ্ট্যের পরিচয়বাহী মধ্যপন্থা অবল¤œন করে এর সীমা সংরক্ষণের প্রতি যথাযথ খেয়াল রেখেছেন, ভিন্ন জাতির মাঝে যার নযির পাওয়া যায় না। তারা চাইতেন যেন যথাসম্ভব ত্বরিত বেগে আরবী ভাষা ব্যাপকতা লাভ করে, কিন্তু এ উদ্দেশ্যে উদ্ভুদ্ধকরণে তারা সীমা ডিঙ্গাতে দেননি, যাতে জোর জবরদস্তির সুযোগ সৃষ্টি হতে না পারে। তারা পৃথিবীর জাতিসমূহের এমন প্রয়োজনকে আরবী ভাষার ওপর ভিত্তিশীল রাখেননি, যা ব্যতীত জীবন অতিবাহিত করাই কষ্টকর হবে।

খোতবা বুঝা কোনো ফরয ওয়াজেব নয়, তা না বুঝলে কেউ গোনাহগার হবে না। অবশ্য এটা স্থানীয় লোকদের ইমাম বা শাসকের বক্তৃতাবুঝতে উৎসাহিত ও উদ্ভুদ্ধকরণে একটি মাধ্যম ছিলো। পক্ষান্তরে খৃস্টানরা এ লক্ষ্য অর্জনে মুসলমানদের সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থা অবল¤œন করে। তারা ভাষার এ তাৎপর্য সম্পর্কে যখন অবহিত হয়, তখন তারা নিজেদের ভাষা পৃথিবীময় ব্যাপকতর করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা শুরু করে। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে তারা মানুষের জীবন সংকীর্ণ করে তোলে। মানুষের ভ্রমণ, গৃহে অবস্থান, পারগুরিক লেনদেন, বেচাকেনা, জীবিকার্জন সব কিছুই তাদের ভাষা জানার ওপর নির্ভরশীল করে দেয়। যদি তাদের অদৃষ্টের বঞ্চনা ও তাদের ভাষার সংকীর্ণতা কঠোরতা না থাকতো, তা হলে নি:সন্দেহে আজ পৃথিবীময় ইংরেজী ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষার নাম নিশানাও থাকতো না।

আল্লাহ তায়ালা ইসলাম এবং আরবী ভাষাকে এ মর্যাদা দান করেছেন যে, যে দেশেই তা প্রবেশ করেছে, সেখানেই স্থানীয় সব ভাষার ব্যবহার প্রচলন রহিত করে দিয়ে সে নিজের স্থান করে নিয়েছে।
প্রখ্যাত ইউরোপীয় পন্ডিত গেম্ভাও লীবান আরবী ভাষার বিশ^জনীনতায় বিস্মিত হয়ে লেখেনÑ
আরবী ভাষা সম্পর্কে আমাদের তাই বলতে হয়, যা আমরা আরব ধর্ম (ইসলাম) সম্পর্কে বলেছি। আগে থেকে বিজয়ীরা যেখানে তাদের বিজিত অঞ্চলসমূহে নিজেদের ভাষা চালু করতে সক্ষম হয়নি, আরবরা সে ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছে। বিজিত জাতি গোষ্ঠীরা আরবদের ভাষাও গ্রহণ করেছে। আরবী ভাষা ইসলামী দেশসমূহে এতোটুকু প্রসার লাভ করে যে, অল্পদিনের মধ্যেই সেখানকার প্রাচীন ভাষাসমূহ, যেমন সুরইয়ানী, কিবতী, ইউনানী (গ্রীক), বার্বার প্রভৃতি ভাষার স্থান দখল করে নেয়। ইরানেও একটা দীর্ঘ সময়সীমা পর্যন্ত আরবী ভাষা প্রচলিত ছিলো।

যদিও পরবর্তীকালে নতুনভাবে স্থানীয় ফার্সী ভাষা আরবী ভাষার স্থান দখল করে, কিন্তু এ সময়ও ওলামায়ে কেরামের লেখার ভাষা ছিলো আরবী। ইরানে প্রায় সকল জ্ঞানগত বিষয় এবং ধর্মীয় গ্রন্থাদি আরবী ভাষায়ই লিখিত হয়েছে। এশিয়ার এ অঞ্চলে আরবী ভাষার সে অবস্থা ছিলো, মধ্যযুগে ইউরোপে ল্যাটিন ভাষার অবস্থা তাই ছিলো। তুর্কী যারা আরবদের রাজ্য জয় করেছে, তারাও আরবদের লিখন পদ্ধতিই গ্রহণ করেছে। আর এ সময় তুর্কীদের দেশে স্বল্প মেধা স্বল্প যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা পর্যন্ত খুব ভালোভাবে এবং সহজে কোরআন মজীদ বুঝতে পারতো।

অবশ্য ইউরোপের ল্যাটিন জাতি গোষ্ঠীসমূহ হচ্ছে একটি উদাহরণ, যেখানে আরবী ভাষা প্রাচীন স্থানীয় ভাষাসমূহের জায়গা দখল করেনি। কিন্তু ইউরোপের ল্যাটিন অঞ্চলেও মুসলমানরা নিজেদের প্রতিপত্তির তিনটি নিদর্শন রেখেছেÑমোসিয়েডোজী ও মোসিয়ে ইংলেম্যান মিলে স্পেন এবং পর্তুগাল ভাষার সেসব শব্দ, যেগুলো আরবী ভাষা থেকে এসেছে, সেগুলোর একটা অভিধান তৈরী করে ফেলেন। ফ্রান্সেও আরবী ভাষা নিজের বিরাট প্রভাব রেখেছে।

ফরাসী মনীষী মোসিয়ে সুদী ইউ অত্যন্ত ঠিক কথাই লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, উদরন ও শোজম্যানদের ভাষাও আরবী শব্দে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাদের নামের ধরন ধারণও আরবীর মতোই। ফরাসী ভাষার এক অভিধান প্রণেতাÑ যিনি শব্দসমূহের মূলধাতু সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, ফ্রান্সে আরবদের অবস্থানের প্রভাব না বাকরীতির ওপর পড়েছে, আর না ভাষার ওপর পড়েছে।

এখানে ইউরোপীয় দেশসমূহে আরবী ভাষার যে প্রভাব প্রতিপত্তি ও বিস্তৃতির ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে, তাতেই প্রতীয়মান হয়, শেষোক্ত অভিধান প্রণেতার কথার মূল্য কতোটুকু। অত্যন্ত বিস্ময়ের কথা, এখনও এমন কিছু শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন, যারা এই অভিধান প্রণেতার মতো নিরর্থক আলোচনার পুনরাবৃত্তি করেন।

আলোচ্য ফরাসী অভিধান প্রণেতার নিরর্থক বর্ণনা তো স্বয়ং ইউরোপীয় মনীষী গেম্ভাও লীবান প্রকাশ করে দিয়ে তাকে আর খ-নযোগ্য রাখেননি। তবে আমরা গেম্ভাও লীবানের সাথে এতোটুকু কথা যোগ করে বলতে চাই, জ্ঞান ও বিদ্যাবত্তার এ কাঙ্গাল অভিধান প্রণেতা হয়তো ইউরোপের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিলেন, নতুবা স্বজাতির অন্যায় পক্ষপাতিত্বের কারণে মানুষকে বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করতে চেয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষী, ইউরোপীয় দেশসমূহে ইসলাম প্রবেশের পর পঞ্চাশ বছরও অতিবাহিত হতে পারেনি, এরই মাঝে তথাকার সর্বসাধারণ অধিবাসী বার্বার এবং ল্যাটিন ভাষার কবর রচনা করে। ইউরোপীয় দেশসমূহে খস্টান পাদ্রীরা নিজেদের ধর্মের নামায ও এবাদতে পঠিত বিষয়ের অনুবাদ আরবী ভাষায় করে তাদের জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করতেও বাধ্য হয়। (গাবেরুল আ্রালুস ওয়া হাযেরুহা, পৃষ্ঠা ৩৮)
সারকথা, মুসলমান শাসকরা ভাষা বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অর্জনের সাথে সাথে জনসাধারণের জীবনকে সহজ করার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইউরোপীয় জাতিসমূহের মতো মুসলমান শাসকরা জোর জবরদস্তি করে আরবী ভাষা গ্রহণে কাউকে বাধ্য করেননি। এদিক থেকে ইসলাম যেমন অপরাপর দ্ভীনকে রহিত করে দিয়েছে, তেমনি আরবী ভাষাও অপরাপর ভাষাকে রহিত করে দেয়ার একটি স্বীক”ত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বলতে পারেন? পূর্বযুগের মুসলমানরা আরবী ভাষার প্রচার প্রসারে এ প্রচেষ্টা কেন চালিয়েছেন? এ প্রচেষ্টার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তো প্রকাশ্য এবং সর্বজনবিদিত এবং তা হলো, শাসক শাসিতের মাঝে যোগাযোগ এবং অবাধ সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। তাদের দ্ভিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো, কোরআনের ভাষা মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলে তখন তাদের মাঝে কোরআনী স্বভাব চরিত্র এবং সামাজিকতাও ধীরে ধীরে সৃষ্টি হবে। সুতরাং আরবী ভাষার ব্যাপক প্রসারের ফলে এই উভয় লক্ষ্যই অর্জিত হয়। আজকাল ইউরোপ সব জান্তার গর্বে গর্বিত। তারা নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, নাগরিকতা ও রাষ্ট্রনীতির মালিক মোখতার বলে মনে করে। নীচের এ উদাহরণের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।

সূত্র: মুসলিম ইতিহাসের গৌরবগাথা

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY