সূরা আল এখলাস : সংক্ষিপ্ত আলোচনা

0
160

সূরা আল এখলাস : সংক্ষিপ্ত আলোচনা
আয়াত ৪ রুকু ১
মক্কায় অবতীর্ণ

সূরার সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সহীহ হাদীসসমূহের ভিত্তিতে এই সূরা কোরআন মজীদের এক-তৃতীয়াংশ। বোখারী শরীফে হযরত আবু সাঈদ (রা.)এর বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, এক ব্যক্তি আরেক জন ব্যক্তিকে বারবার এ সূরার পুনরাবৃত্তি করতে শুনলেন। তিনি সকাল বেলায় রসূল (স.)-এর দরবারে হাযির হয়ে এই ঘটনা তাঁকে বললেন। তিনি বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, এত ছোট্ট একটি সূরা বারবার পড়ার কী প্রয়োজন আছে।
ঘটনা শোনার পর রসূল (স.) বললেন, কসম সেই মহান সত্ত্বার যার হাতে আমার জীবন, এই সূরা হচ্ছে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ এবং এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কেননা, যে একত্ববাদের ঘোষণা আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীর কাছে দিয়েছেন এই ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ হচ্ছে সেই একত্ববাদেরই মূলকথা। এটি আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা ও মানুষের জন্যে তার জীবন পদ্ধতিও বর্ণনা করে। ইসলামী তত্ত্বকথার বড়ো বড়ো কথাগুলোর মধ্যে এর স্থান অনেক শীর্ষে অবস্থিত।

তাফসীর
‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ বর্ণিত ‘আহাদ’ শব্দটি অনেক সূক্ষ্ম। এই শব্দটি প্রথমেই এর সাথে একথাটি যোগ করে দেয় যে, তিনি ছাড়া অন্য কোনো কিছু তাঁর সাথে নেই। এবং এটাও সত্য যে, তাঁর মতো অন্য কিছুই নেই।
আল্লাহ তায়ালার একত্বের অর্থ হচ্ছে অস্তিত্বে তিনি একা। তাঁর অস্তিত্বের একথা ছাড়া আর কিছুই সত্য নয়, তাঁর অস্তিত্ব ছাড়া অন্য কিছুরই কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি ছাড়া অন্য যা কিছু আছে তা তাঁরই দান। তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য গ্রহণ করে এবং নিজেদের অস্তিত্বের ধারণাও তাঁর মূল অস্তিত্ব থেকে গ্রহণ করে।
এ কারণেই এই একত্ব হচ্ছে সবকিছুর কর্তা। অতএব তিনি ছাড়া আর কেউই করনেওয়ালা নেই। অন্য কারো কোনো প্রভাবও নেই। অর্থাৎ এ বিশ্ব জগতের সবকিছুর অস্তিত্ব সত্যিকার অর্থে এবং স্থায়ী কোনো অস্তিত্ব থাকলে তা আল্লাহ তায়ালারই আছে, অন্য কারো নয়। এ থেকে এ কথা জানা যায় যে, এই সূরায় বর্ণিত আকীদায় মানুষের বিশ্বাসগত আকীদা ও তাঁর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা এ উভয়টাই প্রমাণ করে।

তাওহীদের রূপরেখা ও উপকারীতা
তাওহীদের ব্যাখ্যা ও ধারণা যখন একবার মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন তার মন সব ধরনের সন্দেহ, সব ধরনের সন্দেহ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং তার মন এমন সব কিছু থেকেই আলাদা হয়ে যায়, যা সে তার অস্তিত্বের ধারণা এবং তার ক্রিয়াকর্মে কর্তার ভূমিকায় একক ও অদ্বিতীয় সত্তার সাথে সাংঘর্ষিক দেখতে পায়।
যদি সব কয়টি জিনিসের অস্তিত্বের ধারণা থেকে সম্পর্ণ মুক্ত না হতে পারে তবে অন্তত অন্যকিছুর তুলনা থেকে তা তাকে মুক্ত করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্বই আসল নয়। আল্লাহর কর্তা-বাচকের ইচ্ছা ছাড়া অন্য কিছুই সত্য নয়। মনে তখন একক সত্যের অনুভূতি ছাড়া অন্য কোনো ধারণাই অবশিষ্ট থাকে না এবং এই সত্যের বাইরে অন্য সব কিছুর সম্পর্ক থেকেই তার মন পরিষ্কার হয়ে যায়।
তখন সে সব ধরনের বিধিবন্ধন থেকেও মুক্ত হয়ে যায়। নিয়মনীতির বাধা থেকেও তার মুক্তি মেলে। সব আকর্ষন থেকে মুক্ত হয়ে যায়, ভয়ভীতি থেকে মুক্ত হয়ে যায়, যা অনেক কয়টি বিধি নিষেধের মূল। যখন সে আল্লাহ তায়ালাকেই পেয়ে যায় তখন তার সামনে আর দ্বিতীয় কোনো লক্ষ থাকে না।
এ অবস্থায় অন্য কিছুর আকর্ষণ তার কি কাজে লাগবে? যখন সে জেনে যায় যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারোই কিছু করার ক্ষমতা নেই। তখন সে কাকে ভয় করবে? অতএব অস্তিত্বের মূলগত ব্যাপারে যখন আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সে অন্য কোনো সত্যকে দেখতে পায় না এমন ধরনের একটি ধারণা তার মনে সৃষ্টি হলো, তখন তার মনে এই ধারণাও সৃষ্টি হয় যে, সবকিছুর অস্তিত্বের মূলে সেই আসল ও খাঁটি অস্তিত্বই ক্রিয়াশীল। কেননা সব অস্তিত্বের ধারণা ও সৃষ্টি তো মূল সত্ত্বার অস্তিত্ব থেকেই এসেছে। আর এই হচ্ছে সে পর্যায়, যখন যা-ই দেখে তাতে সে আল্লাহর হাতকেই দেখতে পায়।
এরপর আরো এক স্তর ওপরে উঠে সে এই কায়েনাতের সর্বত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। কেননা দেখার মতো আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো কিছুই তো নেই। তিনিই একমাত্র সত্য। এভাবেই আস্তে আস্তে তার অন্তর থেকে ‘উপায় উপকরণ কোনো কিছু করতে পারে’ এই বিশ্বাসই বিলীন হয়ে যায়।
এভাবেই মানুষ প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি ঘটনা দুর্ঘটনাকে তার মূল উৎসের দিকে ফিরিয়ে নেবে যেখান থেকে তা শুরু হয়েছে এবং যা দিয়ে তা প্রভাবানি¦ত হয়েছে। এই মহাসত্যটাকেই কোরআন বহুভাবে ঈমানদারদের মনে বসাতে চেষ্টা করেছে। এ কারণে সে কোনো ব্যাপারের বাহ্যিক কারণ না খুঁজে তাকে সরাসরি আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও এরাদার সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়।
কোরআনের আরো অনেক আয়াতে এই সত্যের দিকে ইংগিত প্রদান করা হয়েছে। যখন সব কয়টি বাহ্যিক উপায়-উপকরণকে সামনে থেকে সরিয়ে দেয়া যায় এবং সমগ্র বিষয়কেই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও এরাদার সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়, তখন মনে দারুণ প্রশান্তি আসে। মানুষ যখন সে একক সত্ত্বার সন্ধান পেয়ে যায় তখন তার যা কিছুর প্রতি আকর্ষণ হয় তা শুধু তার কাছেই চায়। যতো কিছুকেই তার ভয় হয় তা থেকে বাঁচার জন্যে শুধু আল্লাহর কাছেই দোয়া করবে।
এ অবস্থায় সব বাহ্যিক উপায় উপকরণ, ক্রিয়াকলাপের ফলাফল ও প্রভাব কোনোটাই তার মানসিক প্রশান্তি নষ্ট করতে পারে না বরং এগুলো দেখে সে আরো বেশী পরিতৃপ্তি পায়। কারণ সে জানে এগুলোর কোনোই মূল্য নেই, এগুলো কোনোটাই কিছু করতে পারে না। সবকিছুর চড়ান্ত ক্ষমতা এককভাবে আল্লাহ তায়ালার হাতেই।
এ হচ্ছে সে পর্যায়গুলো যা ‘তাসাউফের’ অনুসারীরা অবলম্বন করেছেন, কিন্তু তারা এ পর্যায়গুলোকে টেনে অনেক দুরে নিয়ে গেছেন। কেননা, ইসলাম মানুষের কাছে এই চায় যে, মানুষ এই মহাসত্যের দিকে চলার পথ যেন এভাবে দেখে নেয় যে তাদের এই দুনিয়ার বাস্তব মানুষের জীবনই তাকে কাটাতে হবে এবং এ যমীনে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের সব বিভাগগুলোকে সমভাবে গ্রহণ করে চলতে হবে।
তার সাথে সাথে এই সত্যকেও মনে রাখবে যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো সত্য নেই। তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কিছুর অস্তিত্বও নেই। তিনি ছাড়া আর কেউই কিছু করতে সক্ষম নয় এবং এই পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ সে গ্রহণ করবে না।
এখান থেকেই জীবনের জন্যে পূর্ণাঙ্গ বিধানের প্রশ্নটি শুরু হয়ে যায়, যা এই ব্যাখ্যা ও এর আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় অর্থাৎ এ থেকে যে ধ্যানÑধারণা, অনুভূতি ও সংকল্প তৈরী হয় জীবনের ব্যবস্থা তার ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। এই হচ্ছে একক আল্লাহর আনুগত্যের পথ, যিনি ছাড়া আর কারো অস্তিত্বের কোনোই সত্যতা নেই, তিনি ছাড়া এই বিশ্বজগতে অন্য কোনো নিয়ন্তক নেই। তার সংকল্প ছাড়া আর কারো কোনো সংকল্পের কোনোই প্রভাব নেই।
এটা এমন এক পথ, যে পথে মানুষের ভালোবাসা, আকর্ষণ ও ভয়ভীতির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কারো দিকেই আকৃষ্ট হয় না। আরাম ও কষ্টে, সুখ ও দুঃখে, নেয়ামত ও অভিশাপে শুধু বারবার তার দিকেই ফিরে যেতে হয়। কেননা, যার অস্তিত্ব মূলত কোনো অস্তিত্বই নয় তার দিকে চেয়ে কী লাভ? যিনি ছাড়া অন্য কেউই কিছু করতে পারে না তাকে বাদ দিয়ে অক্ষম কিছুর দিকে তাকিয়ে থেকে কী হবে?
এই পথ হচ্ছে সবকিছু এক আল্লাহর কাছ থেকে নেয়ার বিশ্বাস ও ধারণা, মর্যাদা ও  মূল্যবোধ, মাপকাঠি ও পরিমাপর্যন্ত, শরীয়ত ও আইন-কানুন নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা, শিষ্টাচার ও আনুষ্ঠানিকতা সবকিছুই একই সত্ত্বার কাছ থেকে নিতে হবে, যা সত্যিকার অর্থে একক সত্য অন্য কিছুই এই মানের নয়। এ পথ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পথ যিনি একক ও মহান সত্ত্বা, তাঁর কাছ থেকে ক্রিয়াকর্মের উৎসাহ ও প্রেরণা পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে যাতে করে মানুষ তার কাজকর্ম দিয়ে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে সক্ষম হয়। বাধা থেকে মুক্তি লাভ করে পথভ্রষ্টকারী বিষয় থেকে নাজাত হাসিল করতে পারেÑ চাই তা ব্যক্তি মানুষের মনের গভীরের কিছু হোক, অথবা তা যদি হয় মানুষের নিজস্ব কোনো ব্যক্তি ও জিনিস যা তার আশেপাশে ছড়িয়ে আছে কিংবা তা যদি হয় মানুষের নিজস্ব কোনো ব্যক্তিসত্ত্বার বিষয় অথবা সমগ্র সৃষ্টিকুলের কোনো জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ও ভীতির আকারে হোক, সর্বাবস্থায় এই পথ একজন ব্যক্তি মানুষকে কর্মের প্রেরণা যোগাবে।
এ হচ্ছে এমন এক পথ-যার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের সাথে এই পৃথিবীর অন্য সব কয়টি জিনিসের হে ও মমতা, আকর্ষণ ও সহমর্মিতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এসব কিছুর বিধি নিষেধ থেকে মুক্তি মানে এ নয় যে, এসব কিছুকে খারাপ মনে করতে হবে এবং ঘৃনায় মানুষ এসব কিছু থেকে দূরে সরে যাবে। এর সব কিছুই এসেছে আল্লাহর হাত দিয়ে, এগুলোর নিজেদের অস্তিত্বও সে অস্তিত্ব থেকেই পেয়েছে এবং এই সৃষ্টির সব কিছুতেই সে মৌলিক সত্যের অনুদান দৃষ্টিগোচর হবে। অতএব গোটা সৃষ্টি জগতের সব কিছুই আমাদের কাছে প্রিয়, কারণ এর প্রতিটি জিনিসই হচ্ছে প্রিয়জনের উপহার।
এই পথ উন্মুক্ত ও অনেক উঁচু। এ পথে যমীন খুব ছোটো, বৈষয়িক জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। এই যেন্দেগীর সহায়-সম্পদ খুবই নগণ্য। এ পথের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে এই বিধিবন্ধন ও সীমাবদ্ধতা থেকে বাইরে চলে আসা। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এ মুক্তির মানে দুনিয়ার জীবনকে ছেড়ে দেয়া কিংবা তাকে উদ্দেশ্যহীন মনে করা নয় এবং এটাকে ঘৃণা করে এ জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোও এর উদ্দেশ্য নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ সর্বদাই এ বৈষয়িক জীবনকে নিয়েই চলবে তবে মানবতার উৎকর্ষের খাতিরে তাকে সর্বদাই এসব কিছুর সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।
অপর কথায় এর অর্থ হচ্ছে মানুষদের তার সব কয়টি দায়দায়িত্ব সহই এ দুনিয়ার প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়েছে। নেতৃত্বের আসনও তাকে দেয়া হয়েছে এ সবকিছুরই সাথে। তবে সাথে সাথে প্রয়োজনে এ বৈষয়িক জীবনের বিধিÑবন্ধন থেকে তার পূর্ণাঙ্গ আযাদীও সেখানে অবশিষ্ট থাকবে। আধুনিক গীর্জার পথ ধরে মানবতার যে মুক্তি আসে, তাকে বাহ্য দৃষ্টিতে মনে হয় খুবই সহজ। কিন্তু ইসলাম তা মোটেই চায় না।
কেননা তার দৃষ্টিতে মুক্তির জন্যে খেলাফত তথা মানবতার পথ প্রদর্শন ইসলাম প্রদর্শিত এই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পথ যদিও কিছুটা কঠিন কিন্তু মানুষের মনুষত্বকে এটিই প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের অস্তিত্বের মাঝে উন্নত মান ও উচ্চতা বিরাজমান। তাই মানুষের আল্লাহকে তার স্রষ্টার উৎসের দিকে সর্বদাই স্বাধীন করে রাখতে হবে এবং এ জন্যে সে পথেই একে চালাতে হবে যা আল্লাহ তায়ালা শিখিয়েছেন।
এতক্ষণ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো তাকে ইসলামের প্রথম ও মৌলিক দাওয়াতের মূল ভিত্তি হিসেবে সামনে রাখুন। এই তাওহীদের ধারণাÑবিশ্বাসকেই মানুষের হৃদয়ে বদ্ধমূল করে রাখা হয়েছে। কেননা তাওহীদ কিংবা আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে, তাই হচ্ছে এর বিশ্বাসগত আকীদা-অস্তিত্বের ব্যাখ্যা ও জীবনের পূর্ণ বিধি-বিধান। এটা শুধু মুখে আওড়ানোর একটি বাক্য কিংবা অন্তরে বসিয়ে রাখার একটি ছবিই নয়। মূলত সবকিছুই হচ্ছে এই তাওহীদ। এই হচ্ছে জীবন বিধান, এই হচ্ছে দ্বীন। এরপর যা কিছুই এর ব্যাখ্যা ও পরিশিষ্ট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা হচ্ছে এর ফলশ্রুতি মাত্র।
তাওহীদের এই মৌলিক বিশ্বাসকে এভাবেই অন্তরে বদ্ধমূল করতে হবে যেভাবে এর ব্যাখ্যা পেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এর আগে যাদের ওপর কেতাব নাযিল করেছেন তাদের মধ্যে যেসব ভাঙ্গনÑবিপর্যয় ও গোঁড়ামি সৃষ্টি হয়েছে এবং তার ফলে তাদের বিশ্বাস কর্মধারা ও সমগ্র জীবন যেভাবে বদলে গেছে, তার মূল কারণ ছিলো এই যে, তাওহীদের নির্ভেজাল ধারণা তাদের অন্তর থেকে মিটে গেছে। এই মৌলিক গলদের কারণে তাদের জীবনের সর্বাংশে এই পরিবর্তনসমূহ সূচিত হয়েছে। তাওহীদের ইসলামী আকীদার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি মানুষের সমগ্র জীবনে ব্যাপৃত থাকে। এখানে জীবনের ভিত্তিই রাখা হয় এই আকীদা বিশ্বাসের ওপর। কর্মজীবনের ভিত্তিও এখানে একই জায়গায়। বিশ্বাস ও আইনে সর্বত্রই এ বিশ্বাসের প্রভাব থাকবে সমান সমান। প্রথম প্রস্তাব হচ্ছে, এক আল্লাহর শরীয়তই হবে জীবনের আইন। যদি জীবনে ও জীবনের আইনে এসব প্রভাব বিদ্যমান না থাকে, তাহলে তাওহীদের এ বিশ্বাস সম্পর্ণই মূল্যহীন ব্যাপার। কেননা কোথাও যখন তা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার সব ক’টি প্রভাব নিয়েই সে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। জীবনের সব কয়টি বিভাগ, সব কয়টি স্তর, সবখানেই সমভাবে তার প্রভাব পড়ে।
আল্লাহ তায়ালা এক, এর মানে হচ্ছে, তিনি ‘সামাদ’ কারো মুখাপেক্ষী নন কারো ওপর নির্ভরশীলও নন। তাঁর পিতা নেই, সন্তান নেই, না তাঁর সমকক্ষ দ্বিতীয় কেউ আছে। অবশ্য কোরআন এ বিষয়টির আরো কিছু ব্যাখ্যা পেশ করার জন্যে বলেছে, ‘আল্লাহুস সামাদ’।
‘সামাদ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এমন এক সরদার, যার ইচ্ছা ও আদেশ ছাড়া কিছুই হয় না, কোনো সিদ্ধান্তও তাঁর মরযী ছাড়া করা যায় না। আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি ছাড়া অদ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই। কেননা তিনি তাঁর খোদায়ীতে একক, অন্য সবাই তাঁর বান্দা। কিছু চাওয়া, কিছু আশা করার ব্যাপারে তাঁর দিকেই ধাবিত হতে হয়। যারা তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে তাদের কথা শোনা ও তা যথাযথ পুরণ করার ব্যাপারে তিনি এক ও একক। তিনিই হচ্ছেন সেই একক আল্লাহ তায়ালা, যার ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতিরেকে সমগ্র কায়েনাতে কিছুই সম্পাদিত হয় না। কোনো কিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কোনো সাথী নেই। তিনি যেহেতু এক তাই নির্ভরশীলতা ও মুখাপেক্ষীতার যাবতীয় দোষত্রুটি থেকে তিনি মুক্ত।
‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইয়ুলাদ’ অর্থাৎ তিনিই প্রথম তিনিই শেষ। নিজের অস্তিত্বের জন্যে তাঁর কারো সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রয়োজন নেই। তাঁকে নিজের স্থায়িত্বের জন্যে কারো ওপর ভরসা করতে হয় না। তাঁর অবস্থার কখনো পরিবর্তন হয় না। সর্বাবস্থায় তাঁর গুণাবলী হচ্ছে বিধি বন্ধনহীন।
জন্ম নেয়ার ভেতরে ত্রুটি ও দোষ থাকে। একটি জিনিস আগে ছিলো না জন্মের পরই অস্তিত্বে এসেছে। এ বিষয়টি আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে অসম্ভব ও অবান্তর। তাছাড়া জন্ম শব্দটির সাথে রয়েছে দু’জনের এক সমান হওয়ার সম্পর্ক। এই বিষয়টিও আল্লাহ তায়ালার জন্যে অসম্ভব। এ কারণেই ‘আহাদ’ এ শব্দটির মাঝে জন্মদাতা ও জন্ম উভয় ধারণারই অস্বীকৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
‘ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ’ অর্থাৎ তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই। অস্তিত্বের মূল সত্যেও নেই, সবকিছুই তিনি একা করেন, এ ধারণাতেও কেউ তাঁর মতো নেই। তাঁর নিজস্ব গুণাবলী অথবা অন্য কোনো গুণের ক্ষেত্রেও তাঁর দ্বিতীয় কেউ নেই। একথাও তাঁর সে একা হওয়ার বিষয়টিকেই প্রমাণ করে। সম্পর্ণ একা হওয়ার এ হচ্ছে অপরিহার্য পরিণাম। অবশ্য আলাদাভাবে একথাটা বলার মধ্যে এই গুণের আধিক্য ও এর অবশ্যম্ভাবিতাই বেশী প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকারান্তরে ভালোর খোদা একজন মন্দের খোদা আরেকজন এই বর্ণনা তাও অস্বীকার করে। সেখানে উভয় খোদার উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী পর¯ক্সর বিরোধীÑ একে অপরের উল্টো। এই দুই খোদার আকীদা ইরানী অগ্নিপূজকদের আকীদা থেকে এসেছে। তাঁরা সব সময় আলো আঁধারের জন্যে মনে করে আলাদা খোদা রয়েছে। আরব উপদ্বীপের উত্তর দিকের কিছু এলাকায়ও এই ধারণা প্রচলিত ছিলো, যে সব এলাকায় ইরানীদের রাজত্ব ছিলো।
এ সূরাটির তাওহীদের ইসলামী আকীদার স্বীকৃতি প্রদান করে। আর সূরায়ে ‘কাফেরূন’ তাওহীদ ও শেরেকের আকীদার মাঝে কোনো প্রকার সামঞ্জস্য ও মিলমিশকে প্রত্যাখান করে। এ উভয় সূরার মাঝেই তাওহীদ বিশ্বাসের ভিন্ন ভিন্ন দুটি দিক বর্ণিত ও পরিস্ফুটিত হয়ে আছে। সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী রসূল (স.) ফজরের সুন্নাত দুই রাকয়াতে এই দুই সূরা পড়ে দিনের আরম্ভ করতেন। এভাবে শুরু করার একটা গভীর ও উঁচুমানের উদ্দেশ্য নিহিত ছিলো।

সূত্র: তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY