বাঙ্গালীর জীবনাচারে মুসলিম চিন্তার প্রভাব

লোকাচার

0
246

বাঙ্গালীর জীবনাচারে মুসলিম চিন্তার প্রভাব
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বাঙালি মানেই বাংলাভাষী কোটি মানুষের এক বিশাল গোষ্ঠী। যা ভাষার দিক থেকে বিশ্বে ৯ম। আর বাঙালির জীবনাচার মানে কি? বাংলা নববর্ষের এই লগ্নে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন করলে কেউ হয়তো বলবে, কি আবার পান্তা ইলিশ খাওয়া, পায়জামা-পাঞ্জাবীর কচকচানী আর শাড়ি চুড়ির ঝনঝনানী। কেউ হয়তো আরো দুই কদম এগিয়ে বলবে, ওইতো গরমে তালপাতার বাতাস, আম, কাঁঠাল, লিচুর সুঘ্রাণ, বর্ষায় নকশী কাথায় সুখ বোনা আর গাজীর গানের উল্লাস, শরতে কাশফুলে লুকোচুরি, বর্ষায় বোরো ধানের রোয়া লাগানো, হেমন্তে নবান্ন উৎসব, শীতে পিঠাপায়েস আর নানা রকম সবজি মেলা, বসন্তে ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম।

এইসব পার্বিক পার্বনের পরও বাঙালির জীবনে আরো কিছু একনিষ্ঠ আচার আছে যা যুগে যুগে পালিত হয়ে আসছে। যা একদিকে এ দেশের মানুষের বিশ্বাসের সাথে প্রোথিত অন্যদিকে জীবনঘনিষ্ঠও বটে। যদিও কালের স্রোতে এসব আচার তার রুপ পরিবর্তন করেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিন্তু এসবের পরিপূরক কিছু আসেনি। এসব আচার-অনুষ্ঠানকে আমরা কয়েক ভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন-
১. ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত
২. সামাজিক সংস্কার থেকে আগত।

ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত আচার অনুষ্ঠানের সম্প্রদায় ভেদে ভিন্ন ভিন্ন থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে সনাতন এবং বৌদ্ধধর্মের আচারসমূহ সম্পূর্ণ এ দেশীয় এবং হাজার হাজার বছরের পুরনো। অবশ্য হিন্দু ধর্মের কিছু আচার অনুষ্ঠান উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের কিছু প্রভাব লক্ষণীয়। আর খৃষ্টধর্ম এবং বৃহত্তর মুসলিম সমাজের আচারসমূহ কিছুটা ভিন্ন এবং তুলনামূলক কম বয়েসী, তবুও মুসলমানী অনুষ্ঠানসমূহের শত শত বছরের পথ পরিক্রমায় বাঙালিয়ানার নিজস্ব ঢং এ তা এখন বাঙালির আচারিত অনুষ্ঠান আর যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে।
অনেক কারণেই এদেশীয় মুসলিম রীতির সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি বাঙালি সংস্কৃতির পরিচায়ক।
এক. বাঙালি সমাজের বেশির ভাগ বাসিন্দা মুসলিম যদি পশ্চিম বাঙালাকে হিসেবে ধরি তাহলেও বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যাই বেশি সুতরাং সংখ্যাতত্বে সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সে সমাজ পরিচিত হতে বাঁধা নেই।
দুই. মুসলিম সমাজের এসব আচার-অনুষ্ঠান ঈদ, জুমা শবেবরাত এসবের বয়স এ দেশেরই কয়েকশ কমপক্ষে আটশ, আরো কম হিসেব করলে ছয়শ আরো কমিয়ে হিসেব করলে চারশ বছর তো হবেই। কোনো জাতি চারশ বছর যাবত কোনো নির্দিষ্ট ঢংয়ে সমাজ যাপন করলে তা ঐ জাতির নিজস্ব কালচার হিসেবে বিবেচনা না করার কোনো যুক্তি থাকে না।
তিন. নানাবিধ ইসলামী অনুষ্ঠান যেগুলোকে আমরা মুসলমানী পর্ব বলে থাকি, এসব অনুষ্ঠান পালনে বাঙালি একটা নিজস্ব পদ্ধতি রপ্ত করেছে যা আরব দেশীয় সংস্কৃতি র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে তাতে। যেমন- জুমার নামায শেষে তবারক বিতরণ, ঈদের নামাযের সাথে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ মেলা, রমযানের সিয়াম-সাধনায় বাহারী ও দেশীয় রুচির  ইফতার, শবে বরাতের সিন্নি পায়েস, ঈদের সেমাই ফিরনি ইত্যাদি। সে জন্য এসব অনুষ্ঠানও আজ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ।
চার. আবার এমন কিছু অনুষ্ঠান আছে যেগুলো অন্য কোনো ধর্মের অনুষ্ঠান নয়। আবার মূলধারার ইসলামেও এসবের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজে তা সগৌরবে বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে পীরের দরগাহ ওরস, মাজারে শিন্নি মানত, সুর করে মিলাদ পাঠ। সুতরাং এ দেশের মুসলমানগণ যেমনি বাঙালি তেমনি মুসলমান আর এ কারণেই অনেকে হয়তো বাঙালি মুসলমান্ নামক আরেকটি জাতিসত্ত্বার গন্ধ পান। কিন্তু একথা সত্য এ দেশের মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ। যদিও পহেলা বৈশাখের রং-এর নিচে তা চাপা পড়ে যায়।
পাঁচ. পাশাপাশি এ দেশের মানুষ আরো সুন্দর করে তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে বাঙালি সংস্কৃতির মিশেল করেছে। হয়তো কোথায়ও মূল ইসলামী চেতনা ধরে রাখতে পারেনি। কোথায় হিন্দুয়ানী বা সনাতন ধর্মাগত সংস্কৃতিকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু শুভ বিবাহের আকদ ছাড়া পুরো অনুষ্ঠানটিই তো বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা। ফর্দ, পানচিনি, গায়ে হলুদ, বিয়ের তোরণ, বরযাত্রা, বধূবরণ, বৌভাত ইত্যাদি।
ছয় : আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজার বছরের আচার্য জিনিসটাকে নিজেদের মুসলমানী বিশ্বাসের সাথে সুন্দরভাবে মিলিয়ে নিতে পেরেছে। যেখানে মুসলিমপূর্ব যুগে শ্যামা সঙ্গীত আর ভজন গাইতো সেখানে আজ হামদ, নাত ও নানা ইসলামী গান-গজল চর্চা হয়ে আসছে। মূল ইসলামী ভাবধারার সাথে পুরোটা সঙ্গতিপূর্ণ না হলেও জারি, সারি মুর্শিদী ও ভক্তিমূলক গানের কথাইবা বাদ দেবো কোনো। পুঁথি সাহিত্যে কল্পনা, বাস্তব আর ধর্মবিশ্বাসের একটা মিশেল তো আছেই। যদিও আগেই বলেছি সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে ধর্মীয় চেতনা পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে ধারণ করতে পারেনি। বিশেষ করে শিরক (আল্লাহর সত্ত্বা ও গুণাবলীর সাথে অন্যকে অংশীদার করা) মুক্ত হতে পারেনি। তবুও ভালো মন্দের মাপকাঠি না ধরে সংস্কৃতির মাপকাঠিতে একটি সমৃদ্ধ ধারা বহন করতে পেরেছে, এটাই হচ্ছে কথা।
সাত. সাহিত্য সংস্কৃতির কথাই যদি বলি, মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যকে পুঁথি সাহিত্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রহসন ছাড়া সব কিছুতেই মুসলিম সাহিত্যিকদের যে অবদান তা বাংলা সাহিত্য থেকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। শুধু তাই নয় লোক সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এবং লোকসাহিত্য গবেষণার কাজেও ড. মুহাম্মদ শহীদ উল্যাহ, ড. আশরাফ সিষ্কিকী, আবুল মোমেনসহ কতক গবেষক অবদান রেখেছেন। বাঙালি মুসলমানের অবদান যদি বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি  তবে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়?
আট. গত কয়েক শতকে বাঙালি মুসলমানদের খাদ্য তালিকার সূচী বাঙালি খাদ্য তালিকার সূচী হয়ে গেছে। বাঙালি মুসলমানদের পোশাক আশাক বাঙালি সংস্কৃতির মূল ধারা হয়ে গেছে। সাথে সাথে এ দেশের মুসলমানদের সংস্কৃতি  ও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে। আজকের পহেলা বৈশাখ পান্তা-ইলিশ করেই বাঙালি সংস্কৃতি  পালন সমীচিন নয়। রাখি বন্ধন আর সিঁদুর পরিয়ে, এসো হে বৈশাখ, গান গেয়ে রমনার বটমূলে নেচে গেয়ে। বসন্ত, শীত শরচ্ঞ, বর্ষা, হেমন্ত বরণ করেই বাঙালি সংস্কৃতি  উদ্ধার করার সংকীর্ণ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
নয়. দেড়শ বছর আগের এসো হে বৈশাখ্ গান যদি বাঙালি সংস্কৃতি  হয় তাহলে কয়েকশ বছরের তাজিয়া মিছিল, ঈদর‌্যালী, রবিউল আউয়ালের গজল কেন বাঙালি সংস্কৃতি নয়। বাঙালি সংস্কৃতি থেকে মুসলিম সংস্কৃতি আলাদা করে সংস্কৃতির গতি প্রবাহ কোন দিকে প্রবাহিত হবে তা ভাবার অবকাশ আছে।
দশ. আজ যদি বলি পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতি র গৌরবময় অধ্যায়। তাহলে প্রশ্ন আসে পয়েলা শব্দটাই তো উর্দু। আর বাংলা নববর্ষ যিনি প্রবর্তন করেন সেই সম্রাট আকবর তিনি নিজে বাঙালি ছিলেন না। বাংলার অধিবাসীও ছিলেন না। বাংলাসন নাম দিয়েও বছর শুরু করে নাই। তাহলে এই নববর্ষও আজ বাঙালির একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি  হলো কি করে। হ্যাঁ আমরা বাঙালিরা সেটা করে নিতে পেরেছি এবং বাংলাদেশীরা তাকে আজ আড়ম্বর করে সাজিয়েছে জাতীয় উৎসব হিসেবে। এ জন্য আমাদের মুসলিম সংস্কৃতি  ও আমরা নিজেদের মতো করে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ করে নিতে পেরেছি।
এগার. একান্ত আন্তধর্ম সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে শত বছরের পরিক্রমায় উদযাপিত সব উৎসবই বাঙালির উৎসব, সব পর্বই বাঙালি পর্ব। সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় বিভ্রান্তি এড়াতে হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ সংস্কৃতি র একান্ত পর্বগুলো বাঙালি মুসলমানের, বাঙালি হিন্দুর অথবা বাঙালি বৌদ্ধর আলাদা কালচার হিসেবে স্বীকৃত হতে পারে।
আলোচনার এই প্রান্তে একটি কথায় অবলীলায় আসা যায়। তাহলে বর্তমান বাঙালি সংস্কৃতি র অংশ যেমন হাজার বছরের বাঙালির সংস্কার, তেমনি যুগ যুগ ধরে যাপিত জীবন বিশেষ করে কৃষি কেন্দ্রিক আচারসমূহ বাঙালি ঐতিহ্যের শেকড়ের সাথে সম্পর্কিত আর শত শত বছরের ধারা বাঙালি মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ পার্বন বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে আজকের মাত্রায়। তৈরি করেছে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ধারা। সুতরাং মুসলমানী সংস্কৃতি বাদ দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কিছু চেষ্টা আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে তা অনাকাক্সিক্ষত ও অবাঞ্ছিত।
shovon_jahangir@yahoo.com

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY