সীরাতুন্নবী প্রদর্শনী ১৯৭৭

0
202

সীরাতুন্নবী প্রদর্শনী ১৯৭৭
যে স্মৃতি আজো অম্লান

খাদিজা আখতার রেজায়ী

যারা বই পড়তে ভালোবাসেন তারা বইমেলা পছন্দ করবেন এটাই স্বাভাবিক। তারা হাজার কাজ হাজার ঝামেলার মধ্যেও কোনো না কোনোভাবে সময় বের করে নেন, ছুটে আসেন বইমেলায় প্রতিটি ষ্টল ঘুরে ঘুরে দেখেন, বই কেনেন এবং অনেক কষ্ট করে বইর বোঝা টেনে ঘরে গিয়ে মাঝে মধ্যে ঘরের অন্য সদস্যদের বকুনী ঝাকুনী সয়ে নেন। এরপরও বইগুলো খুলে পড়ে অনেক তৃপ্তি পান তারা। যারা বই পড়তে পছন্দ করেন না তারা মেলায় যান না, কোনো কারণে গেলেও বই কেনেন না তারা মনে করেন এটা একটা বেদরকারী কাজ সময় নষ্ট করা বা বই কিনে পয়সা অপচয় করা। তারা বলেন,‘‘বই পড়ে কবে কখন কোথায় কে মাষ্টার হয়ে গেছ্! আমি এ গ্রুপটার সাথে কোনো রকম তর্কে যেতে চাই না তবে আমি একজন বই ভক্ত মানুষ। আমি বই পড়তে খুবই ভালোবাসি।
বই পড়াটা যদি মানুষের গুণের মধ্যে পড়ে, তাহলে আমি বলবো এটা আমার জন্মগত। আমার আল্টা প্রচুর বই কিনতেন এবং সারাক্ষণ পড়া শোনার মাঝেই থাকতেন। আমার আল্টার পরিবারে আমার ভাই বোনেরা সবাই বই পড়তে ভালোবাসে। বাবার বাড়ী ছেড়ে এসে যাকে জীবন সংগী হিসেবে পেয়েছি তিনিও প্রচুর পড়েন, প্রচুর লেখেন এবং লিখে ও পড়ে তিনি অনেক আনন্দ পান। আমার ছেলে মেয়েরাও তাদের বাবার মতোই বইর পোকা তাদের ঘরে ইদানীং কিছু কিছু নতুন বইর পোকা এসে ঘর আলোকিত করেছে, আল হামদু লিল্লাহ বইর জগতে এসব নতুন জোনাকীরা যেনো এক সময় দুনিয়ার সব অন্ধকার দূর করে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দিতে পারে আমি এ দোয়াই করবো।
অনেকেরই আবার বই পড়া পছন্দ নয়। তাদের মন্তব্য ‘‘বই পড়া শুধু সময় নষ্ট করা’’ তারা বই মেলাও পছন্দ করেন না, বই মেলার কথা শুনলেই বলেনÑ ‘‘আর কাম পায় না, কয় দিন বাদে বাদেই কতোগুলো বইর দোকান নিয়ে বসে’’। অনেক সময় তারা বই মেলায় যান শুধু সমালোচনা করার জন্যে। এটা ঠিক হয় নাই, এটা ভালো হয় নাই, ওটা করার কোনো দরকার ছিলো না, আরো কতো কি!
আল হামদু লিল্লাহ! প্রতিবছর আমরা বই মেলা করি এবং আমাদের বই মেলা আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে খুবই সফল হয়। এ বছর তো বই মেলার সাথে অতিরিক্ত আকর্ষণ রয়েছে একটি মনোজ্ঞ ‘‘সীরাত প্রদর্শন্’ী’ এই সীরাত এক্সিবিশনের কথা শুনে কিছু লোক খুবই উৎসাহিত হয়েছেন এবং অনেকেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছেন কবে হবে? কোথায় হবে? আবার কিছু লোক মুখ ব্যদান করে বলেছেন এটা অসম্ভব, সীরাত এক্সিবিশন করা কি সহজ কথা!
এসব কথা শুনে আমরা অবাক হইনি, ভালো লেগেছে একথা ভেবে যে, তারা নবী (সা.)-কে ভালোবাসেন, তাই ভাবছেন এতো বড়ো কাজ এতো ছোট্ট জায়গায় কিভাবে হবে! নবীর জীবন নিয়ে এক্সিবিশন করতে হলে একটা বড়ো রকমের বাজেট দরকার, সেই সংগতি কি আমাদের আছে? আসলেই নেই। তাই বলে এটা নেই, ওটা নেই বলে বলে কি আমরা বসে থাকবো! যারা হাত গুটিয়ে বসে থাকে, আল্লাহ তায়ালার সাহায্য তারা পায় না। আমরা আমাদের সামর্থ অনুযায়ী সবই করতে চাই। সাহায্য আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে আসবেই। ‘‘হবে ন্ াবলে বসে থাকলে তো কিছুই হবে না, কোনোদিনই হবে না।’’
আমার মনে পড়ে, আজ থেকে প্রায় আটত্রিশ বছর আগের কথা। খুলনা শহরের খালিসপুরে আমরা প্রথম সীরাত এক্সিবিশন করেছিলাম। আমার জীবন সংগী হাফেজ মুনীর প্রথম আমাকেই তার ইচ্ছের কথাটা বলেছিলেন। আমি তো শুনে অবাক! চমৎকার বিষয় তো! কিন্তু কিভাবে হবে কাজটা! বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের সাথেও আলোচনা হলো। দ্এুকজন ছাড়া সবাই উৎসাহিত হলেন, কিন্তু সবারই উদ্বেগ কিভাবে হবে! কেমন হবে কাজটা!
তখনকার দিনে আজকের মতো ইন্টারনেট ছিলো না, কম্পিউটার মোবাইল ফেসবুক কিছুই ছিলো না। মানুষ ভাবতেই পারেনি এটা আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হবে। সীরাত প্রদর্শনী! এটা তো সাধারণ নাটক বা পুঁথিপাঠ নয়! অনেকেই নিরাশ করলো, কিন্তু যার প্লান, যার প্রস্তাব তিনি বসে থাকেননি। আর্টিষ্ট ভাড়া করে দিন রাত পরিশ্রম করে তিনি সব তৈরী করেছেন। কিছু জিনিস তিনি নিজেই লিখেছেন, কোনো ফটোকপিও ছিলো না, সবই ছিলো ম্যানুয়াল। অনেক স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এলো। ওর প্রস্তুতি, ওর প্লানে পরামর্শে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে অবশেষে শুরু হলো প্রথম সীরাত প্রদর্শনী।
তিন দিন ব্যাপী সীরাত প্রদর্শনীর প্রথম দিনেই মানুষের ভীড় দেখে আমরা অবাক হয়ে যাই। দলে দলে নারী-পুরুষ, আলেম-ওলামা, ইসলামী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদরা সবাই এসেছেন।
তিনদিনের সেই অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক মানুষ এসেছেন, এদের মধ্যে নারী দর্শকের ভীড় ছিলো বেশী। মহিলাদের আমি দেখেছি কাগজ কলম নিয়ে নোট করতে। তারা নোট করেছেন, আমাদের সাথে দেখা করে আরো অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন। বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি থাকলে হয়তো একে আরো অনেক সুন্দর করা যেতো। যাই হোক সেই সময়ের জন্যে হয়তো সেটাই যথেষ্ট ছিলো। সবাই উপভোগ করেছেন, আনন্দ পেয়েছেন পত্রিকাগুলোর প্রশংসাপত্র থেকে অন্তত সেটুকুই আমরা বুঝতে পেরেছি।
আলহামদু লিল্লাহ, আজ প্রায় চার দশক পর তথ্য প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগে বিশ^ জ্ঞানভান্ডারের প্রাণকেন্দ্র লন্ডন শহরে আবারও হচ্ছে সীরাত প্রদর্শনী। এবারও সেই একই ব্যক্তির উদ্যম উৎসাহে এটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারও চলবে তিনদিন পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।
আমরা কখনো নিরাশ হইনি এবং কখনো হবোও না ইনশাআল্লাহ। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের জ্ঞানে, বিবেক-বুদ্ধি বিবেচনায় যতোটুকু সম্ভাব্যÑ ততোটুকু আমরা করবো, আমাদের সফলতা আল্লাহর মেহেরবানীতে আসবেই।
আমরা জানি, আজ আটত্রিশ বছর পর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে, প্রদর্শনীর দর্শক এবং দর্শকদের চিন্তাধারা বদলেছে, শহর বদলেছে, ভেন্যুও বদলে গেছে; কিন্তু বদলায়নি সীরাতুন্নবীর চিরন্তন আদর্শের প্রতি নবীপ্রেমিকদের মোহ, বদলায়নি সেই মহামানবের আদর্শের প্রয়োজনীয়তাও।
আটত্রিশ বছর আগের মতো আজো মানুষ শান্তির অনে^ষণে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। আজো তারা দুশমনদের হাতে প্রতারিত হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, কিন্তু শান্তির প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন থেমে থাকেনি, তেমনি থেমে থাকেনি শান্তির পথে বাধাদানকারীদের আষ্ফালনও। তাই আজও প্রয়োজন সীরাত এক্সিবিশানের, প্রয়োজন রসূলের আদর্শকে বারবার সামনে তুলে ধরে পথহারাকে পথের সন্ধান দেয়ার। আজ মানুষরা আসলেই পথ হারিয়ে ফেলেছে। বড়ো-ছোটো ভেদাভেদ নেই, কেউ কাউকে মানে না, সম্মান দেয় না স্নেহ করে না। যার শক্তি আছে সেই দুর্বলের ওপর শাষন চালায়। কথায় কথায় জাহেলিয়াতের যুগের মতো মানুষ মানুষকে হত্যা করে, অত্যাচার করে, নির্যাতন করে, বন্ধু বন্ধুকে ছুরি মারে, গুলি করে, গালি দেয়, পিটিয়ে পিটিয়ে শিশুদের মেরে ফেলে। কন্যা সন্তানদের হত্যা করে। অন্ধকার যুগের নির্মম সব নিয়মগুলো আবার চালু হয়ে গেছে। অন্য পথে, অন্য পদ্ধতিতে অনেকটা আধুনিক টেকনিকে।
জাহেলিয়াতের সব জাহেলী কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে মানুষ মানুষের মতো জীবন যাপন শুষ্প করেছিলো নবীর পরশ পেয়ে। নবীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা পেয়েছিলো নতুন পথের দিশা, নতুন জীবন, নতুন পথ। আজ আবার যদি আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চাই তাহলে নবী করীম (স.)-এর জীবনকে আমাদের ভালো করে জানতে হবে, তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর জীবনকে অনুসরণ করতে পারলে প্রতিটি ঘরে প্রতিটি সংসারে, এখানে সেখানে, সবখানে শান্তি ফিরে আসবে আমরা হতে পারবো দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম।
তাই কামনা করি, আমাদের এই সীরাত প্রদর্শনী আল্লাহর যমীনে মহানবীর শান্তি ও নিরাপত্তা কর্মসূচীর প্রতি নিবেদিত হোক, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি মাইল ফলক হিসেবে কবুল কষ্পন। এবারের বইমেলা ও সীরাত প্রদর্শনীতে যারা যেভাবেই সহযোগিতা করেছেন, এসেছেন, দেখেছেন, উৎসাহ যুগিয়েছেন তাদের সবাইকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব করুন। আমীন ॥

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY