ইসলামী বইমেলা ও সীরাত এক্সিবিশন

0
310

ইসলামী বইমেলা ও সীরাত এক্সিবিশন
অতুলনীয় এক আয়োজন
সালমান আহমদ

 

tn2
শনিবার দুপুরে ইসলামী বইমেলা প্রাঙ্গনে বসে আছি। আমার পাশে বসে আছেন ৯৩ বছর বয়েসের তফাদার সাহেব। তিনি ফরেস্ট গেইট থেকে বইমেলা এবং সীরাত এক্সিবিশন দেখতে এসেছেন।  মঞ্চে ভারী মিষ্টি গলায় কেউ একজন গোলাম মোস্তফার কবিতার এই চরণটুকু গাইছে , “নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি/ আমার মোহাম্মদ রসূল।/ কুলমাখলুকাতের গুলবাগে/ যেন একটি ফোটা ফুল।” তফাদার সাহেব মঞ্চের শিল্পীর সাথে গলা মেলানোর চেষ্টা করেন। শিল্পীর গান শেষ হলে তফাদার সাহেব বলে উঠলেন, ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।’
লন্ডন ইসলামী বইমেলা ২০১৫। ২৪ অক্টোবর দুপুর দেড়টায় মেলার উদ্ভোধন হয়। বইমেলা উদ্ভোধন করেন আল কোরআন একাডেমির চেয়ারম্যান ড. মুনির উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি উদ্ভোধন করেন এবারের বইমেলার অনন্য এক আয়োজন সীরাত এক্সিবিশনের। ‘একটি ভালো বই পড়–ন’ এই শ্লোগানে ২৪, ২৫ এবং ২৬ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার ভেন্যু ছিল এলএমসি’র হলরুম। বইমেলা ও সীরাত এক্সিবিশনের উদ্ভোধন হওয়ার পর নানা বয়েসের নারী-পুরুষ-শিশু দল বেঁধে এগিয়ে যান বইয়ের দোকান ও সীরাত প্রদর্শনীর গ্যালারির দিকে। তবে ভীড়টা জমে সীরাত প্রদর্শনীর গ্যালারিতে। সুন্দর চিত্রকর্ম, পোস্টার, ফেস্টুন, রোলআপ, ওয়াল ব্যানার, ক্যালিগ্রাফির এবং নানা অডিও ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রিয়নবীর ৬৩ বছরের জীবনের সম্ভাব্য সব দিক এবং বিভাগকে এই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন কর হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাফেজ ড. মুনির উদ্দিন আহমদ সমস্ত অজ্ঞতা, অন্ধকার ও অন্যায়কে দূরে ঠেলে দিয়ে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শে মানুষের জীবন গড়ার আহŸান জানান। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একমাত্র প্রিয়নবীর জীবনাদর্শই সমস্ত অজ্ঞতা, অন্ধকার ও অন্যায় দূর করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মুজিবুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাপ্তাহিক দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমুদ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মাওলানা আবদুল কাদের সালেহ, মুজিবুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রফেসর কবির উদ্দিন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. হাফেজ মনীর উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে, একটি ভালো বই পড়–ন। কারণ একটি ভালো বই যেমন একজন মানুষকে বদল দিতে পারে। তেমনি একটি খারাপ বইও তাকে বদলে দিতে পারে। তবে সে বদলে দেয়াটা কিন্তু মোটেই ভালো অর্থে নয়।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত দেশের ভেতরে-বাইরে যেভাবে হাজার হাজার বই বেরুচ্ছে, তার মাঝ থেকে পাঠকেরা যেন নিজেদের জন্য ভালো কিছু বই পছন্দ করতে পারেন; এই জন্যই আমাদের এই মেলার আয়োজন।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আল কোরআন একাডেমীর ইসলামী বইমেলা অনন্যসাধারন একটি আয়োজন। এবারের বইমেলায় সীরাত এক্সিবিশন মেলাকে আরও অনন্য করে দিয়েছে। আজকের এই বইমেলা এবং প্রদর্শনী থেকে আমাদের রাসূল সা. সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা ও জানার আছে। আমাদের জন্য সীরাত চর্চার একটি সংযোগ হোক এই বইমেলা। আল কোরআন একাডেমীর ইসলামী বইমেলা এক নজিরবিহীন জ্ঞানোৎসব হিসেবে পরিণত হচ্ছে।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে সাপ্তাহিক দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমুদ বলেন, ‘আল কোরআন একাডেমীর বইমেলার শ্লোগানটি ব্যতিক্রমী এবং সুন্দর। আমাদের সন্তানদের অবশ্যই ভালো বই পড়তে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। বইয়ের একটি কাহিনী যেমন মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তেমনি জীবনকে আবার ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে।
সীরাত এক্সিবিশন গ্যালারি : ‘মুহাম্মদ সা.’ এই নামে আমাদের সবটুকু আবেগ ও ভালোবাসা মিশে আছে। সীরাত এক্সিবিশন গ্যালারিতে শতাধিকেরও বেশি শিরোনামে মহানবী সা.-এর  জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। জীবনে অনেক সীরাতের বই পড়া হয়েছে। কিন্তু এখানে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। শত লোকের ভীড়ে, মানুষের ফাঁক গলে রাসূলের জীবন পড়ছি দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে। কখনও মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে, কখনও বিষাদে ভরে গেছে মন। কী মনোহর এবং হৃদয়গ্রাহী শিরোনামে নবী জীবন তুলে ধরা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনীর প্রথম অংশে উপস্থাপন করা হয়েছে, ‘নবী পরিবারের বংশ পরিচয়’, ‘যমযম কূপ খনন’, ‘প্রিয়নবীর পারিবারিক পরিচয়ের পটভূমি’, ‘প্রিয়নবীর নবুওয়তের আগের জীবন’। তারপর উপস্থাপন করা হয়েছে, ‘ওহীর বিভিন্ন ধরন’ এবং ‘প্রিয়নবীর দাওয়াতের বিভিন্ন পর্যায়’। নবী জীবনকে বুকে ধারন করে এইভাবে এগিয়েছে প্রদর্শনীর গ্যালারী। বইমেলায় আগত নতুন দর্শনার্থীদের প্রদর্শনীর গ্যালারি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছেন আল কোরআন একাডেমীর চেয়ারম্যান হাফেজ ড. মুনির উদ্দিন আহমদ।  বয়েসের ভাড়ে ন্যূজ তফাদার সাহেব আমার হাতটি শক্ত করে ধরে থাকেন। আমি বুঝতে পারি তার অন্তরে আবেগের ঝড় বইছে। এমন কোন পাষাণ হৃদয় নেই, যার মন এ প্রদর্শনী দেখে উথলা হবে না। আমরা একদল লোকের সাথে হাঁটছি। আমাদের সামনে থেকে প্রদর্শনীর গ্যালারির ধারাবিবরণ দিচ্ছেন ড. মুনির উদ্দিন আহমদ। জনতার কাতারে থেকে দেখছি সুন্দর সুন্দর শিরোনামে প্রিয় নবীর জীবন : ‘প্রিয় নবীর মদীনায় হিজরত’, প্রিয় নবীর মদীনা সনদ’, ‘এতিমের প্রতি দয়া’, ‘ক্ষুধায় তিনি কাতর ছিলেন’, ‘অসুস্থ ক্রীতদাসের প্রতি দয়া’, ‘ইহুদীর টাকা পরিশোধ,’ ‘দয়ার সাগর প্রিয়নবী’, ধৈর্য্যরে মূর্ত প্রতীক,’ ‘দাস দাসীর প্রতি দয়া,’ অতুলনীয় আতিথেয়তা,’ ‘উট বিক্রয়ের অবাক কান্ড’, ‘প্রতিবেশীর হক পালন’, ‘প্রিয় নবীর সৌন্দর্য চর্চা’, ‘খাবারের বেলায় প্রিয় নবীর নীতি,’ ‘প্রিয়নবীর প্রিয় ১২ টি খাবার ও পানীয়’, ‘প্রিয় নবীর প্রসাধনী,’ ‘প্রিয় নবীর পরিচ্ছন্নতা ও চিত্তবিনোদন’, ‘প্রিয় নবীর নিয়মিত পোশাক’, ‘প্রিয় নবীর বিনয় ও ভদ্রতা’, ‘সাধারণ লোকদের সাথে ব্যবহার’, ‘শিশু ও সাহায্য প্রার্থীদের সাথে ব্যবহার’। গ্যালারিতে প্রিয় নবীর সাংসারিক জীবনও তুলে ধরা হয়েছে : ‘প্রিয় নবী : একজন আদর্শ ¯^ামী,’ ‘স্ত্রীর প্রতি প্রিয় নবীর ভালোবাসা’। পশুদের সাথে প্রিয় নবীর আচরণ কেমন ছিলো তা উপস্থাপন করা হয়েছে এই শিরোনামে, ‘অবুঝ পাখী, অবলা জন্তুর প্রতি প্রিয় নবীর ভালোবাসা’। এইভাবে আরও অনেক শিরোনামে মহানবী সা.-এর ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাাষ্ট্রীয় জীবনকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘বিদায় ইয়া রাসূলুল্লাহ’ প্রদর্শনীর এই অংশে এসে মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়েছে। মনে হলো, রাসূল সা. যেন এইমাত্র বিদায় নিলেন।
বইয়ের দোকান : মেলার দ্বিতীয় দিন বিকেলবেলা এসে দেখি গতকালের সেই প্রাণচাঞ্চল্যে উদ্দীপ্ত পরিবেশ। সীরাত এক্সিবিশন গ্যালারি থেকে বইয়ের দোকানগুলোতে তার স্পন্দন ছড়িয়ে পড়েছে। আগত ব্যক্তিরা বেশ ¯^াচ্ছন্দ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আজকের দিনে দর্শনার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ-তরুণী এসেছেন। মেলার প্রবেশ মুখে স্টল নিয়ে বসেছে ‘ইস্ট লন্ডন বুক শপ’। কথা হয় ইস্ট লন্ডন বুক শপের ¯^ত্বাধিকারী আবুল খয়েরের সঙ্গে। বইমেলার সার্বিক দিক নিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রচুর মানুষ মেলা প্রাঙ্গনে আসছেন। বইও বিক্রি হচ্ছে ভালো। এবারের বইমেলায় সাথে সীরাত এক্সিবিশন যুক্ত হওয়ায় লোক সমাগম অনেক বেশি হয়েছে।’
মেলার মধ্যখানে সীরাত বিষয়ক বইয়ের স্টল নিয়ে বসেছেন ইকবাল মানসুর আহমদ। ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কিছু সীরাতের বই এই স্টলে স্থান পেয়েছে। এই স্টলটি মেলায় আগত দর্শকদের আলাদা নজর কেড়েছে। এই স্টলের সামনে ‘ছোটদের মহানবী’, ‘শিশুদের মহানবী,’ ‘আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ (দঃ)’, ‘দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’, ‘মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (স.)’, ‘মহানবীর কথা’, ‘সীরাতুন নবী’, ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন,’ ‘আলোর আবাবীল,’ ‘আর-রাহীকুল মাখতুম’, ‘প্রিয় নবী,’ ‘আল কোরআনের আলোকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল আরাবী’, ‘রৌদ্রময় ভূখন্ড’, ‘মহানবী মুহাম্মদ সা.’, ‘মুহাম্মদ সা. ইসলামের বার্তাবাহক’, ‘নবুয়্যত ও রিসালাত’, ‘ওসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সা.’ সহ অনেক সীরাতের বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ইকবাল মানসুর আহমদ জানালেন, সীরাতের বইগুলো তিনি ঢাকা ও কলকাতা থেকে অনেক কষ্ট করে জোগাড় করেছেন।
বইমেলার ছোটোকাগজ : ইসলামী বইমেলা ২০১৫ উপলক্ষে একটি ছোটোকাগজও বেরিয়েছে। প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে এই ছোটোকাগজটি বের হয়। ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ এই ছোটোকাগজটি সম্পাদনা করেছেন। এতে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং গতবারের মেলা বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘সীরাতুন্নবী প্রদর্শনী ১৯৭৭: যে স্মৃতি আজো অম্লান’ শিরোনামে চমৎকার একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখেছেন খাদিজা আখতার রেজায়ী। সাপ্তাহিক দেশ সম্পাদক তাইছির মাহমদু লিখেছেন ‘বই পড়ার সেকাল একাল’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ।
অবশেষে : মেলার তৃতীয় দিন সন্ধ্যা ছয়টায় আল কোরআন একাডেমীর চেয়ারম্যান ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ যখন মঞ্চে উঠলেন তখন বইমেলায় বাজলো বিদায়ের সুর। দীর্ঘ একবছর অপেক্ষার মিলনমেলা ভেঙ্গে যাবে এখন। এ বছর যেসব মানুষের সাথে দেখা হলো, আগামী বছর হয়তো তাদের দেখা পাওয়া যাবে না। এ বছর যেসব বই মেলায় এসেছে, সামনের মেলায় হয়তো তা পাওয়া যাবে না। তবুও নতুন কিছু দেখার ¯^প্নে আমরা থাকি উদ্বেলিত। আল কোরআন একাডেমীর চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন আহমদ তার সমাপনী বক্তব্যে সেই নতুনের জয়গান গাইলেন, ‘আমি ¯^প্ন দেখি এই বইমেলা আরও বড়ো হবে। আগামী বছর আমরা এই সীরাত এক্সিবিশনটা আরও সমৃদ্ধ করবো। নতুন প্রজন্মের মুসলিম তরুণদের জন্য আলাদা ইংরেজী ভাষার গ্যালারি হবে।’
তিনদিনের মেলা প্রাঙ্গন আক্ষরিক অর্থেই ছিলো শুদ্ধতায় ভরা। ‘বইমেলা’, ‘এক্সিবিশন’ এসব শব্দে এখন বরকতের গন্ধ পাচ্ছি। জীবনে অনেক বইমেলা এবং এক্সিবিশনে যাওয়া হয়েছে, এরকম অনুভূতি কোথাও হয়নি। সত্যিই অতুলনীয় এক আয়োজন।
সালমান আহমদ, সম্পাদক, আল আহরার

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY