আল আমীন থেকে আর রাসূল

সীরাতুন্নবী

0
205

আল আমীন থেকে আর রাসূল
আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী

অনুবাদ: খাদিজা আখতার রেজায়ী

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম মক্কায় বনি হাশেম বংশে ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। সেই বছরেই হাতী যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় সমন্দাট নওশেরওঁয়ায় সিংহাসনে আরোহণের চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়েছিল। জন্ম তারিখ ছিল ২০ অথবা ২২ শে এপ্রিল। ৫৭১ ঈসায়ী সাল। আল্লামা মোহাম্মদ সোলায়মান নদভী, সালমান মনসুরপুী এবং মোহম্মদ পাশা ফালাকি গবেষণা করে এ তথ্য প্রদান করেছেন।

ইবনে স্দা-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের মাতা বলেছেন, যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন তার দেহ থেকে এটি নূর বের হলো, সেই নূর দ্ভারা শাম দেশের মহল উজ্জ্বল হয়ে গেল। ইমাম আহমদ হযরত ইবনে ছারিয়া থেকে প্রায় একই ধরনের একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

কোন কোন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহর রসূলের জন্মের সময় কিছু কিছু ঘটনা নবুয়তের পটভূমি হিসাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কিসরার রাজ প্রাসাদের চৌষ্কটি পিলার ধসে পড়েছিল। অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকুস্ক নিভে গিয়েছিল। বহিরার গীর্জা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল অবশ্য বায়হাকির বর্ণনা, কিন্তু মোহম্মদ গাজ্জালী এ বর্ণনা সমর্থন করেননি।

জন্মের পর তাঁর মা, তাঁর দাদা আবদুল মোত্তালেবের কাছে পৌত্রের জন্মের সুসংবাদ দিলেন। তিনি খুব খুশি হলেন এবং সানন্দভাবে তাঁকে কাবাঘরে নিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন এবং আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলেন। এ সময় তিনি তাঁর নাম রাখলেন ষ্ক্রমোহম্মদ্। এ নাম আরবে পরিচিত ছিল না।  এরপর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সপ্তম দিনে তার খৎনা করলেন।

মায়ের পর তাঁকে আবু লাহাবের দাসী ছাওবিয়া দুধ পান করান। সে সময় ছাওবিয়ার কোলের শিশুর নাম ছিল মাস™£হ। ছাওবিয়া তাঁর আগে হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এবং তাঁর পরে আবু সালমা সামা ইবনে আবদুল আছাদ মাখজুমিকে দুধ পান করিয়েছিলেন।

নবুয়তের আগের জীবন
বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে যে সব গুণ বৈশিষ্ট পাওয়া যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লামের মধ্যে এককভাবেই সেই সব গুণবৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। তিনি ছিলেন দূরদর্শিতা, সত্যপ্রিয়তা এবং চিন্তাশীলতার এক সুউ” মিনার। চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, পরিপক্কতা, উষ্কেশ্য ও লক্ষ্যের পবিত্রতা তাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। দীর্র্ঘ সময়ের নীরবতার পর তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করতেন। পরিচ্ছন্ন, মার্জিত সুন্দর বিবেক বুদ্ধি, উন্নত স্বভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি জীবন সম্পর্কে॥বিশেষত মানুষের জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। এ অধ্যয়নের মাধ্যমে মানুষকে যে সকল পঙ্কিলতায় তিনি নিমজ্জিত দেখলেন, এতে তাঁর মন ঘৃণায় রী রী করে উঠলো। তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত মানুষ থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখলেন। মানুষের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেয়ার পর মানব কল্যাণে যতোটা সম্ভব অংশ গ্রহণ করতেন, বাকি সময় নিজের প্রিয় নির্জনতার ভুবনে ফিরে যেতেন। তিনি কখনো মদ স্পর্শ করেন নি, আস্তানায় যবাই করা পশুর গোশত খাননি, মূর্তির জন্য আয়োজিত উৎসব, মেলা ইত্যাদিতে কখনোই অংশ গ্রহণ করেননি।
শুষ্প থেকে তিনি মূর্তি নামের বাতিল উপাস্যদের অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। এতো বেশি ঘৃণা তাঁর অন্য কিছুর প্রতি ছিল না। লাত এবং ওজ্জার নামে শপথও তিনি সহ্য করতে পারতেন না।

তকদীর তাঁর ওপর হেফাযতের ছায়া ফেলে রেখেছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। পার্থিব কোন কিছু পাওয়ার জন্য যখন মন ব্যাকুল হয়েছে, অথবা অপছন্দনীয় রুসুম-রেওয়াজের অনুসরণের জন্য মনে ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে তখন আল্লাহ পাক তাঁকে সেসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
ইবনে আছিরের এক বর্ণনায় রয়েছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহেলি যুগের লোকেরা যেসব কাজ করতো, দ্বুারের বেশি কখনোই সেসব করার ইচ্ছে আমার হয়নি। সেই কাজেও আল্লাহর পক্ষ থেকে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে।

এরপর সে ধরনের কাজের ইচ্ছা কখনোই আমার মনে জাগেনি। ইতিমধ্যে আল্লাহ পাক আমাকে নবুয়তের গৌরবে গৌরবাণ্বিত করেছেন। মক্কার উপকণ্ঠে যে বালক আমার সাথে বকরি চরাতো একদিন তাকে বললাম, তুমি আমার বকরিগুলোর দিকে যদি লক্ষ্য রাখতে তবে আমি মক্কায় গিয়ে অন্য যুবকদের মতো রাত্রিকালের গল্প-গুজবের আসরে অংশ নিতাম। রাখাল রাযি হলো। আমি মক্কার দিকে রওয়ানা দিলাম। প্রথম ঘরের কাছে গিয়ে বাজনার আওয়াজ শুনলাম। জিজ্ঞাসা করায় একজন বলল, অমুকের সাথে অমুকের বিয়ে হচ্ছে। আমি শোনার জন্য বসে পড়লাম। আল্লাহ পাক আমার কান বন্ধ করে দিলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। রোদের আঁচ গায়ে লাগার পর আমার ঘুম ভাঙ্গলো। আমি তখন মক্কার উপকণ্ঠে সেই রাখালের কাছে ফিরে গেলাম। সে জিজ্ঞাসা করার পর সব কথা খুলে বললাম। আরো একদিন একই রকমের কথা বলে রাখালের নিকট থেকে মক্কায় পৌঁছুলাম কিন্তু প্রথমোক্ত রাতের মতই ওই ধরনের ভুল ইচ্ছা আমার মনে জাগ্রত হয়নি।
সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, কাবাঘর যখন নির্মাণ করা হয়েছিল তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আল্টাস পাথর ভাঙ্গছিলেন। হযরত আল্টাস আল্লাহর রসূলকে বললেন, তহবন্দ খুলে কাঁধে রাখো, পাথরের ধুলোবালি থেকে রক্ষা পাবে। তহবন্দ খোলার সাথে সাথে তিনি মাটিতে গিয়ে পড়লেন।, আকাশের প্রতি তাকালেন এবং বেহুঁশ হয়ে গেলেন, খানিক পরেই হুঁশ ফিরে এলে বললেন, আমার তহবন্দ আমার তহবন্দ। এরপর তাঁর তহবন্দ তাঁকে পরিয়ে দেয়া হয়। এক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, এ ঘটনার পর তাঁর লজ্জাস্থান আর কখনো দেখা যায়নি।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রশংসনীয় কাজ, উন্নত সুন্দর চরিত্র এবং মাধূর্য মস্কিত স্বভাবের কারণে স্বতন্ত্র এবং বিশিষ্ট ছিলেন তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অধিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, উন্নত চরিত্রের অধিকারী, সম্মান্নিত প্রতিবেশী সর্বাধিক দূরদর্শিতা সম্পন্ন, সকলের চেয়ে অধিক সত্যবাদী সকলের চেয়ে কোমল প্রাণ ও সর্বাধিক পবিত্র পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী। ভালো কাজে ভালো কথায় তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রসর এবং প্রশংসিত। অংগীকার পালনে ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রণী, আমানতদারির ক্ষেত্রে ছিলেন অতুলনীয়। স্বজাতির লোকেরা তার নাম রেখেছিল আল-আমিন। তিনি ছিলেন প্রশংসনীয়  গুণ বৈশিষ্টের সমন্বয়। হযরত খাদিজা রাদি আল্লাহু আনহা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি বিপদগ্রস্তদের বোঝা বহন করতেন, দু”খী দরিদন্দ লোকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতেন, মেহমানদারি করতেন, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্যকারী থাকতেন।

[ বিশ্বব্যাপী সিরাত প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত ষ্ক্রআর রাহীকল মাখতুম্ গ্রন্থ থেকে। আল কোরআন একাডেমী লস্কন-এর বাংলাদেশ কার্যালয় সম্পন্দতি বইটির বাংলা অনুবাদ পরিবেশন করেছে ]

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY