পারা ৩: সূরা আল বাকারা, সূরা আলে ইমরান, কোরআন শরীফ: সহজ সরল বাংলা অনুবাদ

0
430

পারা ৩: সূরা আল বাকারা, সূরা আলে ইমরান
কোরআন শরীফ: সহজ সরল বাংলা অনুবাদ

২৫৩. এই (যে) নবী রসূলরা (রয়েছে) এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশী মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যার সাথে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মর্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন; আমি মারইয়ামের ছেলে ঈসাকে (কতিপয়) উজ্জ্বল নিদর্শন দিয়েছিলাম, অতপর পবিত্র রূহের মাধ্যমে তাকে আমি সাহায্য করেছি; আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাদের (আগমনের) পর যাদের কাছে এসব উজ্জ্বল নিদর্শন এসেছে তারা কখনো মারামারিতে লিপ্ত হতো না, কিন্তু (রসূলদের পর) তারা (দলে উপদলে) বিভক্ত হয়ে গেলো, অতপর তাদের মধ্যে কিছু লোক ঈমান আনলো আবার তাদের কিছু লোক (আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নবীকে) অস্বীকার করলো, (অথচ) আল্লাহ পাক চাইলে এরা কেউই যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হতো না, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাই করেন যা তিনি ইচ্ছা করেন।
২৫৪. হে ঈমানদাররা, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আমার দেয়া ধন সম্পদ থেকে (আমার পথে) ব্যয় করোÑ সে দিনটি আসার আগে, যেদিন কোনো রকম বেচাকেনা, বন্ধুত্ব ভালোবাসা থাকবেনা থাকবেনা কোনো রকমের সুপারিশ। (এ দিনের) অস্বীকারকারীরাই হচ্ছে যালেম।
২৫৫. মহান আল্লাহ তায়ালা, তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, তিনি অনাদি এক সত্তা, ঘুম (তো দূরের কথা, সামান্য) তন্দ্রাও তাঁকে আচ্ছন্ন করে না; আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তার সব কিছুরই একচ্ছত্র মালিকানা তাঁর; কে এমন আছে যে তাঁর দরবারে বিনা অনুমতিতে কিছু সুপারিশ পেশ করবে? তাদের বর্তমান ভবিষ্যতের সব কিছুই তিনি জানেন, তাঁর জানা বিষয়সমূহের কোনো কিছুই (তাঁর সৃষ্টির) কারো জ্ঞানের সীমা পরিসীমার আয়ত্তাধীন হতে পারে না, তবে কিছু জ্ঞান যদি তিনি কাউকে দান করেন (তবে তা ভিন্ন কথা), তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য আসমান যমীনের সব কিছুই পরিবেষ্টন করে আছে, এ উভয়টির হেফাযত করার কাজ কখনো তাঁকে পরিশ্রান্ত করে না, তিনি পরাক্রমশালী ও অসীম মর্যাদাবান।
২৫৬. (আল্লাহর) দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই, (কারণ) সত্য (এখানে) মিথ্যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি বাতিল (মতাদর্শ)-কে অস্বীকার করে, আল্লাহর (দেয়া জীবনাদর্শের) ওপর ঈমান আনে, সে যেন এর মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো, যা কোনোদিনই ছিঁড়ে যাবার নয়; আল্লাহ তায়ালা (সব কিছুই শোনেন) এবং (সবকিছুই) জানেন।
২৫৭. যারা (আল্লাহর ওপর) ঈমান আনে, আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন তাদের সাহায্যকারী (বন্ধু), তিনি (জাহেলিয়াতের) অন্ধকার থেকে তাদের (ঈমানের) আলোতে বের করে নিয়ে আসেন, (অপরদিকে) যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, বাতিল (শক্তিসমূহ)-ই হয়ে থাকে তাদের সাহায্যকারী, তা তাদের (দ্বীনের) আলোক থেকে (কুফরীর) অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়; এরাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।
২৫৮. তুমি কি সে ব্যক্তির অবস্থা দেখোনি যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা (দুনিয়ার) রাষ্ট্র ক্ষমতা দেয়ার পর সে ইবরাহীমের সাথে স্বয়ং মালিকের ব্যাপারেই বিতর্কে লিপ্ত হলো, (বিতর্কের এক পর্যায়ে) ইবরাহীম বললো, আমার মালিক তিনি, যিনি (সৃষ্টিকুলকে) জীবন দান করেন, মৃত্যু দান করেন, সে বললো, জীবন মৃত্যু তো আমিও দিয়ে থাকি, ইবরাহীম বললো, (আমার) আল্লাহ তায়ালা পূর্ব দিক থেকে (প্রতিদিন) সূর্যের উদয়ন ঘটান, (একবার) তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে বের করে দেখাও তো! (এতে সত্য) অস্বীকারকারী ব্যক্তিটি হতভম্ব হয়ে গেলো, (আসলে) আল্লাহ তায়ালা যালেম জাতিকে কখনো পথের দিশা দেন না।
২৫৯. অথবা (ঘটনাটি) কি সেই ব্যক্তির মতো যে একটি বস্তির পাশ দিয়ে যাবার সময় যখন দেখলো, তা (বিধ্বস্ত হয়ে) আপন অস্তিত্বের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, (তখন) সে ব্যক্তি বললো, এ মৃত জনপদকে কিভাবে আল্লাহ তায়ালা আবার পুনর্জীবন দান করবেন, এক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা (সত্যি সত্যিই) তাকে মৃত্যু দান করলেন এবং (এভাবেই তাকে) একশ বছর ধরে মৃত (ফেলে) রাখলেন, অতপর তাকে পুনরায় জীবিত করলেন; এবার জিজ্ঞেস করলেন, (বলতে পারো) তুমি কতোকাল (মৃত অবস্থায়) কাটিয়েছো? সে বললো, আমি একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ (মৃত অবস্থায়) কাটিয়েছি, আল্লাহ তায়ালা বললেন, বরং এমনি অবস্থায় তুমি একশ বছর কাটিয়ে দিয়েছো, তাকিয়ে দেখো তোমার নিজস্ব খাবার ও পানীয়ের দিকে, (দেখবে) তা বিন্দুমাত্র পচেনি, তোমার গাধাটির দিকেও দেখো, (তাও একই অবস্থায় আছে, আমি এসব এ জন্যেই দেখালাম), যেন আমি তোমাকে মানুষদের জন্যে (পরকালীন জীবনের) একটি (জীবন্ত) প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি, এ (মৃত জীবের) হাড় পাঁজরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো, (তুমি নিজেই দেখতে পাবে) আমি কিভাবে তা একটার সাথে আরেকটার জোড়া লাগিয়ে (নতুন জীবন) দিয়েছি, অতপর কিভাবে তাকে আমি গোশতের পোশাক পরিয়ে দিয়েছি, অতএব (এভাবে আল্লাহর দেখানো) এ বিষয়টি যখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো তখন সে বলে উঠলো, আমি জানি, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
২৬০. (আরো স্মরণ করো,) যখন ইবরাহীম বললো, হে মালিক, মৃতকে তুমি কিভাবে (পুনরায়) জীবন দাও তা আমাকে একটু দেখিয়ে দাও; আল্লাহ তায়ালা বললেন, কেন, তুমি কি (না দেখে) বিশ্বাস করো না? ইবরাহীম বললো, হাঁ (প্রভু, আমি বিশ্বাস করি), কিন্তু (এর দ্বারা) আমার মন একটু সান্ত¡না পাবে (এই যা); আল্লাহ তায়ালা বললেন (তুমি বরং এক কাজ করো), চারটি পাখী ধরে আনো, অতপর (আস্তে আস্তে) এই পাখীগুলোকে তোমার কাছে পোষ মানিয়ে নাও (যাতে ওদের নাম তোমার কাছে পরিচিত হয়ে যায়), তারপর (তাদের কেটে কয়েক টুকরায় ভাগ করো,) তাদের (কাটা) এক একটি টুকরো এক একটি পাহাড়ের ওপর রেখে এসো, অতপর ওদের (সবার নাম ধরে) তুমি ডাকো, (দেখবে জীবন্ত পাখীতে পরিণত হয়ে) ওরা তোমার কাছে দৌড়ে আসবে; তুমি জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা মহাশক্তিশালী, বিজ্ঞ কুশলী।
২৬১. যারা নিজেদের ধন সম্পদ আল্লাহ তায়ালার পথে খরচ করে তাদের উদাহরণ হচ্ছে একটি বীজের মতো, যে বীজটি বপন করার পর তা থেকে (একে একে) সাতটি শীষ বেরুলো, আবার এর প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ শস্য দানা; (আসলে) আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন; আল্লাহ তায়ালা অনেক প্রশস্ত, অনেক বিজ্ঞ।
২৬২. যারা আল্লাহ তায়ালার পথে নিজেদের ধন সম্পদ ব্যয় করে এবং ব্যয় করে তা প্রচার করে বেড়ায় না, প্রতিদান চেয়ে তাকে কষ্ট দেয় না, (এ ধরণের লোকদের জন্যে) তাদের মালিকের কাছে তাদের জন্যে পুরস্কার (সংরক্ষিত) রয়েছে, (শেষ বিচারের দিন) এদের কোনো ভয় নেই, তারা (সেদিন) দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না।
২৬৩. (একটুখানি) সুন্দর কথা বলা এবং (উদারতা দেখিয়ে) ক্ষমা করে দেয়া সেই দানের চাইতে অনেক ভালো, যে দানের পরিণামে কষ্টই আসে; আল্লাহ তায়ালা কারোই মুখাপেক্ষী নন, তিনি পরম ধৈর্যশীলও বটে।
২৬৪. হে ঈমানদাররা, তোমরা (উপকারের) খোঁটা দিয়ে এবং (অনুগৃহীত ব্যক্তিকে) কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান সদকা বরবাদ করে দিয়ো নাÑ ঠিক সেই (হতভাগ্য) ব্যক্তির মতো, যে শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশেই দান করে, সে আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের ওপর বিশ্বাস করে না; তার (দানের) উদাহরণ হচ্ছে, যেন একটি মসৃণ শিলাখন্ডের ওপর কিছু মাটি(-র আস্তরণ), সেখানে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হলো, অতপর পাথর শক্ত হয়েই পড়ে থাকলো। (দান খয়রাত করেও) তারা (মূলত) এই অর্জনের ওপর থেকে কিছুই করতে পারলো না, আর যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তায়ালা তাদের কখনো সঠিক পথ দেখান না।
২৬৫. (অপরদিকে) যারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্যে এবং নিজেদের মানসিক অবস্থা (আল্লাহর পথে) সুদৃঢ় রাখার জন্যে নিজেদের ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ হচ্ছে, যেন তা কোনো উঁচু পাহাড়ের উপত্যকায় একটি (সুসজ্জিত) ফসলের বাগান, যদি সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় তাহলে ফসলের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়, আর প্রবল বৃষ্টিপাত না হলেও শিশির বিন্দুগুলোই (ফসলের জন্য) যথেষ্ট হয়, আল্লাহ তায়ালা ভালো করেই পর্যবেক্ষণ করেন তোমরা কে কি কাজ করো।
২৬৬. তোমাদের কেউ কি চাইবে যে, তার কাছে (ফলে ফুলে সুশোভিত) একটি বাগান থাকুক, যাতে খেজুর ও আংগুরসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল থাকবে, তার তলদেশ দিয়ে আবার প্রবাহমান থাকবে কতিপয় ঝর্ণাধারা, আর (এর ফল ভোগ করার আগেই) বাগানের মালিক বয়সের ভারে নুয়ে পড়বে এবং তার কিছু দুর্বল সন্তান থাকবে, (এ অবস্থায় হঠাৎ করে) এক আগুনের ঘূর্ণিবায়ু এসে তার সব (স্বপ্ন) জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে; এভাবেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিদর্শনগুলো তোমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা (আল্লাহ তায়ালার এসব কথার ওপর) চিন্তা গবেষণা করতে পারো।
২৬৭. হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা নিজেরা যা অর্জন করেছো, সে পবিত্র (সম্পদ) এবং যা আমি যমীনের ভেতর থেকে তোমাদের জন্যে বের করে এনেছি, তার থেকে (একটি) উৎকৃষ্ট অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো, (আল্লাহর জন্যে এমন) নিকৃষ্টতম জিনিসগুলো বেছে রেখে তার থেকে ব্যয় করো না, যা অন্যরা তোমাদের দিলে তোমরা তা গ্রহণ করবে না, অবশ্য যা কিছু তোমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ করো তা আলাদা, তোমরা জেনে রেখো, আল্লাহ তায়ালা (তোমাদের দানের) মুখাপেক্ষী নন, সব প্রশংসার মালিক তো তিনিই!
২৬৮. শয়তান সব সময়ই তোমাদের অভাব অনটনের ভয় দেখাবে এবং সে (নানাবিধ) অশ্লীল কর্মকান্ডের আদেশ দেবে, আর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের তাঁর কাছ থেকে অসীম বরকত ও ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন (এবং সে দিকেই তিনি তোমাদের ডাকছেন), আল্লাহ তায়ালা প্রাচুর্যময় ও সম্যক অবগত।
২৬৯. আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে (একান্তভাবে) তাঁর পক্ষ থেকে (বিশেষ) জ্ঞান দান করেন, আর যে ব্যক্তিকে (আল্লাহ তায়ালার সেই) বিশেষ জ্ঞান দেয়া হলো (সে যেন মনে করে), তাকে (সত্যিকার অর্থেই) প্রচুর কল্যাণ দান করা হয়েছে, আর প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া (আল্লাহর এসব কথা থেকে) অন্য কেউ কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারে না।
২৭০. তোমরা যা কিছু খরচ করো আর যা কিছু (খরচ করার জন্যে) মানত করো, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তা জানেন; যালেমদের (আসলেই) কোনো সাহায্যকারী নেই।
২৭১. (আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্যে) তোমরা যা কিছু দান করো, তা যদি প্রকাশ্যভাবে (মানুষদের সামনে) করো তা ভালো কথা (তাতে কোনো দোষ নেই), তবে যদি তোমরা তা (মানুষদের কাছে) গোপন রাখো এবং (চুপে চুপে) অসহায়দের দিয়ে দাও, তা হবে তোমাদের জন্যে উত্তম; (এ দানের কারণে) আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বহুবিধ গুনাহ খাতা মুছে দেবেন, আর তোমরা যাই করো না কেন, আল্লাহ তায়ালা সব কিছু সম্পর্কেই ওয়াকেফহাল রয়েছেন।
২৭২. (যারা তোমার কথা শোনে না,) তাদের হেদায়াতের দায়িত্ব তোমার ওপর নয়, তবে আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকেই সঠিক পথ দেখান, তোমরা যা দান সদকা করো এটা তোমাদের জন্যেই কল্যাণকর, (কারণ) তোমরা তো এ জন্যেই খরচ করো যেনো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারো; (তোমরা আজ) যা কিছু দান করবে (আগামীকাল) তার পুরোপুরি পুরস্কার তোমাদের আদায় করে দেয়া হবে, (সেদিন) তোমাদের ওপর কোনো রকম যুলুম করা হবে না।
২৭৩. দান সদকা তো (তোমাদের মাঝে এমন) কিছু গরীব মানুষের জন্যে, যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত, তারা (নিজেদের জন্যে) যমীনের বুকে চেষ্টা সাধনা করতে পারে না, আÍসম্মানবোধের কারণে কিছু চায় না বলে অজ্ঞ (মূর্খ) লোকেরা এদের মনে করে এরা (বুঝি আসলেই) সচ্ছল, কিন্তু তুমি এদের (বাহ্যিক) চেহারা দেখেই এদের (সঠিক অবস্থা) বুঝে নিতে পারো, এরা মানুষদের কাছ থেকে কাকুতি মিনতি করে ভিক্ষা করতে পারে না; তোমরা যা কিছুই খরচ করবে আল্লাহ তায়ালা তার (যথার্থ) বিনিময় দেবেন, কারণ তিনি সব কিছুই দেখেন।
২৭৪. যারা দিন রাত প্রকাশ্যে ও সংগোপনে নিজেদের মাল সম্পদ ব্যয় করে, তাদের মালিকের দরবারে তাদের এ দানের প্রতিফল (সুরক্ষিত) রয়েছে, তাদের ওপর কোনো রকম ভয় ভীতি থাকবে না, তারা (সেদিন) চিন্তিতও হবে না।
২৭৫. যারা সূদ খায় তারা (মাথা উঁচু করে) দাঁড়াতে পারবে না, (দাঁড়ালেও) তার দাঁড়ানো হবে সে ব্যক্তির মতো, যাকে শয়তান নিজস্ব পরশ দিয়ে (দুনিয়ার লোভ লালসায়) মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে; এটা এ কারণে, যেহেতু এরা বলে, ব্যবসা বাণিজ্য তো সূদের মতোই (একটা কারবারের নাম), অথচ আল্লাহ তায়ালা ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন, তাই তোমাদের যার (যার) কাছে তার মালিকের পক্ষ থেকে (সূদ সংক্রান্ত) এ উপদেশ পৌঁছেছে, সে অতপর সূদের কারবার থেকে বিরত থাকবে, আগে (এ আদেশ আসা পর্যন্ত) যে সূদ সে খেয়েছে তা তো তার জন্যে অতিবাহিত হয়েই গেছে, তার ব্যাপার একান্তই আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্তের ওপর; কিন্তু (এরপর) যে ব্যক্তি (আবার সূদী কারবারে) ফিরে আসবে, তারা অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।
২৭৬. আল্লাহ তায়ালা সূদ নিশ্চিহ্ন করেন, (অপর দিকে) দান সদকা (-র পবিত্র কাজ)-কে তিনি (উত্তরোত্তর) বৃদ্ধি করেন; আল্লাহ তায়ালা (তাঁর নেয়ামতের প্রতি) অকৃতজ্ঞ পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের কখনো পছন্দ করেন না।
২৭৭. তবে যারা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহ তায়ালার ওপর ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে, নামায প্রতিষ্ঠা করেছে, যাকাত আদায় করেছে, তাদের ওপর কোনো ভয় থাকবে না, তারা সেদিন চিন্তিতও হবে না।
২৭৮. হে ঈমনদার লোকেরা, তোমরা (সূদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করো, আগের (সূদী কারবারের) যে সব বকেয়া আছে তোমরা তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যিই তোমরা আল্লাহর ওপর ঈমান আনো।
২৭৯. যদি তোমরা এমনটি না করো, তাহলে অতপর আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে (তোমাদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধের (ঘোষণা থাকবে), আর যদি (এখনো) তোমরা (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসো তাহলে তোমরা তোমাদের মূলধন ফিরে পাবার অধিকারী হবে, (সূদী কারবার দ্বারা) অন্যের ওপর যুলুম করো না, তোমাদের ওপরও অতপর (সূদের) যুলুম করা হবে না।
২৮০. সে (ঋণ গ্রহীতা) ব্যক্তি কখনো যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে (তার ওপর চাপ দিয়ো না, বরং) তার সচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও; আর যদি তা মাফ করে দাও, তাহলে তা হবে তোমাদের জন্যে অতি উত্তম কাজ, যদি তোমরা (ভালোভাবে) জানো (তাহলে এটাই তোমাদের করা উচিৎ)!
২৮১. সে দিনটিকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে, সেদিন প্রত্যেক মানব সন্তানকে (জীবনভর) কামাই করা পাপপুণ্যের পুরোপুরি ফলাফল দিয়ে দেয়া হবে, (কারো ওপর সেদিন) কোনো ধরনের যুলুম করা হবে না।
২৮২. হে ঈমানদার বান্দারা, তোমরা যখন পরস্পরের সাথে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্যে ঋণের চুক্তি করো তখন তা লিখে রাখো; তোমাদের মধ্যকার যে কোনো একজন লেখক সুবিচারের ভিত্তিতে (এ চুক্তিনামা) লিখে দেবে, যাকে আল্লাহ তায়ালা লেখা শিখিয়েছেন সে যেন কখনো লিখতে অস্বীকৃতি না জানায়, (লেখার সময়) ঋণ গ্রহীতা (লেখককে) বলে দেবে কি (কি শর্ত সেখানে) লিখতে হবে, (এ পর্যায়ে) লেখক অবশ্যই তার মালিক আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা উচিত, (চুক্তিনামা লেখার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে) তার কিছুই যেন বাদ না পড়ে; যদি সে ঋণ গ্রহীতা অজ্ঞ মূর্খ্এবং (সব দিক থেকে) দুর্বল হয়, অথবা (চুক্তিনামার কথাবার্তা বলে দেয়ার) ক্ষমতাই তার না থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে তার কোনো অভিভাবক ন্যায়ানুগ পন্থায় বলে দেবে কি কি কথা লিখতে হবে; (তদুপরি) তোমাদের মধ্য থেকে দুই জন পুরুষকে (এ চুক্তিপত্রে) সাক্ষী বানিয়ে নিয়ো, যদি দুই জন পুরুষ (একত্রে) পাওয়া না যায় তাহলে একজন পুরুষ এবং দুজন মহিলা (সাক্ষী হবে), যাতে করে তাদের একজন ভুলে গেলে দ্বিতীয় জন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে; এমন সব লোকদের মধ্য থেকে সাক্ষী নিতে হবে যাদেরকে উভয় পক্ষই পছন্দ করবে, (সাক্ষীদের) যখন (সাক্ষ্য প্রদানের জন্যে) ডাকা হবে তখন তারা তা অস্বীকার করবে না; (লেনদেনের সময়) পরিমাণ ছোট হোক কিংবা বড়ো হোক, তার দিন ক্ষণসহ (লিখে রাখতে) অবহেলা করো না; এটা আল্লাহর কাছে ন্যায্যতর ও সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে অধিক মযবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং (পরবর্তীকালে) যাতে তোমরা সন্দিগ্ধ না হও, তার সমাধানের জন্যেও এটা নিকটতর (পন্থা), যা কিছু তোমরা নগদ (হাতে হাতে) আদান প্রদান করো তা (সব সময়) না লিখলেও তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই, তবে ব্যবসায়িক লেনদেনের সময় অবশ্যই সাক্ষী রাখবে, (দলিলের) লেখক ও (চুক্তিনামার) সাক্ষীদের কখনো (তাদের মত বদলানোর জন্যে) কষ্ট দেয়া যাবে না; তারপরও তোমরা যদি তাদের এ ধরনের যাতনা প্রদান করো তাহলে (জেনে রেখো), তা হবে (তোমাদের জন্যে) একটি মারাÍক গুনাহ, (এ ব্যাপারে) আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সবকিছুই শিখিয়ে দিচ্ছেন, (কেননা) আল্লাহ তায়ালা সবকিছুই জানেন।
২৮৩. যদি তোমরা কখনো সফরে থাকো এবং (এ কারণে ঋণের চুক্তি লেখার মতো) কোনো লেখক না পাও, তাহলে (চুক্তি লেখার বদলে) কোনো জিনিস বন্ধক রেখে দাও, যখন তোমাদের কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে কোনো বন্ধকী জিনিসের ব্যাপারে বিশ্বাস করে, এমতাবস্থায় যে ব্যক্তিকে বিশ্বাস করা হয়েছে তার উচিত সেই আমানত যথাযথ ফেরত দেয়া এবং (আমানতের ব্যাপারে) আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা, যিনি তার মালিক; তোমরা কখনো সাক্ষ্য গোপন করো না, যে ব্যক্তি তা গোপন করে সে অবশ্যই অন্তরের দিক থেকে পাপিষ্ঠ (সাব্যস্ত হয়); বস্তুত আল্লাহ তায়ালা তোমাদের যাবতীয় কাজকর্মের ব্যাপারেই সম্যক অবগত রয়েছেন।
২৮৪. আসমান যমীনে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ তায়ালার জন্যে, তোমরা তোমাদের মনের ভেতর যা কিছু আছে তা যদি প্রকাশ করো কিংবা তা গোপন করো, আল্লাহ তায়ালা (একদিন) তোমাদের কাছ থেকে এর (পুরোপুরিই) হিসাব গ্রহণ করবেন; (এরপর) তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে মাফ করে দেবেন, (আবার) যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি শাস্তি দেবেন; আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
২৮৫. (আল্লাহর) রসূল সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছে যা তার ওপর তার মালিকের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে, আর যারা (সে রসূলের ওপর) বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারাও (সে একই বিষয়ের ওপর) ঈমান এনেছে; এরা সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর ওপর, তাঁর ফেরেশতাদের ওপর, তাঁর কেতাবসমূহের ওপর, তাঁর রসূলদের ওপর। (তারা বলে,) আমরা তাঁর (পাঠানো) নবী রসূলদের কারো মাঝে কোনো রকম পার্থক্য করি ন; আর তারা বলে, আমরা তো (আল্লাহর নির্দেশ) শুনেছি এবং (তা) মেনেও নিয়েছি, হে আমাদের মালিক, (আমরা) তোমার ক্ষমা চাই এবং (আমরা জানি,) আমাদের (একদিন) তোমার কাছেই ফিরে যেতে হবে।
২৮৬. আল্লাহ তায়ালা কখনো কাউকেই তার শক্তি সামর্থের বাইরে কোনো কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না; সে ব্যক্তির জন্যে ততোটুকুই বিনিময় রয়েছে যতোটুকু সে (এ দুনিয়ায়) সম্পন্ন করবে, আবার সে যতোটুকু (মন্দ দুনিয়ায়) অর্জন করেছে তার ওপর তার (ততোটুকু শাস্তিই) পতিত হবে; (অতএব, হে মোমেন ব্যক্তিরা, তোমরা এই বলে দোয়া করো,) হে আমাদের মালিক, যদি আমরা কিছু ভুলে যাই, (কোথাও) যদি আমরা কোনো ভুল করে বসি, তার জন্যে তুমি আমাদের পাকড়াও করো না, হে আমাদের মালিক, আমাদের পূর্ববর্তী (জাতিদের) ওপর যে ধরনের বোঝা তুমি চাপিয়েছিলে তা আমাদের ওপর চাপিয়ো না, হে আমাদের মালিক, যে বোঝা বইবার সামর্থ আমাদের নেই তা তুমি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না, তুমি আমাদের ওপর মেহেরবানী করো। তুমি আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের ওপর তুমি দয়া করো। তুমিই আমাদের (একমাত্র আশ্রয়দাতা) বন্ধু, অতএব কাফেরদের মোকাবেলায় তুমি আমাদের সাহায্য করো।

সূরা আলে ইমরান
মদীনায় অবতীর্ণ আয়াত ২০০, রুকু ২০
রহমান রহীম আল্লাহ তায়ালার নামে
১. আলিফ-লাম-মীম।
২. মহান আল্লাহ তায়ালা, তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, (তিনি) চিরঞ্জীব, (তিনি) চিরস্থায়ী।
৩. তিনি সত্য (দ্বীন) সহকারে তোমার ওপর (এই) কেতাব নাযিল করেছেন, যা তোমার আগে নাযিল করা যাবতীয় কেতাবের সত্যতা স্বীকার করে। তিনি তাওরাত ও ইনজীলও নাযিল করেছেন;
৪. মানব জাতিকে (সঠিক) পথ প্রদর্শনের জন্যে ইতিপূর্বে (আল্লাহ তায়ালা আরো কেতাব নাযিল করেছেন), তিনি (হক ও বাতিলের মধ্যে) ফয়সালা করার মানদন্ড (হিসেবে কোরআন) অবতীর্ণ করেছেন; (তা সত্ত্বেও) যারা আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি; আল্লাহ তায়ালা অসীম ক্ষমতার মালিক, তিনি চরম প্রতিশোধ গ্রহণকারীও বটে!
৫. আল্লাহ তায়ালার কাছে আকাশমালা ও ভূখন্ডের কোনো তথ্যই গোপন নেই।
৬. তিনি তো সেই মহান সত্তা যিনি (মায়ের পেটে) শুক্রকীটে (থাকতেই) তাঁর ইচ্ছামতো তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন; (আসলেই) আল্লাহ তায়ালা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মা’বুদ নেই, তিনি প্রচন্ড ক্ষমতাশালী এবং প্রবল প্রজ্ঞাময়।
৭. তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমার ওপর এ কেতাব নাযিল করেছেন। (এই কেতাবে দু’ধরনের আয়াত রয়েছে), এর কিছু হচ্ছে (সুস্পষ্ট) দ্ব্যর্থহীন আয়াত, সেগুলোই হচ্ছে কেতাবের মৌলিক অংশ, (এ ছাড়া) বাকী আয়াতগুলো হচ্ছে রূপক (বর্ণনায় বর্ণিত, মানুষের মাঝে) যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা (এগুলোকে কেন্দ্র করেই নানা ধরনের) ফেতনা ফাসাদ (সৃষ্টি করে) এবং আল্লাহর কেতাবের (অপ) ব্যাখ্যা করার উদ্দেশে এসব (রূপক) আয়াত থেকে কিছু অংশের অনুসরণ করে, (মূলত) এসব (রূপক) বিষয়ের ব্যাখ্যা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কেউই জানে না। (এ কারণেই) যাদের মধ্যে জ্ঞানের গভীরতা আছে তারা (এসব আয়াত সম্পর্কে) বলে, আমরা এর ওপর ঈমান এনেছি, এগুলো সবই তো আমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (আমাদের দেয়া হয়েছে। সত্য কথা হচ্ছে, আল্লাহর হেদায়াতে) প্রজ্ঞাসম্পন্ন লোকেরাই কেবল শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
৮. (তারা আরো বলে,) হে আমাদের মালিক, (একবার যখন) তুমি আমাদের (সঠিক) পথের দিশা দিয়েছো, (তখন আর) তুমি আমাদের মনকে বাঁকা করে দিয়ো না, একান্ত তোমার কাছ থেকে আমাদের প্রতি দয়া করো, কেননা যাবতীয় দয়ার মালিক তো তুমিই।
৯. হে আমাদের মালিক, তুমি অবশ্যই সমগ্র মানব জাতিকে তোমার সামনে (হিসাব-নিকাশের জন্যে) একদিন একত্রিত করবে, এতে কোন রকম সন্দেহ নেই; নিসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা (কখনোই) ওয়াদা ভংগ করেন না।
১০. যারা (আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর বিধান) অস্বীকার করেছে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি আল্লাহর (আযাব) থেকে (তাদের বাঁচানোর ব্যাপারে) কোনোই উপকারে আসবে না; (প্রকারান্তরে) তারাই জাহান্নামের ইন্ধন হবে।
১১. (তাদের পরিণতি হবে) ফেরাউন ও তাদের পূর্ববর্তী (না-ফরমান) জাতিসমূহের মতো; তারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলো, অতএব তাদের অপরাধের কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের (শক্ত করে) পাকড়াও করলেন; (বস্তুত) শাস্তি প্রয়োগে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত কঠোর।
১২. (হে নবী,) যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে সেসব (বিদ্রোহী) কাফেরদের তুমি বলে দাও, অচিরেই তোমরা (এ দুনিয়ায় লাঞ্ছিত) পরাজিত হবে এবং (পরকালে) তোমাদের জাহান্নামের (আগুনের) কাছে জড়ো করা হবে; (আর জাহান্নাম!) তা তো হচ্ছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট অবস্থান!
১৩. সে দল দু’টোর মধ্যে তোমাদের জন্যে (শিক্ষণীয়) কিছু নিদর্শন (মজুদ) ছিলো, যারা (বদরের) সম্মুখসমরে একে অপরের সামনাসামনি হয়েছিলো; (এদের মধ্যে) এক বাহিনী লড়ছিলো আল্লাহর (দ্বীনের) পথে, আর অপর বাহিনীটি ছিলো (অবিশ্বাসী) কাফেরদের, (এ সম্মুখসমরে) তারা চর্মচক্ষু দিয়ে তাদের (প্রতিপক্ষকে) তাদের দ্বিগুণ দেখতে পাচ্ছিলো, (তারপরও) আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে সাহায্য (ও বিজয়) দান করেন; এ (সব ঘটনার) মাঝে সেসব লোকের জন্যে অনেক কিছু শেখার আছে যারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন।
১৪. নারী জাতির প্রতি ভালোবাসা, সন্তান সন্ততি, কাঁড়ি কাঁড়ি সোনা রূপা, পছন্দসই ঘোড়া, গৃহপালিত জন্তু ও যমীনের ফসল (সব সময়ই) মানব সন্তানের জন্যে লোভনীয় করে রাখা হয়েছে; (অথচ) এ সব হচ্ছে পার্থিব জীবনের কিছু ভোগের সামগ্রী (মাত্র! স্থায়ী জীবনের) উৎকৃষ্ট আশ্রয় তো একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছেই রয়েছে।
১৫. (হে নবী,) তুমি (তাদের) বলো, আমি কি তোমাদের এগুলোর চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো বস্তুর কথা বলবো? (হ্যাঁ, সে উৎকৃষ্ট বস্তু হচ্ছে তাদের জন্যে,) যারা আল্লাহকে ভয় করে এমন সব লোকদের জন্যে তাদের মালিকের কাছে রয়েছে (মনোরম) জান্নাত, যার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহমান থাকবে (অগণিত) ঝর্ণাধারা এবং তারা সেখানে অনাদিকাল থাকবে, আরো থাকবে (তাদের) পূত পবিত্র সংগী ও সংগিনীরা (সর্বোপরি) থাকবে আল্লাহ তায়ালার (অনাবিল) সন্তুষ্টি; আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের (কার্যকলাপের) ওপর সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।
১৬. যারা বলে, হে আমাদের মালিক, আমরা অবশ্যই তোমার ওপর ঈমান এনেছি, অতপর আমাদের (যা) গুনাহখাতা (আছে তা) তুমি মাফ করে দাও এবং (শেষ বিচারের দিন) তুমি আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে দিয়ো।
১৭. এরা হচ্ছে ধৈর্যশীল এবং সত্যাশ্রয়ী, (এরা) অনুগত এবং দানশীল, (সর্বোপরি) এরা হচ্ছে শেষরাতে কিংবা ঊষালগ্নের পূর্বে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।
১৮. আল্লাহ তায়ালা (স্বয়ং) সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি ছাড়া অন্য কোনো মা’বুদ নেই, ফেরেশতারা এবং জ্ঞানবান মানুষরাও (এই একই সাক্ষ্য দিচ্ছে), আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র ন্যায় ও ইনসাফ কার্যকর করেন, তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মা’বুদ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, তিনি প্রজ্ঞাময়।
১৯. নিসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ তায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কেতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে (বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে) মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো, (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
২০. যদি এরা তোমার সাথে (এ ব্যাপারে) কোনোরূপ বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে (তুমি তাদের) বলে দাও, আমি এবং আমার অনুসারীরা (সবাই) আল্লাহর কাছে আÍসমর্পণ করে নিয়েছি; অতপর যাদের (আল্লাহর পক্ষ থেকে) কেতাব দেয়া হয়েছে এবং যারা (কোনো কেতাব না পেয়ে) মূর্খ্(থেকে গেছে), তাদের (সবাইকেই) জিজ্ঞেস করো, তোমরা কি সবাই আল্লাহর কাছে আÍসমর্পণ করেছো? (হ্যাঁ,) তারা যদি (জীবনের সর্বক্ষেত্রে) আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয় তাহলে তারা তো সঠিক পথ পেয়েই গেলো, কিন্তু তারা যদি (ঈমান থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে মনে রেখো, তোমার দায়িত্ব হচ্ছে কেবল (আমার কথা) পৌঁছে দেয়া; আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের (কর্মকান্ড নিজেই) পর্যবেক্ষণ করছেন।
২১. নিসন্দেহে যারা আল্লাহর (নাযিল করা) নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে, যারা অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করে হত্যা করে মানব জাতিকে যারা ন্যায় ও ইনসাফ মেনে চলার আদেশ দেয় তাদেরও, এদের তুমি এক কঠোর শাস্তির সুসংবাদ দাও।
২২. (এদের অবস্থা হচ্ছে,) দুনিয়া আখেরাত উভয় স্থানেই এদের কর্ম ব্যর্থ (ও নিষ্ফল) হয়ে গেছে, (আর এ কারণেই) এদের কোথাও কোনো সাহায্যকারী নাই।
২৩. (হে নবী,) তুমি তাদের সম্পর্কে চিন্তা করে দেখেছো কি, যাদের আমার কেতাবের কিছু অংশ দেয়া হয়েছিলো, অতপর তাদের যখন আল্লাহর কেতাবের (সে অংশের) দিকে ডাকা হলো যা তাদের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়সমূহের মীমাংসা করে দেবে, তখন তাদের একদল লোক (এ হেদায়াত থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিলো, (মূলত) এরাই হচ্ছে সেসব লোক যারা (আল্লাহর ফয়সালা থেকে) মুখ ফিরিয়ে রাখে।
২৪. এটা এ কারণে যে, এ (নির্বোধ) লোকেরা বলে, (দোযখের) আগুন আমাদের (শরীর) কখনো স্পর্শ করবে না, (আর যদি একান্ত করেও তা হবে) হাতেগনা কয়েকটি দিনের ব্যাপার মাত্র, (মূলত) তাদের নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসের মাঝে নিজেদের মনগড়া ধারণাই তাদের প্রতারিত করে রেখেছে।
২৫. অতপর (সেদিন) অবস্থাটা হবে, যেদিন আমি সমগ্র মানব সন্তানকে একত্রিত করবো, যেদিন সম্পর্কে কোনো দ্বিধা সন্দেহের অবকাশ নেই, সেদিন প্রত্যেক মানব সন্তানকেই তার নিজস্ব অর্জিত বিনিময় পুরোপুরি দিয়ে দেয়া হবে এবং (সেদিন) তাদের ওপর বিন্দুমাত্রও যুলুম করা হবে না।
২৬. (হে নবী), তুমি বলো, হে রাজাধিরাজ (মহান আল্লাহ), তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে সাম্রাজ্য দান করো, আবার যার কাছ থেকে চাও তা কেড়েও নিয়ে যাও, যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত করো, যাকে ইচ্ছা তুমি অপমানিত করো; সব রকমের কল্যাণ তো তোমার হাতেই নিবদ্ধ; নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর ওপর একক ক্ষমতাবান।
২৭. তুমিই রাতকে দিনের মাঝে শামিল করো, আবার দিনকে রাতের ভেতর শামিল করো; প্রাণহীন (বস্তু) থেকে তুমি (যেমন) প্রাণের আবির্ভাব ঘটাও, (আবার) প্রাণহীন (অসাড়) বস্তু বের করে আনো প্রাণসর্বস্ব (জীব) থেকে এবং যাকে ইচ্ছা তুমি বিনা হিসেবে রেযেক দান করো।
২৮. ঈমানদার ব্যক্তিরা কখনো ঈমানদারদের বদলে অবিশ্বাসী কাফেরদের নিজেদের বন্ধু বানাবে না, যদি তোমাদের কেউ তা করে তবে আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্কই থাকবে না, হাঁ তাদের কাছ থেকে কোনো আশংকা (থাকলে) তোমরা নিজেদের বাঁচানোর প্রয়োজন হলে তা ভিন্ন কথা; আল্লাহ তায়ালা তো বরং তাঁর নিজের ব্যাপারেই তোমাদের ভয় দেখাচ্ছেন (বেশী, কারণ তোমাদের) আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
২৯. (হে নবী,) তুমি বলো, তোমরা তোমাদের মনের ভেতর কিছু গোপন করে রাখো, কিংবা তা (সবার সামনে) প্রকাশ করে দাও, তা আল্লাহ তায়ালা (ভালোভাবে) অবগত হন; আসমান যমীন ও এর (আভ্যন্তরীণ) সবকিছুও তিনি জানেন, সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালা (সৃষ্টিলোকের) সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তিনিই সকল শক্তির আধার।
৩০. যেদিন প্রত্যেকেই তার ভালো কাজ সামনে হাযির দেখতে পাবে, যে ব্যক্তির কৃতকর্ম খারাপ থাকবে সে সেদিন কামনা করতে থাকবে যে, তার এবং তার (কাজের) মাঝে যদি দুস্তর একটা তফাৎ থাকতো! আল্লাহ তায়ালা তো তোমাদের তাঁর (ক্ষমতা ও শাস্তি) থেকে ভয় দেখাচ্ছেন, কারণ আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের সাথে অত্যন্ত অনুগ্রহশীল।
৩১. (হে নবী,) তুমি বলো, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (আমাকে ভালোবাসলে) আল্লাহ তায়ালাও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন; আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
৩২. তুমি (আরো) বলো, (তোমরা) আল্লাহ তায়ালা ও (তাঁর) রসূলের কথা মেনে চলো, (এ আহ্বান সত্ত্বেও) তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় (তাহলে তুমি জেনে রেখো), আল্লাহ তায়ালা কখনো কাফেরদের পছন্দ করেন না।
৩৩. অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা আদম, নূহ এবং ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদের সৃষ্টিকুলের ওপর (নেতৃত্ব করার জন্যে) বাছাই করে নিয়েছেন।
৩৪. (নেতৃত্বে সমাসীন) এদের সন্তানরা বংশানুক্রমে পরস্পর পরস্পরের বংশধর। আল্লাহ তায়ালা (সবার কথাবার্তা) শুনতে পান এবং (সব কথা তিনি) জানেন।
৩৫. (স্মরণ করো,) যখন ইমরানের স্ত্রী বললো, হে আমার মালিক, আমার গর্ভে যা আছে তাকে আমি স্বাধীনভাবে তোমার (দ্বীনের কাজ করার) জন্যে উৎসর্গ করলাম, তুমি আমার পক্ষ থেকে এ সন্তানটিকে কবুল করে নাও, অবশ্যই তুমি (সব কথা) শোনো এবং (সব বিষয়) জানো।
৩৬. অতপর (এক সময়) যখন ইমরানের ¯স্ত্রী তাকে জন্ম দিলো, (তখন) সে বললো, হে আমার মালিক, (একি!) আমি তো (দেখছি) একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছি (একটা মেয়েকে কিভাবে আমি তোমার পথে উৎসর্গ করবো); আল্লাহ তায়ালা তো ভালোভাবেই জানতেন, ইমরানের স্ত্রী কি জন্ম দিয়েছে, (আসলে) ছেলে কখনো মেয়ের মতো (সব কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম) হয়না, (ইমরানের ¯স্ত্রী বললো), আমি এ শিশুর নাম রাখলাম মারইয়াম এবং আমি এ শিশু ও তার (অনাগত) সন্তানকে অভিশপ্ত শয়তানের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষার জন্যে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।
৩৭. আল্লাহ তায়ালা (ইমরানের স্ত্রীর দোয়া কবুল করলেন এবং) তাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবেই গ্রহণ করে নিলেন এবং (ধীরে ধীরে) তাকে তিনি ভালোভাবেই গড়ে তুললেন, (আর সে জন্যেই) আল্লাহ তায়ালা তাকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রাখলেন, (বড়ো হবার পর) যখনি যাকারিয়া তার কাছে (তার নিজস্ব) এবাদাতের কক্ষে যেতো, (তখনি সে দেখতে) পেতো সেখানে কিছু খাবার (মজুদ রয়েছে, খাবার দেখে) যাকারিয়া জিজ্ঞেস করতো, হে মারইয়াম, এসব (খাবার) তোমার কাছে কোত্থেকে আসে? মারইয়াম জবাব দিতো, এ সব (আসে আমার মালিক) আল্লাহর কাছ থেকে; (আর) অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে বিনা হিসেবে রেযেক দান করেন।
৩৮. সেখানে (দাঁড়িয়েই) যাকারিয়া তার মালিকের কাছে দোয়া করলো, হে আমার মালিক, তুমি তোমার কাছ থেকে আমাকে (তোমার অনুগ্রহের প্রতীক হিসেবে) একটি নেক সন্তান দান করো, নিশ্চয়ই তুমি (মানুষের) ডাক শোনো।
৩৯. অতপর ফেরেশতারা তাকে ডাক দিলো এমন এক সময়ে যখন সে এবাদাতের কক্ষে নামায আদায় করছিলো (ফেরেশতারা বললো, হে যাকারিয়া, আল্লাহ তায়ালা তোমার ডাক শুনেছেন), অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ইয়াহইয়ার (জন্ম সম্পর্কে) সুসংবাদ দিচ্ছেন, (তোমার সে সন্তান) আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বাণীর সত্যায়ন করবে, সে হবে (সমাজের) নেতা, (সে হবে) সচ্চরিত্রবান, (সে হবে) নবী, (সর্বোপরি সে হবে) সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের একজন।
৪০. (এ কথা শুনে) যাকারিয়া বললো, হে আমার মালিক, আমার (ঘরে) ছেলে হবে কিভাবে, (একে তো) আমি নিজে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গেছি, (তদুপরি) আমার স্ত্রীও বন্ধ্যা (সন্তান ধারণে সম্পূর্ণ অক্ষম); আল্লাহ তায়ালা বললেন, হাঁ এভাবেই আল্লাহ তায়ালা যা চান তা তিনি করেন।
৪১. যাকারিয়া নিবেদন করলো, হে মালিক, তুমি আমার জন্যে (এর) কিছু (পূর্ব) লক্ষণ ঠিক করে দাও; আল্লাহ তায়ালা বললেন (হাঁ), তোমার (সে) লক্ষণ হবে এই যে, তুমি তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত মানুষের সাথে ইশারা ইংগিত ছাড়া কথাবার্তা বলবে না; (এ অবস্থায়) তুমি তোমার মালিককে বেশী বেশী স্মরণ করবে এবং সকাল সন্ধ্যায় (তাঁর পবিত্র নামসমূহের) তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে।
৪২. (অতপর মারইয়াম বয়োপ্রাপ্ত হলে) আল্লাহর ফেরেশতারা যখন বললো, হে মারইয়াম, আল্লাহ তায়ালা নিসন্দেহে তোমাকে (একটি বিশেষ কাজের জন্যে) বাছাই করেছেন এবং (সে জন্যে) তোমাকে তিনি পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীকুলের ওপর তিনি তোমাকে বাছাই করেছেন।
৪৩. হে মারইয়াম, (এর যোগ্য হওয়ার জন্যে) তুমি সর্বদা তোমার মালিকের অনুগত হও, তাঁর কাছে (আনুগত্যের) মাথা নত করো এবং এবাদাতকারীদের সাথে তুমিও (তার) এবাদাত করো।
৪৪. (হে নবী,) এ সবই তো (ছিলো তোমার জন্যে) অদৃশ্যলোকের সংবাদ, আমিই এগুলো তোমাকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছি; (নতুবা) তুমি তো সেখানে তাদের পাশে হাযির ছিলে না (বিশেষ করে) যখন (এবাদাতখানার পুরোহিতরা) মারইয়ামের পৃষ্ঠপোষক কে হবে এটা নির্বাচনের জন্যে কলম নিক্ষেপ (করে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা) করছিলো, আর তুমি তাদের ওখানেও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা (এ নিয়ে) বিতর্ক করছিলো!
৪৫. অতপর ফেরেশতারা বললো, হে মারইয়াম, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাকে (একটি পুত্র সন্তানের জন্ম সংক্রান্ত) নিজস্ব এক বাণীর দ্বারা সুসংবাদ দিচ্ছেন, তার নাম মাসীহ (সে পরিচিত হবে) মারইয়ামের পুত্র ঈসা, দুনিয়া আখেরাতের উভয় স্থানেই সে সম্মানিত হবে, সে হবে (আল্লাহর) সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্যতম।
৪৬. সে দোলনায় থাকা অবস্থায় (যেমন) মানুষের সাথে কথা বলতে পারবে, পরিণত বয়সেও (তেমনিভাবে তাদের সাথে) কথা বলবে, (বস্তুত) সে হবে নেককার মানুষদের একজন।
৪৭. মারইয়াম বললো, হে আমার মালিক, আমার (গর্ভে) সন্তান আসবে কোত্থেকে? আমাকে তো কখনো কোনো মানব সন্তান স্পর্শ পর্যন্ত করেনি; আল্লাহ তায়ালা বললেন, এভাবেই আল্লাহ তায়ালা যাকে চান (চিরাচরিত নিয়ম ছাড়াই) তাকে পয়দা করেন; তিনি যখন কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তখন শুধু তাকে বলেন, ‘হও’, অতপর (সাথে সাথে) তা (সংঘটিত) হয়ে যায়।
৪৮. (ফেরেশতারা মারইয়ামকে বললো,) তোমার সন্তানকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কেতাব ও প্রজ্ঞার বিষয়গুলো শেখাবেন, (সাথে সাথে তিনি তাকে) তাওরাত এবং ইনজীলও শিক্ষা দেবেন। ৪৯. (আল্লাহ তায়ালা তাকে) বনী ইসরাঈলদের কাছে রসূল করে পাঠালেন (অতপর সে আল্লাহর রসূল হয়ে তাদের কাছে এসে বললো), আমি নিসন্দেহে তোমাদের মালিকের কাছ থেকে (নবুওতের কিছু) নিদর্শন নিয়ে এসেছি (এবং সে নিদর্শনগুলো হচ্ছে), আমি তোমাদের জন্যে মাটি দ্বারা পাখীর মতো করে একটি আকৃতি বানাবো এবং পরে তাতে ফুঁ দেবো, অতপর (তোমরা দেখবে এই) আকৃতিটি আল্লাহর ইচ্ছায় (জীবন্ত) পাখী হয়ে যাবে, আর জন্মান্ধ এবং কুষ্ঠ রোগীকেও সুস্থ করে দেবো, (আল্লাহর ইচ্ছায় এভাবে) আমি মৃতকেও জীবিত করে দেবো, আমি তোমাদের আরো বলে দেবো, তোমরা তোমাদের ঘরে কি কি জিনিস খাও, আবার কি জিনিস (না খেয়ে) জমা করে রাখো; (মূলত) তোমরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনো তাহলে (নিসন্দেহে) এতে তোমাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।
৫০. (মাসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম আরও বলবে,) তাওরাতের যে বাণী আমার কাছে রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী, (তা ছাড়া) তোমাদের ওপর হারাম করে রাখা হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসও আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেবো এবং আমি তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (এই) নিদর্শন নিয়েই এসেছি, অতএব তোমরা আল্লাহকেই ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো।
৫১. নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমার মালিক, তোমাদেরও মালিক, অতএব তোমরা তাঁরই এবাদাত করো; (আর) এটাই হচ্ছে একমাত্র সঠিক ও সোজা পথ।
৫২. অতপর ঈসা যখন তাদের থেকে কুফরী আঁচ করতে পারলো, তখন সে (সাথীদের ডেকে) বললো, কে (আছো তোমরা) আল্লাহ তায়ালার (পথের) দিকে (চলার সময়) আমার সাহায্যকারী হবে! হাওয়ারীরা বললো, (হ্যাঁ) আমরাই (হবো) আল্লাহর সাহায্যকারী; আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি (হে ঈসা), তুমি সাক্ষী থাকো, আমরা সবাই আল্লাহর এক একজন অনুগত বান্দা।
৫৩. (হাওয়ারীরা বললো,) হে আল্লাহ, তুমি যা কিছু নাযিল করেছো আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি এবং আমরা রসূলের কথাও মেনে নিয়েছি, সুতরাং তুমি (সত্যের পক্ষে) সাক্ষ্যদাতাদের সাথে আমাদের (নাম) লিখে দাও।
৫৪. বনী ইসরাঈলের লোকেরা (আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে দারুণ) শঠতা করলো, তাই আল্লাহও কৌশলের পন্থা গ্রহণ করলেন; (বস্তুত) আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন সর্বোত্তম কৌশলী!
৫৫. যখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে ঈসা, আমি তোমার এ দুনিয়ার (জীবন কাটানোর) কাল শেষ করতে যাচ্ছি এবং (অচিরেই) আমি তোমাকে আমার কাছে তুলে আনবো, যারা (তোমাকে মেনে নিতে) অস্বীকার করছে তাদের (যাবতীয় পাপ) থেকেও আমি তোমাকে পবিত্র করে নেবো, আর যারা তোমাকে অনুসরণ করছে তাদের আমি কেয়ামত পর্যন্ত এই অস্বীকারকারীদের ওপর (বিজয়ী করে) রাখবো, অতপর তোমাদের সবাইকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে, সেদিন (ঈসা সম্পর্কিত) যেসব বিষয়ে তোমরা মতবিরোধে লিপ্ত ছিলে তার সব কয়টি বিষয়ই আমি তোমাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবো।
৫৬. যারা (আমার বিধান) অস্বীকার করেছে আমি তাদের এ দুনিয়ায় (অপমান) ও আখেরাতে (আগুনে দগ্ধ হওয়ার) কঠোরতর শাস্তি দেবো, (এ থেকে বাঁচানোর মতো সেদিন) তাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।
৫৭. অপরদিকে যারা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে, অতপর আল্লাহ তাদের (সবাই)-কে তাদের পাওনা পুরোপুরিই আদায় করে দেবেন; আল্লাহ তায়ালা যালেমদের কখনো ভালোবাসেন না।
৫৮. এই (কেতাব) যা আমি তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি, তা হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শন ও জ্ঞানপূর্ণ উপদেশ বিশেষ।
৫৯. আাল্লাহ তায়ালার কাছে ঈসার উদাহরণ হচ্ছে (প্রথম মানুষ) আদমের মতো; তাকেও আল্লাহ তায়ালা (মাতা-পিতা ছাড়া সরাসরি) মাটি থেকে পয়দা করেছেন, তারপর তাকে বললেন, (এবার তুমি) হয়ে যাও, সাথে সাথে তা (মানুষে পরিণত) হয়ে গেলো।
৬০. (এ হচ্ছে) তোমার মালিক (আল্লাহ)-এর পক্ষ থেকে (আসা) সত্য (প্রতিবেদন), অতপর তোমরা কখনো সেসব দলে শামিল হয়ো না যারা (ঈসার ব্যাপারে নানারকম) সন্দেহ পোষণ করে।
৬১. এ বিষয়ে আল্লাহর কাছ থেকে (সঠিক) জ্ঞান আসার পরও যদি কেউ তোমার সাথে (খামাখা) ঝগড়া-বিবাদ ও তর্র্ক করতে চায় তাহলে তুমি তাদের বলে দাও, এসো (আমরা সবাই এ ব্যাপারে একমত হই), আমরা আমাদের ছেলেদের ডাকবো এবং তোমাদের ছেলেদেরও ডাকবো, (একইভাবে আমরা ডাকবো) আমাদের নারীদের এবং তোমাদের নারীদেরও, (সাথে সাথে) আমরা আমাদের নিজেদের এবং তোমাদেরও (এক সাথে জড়ো হওয়ার জন্যে) ডাক দেবো, অতপর (সবাই এক জায়গায় জড়ো হলে) আমরা বিনীতভাবে দোয়া করবো, (আমাদের মধ্যে) যে মিথ্যাবাদী তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক।
৬২. এ হচ্ছে সঠিক (ও নির্ভুল) ঘটনা। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মা’বুদ নেই; নিসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা পরম শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাময়।
৬৩. অতপর তারা যদি (এ চ্যালেঞ্জ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে (তারা যেন জেনে রাখে,) আল্লাহ তায়ালা কলহ সৃষ্টিকারীদের (ভালো করেই) জানেন।
৬৪. (হে নবী,) তুমি বলো, হে কেতাবধারীরা, এসো আমরা এমন এক কথায় (উভয়ে একমত হই) যা আমাদের কাছে এক (ও অভিন্ন এবং সে কথাটি হচ্ছে), আমরা উভয়েই আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কারো এবাদাত করবো না এবং তাঁর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার বানাবো না, (সর্বোপরি) এক আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আমরা আমাদের মাঝেও একে অপরকে প্রভু বলে মেনে নেবো না; অতপর তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদের তুমি বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেকো, আমরা আল্লাহর সামনে আনুগত্যের মাথা নত করে দিয়েছি।
৬৫. (তুমি আরো বলো,) হে কেতাবধারীরা, তোমরা ইবরাহীম সম্পর্কে (আমাদের সাথে অযথা) কেন তর্ক করো, অথচ (তোমরা জানো) তাওরাত ও ইনজীল তার (অনেক) পরে নাযিল করা হয়েছে; তোমরা কি (এ কথা) বুঝতে পারছো না?
৬৬. হ্যাঁ, এর কয়েকটি বিষয়ে তোমাদের (হয়তো) কিছু কিছু জানাশোনা ছিলো এবং সে বিষয়ে তো তোমরা তর্ক বিতর্কও করলে, কিন্তু যেসব বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞানই নেই সেসব বিষয়ে তোমরা বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছো কেন? আল্লাহ তায়ালাই (সব কিছু) জানেন, তোমরা কিছুই জানো না,
৬৭. (সঠিক ঘটনা হচ্ছে,) ইবরাহীম না ছিলো ইহুদী না ছিলো খৃস্টান; বরং সে ছিলো একজন একনিষ্ঠ মুসলিম; সে কখনো মোশরেকদের দলভুক্ত ছিলো না।
৬৮. মানুষদের ভেতর ইবরাহীমের সাথে (ঘনিষ্ঠতম) সম্পর্কের বেশী অধিকার তো আছে সেসব লোকের, যারা তার অনুসরণ করেছে, এ নবী ও (তার ওপর) ঈমান আনয়নকারীরাই (হচ্ছে) ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তি; (মূলত) আল্লাহ তায়ালা একমাত্র তাদেরই সাহায্যকারী (পৃষ্ঠপোষক) যারা তাঁর ওপর ঈমান আনে।
৬৯. এ কেতাবধারীদের একটি দল (বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে) তোমাদের কোনো না কোনোভাবে পথভ্রষ্ট করে দিতে চায়; যদিও তাদের এ বোধটুকু নেই যে, (তাদের এসব কর্মপন্থা) তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিকেই পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।
৭০. হে কেতাবধারীরা, তোমরা (জেনে বুঝে) কেন আল্লাহর আয়াত (ও তাঁর বিধান) অস্বীকার করছো, অথচ (এই ঘটনাসমূহের সত্যতার) সাক্ষ্য তো তোমরা নিজেরাই বহন করছো।
৭১. হে কেতাবধারীরা, কেন তোমরা ‘হক’-কে বাতিলের সাথে মিশিয়ে দিচ্ছো, (এতে করে) তোমরা তো সত্যকেই গোপন করে দিচ্ছো, অথচ (এটা যে সত্যের একান্ত পরিপন্থী) তা তোমরা ভালো করেই জানো।
৭২. আহলে কেতাবদের (মধ্য থেকে) একদল (নির্বোধ) তাদের নিজেদের লোকদের বলে, মুসলমানদের ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা সকাল বেলায় তার ওপর ঈমান আনো এবং বিকেল বেলায় (গিয়ে) তা অস্বীকার করো, (এর ফলে) তারা সম্ভবত (ঈমান থেকে) ফিরে আসবে।
৭৩. যারা তোমাদের জীবন বিধানের অনুসরণ করে, এমন সব লোকজন ছাড়া অন্য কারো কথাই তোমরা মেনে নিয়ো না; (হে নবী,) তুমি বলে দাও, একমাত্র হেদায়াত হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত (তোমরা একথা মনে করো না যে), তোমাদের যে ধরনের (ব্যবস্থা) দেয়া হয়েছে তেমন ধরনের কিছু অন্য কাউকেও দেয়া হবে এবং (সে সূত্র ধরে) অন্য লোকেরা তোমাদের মালিকের দরবারে তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো রকম যুক্তিতর্ক খাড়া করবে, (হে নবী); তুমি তাদের বলে দাও, (হেদায়াতের এ) অনুগ্রহ অবশ্যই আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই তা দান করেন; আল্লাহ তায়ালা বিশাল, প্রজ্ঞাসম্পন্ন।
৭৪. নিজের দয়া দিয়ে তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই (হেদায়াতের জন্যে) খাস করে নেন; (বস্তুত) আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন অসীম দয়া ও অনুগ্রহের মালিক।
৭৫. আহলে কেতাবদের মধ্যে এমন লোকও আছে, তুমি যদি তার কাছে ধন সম্পদের এক স্তুপও আমানত রাখো, সে (চাওয়ামাত্রই) তা তোমাকে ফেরত দেবে, আবার এদের মধ্যে এমন কিছু (লোকও) আছে যার কাছে যদি একটি দীনারও তুমি রাখো, সে তা তোমাকে ফিরিয়ে দেবে না, হ্যাঁ, যদি (এ জন্যে) তুমি তার ওপর চেপে বসতে পারো তাহলে (সেটা ভিন্ন), এটা এই কারণে যে, এরা বলে, এই (অ-ইহুদী) অশিক্ষিত লোকদের ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, (এভাবেই) এরা বুঝে শুনে আল্লাহর ওপর মিথ্যা কথা বলে।
৭৬. অবশ্য যে ব্যক্তি (আল্লাহর সাথে স¤ক্সাদিত) প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে এবং (সে ব্যাপারে) সাবধানতা অবলম্বন করে, (তাদের জন্যে সুখবর হচ্ছে) আল্লাহ তায়ালা সাবধানী লোকদের খুব ভালোবাসেন।৭৭. (যারা নিজেদের আল্লাহর সাথে স¤ক্সাদিত) প্রতিশ্রুতি ও শপথসমূহ সামান্য (বৈষয়িক) মূল্যে বিক্রি করে দেয়, পরকালে তাদের জন্যে (আল্লাহর পুরস্কারের) কোনো অংশই থাকবে না, সেদিন এদের সাথে আল্লাহ তায়ালা কোনো কথাবার্তা বলবেন না, (এমনকি সেদিন) আল্লাহ তায়ালা তাদের দিকে তাকিয়েও দেখবেন না এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের পাক পবিত্রও করবেন না, (সত্যিই) এদের জন্যে রয়েছে কঠোর পীড়াদায়ক আযাব। ৭৮. এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা কেতাবের কোনো অংশ যখন পড়ে তখন নিজেদের জিহ্বাকে এমনভাবে এদিক-সেদিক করে নেয়, যাতে তোমরা মনে করতে পারো যে, সত্যি বুঝি তা কেতাবের কোনো অংশ, কিন্তু (আসলে) তা কেতাবের কোনো অংশই নয়, তারা আরো বলে, এটা আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে, কিন্তু তা আল্লাহর কাছ থেকে আসা কিছু নয়, এরা জেনে শুনে আল্লাহর ওপর মিথ্যা কথা বলে চলেছে।
৭৯. কোনো মানব সন্তানের পক্ষেই এটা (সম্ভব) নয় যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে তাঁর কেতাব, প্রজ্ঞা ও নবুওত দান করবেন, অতপর সে লোকদের (ডেকে) বলবে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে (এখন) সবাই আমার বান্দা হয়ে যাও, বরং সে (তো নবুওতপ্রাপ্তির পর এ কথাই) বলবে, তোমরা সবাই তোমাদের মালিকের বান্দা হয়ে যাও, এটা এই কারণে যে, তোমরাই মানুষদের (এই) কেতাব শেখাচ্ছিলে এবং তোমরা নিজেরাও (তাই) অধ্যয়ন করছিলে।
৮০. আল্লাহর ফেরেশতা ও তাঁর নবীদের প্রতিপালকরূপে স্বীকার করে নিতে এ ব্যক্তি তোমাদের কখনো আদেশ দেবে না; একবার আল্লাহর অনুগত মুসলমান হবার পর সে কিভাবে তোমাদের পুনরায় কুফরীর আদেশ দিতে পারে?
৮১. আল্লাহ তায়ালা যখন তাঁর নবীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন (তখন তিনি বলেছিলেন, এ হচ্ছে) কেতাব ও (তার ব্যবহারিক) জ্ঞান কৌশল, যা আমি তোমাদের দান করলাম, অতপর তোমাদের কাছে যখন (আমার কোনো) রসূল আসবে, যে তোমাদের কাছে রক্ষিত (আগের) কেতাবের সত্যায়ন করবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার (আনীত বিধানের) ওপর ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে; আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি এ (কথার) ওপর এ অংগীকার গ্রহণ করছো? তারা বললো, হ্যাঁ আমরা (মেনে চলার) অংগীকার করছি; আল্লাহ তায়ালা বললেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সাথে (এ অংগীকারে) সাক্ষী হয়ে রইলাম।
৮২. অতপর যারা তা ভংগ করে (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেবে, তারা অবশ্যই বিদ্রোহী (বলে পরিগণিত) হবে।
৮৩. তারা কি আল্লাহর (দেয়া জীবন) ব্যবস্থার বদলে অন্য কোনো বিধানের সন্ধান করছে? অথচ আসমান যমীনে যা কিছু আছে ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক, আল্লাহ তায়ালার (বিধানের) সামনে আÍসমর্পণ করে আছে এবং প্রত্যেককে তো তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
৮৪. (হে নবী,) তুমি বলো, আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি, ঈমান এনেছি আমাদের ওপর যা নাযিল করা হয়েছে তার ওপর, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাদের অন্যান্য বংশধরদের প্রতি যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার ওপরও (আমরা ঈমান এনেছি), আমরা আরো ঈমান এনেছি, মূসা, ঈসা এবং অন্য নবীদের তাদের মালিকের পক্ষ থেকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তার ওপরও, (আল্লাহর) এ নবীদের কারো মাঝেই আমরা কোনো ধরনের তারতম্য করি না, (মূলত) আমরা সবাই হচ্ছি আল্লাহর কাছে আÍসমর্পণকারী (মুসলমান)।
৮৫. যদি কেউ ইসলাম ছাড়া (নিজের জন্যে) অন্য কোনো জীবন বিধান অনুসন্ধান করে তবে তার কাছ থেকে সে (উদ্ভাবিত) ব্যবস্থা কখনো গ্রহণ করা হবে না, পরকালে সে চরম ব্যর্থ হবে। ৮৬. (বলো,) যারা ঈমানের (আলো পাওয়ার) পর কুফরী করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাদের কিভাবে (আবার আলোর) পথ প্রদর্শন করবেন, অথচ (এর আগে) এরাই সাক্ষ্য দিয়েছিলো যে, আল্লাহর রসূল সত্য এবং (এ রসূলের মাধ্যমেই) এদের কাছে উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এসেছিলো; (আসলে) আল্লাহ তায়ালা কখনো সীমালংঘনকারী ব্যক্তিদের সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।
৮৭. এসব (সীমালংঘনজনিত) কার্যকলাপের একমাত্র প্রতিদান হিসেবে তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতা ও অন্য সব মানুষের অভিশাপ (বর্ষিত হবে)।
৮৮. (সে অভিশপ্ত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম,) সেখানে তারা অনাদিকাল ধরে পড়ে থাকবে, (এক মুহূর্তের জন্যেও) তাদের ওপর শাস্তির মাত্রা কমানো হবে না, না আযাব থেকে তাদের (একটুখানি) বিরাম দেয়া হবে!
৮৯. (তবে) তাদের কথা আলাদা, যারা (এসব কিছুর পর) তাওবা করেছে এবং (তারপর) নিজেদের সংশোধন করে নিয়েছে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
৯০. কিন্তু যারা একবার ঈমান আনার পর কুফরীর (পথ) অবলম্বন করেছে, অতপর তারা এই বেঈমানী (কার্যকলাপ) দিন দিন বাড়াতেই থেকেছে, (আল্লাহর দরবারে) তাদের তাওবা কখনো কবুল হবে না, কারণ এ ধরনের লোকেরাই হচ্ছে পথভ্রষ্ট।
৯১. (এটা সুনিশ্চিত,) যারা আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করেছে এবং কুফরী অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু হয়েছে, তারা যদি নিজেদের (আল্লাহর আযাব থেকে) বাঁচানোর জন্যে এক পৃথিবীপSর্ণ স্বর্ণও মুক্তিপণ হিসেবে খরচ করে, তবু তাদের কারো কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না; বস্তুত এরাই হচ্ছে সে সব (হতভাগ্য) ব্যক্তি যাদের জন্যে রয়েছে মর্মন্তুদ আযাব, আর সেদিন তাদের কোনো সাহায্যকারীও থাকবে না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY