মুসলিম মনীষীদের শিক্ষাজীবনে দারিদ্র এবং ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণ

0
759

শিক্ষাজীবনে দারিদ্র এবং ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণ
মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শফি (র.)

হযরত ইমাম মালেক (র.) :

হযরত ইমাম মালেক (র.) বলেন, দারিদ্র ও ক্ষুধার স্বাদ আস্বাদন না করা পর্যন্ত কারো (দ্ভীনী) এলেম অর্জিত হয় না। অতপর তিনি হাদীস শাস্ত্রের ইমাম হযরত রবিয়া (র.)-এর দরিদ্রতা নিস্বতার আলোচনা করেন। এলেম অনে^ষণহেতু তাকে এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে যে, তিনি ঘরের চাল বিক্রি করে দিয়েছেন। এমনকি তিনি নিচুমানের খেজুর এবং আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত মোনাক্কা খেয়ে জীবন ধারণ করতেন।

ইমাম আবু ইউসুফ (র.)-এর শিক্ষাজীবন
ইবরাহীম বিন জাররাহ (র.):
ইবরাহীম বিন জাররাহ (র.) বলেন, আমি স্বয়ং হযরত ইমাম আবু ইউসুফ (র.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি এলেম অনে^ষণ করেছি এবং আমার সাথে এতো লোক এলেম অনে^ষণ করেছেন, যাদের সংখ্যা আমি এখন গুনেও শেষ করতে পারবো না, কিন্তু এলেম থেকে সে ব্যক্তিই উপক”ত হয়েছে, দু”খ যার অন্তরকে রঞ্জিত করেছে। দ”ুখে অন্তরকে রঞ্জিত করেছেÑ এ কথার অর্থ, হযরত ইমাম আবু ইউসুফ (র.)-এর ছাত্র জীবনে ঘরের লোকেরা তার জন্যে দুধে রুটি ছেড়ে দিয়ে রাখতো। সকাল বেলা রুটি দুধ খেয়েই তিনি শিক্ষা মজলিসে হাযির হতেন। শিক্ষা মজলিস থেকে ফিরেও দুধ রুটিই আহার করতেন। সুস্বাদু খাদ্য রান্না হবে আর তা খাবেন, এ জন্যে অপেক্ষায় থেকে সময় নষ্ট করতেন না। তার সমপাঠীরা হালুয়া ইত্যাদি প্রস্তুত করতে লেগে সবকের একাংশ থেকে বঞ্চিত থেকে যেতো।

ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর শিক্ষাজীবন
হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, কেউই ধন সম্পদ এবং সম্মান প্রতিপত্তি দ্ভারা দ্ভীনী এলেম অর্জনে সফলতা লাভ করতে পারেনি; বরং দ্ভীনী এলেম অর্জনে সে ব্যক্তি সফল হয়, যে অসচ্ছল জীবন যাপন করার, সম্মানিত ওস্তাদদের সামনে নিজেকে অবমানিত করার এবং এলেম ও ওলামায়ে কেরামকে ইযযত সম্মান করার কর্মধারা গ্রহণ করে। হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, আমি একেবারে ছোটোকালেই পিত”হারা হই। আমার মা খুব কষ্টে আমাকে লালন পালন করতেন। আমি লেখাপড়ার উপযুক্ত হলে মা আমাকে মক্তবে পাঠিয়ে দেন। আমার মক্তব জীবনে শিক্ষকের আর্থিক কোনো প্রকার সেবা করার সংগতি আমার মায়ের ছিলো না। তাই আমি আমার শিক্ষককে এ কথায় সম্মত করি, আপনি কোথাও গেলে অথবা কোনো প্রয়োজনে মক্তবে পড়াতে না পারলে তখন আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত”পে কাজ চালিয়ে যাবো। এভাবেই মক্তবে আমি কোরআন মজীদ সমাপ্ত করি।

এরপর থেকে আমি ওলামায়ে কেরামের শিক্ষা মজলিসে হাযির হতে শুরু করি। সম্মানিত ওস্তাদদের থেকে কোনো হাদীস অথবা মাসয়ালা শুনতে পেলে আমি তা লিখে রাখার চেষ্টা করতাম, কিন্তু আমার মায়ের কাছে এতো পয়সা ছিলো না, যা দ্ভারা আমি কাগজ কিনতে পারি। তাই আমি একটা পদ্ধতি অবল¤œন করি এবং তা হচ্ছে, পরিদ্দার পরিচ্ছন্ন কোনো হাড় নযরে পড়লে আমি তা উঠিয়ে নিতাম এবং সে হাড়ের ওপরই লিখতাম। হাড়খানা লেখায় পূর্ণ হয়ে গেলে তা কোনো ঠিলিয়ায় (কলসিতে) রেখে সংরক্ষণ করতাম। এ অবস্থায়ই আমার শিক্ষা জীবনের একটা অংশ অতিক্রান্ত হয়। এর পর ঘটনাক্রমে ইয়ামানের শাসনকর্তা আমাদের এলাকায় এলে কোরায়শের কিছু সম্মানিত লোক তার কাছে সুপারিশ করেন, তিনি যেন আমাকে তার সাথে রাখেন। তিনি সান্ের এ সুপারিশ মঞ্জুর করেন, কিন্তু শাসকদের সাহচর্যে অবস্থানের উপযোগী এক জোড়া কাপড় প্রস্তুত করে দেবার আর্থিক সংগতি আমার মায়ের ছিলো না। একান্ত বাধ্য হয়েই আমার মা ষোল স্বর্ণ মুদ্রায় নিজের চাদরখানা বিক্রি করে তা দ্ভারা আমাকে পোশাক বানিয়ে দেন।

আমি ইয়ামানের শাসনকর্তার সাথে সেখানে পৌঁছি। তিনি আমাকে একটা কাজ দেন। আমি ক”তজ্ঞতা সহকারে তা গ্রহণ করি। অতপর তিনি আরও কাজ বাড়িয়ে দেন এবং বাড়াতেই থাকেন। এ সময় ইয়ামানের কিছু লোক ওমরা অদায়ের উদ্দেশে মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়। তারা মক্কাবাসীর কাছে আমার ভালো কাজের প্রশংসা করে, এতে আমি মানুষের কাছে বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠি। এরপর আমি ইয়ামান থেকে নিজের জন্মভূমি মক্কা শরীফে আগমন করি এবং ইবনে আবী ইয়াহইয়ার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশে সেখানে গমন করি। তিনি আমাকে ভর্ৎসনা তিরন্ডার করে ধমকিয়ে বললেন, তুমি আমাদের সাহচর্যে অবস্থান করো, এতদসত্ত্বেও এমন এমন কাজ করো। অর্থাৎ, শাসকবর্গ এবং আমীর ওমরার সাথে অবস্থান করো।

হযরত সুফিয়ান সাওরী:
এরপর আমি হযরত সুফিয়ান সাওরী (র.)-এর সমীপে উপস্থিত হই। তিনি আমাকে সতর্ক করেন, তবে অন্যভাবে। তিনি অত্যন্ত ভদ্রভাবে আমাকে বললেন, আমি তোমার ঘটনা শুনেছি। যা শুনেছি সেটা আমার পছ্র হয়নি। তোমার ওপর এলেম প্রচার প্রসারের যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তুমি সে ফরয দায়িত্ব আদায় করোনি। যা হোক, যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। ভবিষ্যতে তোমার ওপর অর্পিত এলেম প্রচার প্রসারের গুরুদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে।
হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, ইবনে আবী ইয়াহইয়ার নসীহত উপদেশের তুলনায় হযরত সুফিয়ান সাওরী (র.)-এর উপদেশ আমার ওপর অনেক বেশী প্রভাব বিস্তার করে। তাই আমি সরকারী চাকরি ছেড়ে দেই।

হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) :
হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, ইমাম আযম আবু হানীফা (র.)-এর ছাত্র হযরত ইমাম মোহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী (র.) থেকে আমি যে পরিমাণ এলেম অর্জন করেছি, লেখা সম্ভব হলে সেসব এক উটের বোঝা হবে। তিনি আরও বলেন, যে এলেম অর্জনের জন্যে সামান্য সময়ের অপমান অপদস্থতা, দুখ কষ্ট বরণ করে নিতে সম্মত হয় না, সে চিরকাল মূর্খতাজনিত অপমান অপদস্থতা আর অসম্মানের কাছে ব্রী হয়ে থাকে।

হযরত আলী (রা.) :
হযরত আলী (রা.) এক ভাষণে বলেন, তোমরা খুব ভালোভাবে বুঝে নাও। মানুষ সে কাজের সাথেই সম্পৃক্ত হয় যা সে ভালোভাবে সম্পাদন করতে সক্ষম। আর প্রত্যেক মানুষেরই সম্মান মর্যাদা, অবস্থান সে কাজ দ্ভারাই চি€িত নির্ধারিত হয়, যে কাজ সে ভালোভাবে জানে। তাই তোমরা এলেম অর্জন করে পরগুরে এলেম সম্পর্কিত কথাবার্তাই বলো, তাহলে তোমাদের সম্মান মর্যাদা প্রকাশ পাবে।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, হযরত আলী (রা.)-এর উক্তি প্রত্যেক মানুষের সম্মান মর্যাদা সে কাজ দ্ভারাই নির্ধারিত হয় যা সে ভালোভাবে জানে এমন এক বাক্য, যার নযির কোনো জ্ঞানী বিজ্ঞজনের উক্তিতেই নেই। অনেক কবিই উল্লিখিত বাক্যাংশ ভিত্তি করে কবিতা রচনা করেছেন।
হযরত কাতাদা (রা.) বলেন, কারো জন্যে তার এলেম যদি  যথেষ্ট হতো, তবে তা হযরত মূসা (আ.)-এর জন্যেই হতে পারতো। আল্লাহ তায়ালা তাকে যে এলেম দান করেছিলেন, সমকালে তার নযির ছিলো না। এতদসত্ত্বেও তিনি কোরআনের ভাষায় হযরত খেযের (আ.) সমীপে নিবেদন করেনÑ
ষ্ক্রআমি কি আপনার সংগে অবস্থান করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সে হেদায়াতের শিক্ষা  প্রদান করবেন, আল্লাহর তরফ থেকে যা আপনাকে দান করা হয়েছে।
সূত্র ” মুসলিম ইতিহাসের গৌরবগাথা

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY