দাওয়াতে তাবলীগের নির্দেশ

0
275

দাওয়াতে তাবলীগের নির্দেশ
সূরা মোদদাসসের-এর শুরু থেকে ‘‘ওয়া লিরাব্বেকা ফাসবির’’ পর্যন্ত আয়াতসমূহে রসূল (স.)-কে কয়েকটি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যেগুলো দৃশ্যত সংক্ষিপ্ত এবং সহজ সরল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খুবই সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তব অবস্থার ওপর যেসব নির্দেশের গভীর প্রভাব প্রযুক্ত হয়।

যথা-
এক. ভয় প্রদর্শন করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এ নির্দেশের শেষ মনযিল হচ্ছে, বিশে^ আল্লাহর ইচ্ছার বিষ্পদ্ধে যেসব কাজ হচ্ছে, তার মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেয়া। সে ভয় এমনভাবে দেখাতে হবে যাতে আল্লাহর আযাবের ভয়ে মানুষের মনে মগজে শোরগোল এবং উথাল পাথাল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

দুই. রব-এর শ্রেষ্ঠত্ব বড়োত্ব কার্যকর করার শেষ মনযিল হচ্ছে, যমীনে যেন শুধু তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব বড়োত্ব বহাল থাকে, অন্য কারো শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকতে দেয়া যাবে না; বরং অন্য সব কিছুর আধিপত্য নস্যাৎ করে উড়িয়ে দিতে হবে। ফলে আল্লাহর যমীনে একমাত্র তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমাই যেন অবশিষ্ট থাকে।

তিন. পোশাকের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতার শেষ মনযিল হচ্ছে, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা অর্জন এবং সর্বপ্রকার অপরিচ্ছন্নতা অপবিত্রতার কলুষতা থেকে পূর্ণতার সে সীমায় উন্নীত হতে হবে, যা আল্লাহর রহমতের ঘন ছায়ায় তাঁর হেফাযত ও সংরক্ষণে এবং হেদায়াত ও নূরের অধীনে সম্ভব হয়। উল্লিখিত রকমের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা অর্জনের পর মানবসমাজের এমন উত্তম ও নমুনা সৃষ্টি হয়, যেন সকল সুস্থ নীরোগ অন্তর রসূল (স.)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং সব বক্র অন্তকরণে ঁতার ভীতি প্রভাব ও সম্মান মর্যাদার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তাঁর মহিমাই অন্তরে জাগ্রত হয়। এভাবে সমগ্র বিশ^ বিরোধিতা বা আনুগত্যে তাঁর আশেপাশে দৃঢ়ভাবে স্থির হয়ে যায়।
চার. কারো প্রতি দয়া অনুগ্রহ করার পর অধিক বিনিময় প্রত্যাশা না করার শেষ মনযিল হচ্ছে, নিজের কাজকর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না, গুরুত্ব দেবে না; বরং একটির পর অন্য একটি কাজের জন্যে চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাবে। বড়ো রকমের কোরবানী করেও সেটাকে এ অর্থে তুচ্ছ ভাবতে থাকবে যে, এটা আমার কোনো কৃতিত্ব নয়। আল্লাহ তায়ালার স্মরণ এবং তাঁর সামনে জবাবদিহির অনুভূতি যেন নিজের চেষ্টা সাধনার অনুভূতির ওপর প্রবল থাকে।

পাঁচ. শেষ আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াতের কাজ শুরু করার পর শত্রুদের তরফ থেকে বিরোধিতা, হাসিঠাট্টা, উপহাস বিদ্রুপ থেকে আপনি এবং আপনার সঙ্গীদের হত্যা করার এবং আপনার আশেপাশে সমবেত হওয়া ঈমানদারদের নিশ্চিন্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা প্রচেষ্টা হবে। বীরত্ব এবং দৃঢ়তার সাথে আপনাকে এসব কিছুতে ধৈর্যধারণ করতে হবে। আপনার এসব কিছুরই মুখোমুখি হতে হবে। এ ধৈর্য মনের শান্তির জন্যে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্যে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘‘ওয়া লিরাব্বেকা ফাছবের’’, অর্থাৎ তোমার প্রতিপালকের জন্যে ধৈর্য ধারণ করো।

এ সকল নির্দেশ প্রকাশ্য ভাষায় কতো সহজ সরল এবং সংক্ষিপ্ত, শব্দ চয়ন কতো স্বস্তিপূর্ণ এবং কাব্যধর্মী, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এবং লক্ষ্য উষ্কেশ্যের দিক থেকে তা কতো ওযনদার ও তাৎপর্যমস্কিত। এ কয়েকটি শব্দের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে চারদিকে কতো কঠোর কিছু ব্যাপৃত হবে, যা সমগ্র বিশে^র কোণা কোণায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটিকে আরেকটির সাথে মিশিয়ে দেবে।
উল্লিখিত আয়াতগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের উপাদানও বিদ্যমান রয়েছে। বনী আদমের কিছু আমল এমন রয়েছে যার পরিণাম মন্দ। এ কথা সবাই জানে, এ দুনিয়ায় মানুষকে তার সব আমলের বিনিময় দেয়া হয় না এবং তা সম্ভবও নয়। তাই দুনিয়ার দিনগুলো ব্যতীত এমন একটা দিন থাকা দরকার, যেদিন সব কাজের যথাযথ এবং পুরোপুরি বিনিময় দেয়া হবে। এটাও ভীতি প্রদর্শনের একটা দাবী। এটাই হচ্ছে কেয়ামতের দিন, সেদিন প্রতিফল এবং বিনিময় দেয়ার দিন। এদিন বিনিময় দেয়ার অত্যাবশ্যক দাবী, আমরা এ পৃথিবীতে যে জীবন অতিবাহিত করছি, এর চেয়ে একটা পৃথক জীবন থাকা।
অন্যান্য আয়াতে বান্দাদের কাছে নির্ভেজাল তাওহীদ অবলম্বনের দাবী করা হয়েছে, বান্দা তার সব ইচ্ছা-আকাংখা আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করে দেয়ার, আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নিজের প্রবৃত্তির ইচ্ছা আকাংখা এবং অন্যান্য মানুষের ইচ্ছা আকাংখা ত্যাগ করার দাবী জানানো হয়েছে। এমনি করে দাওয়াত ও তাবলীগের উপায় উপাদানের সারকথা হচ্ছেÑ

ক, তাওহীদ। খ, পরকালের প্রতি বিশ^াস। গ. তাযকিয়ায়ে নফসের ওপর গুরুত্বারোপ। অর্থাৎ অশুভ পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাবে এমন কলুষ অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকা, ফযীলত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নেক আমলে তৎপর থাকার চেষ্টা সাধনা করা। ঘ. নিজের সকল কাজ আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। ঙ. এসব কিছু প্রিয় নবীর নবুয়ত রেসালাতের ওপর বিশ^াস স্থাপন, মাহাত্ম্যপূর্ণ নেত™£ত্বের অনুসরণ এবং তার হেফাযাত ও সৎপথ প্রদর্শনে পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আলোকে সম্পন্ন করা।

এসব আয়াত আল্লাহ তায়ালার আওয়াযে এক আসমানী অহবানের শামিল। যাতে নবী করীম (স.)-কে সে মর্যাদাপূর্ণ কাজের জন্যে ওঠার এবং চেষ্টা সাধনার ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার আল্ডান জানানো হয়েছে। যেমন এরশাদ হয়েছেÑ হে চাদর আচ্ছাদিত, ওঠো এবং ভয় দেখাও। এ আয়াতে যেন তাকে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি নিজের জন্যে বাঁচবে, শুধু সেই আরামের জীবন কাটাতে পারে, কিন্তু তুমি যে বিশাল ভার বহন করে চলেছো। তাতে ঘুমের সাথে তোমার কি সম্পর্ক? আরাম আয়েশের সাথে  কি সংশ্লিষ্টতা? আরামদায়ক উপকরণ সামগ্রীর সাথে তোমার কি সম্পর্ক? তুমি সে মহান কাজের জন্যে বেরিয়ে পড়ো, যে কাজ তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তোমার জন্যে প্রস্তুত বিরাট দায়িত্বের বোঝা তোলার জন্যে এগিয়ে এসো। চেষ্টা সাধনা, কষ্ট পরিশ্রম এবং শ্রান্তি ক্লান্তি বরণের জন্যে ওঠো, এখন তোমার ঘুম এবং আরামের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন সময় লাগাতার বিনিদ্র রজনী কাটানোর, দীর্ঘ পরিশ্রমের। তুমি এ কাজ করতে তৈরী হও।
এ সব বিরাট তাৎপর্য এবং ভীতিপূর্ণ কথা। যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরামের জীবন, উত্তাপপূর্ণ আশ্রয় এবং কোমল শয্যা থেকে টেনে তুলে প্রবল তুফান এর মধ্যে উত্তাল সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছে। তাকে মানুষের বিবেক এবং জীবনের বাস্তবতার টানাপড়েনের মাঝে এনে দাঁড় করিয়েছে।

এরপর আল্লাহর রসূল উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশি সময় যাবত এ অবস্থায়ই থেকেছেন; আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করেছেন। নিজের জীবনও নিজের অথবা পরিবার পরিজনের জন্যে ছিলো না। উঠে দাঁড়ানোর পর তিনি সে অবস্থায়ই ছিলেন। তাঁর কাজ ছিলো আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দেয়া। কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি ছাড়াই এ কোমর ভাংগা বোঝা তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। এটা ছিলো পৃথিবীতে ‘‘আমানতে কোবরা’’ বা মহা আমানতের বোঝা, সমগ্র মানবতার বোঝা, সমগ্র আকীদা বিশ^াসের বোঝা, বিভিন্ন ময়দানে জেহাদ ও প্রতিরোধের বোঝা। বিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি সংগ্রামমুখর জীবন যাপন করেছেন। এ আসমানী নির্দেশ শোনার পর কঠিন দায়িত্ব কখনোই তাঁকে এক অবস্থা অন্য অবস্থা থেকে উদাসীন অমনোযোগী করতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আমাদের এবং সমগ্র মানব জাতির পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।

সূত্র: আর রাহীকুল মাখতুম

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY