প্রিয় নবী (স) এর মদীনায় হিজরত

0
752

মদীনা তাইয়্যেবায় হিজরত
ইমাদুদ্দিন ইবনে কাছীর

রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মক্কা নগরীতে একাই বয়ে গেলেন। তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-কে দৃঢ়ভাবে মক্কায় থাকার নির্দেশ দেন। মক্কার মোশরেকরা কিছু মুসলমানকে জোরপূর্বক আটকে রাখে। হযরত আবু বকর (রা.) নিজের এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর সফরের সামান তৈরী করে রেখে যে কোনো মুহূর্তে মদীনায় যাওয়ার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুলল আলামীনের নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন। মোশরেকরা একদিন রাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-কে হত্যার মতো ঘৃণ্য ইচ্চা পোষণ করে। কয়েকজনকে তারা দরজার চৌকাঠে বসিয়ে দেয়, যাতে তিনি বের হতেই তাঁকে আক্রমণ করা যায়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন দরজা দিয়ে বের হন তখন কেউই তাঁকে দেখতে পায়নি। এক হাদীসে এসেছে,‘‘ তিনি তাদের ওপর কিছু মাটি নিক্ষেপ করেন এবং এভাবে আবু বকর (রা.)-এর ঘরে পৌঁছে যান’’।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর (রা.)-এর সাথে তার ঘরের একটা জানালা দিয়ে রাতের বেলায় বের হন। তিনি আবদুল্লাহ বিন উরাইকাতকে কিছু বিনিময় দিয়ে পথ প্রদর্শনের জন্য সাথে নিয়ে নেন। আবদুল্লাহ পাহাড়ী রাস্তা সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞ এবং পবিত্র ভূমি মদীনা অভিমুখী যাত্রীদের পথ প্রদর্শনে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি তখনও নিজ ধর্মে  অবিচল, তা সত্ত্বেও দ্জুনই তার ওপর আস্থা রাখেন। নিজেদের দ্ুেটা উটনী তার দায়িত্বে ছেড়ে দেন এবং তিন দিনের ভেতর তাকে গারে সাওর (সাওর পর্বত গুহা) পর্যন্ত পৌঁছার নির্দেশ দেন। তিনি যখন গুহা পর্যন্ত পেঁৗঁছেন তখনও কোরায়শরা জানতে পারেনি, তিনি কোন দিকে যাচ্চেন।

আমের বিন ফোহায়রা হযরত আবু বকর (রা.)-এর বকরী চরিয়ে রাতে ওখানে নিয়ে আসতো। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) তাঁদের খাদ্য পানীয় গারে সাওর পর্যন্ত পৌঁছাতেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আবু বকর (রা.) দিনের বেলায় মক্কায় যা কিছু শুনতেন রাতে এসে তা তাঁদের কাছে বলে যেতেন এবং তাঁরা তার থেকে শোনা বিষয়ে সতর্ক হয়ে চলতেন।

মক্কার মোশরেকরা তাঁদের সন্ধানে সাওর গুহা এবং তার আশেপাশের এলাকা পর্যন্ত এসে পৌঁছে। এমনকি তারা গর্তের মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাদের পায়ের ঠিক নীচেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর (রা.) বিশ্রাম করছিলেন, কিন্তু গর্তের মুখ তাদের চোখে পড়েনি। বলা হয় (আল্লাহই ভালো জানেন), একটি মাকড়সা জাল বুনে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলো এবং দুটো কবুতর সেখানে এসে ডিম দিয়েছিলো। নি¤েœাক্ত আয়াতের ভাবার্থ এটাইÑ
‘‘যদি তোমরা তাকে সাহায্য নাও করো, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেররা তাকে বের করে দেয় এবং তিনি দ্জুনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন এবং তারা উভয়েই গর্তের মধ্যে অবস্থান করছিলেন।্ (সূরা আত তাওবা, আয়াত ৪০)

তিন দিন পর ইবনে উরাইকাত দুটি উটনী নিয়ে আসেন এবং উভয়ে তাতে আরোহণ করেন। হযরত আবু বকর (রা.) আমের বিন ফোহায়রা (রা.)-এর পেছনে বসেন এবং আবদুল্লাহ বিন উরাইকাত আদদেলী তাদের আগে উটের ওপর আরোহণ করেন। কোরায়শরা ঘোষণা করেছে, যে ব্যক্তি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর (রা.)-এর মধ্যে থেকে কাউকে ধরে নিয়ে আসবে তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেয়া হবে। যখন তাঁরা মোদবেহ গোত্রের কাছ দিয়ে যাচ্চিলেন তখন সে গোত্রের প্রধান সোরাকা বিন মালেক জুশুম তাঁদের দেখে ফেলে। অতপর সে তার ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের সন্ধানে বের হয়। যখন সে কাছে আসে তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পায়।

চলার পথে হযরত আবু বকর (রা.) এদিকে ওদিকে দেখতেন যেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কোনো রকম কষ্ট না হয়, কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এমন করতেন না। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, সোরাকা বিন মালেক তো আমাদের একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম দোয়া করেন, এতে সোরাকার ঘোড়ার সামনের দ্পুা ভূমিতে ধসে যায়। এ দেখে সোরাকা বলতে লাগলো, আপনার দোয়ার কারণেই আমার ঘোড়ার পা ভূমিতে ধসে গেছে। আমার জন্যে দোয়া করুন। বিনিময়ে আমি আপনাদের অনুসন্ধানরত লোকদের ফিরিয়ে দেবো। সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম দোয়া করলে সোরাকার ঘোড়ার পা ভূমি থেকে বেরিয়ে আসে। এ সময় সোরাকা বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, আমাকে নিরাপত্তাপত্র লেখে দিন। হযরত আবু বকর (রা.) চামড়ার ওপর তাকে নিরাপত্তাপত্র লেখে দেন। সোরাকা ফিরে এসে মানুষজনকে বলতে থাকেন, ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই।
বিদায় হজ্জের পর সোরাকা মুসলমান হয়ে মদীনায় আগমন করেন এবং তাকে লিখে দেয়া নিরাপত্তাপত্র রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-কে দেখান। নিরাপত্তাপত্রের ওয়াদা মোতাবেক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাকে নিরাপত্তা দেন। তাঁর থেকে এমনটাই আশা করা হচ্চিলো। এ সফরে তিনি উম্মে মাবাদ (রা.)৪-এর তাঁবুর কাছ দিয়ে অতিক্রম করেন এবং দুপুরে সেখানে বিশন্দাম গ্রহণ করেন। এ সময় উম্মে মাবাদ (রা.) বকরীর মোজেযা দেখেন। তখন দুর্ভিক্ষ অনাবৃষ্টি চলছিলো। তা সত্ত্বেও বকরীর দুধের আধিক্য দেখে জ্ঞান বিবেক অস্থির পেরেশান হয়ে যাচ্চিলো।

মদীনায় প্রবেশ
ইতিপূর্বে আনসাররা সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মদীনার উদ্দেশে মক্কা শরীফ ত্যাগ করেছেন। তারা প্রতিদিন হাররা নামক এলাকায় তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকতেন। নবুওয়তের ১৩তম বছরের ১২ই রবিউল আউয়াল চাশতের সময় তিনি মদীনায় পৌঁছান। প্রতিদিনের ন্যায় আনসাররা অপেক্ষা করে বাড়ী ফিরে যান। এক ইহুদী প্রথম তাঁকে দেখতে পায়। সে নিজ বাড়ীর ছাদের ওপর থেকে চীৎকার করে ডাকতে লাগলো, হে বনী কায়লা, তোমাদের প্রতীক্ষিত লোক এসে গেছেন। আওস ও খাযরাজের একটা উপত্যকার নাম ছিলো কায়লা, এজন্যে ইহুদী লোকটি তাদের বনী কায়লা বলে স¤েœাধন করে। আনসাররা হাতিয়ার নিয়ে বের হন এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর সমীপে হাদিয়া পেশ করেন।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কোবায় কুলসুম বিন হেদামের বাড়ীতে, মতান্তরে সাদ বিন খায়সামার বাড়ীতে অবস্থান করেন। মুসলমানরা অবস্থানস্থলে এসে তাঁকে সালাম করতেন। অনেকেই ইতিপূর্বে তাঁকে দেখেননি। অধিকাংশ মুসলমান হযরত আবু বকর (রা.)-কেই নবী মনে করতে লাগলেন। কারণ, তিনি একটু বেশী বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তীব্র গরমে আবু বকর (রা.) একখানা কাপড় হাতে নিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর মাথার ওপর ছায়া দিলে লোকেরা সঠিকভাবে তাঁকে চিনতে পারে।

মদীনায় অবস্থান
চৌদ্দ দিন তিনি কোবায় থাকেন। এ সময় সেখানে মাসজিদে কোবার ভিত্তি স্থাপন করেন। তারপর আল্লাহর নির্দেশে সেখান থেকে রওনা হয়ে বনী সালেম বিন আওফ গোত্রে পৌঁছে দ্ব£নুন নামক উপত্যকায় জুমার নামায আদায় করেন।
গোত্রের লোকেরা তাঁকে সেখানে অবস্থান করার জন্যে আবেদন জানান। তিনি উত্তরে বললেন, আমার উটকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর আদেশ মোতাবেকই সেটি থেমে যাবে। উট হাঁটতে লাগলো আর প্রত্যেকেই তাঁকে তার ঘরে থাকার আবেদন করতে লাগলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উত্তরে শুধু বললেন, উটটি ছেড়ে দাও, তাকে বলে দেয়া হয়েছে কোথায় থামতে হবে।

উট বনী নাজ্জার মহল্লায় এসে বসে পড়ে। এখানেই এখন মাসজিদে নববী অবস্থিত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উট থেকে নামলেন না। উট পুনরায় হাঁটতে লাগলো। কিছু দূর যাবার পর এদিক সেদিক তাকিয়ে আবার পূর্বের স্থানে এসে বসে পড়ে। এবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উট থেকে নামলেন। এটা ছিলো নাজ্জার গোত্রের মহল্লা। আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) উটের হাওদা তুলে রসূলকে ঘরে নেন। তিনি এখানে মাসজিদ (মাসজিদে নববী) নির্মাণের জন্যে জায়গা খরিদ করেন। এ জায়গার মালিক ছিলো দ্জুন এতিম বালক। সেখানে খেজুর শুকানো হতো। তিনি সেখানে মাসজিদ নির্মাণ করেন। এটাই আজ মাসজিদে নববী নামে পরিচিত। মাসজিদের পাশে আহলে বায়তদের জন্যে কামরা তৈরী হয়। শুধু হযরত আলী (রা.) তখনও মক্কায় থেকে যান। রসূলের কাছে রাখা লোকদের গচ্চিত সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে তিনিও মদীনায় হাযির হন।

মোহাজের ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মদীনার ইহুদীদের সাথে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন এবং সন্ধি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এক দস্তাবেজ লিপিবদ্ধ করেন। ইহুদী পন্ডিত আবদুল্লাহ বিন সালাম মুসলমান হন। অন্যেরা তাদের কুফরীর ওপর কায়েম থাকে। ইহুদীদের তিনটি গোত্র ছিলোÑ (১) কায়নুকা, (২) নাযির ও (৩) কোরায়যা।

মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে তিনি ‘‘ভাই ভাইয়ের’’ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। ইসলামের সূচনাকালে ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে তারা একে অপরের উত্তরাধিকারীও হতেন। ভাই ভাইয়ের এ সম্পর্ক তাদের কাছে প্রকৃত নিকটত্মীয়তার চেয়েও অগ্রগণ্য ছিলো।

ইবনে হাযম তার ‘‘জাওয়ামেউস সীরাহ’’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, অভাবগ্রস্ত মোহাজেরদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের জন্যে আল্লাহ তায়ালা যাকাত ফরয করেন। কোনো কোনো মোহাদ্দেস বলেন, যাকাত ফরয হওয়ার সঠিক তারিখ তাদের জানা নেই।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY