ইতিহাস বনাম কোরআনের তথ্য

0
399

ইতিহাস বনাম কোরআনের তথ্য

মহাগ্রন্থ আল কোরআন মানব জাতির সামনে যে ইতিহাস তুলে ধরে তা কোনো ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী মানুষের আন্দায অনুমানের ভিত্তিতে রচিত নয় এবং নিছক অতীতের কেসসা কাহিনী শোনানোও এ ইতিহাস বর্ণনার উদ্দেশ্য নয়। যে ইতিহাস এ কোরআন পেশ করেছে, পেশকৃত সে ইতিহাস যে যুগের, যে অঞ্চলেরই হোক না কেন, সে ব্যাপারে কোরআনের বক্তব্যই চূড়ান্ত সত্য। কারণ এই কোরআনিক ইতিহাসের সরবরাহকারী হলেন মহাজ্ঞানী চিরঞ্জীব সত্তা আল্লাহর রব্বুল আলামীন। উদাহরণস্বরূপ নমরূদ, যুলকারনায়নের ইতিহাসের কথাটা এখানে তুলে ধরতে পারি।

আল কোরআনের আয়াতে যুল কারনায়নের যে বর্ণনা এসেছে তাতে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়, তাঁর আগমনকাল ও স্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। আসলে কোরআনে বর্ণিত কেসসাগুলোর মধ্যে এ দিকগুলো পরিত্যাগ করা হয়েছে। কেননা কবে কোন ঘটনা ঘটেছে সে সব তারিখ জানানো এ ইতিহাস বর্ণনার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব ঘটনার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা। মানব জীবন ও তার সুখ শাস্তি প্রয়োজনে যে শিক্ষা তা চিরদিনের জন্যেই এক এ শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে যেসব ঘটনা বা কাহিনী বর্ণনা করা হয় তাও সকল যমানার জন্যে একইভাবে প্রযোজ্য বিধায় ওসব ঘটনা অধিকাংশ স্থানে কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা কালের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। এজন্যেই স্থান ও কালের কথার উল্লেখ নেই।

প্রচলিত ইতিহাসে সেকান্দার যুলকারনায়ন নামক যে বাদশাহ সম্পর্কে জানা যায়, সে ব্যক্তি এবং আল কোরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন এক ব্যক্তি নয়, কারণ সে ব্যক্তি ছিলো একজন পৌত্তলিক গ্রীক বাদশাহ। যার সম্পর্কে আল কোরআন জানিয়েছে, তিনি ছিলেন সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, পুনরুত্থান এবং আখেরাতের জীবনের ওপরও ছিলো তার প্রগাঢ় বিশ্বাস।

‘আল আসারুল বাক্বিয়াতু আনিল কুরূনিল খালিয়াত’ নামক কেতাবে জ্যোতির্বিদ আবু রায়হান আল বিরূনী বলেন, আল কোরআনে বর্ণিত যুলকারনায়ন ছিলেন ‘হেময়ারের’ অধিবাসী। তার নাম থেকেই তিনি একথা প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন, যেহেতু হেময়ারের বাদশাহরা ‘য-কায়া-নুয়াস’ ও ‘য-য়্যাযান’ নামক উপাধিসমূহ গ্রহণ করতেন, কিন্তু একথা যে যুলকারনায়ন সম্পর্কে কথা এসেছে তার মূল নাম ছিলো আবু বকর ইবনে আফরিকাশ। তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে ভূমধ্য সাগরের উপকূলে পৌঁছে যান। সেখান থেকে তিনি তিউনিসিয়া মরক্কো ইত্যাদি দেশের দিকে অগ্রসর হন। তিনি আফ্রিকা মহাদেশে একটি নগরী নির্মাণ করেন এবং তার নামেই সেখানকার সকল এলাকার নামকরণ করা হয়। তাকে যুলকারনায়ন নামে অভিহিত করা হতো, যেহেতু তিনি সূর্যের দুই উদয়ের স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন।’

ওপরের এ বক্তব্য সঠিক হলেও হতে পারে, কিন্তু একথা প্রমাণ করার মতো আমাদের কাছে কোনো যথেষ্ট যুক্তি প্রমাণ নেই। কোরআন কারীমে এই যুলকারনায়নের জীবনী সম্পর্কে যে আংশিক বর্ণনা এসেছে, এর চেয়ে বেশী কোনো তথ্য প্রচলিত ইতিহাস থেকেও আমরা পাই না। আল কোরআনে অন্যান্য যেসব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর মতোই তার সম্পর্কে সামান্য কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় মাত্র, যেমন নূহ জাতি, হুদ জাতি, সালেহ জাতি ইত্যাদি সম্পর্কে আল কোরআনে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেখা যায়। আসলে আধুনিক যেসব ইতিহাস আমরা দেখতে পাই, এগুলোর বেশীর ভাগই নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। প্রাক ইতিহাস যুগের বহু ঘটনা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না; সুতরাং ওসব ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা একেবারেই নিরর্থক। তবে যদি তাওরাত কেতাব পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা না হতো, অর্থাৎ এ কেতাব যে অবস্থায় নাযিল হয়েছিলো, যদি সে অবস্থায় আজ পর্যন্ত বর্তমান থাকতো তাহলে এ কেতাব থেকে অতীতের রাজা বাদশাহ ও জাতিসমূহ সম্পর্কে বহু প্রামাণ্য সত্য সঠিক তথ্য জানা সম্ভব হতো, কিন্তু নিসন্দেহে একথা সত্য, তাওরাত বহু কাল্পনিক বা পৌরাণিক কাহিনীতে ভরপুর হয়ে রয়েছে এবং এতে এমনও অনেক বর্ণনা আছে যা আল্লাহর প্রেরিত মূল ঘটনার ওপর যথেষ্ট রং চড়িয়ে লেখা হয়েছে, যার ফলে তাওরাতকে আর প্রামাণ্য বা ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর সঠিক উৎস বলে মনে করা যায় না।

আর এ কথা তো অত্যন্ত সুস্পষ্ট, দুই কারণে আল কোরআনকে ইতিহাসের নিরিখে বিচার করা যায় না

এক. ইতিহাসের জন্ম হয়েছে অতি সা¤ক্স্রতিককালে, অথচ ইতিপূর্বে সংঘটিত মানব ইতিহাসের অসংখ্য ঘটনা অজানার অন্তরালেই রয়ে গেছে, যে বিষয়ে কোনো কিছুই জানা যায় না। এমতাবস্থায় আল কোরআন ওই সকল হারানো দিনের অনেক তথ্য পেশ করেছে তথাকথিত ইতিহাস যার কোনো খবরই রাখে না বা রাখা তার পক্ষে সম্ভবই নয়।

দুই. অতীতের ঘটনাবলীর মধ্য থেকে কোনো কিছু যদি ইতিহাসে পাওয়া যায়ও তো তার কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। কারণ, সেগুলো হচ্ছে সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসম্পন্ন ও অপ্রতুল জ্ঞানের অধিকারী মানুষের নিজের তৈরী এবং সেসব গ্রন্থাবলী পরিবর্তন পরিবর্ধন ও অতিরঞ্জনের দোষ ত্র“টি-বিচ্যুতি থেকে মোটেই মুক্ত নয় এর নযির তো আমরা আমাদের এ আমলেই দেখতে পাচ্ছি। অথচ এখন তো এমনি গৌরবপূর্বের্ণ সময় যখন অজানা ও গোপন তথ্যাদির সত্যাসত্য সহজেই জানা বা যাচাই করা সহজসাধ্য হয়ে গেছে। এখন কোনো এক ব্যক্তি কর্তৃক সরবরাহকৃত সংবাদ একাধিকভাবে দেখা হয়, বর্ণনা করা হয়, নানা পোশাক পরিয়ে প্রকাশ করা হয় এবং এসব সম্পর্কে যে বিভিন্নমুখী বিবরণ দেয়া হয়, দেখা যায় তার একটা আরেকটার বিপরীত। এ ধরনের সংগ্রহ মাধ্যম থেকেই তো গ্রহণ করা হয় ইতিহাসের উপাদানসমূহ এবং এভাবে গড়ে উঠেছে আধুনিক ইতিহাসের ধারা। এটাই ইতিহাস সম্পর্কে আসল সত্য, তা যে যা বাগাড়ম্বর করুক না কেন।

এখন সংক্ষিপ্ত কথা হচ্ছে, কোরআন করীমে যে সব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো যদি ইতিহাসের মাপকাঠিতে বিচার করা হয় তাহলে যে কথাটি আসে তা হচ্ছে, এ কালাম অস্বীকার করে মানুষের উদ্ভাবিত সেসব বৈজ্ঞানিক মূলনীতি কার্যকর করতে হবে যা সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতে পারে। এ কথা বলার সময় ওই প্রগতিবাদীরা খেয়াল করে না যে, চূড়ান্ত ফয়সালাদানকারী আল কোরআনের সাথে ওই বৈজ্ঞানিক নীতি সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে কিনা। প্রকৃত মোমেন ব্যক্তি কিছুতেই এসব তথাকথিত জ্ঞানগর্ভ বা বৈজ্ঞানিক উপায় উপাদানের বিষয়গুলো মেনে নিতে পারে না। যেহেতু এসব আবিষ্কার ও তথ্যাদির ভিত্তি হচ্ছে নিছক আন্দায অনুমান, আর অনুমান কোনো সময় সঠিক হয় আবার পরবর্তীকালে বে-ঠিকও প্রমাণিত হয়। পক্ষান্তরে কোরআন যে তথ্য, যে ইতিহাস আমাদের সামনে পেশ করেছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা এ কোরআন এসেছে সেই অদ্বিতীয় ও চিরঞ্জীব সত্তার কাছ থেকে যিনি চিরকাল ছিলেন, চিরকাল থাকবেন। শুধু এই পৃথিবীর ইতিহাসই নয়; বরং গোটা পৃথিবী ও সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে সবই তো তাঁর সৃষ্টি। সুতরাং পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে কোরআনের তথ্যই একমাত্র নির্ভুল ও চূড়ান্ত। তাই আমরা কখনোই ইতিহাসের তথ্যের মানদন্ডে কোরআনকে যাচাই করবো না; বরং কোরআনের তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা ইতিহাসের সত্যাসত্য যাচাই করবো। কোরআনের একটি অক্ষরের সাথেও যদি ইতিহাসের কোনো সংঘর্ষ দেখা দেয়, তাহলে আমরা ইতিহাসকে ছুঁড়ে ফেলে কোরআনের তথ্য গ্রহণ করবো।

সূত্র: আল কোরআন একাডেমী পাবলিশেন্স প্রকাশিত বিষম্য়কর গ্রন্থ আল কোরআন গ্রন্থ থেকে।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY