প্রিয় নবীর দিন রাত্রি

0
393

প্রিয় নবীর দিন রাত্রি
গাজী জাহেদা খোদা বখশ

রসূলে আকরাম (স.) রাতের মধ্যভাগের পর শয্যাত্যাগ করতেন। তারপর অন্যান্য দোয়া ছাড়াও নিন্মোক্ত দোয়া পাঠ করতেন। ‘‘আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আহইয়ানা বা’’দা মা আমা’’তানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।’’ অর্থাৎ সেই আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা যিনি আমাকে মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন এবং সবশেষে তার দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।

প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ
প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যাওয়ার সময় তিনি জুতো পরিধান করে মাথা ঢেকে বাঁ পা আগে দিয়ে প্রবেশ করতেন। প্রবেশের আগে এই দোয়া পড়তেন ‘‘আল্লাহুমা ইন্নি আউযুবেকা মিনাল খোবছে ওয়াল খাবায়েছ।’’ অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক, আমি কষ্ট দায়ক পুরুষ এবং নারী জ্বীন ও শয়তান থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
প্রাকৃতিক প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর প্রথমে ডান পা বাইরে দিতেন এবং বলতেন হে আল্লাহ, আমিতোমার কাছে মাগফেরাত কামনা করছি। এরপর এই দোয়া পাঠ করতেন, ‘‘আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আযহাবা আনিল আযা ওয়া আফা’’নি।’’ অর্থাৎ সেই আল্লাহ তায়ালার শোকর, যিনি আমার কষ্ট দূর করেছেন এবং আমাকে সুস্থতা দান করেছেন।

শেষ রাতের নামায
প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের পর হুযুর (স.) ওযুর জন্য বসতেন এবং এই দোয়া বারবার পাঠ করতেন, ‘‘আল্লাহুম্মাগফেরলি যামবি ওয়া আ’’লি ফি দারী ওয়া বারেক লী ফি রেযকী’’ অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক, তুমি আমার গুনাহ মাফ করে দাও। আমার ঘরে বাইরে প্রশস্ততা দাও এবং আমার রেযেকে বরকত দান করো।
এরপর হুযুর (স.) উভয় হাত ধুতেন। কুলি করে মেসওয়াক করতেন। ওযু করার সময় হাত পায়ের আংগুল ও দাঁড়ি খেলাল করতেন। ওযুর জন্য যেসব অংগ প্রত্যংগ ধোয়ার প্রয়োজন সেই সব স্থানে ভালোভাবে পানি পৌঁছাতেন। সতর্ক থাকতেন কোন অংশ যেন শুকনো না থেকে যায়। ওযু করার পর হুযুর (স.) আকাশের দিকে তাকিয়ে নি¤েœাক্ত দোয়া পাঠ করতেন॥‘‘আশহাদু আল লা’’ ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু অ আশহাদু আন্না মোহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।’’ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ (স.) আল্লাহর বান্দা ও রসূল।

এরপর হুযুর (স.) সূরা আলে এমরানের শেষ রুকু তেলাওয়াত করতেন এবং তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। তাহাজ্জুদ কখনো ৪ কখনো ৬ কখনো ১০ কখনো ১২ রাকাত আদায় করতেন। এই সময়ের নামাযে তিনি বড় বড় সূরা পাঠ করতেন। তাহাজ্জুদ শেষে তিনি বেতেরের নামায আদায় করতেন। এরপর আল্লাহর দরবারে বিনয় ও নম্রতার সাথে উম্মতের জন্য দোয়া করতেন।

তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে হুযুর (স.) কিছুক্ষণ বিছানায় বিশ্রাম নিতেন। অথবা পরিবারের সাথে সাথে মুসলমানদের কল্যাণ সম্পর্কে আলোচনা করতেন। হযরত বেলাল (রা”) ফজরের নামাযের আযান দিলে হুযুর (স.) ঘরের ভেতরেই দুই রাকাত সুন্নত আদায় করতেন। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা ‘‘কাফেরুন’’ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা ‘‘এখলাছ’’ পাঠ করতেন। মাগরেবের দুই রাকাত সুন্নতও হুযুর (স.) উল্লেখিত সূরা দিয়ে আদায় করতেন।

মসজিদে ফজরের নামায
ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত ঘরে পাঠ করার পর হুযুর (স.) মসজিদে যেতেন। ডান পা এগিয়ে দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতেন। এ সময় তিনি পাঠ করতেন, ‘‘আল্লাহুম্মাফতাহলী আবওয়াবা রাহমাতেকা’’। অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক, আমার জন্য তুমি রহমতের দরজা খুলে দাও।
মসজিদে এ’’তেকাফের নিয়ত করার সময় এই দোয়া করতেন, ‘‘নাওয়াইতু লে সুন্নাতিল এতেকাফ’’। অর্থাৎ আমি সুন্নাত অনুযায়ী এতেকাফের নিয়ত করছি।

জামাতে নামাযের শেষে হুযুর (স.) সাহাবাদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বসতেন এবং সূর্য কিছুটা ওপরে ওঠার পর পরই এশরাকের নামায আদায় করতেন। মসজিদে থেকে বের হওয়ার সময় বাঁ পা মসজিদের বাইরে রাখতেন এরপর ডান পা বাইরে বের করতেন। সেই সময় হুযুর (স.) এই দোয়া পাঠ করতেন, ‘‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আছআলুকা মিন ফাদলেকা’’। অর্থাৎ আল্লাহ পাক, আমি তোমার কাছে তোমার অনুগ্রহ কামনা করছি।

দ্বীনের দাওয়াত
হুযুর (স.) যোহর আসর মাগরেব এবং এশার নামায সাহাবাদের সংগে মসজিদে আদায় করতেন। ওহী নাযিল হওয়ার পর হুযুর (স.) নাযিলক”ত ওহী সাহাবাদের শোনাতেন এবং লেখাতেন। সাহাবাদের সংগে নিয়ে তিনি বাজারে যেতেন এবং লোকদের ওয়ায নসিহত করতেন। ‘‘লা-শরিক আল্লাহর’’ এবাদাতের দাওয়াত দিতেন। মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করতেন। পরস্পর মিলেমিশে জীবন কাটাতে বলতেন। ব্যবসা বাণিজ্যে সততা ও বিশ^স্ততা রক্ষা এবং অংগীকার পূরণের আদেশ দিতেন। সকল মন্দ কাজ এবং অবৈধ কাজ করতে নিষেধ করতেন। নেক কাজ এবং এখলাছের নসিহত করতেন।

মক্কায় তের বছরের জীবনে হুযুর আকরাম (স.) বিভিন্ন ঘরে এবং গোত্রে একাকী যেতেন। তিনি লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কুফুরী এবং শেরেক থেকে বহু প্রকার নির্যাতন সয়ে এমনকি রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও রসূল (স.) দ্বীনের দাওয়াত মানুষের নিকট পৌঁছাতেন, সত্যের দাওয়াত দিতেন, তাদের আল্লাহর এবাদাত শিক্ষা দিতেন।

মানুষের সাথে সাক্ষাৎকার
রসূলে আকরাম (স.) মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সময়ে নমন্দতা ভদন্দতার পরিচয় দিতেন। তিনি প্রথমে সালাম দেয়ার চেষ্টা করতেন। সফর থেকে ফিরে আসা লোকদের এবং মোসাফেরদের সাথে কোলাকুলি করতেন, ‘‘আসসালামু আলায়কুম ইয়া রাসুলুল্লাহ’’ বলার জবাবে বলতেন, ‘‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু।’’ বন্ধুদের কাছ থেকে হুযুর (স.) হাদীয়া গ্রহণ করতেন, তবে বিনিময়ে কিছু দেয়ারও চেষ্টা করতেন।

শিশুদের প্রতি ভালোবাসা
নবী করিম (স.) শিশুদের ভালোবাসতেন। ন্সেহভরে তিনি তাদের কোলে তুলে নিতেন। মাথায় হাত রেখে দোয়া করতেন। পরম স্নেহে শিশুদের আহার করাতেন। সওয়ারীর পিঠে থাকার সময়ে শিশুদের নিজের পেছনে বসাতেন। শিশুদের সাথে তিনি সব সময় হাঁসি তামাশা এবং রসিকতা করতেন।

সাহায্যপ্রার্থীদের সাথে ব্যবহার
হুযুর আকরাম (স.) সাহায্যপ্রার্থীদের সাধ্যমত সাহায্য করতেন। সাহায্য প্রার্থী সুস্থ সবল হলে তাকে কাজ করার পরামর্শ দিতেন। প্রতিবেশী এতিম বিধবা দুস্থদের প্রতি খেয়াল রাখতেন এবং তাদের যতোটা সম্ভব সাহায্য করতেন। সাহাবাদেরকেও উপদেশ দিতেন তারা যেন গরীব-দু:খীদের সাধ্যমতো সাহায্য করে।

ঘরোয়া কাজকর্মে সহযোগিতা দান
হুযুর (স.) ঘরকন্নার কাজে খুশী মনে অংশ গ্রহণ করতেন। তিনি ঘর পরিষ্কার করতেন, পশুদের খাবার দিতেন, নিজ হাতে বকরির দুধ দোহন করতেন। কাপড় সেলাই করতেন। জুতো সিলাই করতেন। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতেন। গৃহভৃত্যদের সংগে বসে আটা পিষতেন। মোট কথা হুযুর (স.) ঘরের কোন কাজ করার ক্ষেত্রেই কোন প্রকার লজ্জা সংকোচ বোধ করতেন না। সাহাবাদের সংগে থাকার সময়েও তিনি নিজে কাজ করতেন। এমনকি অন্যদের চেয়ে বেশী কাজ করার চেষ্টা করতেন।

রুচি সম্মত পোশাক পরিধান
হুযুর আকরাম (স.) জামা এবং লুংগি অর্থাৎ তহবন্দ পরিধান করতেন। তাঁর জামা থাকতো হাতের কবজি পর্যন্ত। জামা পরিধানের সময় ডান দিক থেকে খোলার সময় বাঁ দিক থেকে শুরু করতেন। জামার বুকের অংশ থাকতো খোলা। সেই অবস্থায় নামায আদায় করতেন। যদি কখনো বুকের অংশ খুলতেন তবে বুকের কিছু অংশ দেখা যেতো।

হুযুর (স.) নাভির নীচে লুংগি পরতেন। পায়জামাও তিনি কিনেছিলেন কিন্তু নিজে পরিধান করেননি। তবে সাহাবাদেরকে পায়জামা পরতে দেখে খুশী হতেন।

জুমার দিনে আল্লাহর প্রশংসা এবং শোকরিয়া আদায় করে হুযুর (স.) নতুন পোশাক পরিধান শুরু করতেন। সাধারণত তিনি সাদা পোশাক পরিধান করতেন। তবে সবুজ রংগের পোশাকও তাঁর অপছন্দনীয় ছিল না। গাঢ় লাল রংগের পোশাক পছন্দ করতেন না, পরিধানও করতেন না। গায়ে তিনি যে চাদর ব্যবহার করতেন সেটি ছিল চার গজ দৈর্ঘ্য এবং আড়াই গজ প্রস্থ। সাদা এবং ডোরাকাটা চাদর পরিধান করতেন। মাথায় টুপি এবং টুপির ওপর পাগড়ি পরতেন। পাগড়ির কাপড় থাকতো সাত গজ ল¤œা। পাগড়ির নিচে অবশ্যই টুপি পরতেন। পাগড়ির  লেজ এক বিঘত পরিমাণ ঝুলে থাকতো। কালো কাপড়ের পাগড়িও তিনি পরিধান করেছেন।

জুতো, আংটি নখের যত্ন নেয়া
হুযুর (স.) ফিতা বাঁধা চপ্পল ব্যবহার করতেন। মাঝে মাঝে মোযাও তিনি পরিধান করেন। ওযুর সময়ে মোযার ওপর মোসেহ করতেন। হুযুর (স.)-এর আংটি ছিলো রুপার তৈরী। সেই আংটিতে ‘‘রসূলুল্লাহ’’ কথাটি খোদাই করা ছিলো। এই আংটি তিনি কখনো ডান হাতের কখনো বাম হাতের মধ্যমায় পরিধান করতেন। সেই আংটি দ্বারাই চিঠিতে সীলমোহর দেয়া হতো।

পনেরদিন পর পর হুযুর (স.) নখ কাটতেন। হাতের নখ ডান হাতের শাহাদাত আংগুল থেকে কাটা শুরু করতেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য আংগুলের নখ কাটতেন। পায়ের আংগুলের নখ কাটার ক্ষেত্রে প্রথমে ডান পা এরপর বাম পায়ের আংগুলের নখ কাটতেন।

পানাহার পদ্ধতি
হুযুর (স.) ঠাস্কা মিঠা পানি পছন্দ করতেন। গ্লাস, পেয়ালা বা বরতনে রাখা পানির পাত্র ডান হাতে ধরতেন। বসে ‘‘বিসমিল্লাহ’’ বলে দু’’তিনবারে অল্প অল্প করে পানি পান করতেন। প্রথমদিকে ‘‘আল হামদুল্লিাহ’’ পরে ‘‘আশ শোকরো লিল্লাহ’’ বলতেন। তাঁর পানি পানের সময় কোন প্রকার শব্দ হতো না। সাহাবাদের সংগে পানি পানের সময় প্রথমে অন্যদের পান করাতেন এরপর নিজে পান করতেন।
খাবার খাওয়ার সময় হুযুর (স.) নিজের মাথা ঢেকে নিতেন। হাত ধুতেন। মাটিতে বসে দস্তরখান বিছিয়ে ‘‘বিসমিল্লাহ’’ বলে সামনের দিক থেকে খাবার মুখে দিতেন। প্রথম লোকমা মুখে তোলার সময় ‘‘বিসমিল্লাহ’’ এবং শেষ করে ‘‘আল হামদুলিল্লাহ’’ বলতেন। খাবার শেষ হলে আংগুল চেটে খেতেন এবং বরতনে কোন খাবার অবশিষ্ট রাখতেন না। মাটিতে খাবার পড়ে গেলে তা তুলে নিয়ে পরিষ্কার করে খেতেন।

আহার শেষে হুযুর (স.) নিজের হাত ধুতেন এবং সেই হাত মাথায় মুছতেন। মাঝে মাঝে তোয়ালে দিয়েও হাত মুছতেন। কুলিও করতেন।
পরিবারের সদস্য সাহাবাদের সাথে বসে একত্রেও খাবার খেতেন। নিজে এমনভাবে খেতেন যেন সংগীদের কেউ লজ্জা সংকোচে কম খেয়ে অর্ধভুক্ত না থাকে। খাওয়া শেষে হলে অন্য দোয়ার সাথে এই দোয়াও পড়তেন, ‘‘আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আত‘‘আমানা ওয়া ছাকা’’না ওয়া জায়ালানা মিনাল মোছলেমীন। অর্থাৎ সেই আল্লাহ পাকের শোকর, যিনি আমাদের পানাহার করিয়েছেন এবং মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

কারো ঘরে দাওয়াতে গেলে আহার শেষে মেযবানের জন্য বরকত ও কল্যাণের দোয়া করতেন। হুযুর (স.) কোন মুসলমানের দাওয়াতই ফিরিয়ে দিতেন না। আহলে কেতাবদের দাওয়াতও তিনি গ্রহণ করতেন।
মাঝে মাঝে খরবুজা এবং খেজর একত্রিত করে খেতেন। বেশী নরম খাবার এবং এক পদের বেশী খাবার মোটেই পছন্দ করতেন না। খাবার জিনিস হুযুর (স.) কখনো নাকে শুকতেন না। কোন জিনিস পছন্দ না হলে সেই খাবার আহার করা থেকে বিরত থাকতেন। মুরগির গোশতও তিনি খেতেন।

হেলান দিয়ে কিংবা, চেয়ারে বসে হুযুর (স.) কখনো আহার করতেন না। তিনি আজীবন যবের রুটি খেয়েছেন। কখনোই পুরো পেট ভরে আহার করেননি। তিনি ছাতুও খেতেন। কেউ বাম হাতে খেলে তাকে তিরষ্কার করে ডান হাতে খেতে বলতেন।

কাঁচা রসূন পেঁয়াজ হুযুর (স.) পছন্দ করতেন না। কেউ ওসব খেয়ে এলে তাকে দিয়ে বারবার মুখ পরিষ্কার করাতেন। যোহরের নামায শেষে হুযুর (স.) আহার করতেন এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতেন।

হুযুরকে কেউ মৌসুমের নয়া ফল হাদিয়া হিসেবে দিলে তিনি আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতেন। ভক্তিভরে চোখে এবং ঠোটে লাগাতেন। মজলিসে সব চেয়ে যে কম বয়েসী থাকতো তাকে আগে খেতে দিতেন। পরে অন্যদেরকে ডান দিক থেকে পরিবেশন করতেন। যে কোন খাবার তিনি ডান দিক থেকে পরিবেশনের নির্দেশ দিতেন।

নতুন মৌসুমী ফল ঘরে তোলার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে যে ছোট তাকে আগে দিতেন। সকল নেয়ামতের জন্য মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করতেন।

খুশবু ও তেলের ব্যবহার
হুযুর (স.) বাইহান মেশক এবং আওদ-এর খুশবু পছন্দ করতেন। মেহেদীর ফুলও তাঁর পছন্দনীয় ছিল।
গোসলের পর বিশেষত জুমার নামাযের সময়ে হুযুর (স.) খুশবু ব্যবহার করতেন। রাতেও খুশবু ব্যবহার করতেন। কেউ খুশবু উপহার  দিলে খুশী হতেন।
মাথায় এবং দাঁড়িতে তেল ব্যবহার করতেন। এরপর তা আঁচড়াতেন। দাঁড়িতে পানি লাগিয়েও আঁচড়ে নিতেন।
আয়নায় চেহারা দেখে এই দোয়া পড়তেন, ‘‘আল্লাহুম্মা আনতা হাছছানতা খালফী ফাহাছছেন খুলুকী অ আওছে’’ আলাইয়া ফি রেযকি’’। অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক তুমি আমার চেহারাকে সুন্দর করে তৈরী করেছো, আমার চরিত্রও সুন্দর করে দাও, আমার রেযেক এর মধ্যে বরকত দাও।

চলাফেরার করার সময়
হুযুর (স.) সাহাবাদের পেছনে চলাফেরা করতে পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, আমার পেছনে ফেরেশতাদের আসতে দাও। কোথাও যাওয়ার সময় হুযুর (স.) ‘‘বিসমিল্লাহ’’ বলে রওয়ানা হতেন। উঁচু জায়গায় ওঠার সময় ‘‘আল্লাহু আকবর’’ বারবার বলতেন, নীচু জায়গায় অবতরণের সময় বলতেন ‘‘সুবহানাল্লাহু’’। পথ চলার সময়ে আল্লাহ পাকের যেকের করতেন। সাহাবাদের যেকের করার পরামর্শ দিতেন।
সওয়ারীর পিঠে ওঠার সময়ে হুযুর (স.) ‘‘বিসমিল্লাহ’’ বলতেন। এরপর এই দোয়া পাঠ করতেন, ‘‘সোবাহানাল্লাযি ছাখখাবা লানা হাযা ওয়া মা’’ কুন্না লাহু মোকরেনীন। ওয়া ইল্লা ইলা রাল্টেনা লা মোনকালেবুন।’’ অর্থাৎ পাক পবিত্র সে মহান আল্লাহ, যিনি একে আমাদের জন্য নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন। যদি তিনি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করতেন তবে আমরা একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। নিসন্দেহে আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে।
হুযুর (স.) হাঁচি  দেয়ার পর ‘‘আল হামদুলিল্লাহ’’ বলতেন। যারা শুনতো তারা বলতো ‘‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’’। জবাবে হুযুর (স.) বলতেন, ‘‘ইয়াহদিয়াকুমুল্লাহু ওয়া ইউছলেহ আমা’’লাকুম।’’ অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত করুন এবং তোমার অবস্থা ভালো করুন। এই সময়ে সংগীরা নীরব থাকলে হুযুর স”) ও নীরব থাকতেন।

মজলিসে অংশ গ্রহণ
হুযুর (স.) কোন সমাবেশ বা মজলিসে অংশ গ্রহণের সময়ে যেখানে জায়গা পেতেন সেখানেই বসতেন। অন্যদের অতিক্রম করে সামনে যাওয়ার কখনো চেষ্টা করতেন না। তাঁর সম্মানে কেউ উঠে দাঁড়ালে তিনি বিরক্ত হতেন। এই কারণেই হুযুর তার সমানে দাঁড়ানো বন্ধ করে দেন।
সাক্ষাতের সময় কেউ করমর্দন করলে তার হাত সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত হুযুর (স.) নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতেন না। হাতে চুম্বন করা তিনি পছন্দ করতেন না। কারো সাথে তিনি  যখন কথা বলতেন তখন তৃতীয় কোন ব্যক্তি কথা শুরু করলে তিনি সেই ব্যক্তির কথায় মনোযোগ দিতেন না।
মজলিস শেষ হলে হুযুর (স.) এই দোয়া পাঠ করতেন, সোবহানাল্লাহে ওয়া বেহামাদেহী সোবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বেহামদেকা আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লা আন্তা আন্তাগফেরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা।’’ অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা, হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তোমার প্রশংসার সাথে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই। তোমার নিকট আমি ক্ষমা চাই এবং আপনার দিকেই ফিরে আসছি।

ওয়ায নসিহত
হুযুর (স.) সব সময়েই মানুষের ওয়ায নসিহত করতেন। পবিত্র কোরআন নাযিল হলে সাহাবাদের শোনাতেন এবং লেখাতেন। আল্লাহ পাক যেসব হুকুম আহকাম নাযিল করতেন যেসব বাস্তবায়ন করতেন। মানুষেরা কোন মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলে আন্তরিকতার দ্বারা তাদের সেটি বুঝিয়ে দিতেন। ওয়াযের মহফিল একদিন বিরতি দিয়ে করতেন, যাতে শ্রোতারা বিরক্ত না হয়।

রোগীদের সেবা যত্ন
রসূলে আকরাম (স.) রোগীদের খবর নেয়ার জন্য অথবা অন্য কোন প্রয়োজনে কোন সাহাবীর ঘরে গেলে দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইতেন। সেই সাথে ‘‘আসসালামু আলায়কুম’’ বলতেন।
হুযুর (স.) আগন্তুকদেরকে ঘরের দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে গৃহকর্তার নিকট ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাও। অনুমতি পাওয়ার পর সালাম নিবেদন করো।

রোগীদের অসুখের খবর নেয়া এবং সান্ত¡না দেয়ার জন্যও তিনি তাদের কাছে যেতেন। রোগীর কপালে হাত রাখতেন। রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতেন। রোগীকে আল্লাহর স্মরণের সবক দিতেন। রহমতে দো আলম (স.) অমুসলিম রোগীদেরও সে শশ্রুষা করতেন।

তার জীবনে হাঁসি রসিকতা
হুযুর (স.) মাঝে মাজে সহজ সরল রসিকতার পরিচয় দিতেন। যেমন, একদিন তিনি একজনকে, ‘‘ওহে ভাই, দুই কানওয়ালা’’ বলে ডাক দিলেন। সওয়ারী চেয়ে একদিন বললেন, ‘‘সওয়ারীর জন্য কি উটের কোনো শাবক পাওয়া যাবে?’’

একবৃদ্ধা মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, বৃদ্ধ মহিলারা  কি বেহেশতে যাবে না? হুযুর (স.) বললেন, না যাবে না। বৃদ্ধা একথা শুনে কাঁদতে শুরু করলেন। হুযুর (স.) বললেন, বৃদ্ধারা যৌবনবতী হয়েই তবে বেহেশতে প্রবেশ করবে।’’

হুযুর (স.) কখনো অট্টহাসি হাঁসতেন না। কাউকে উ”স্বরে হাঁসতে দেখলে বলতেন, মৃত্যুর কথা যদি তোমার স্মরণ থাকে তবে অমন করে হেসো না। হাঁসির সময়ে হুযুর (স.)-এর দাঁত দেখা যেতো; কিন্তু কোন শব্দ হতো না। কান্নার সময়েও কোন শব্দ হতো না। দীর্ঘশ^াস ফেলে ‘‘আহ’’ বলতেন এবং দু’’চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতো। শোক এবং দু:খ কষ্ট প্রকাশের জন্য মাথায় মুখে  এবং দাঁড়িতে হাত বুলাতেন। এরপর বলতেন ‘‘হাছবুনাল্লাহু ওয়া নে’’মাল ওয়াকীল’’। অর্থাৎ আল্লাহ পাকই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম অভিভাবক।
উচ্চস্বরে কান্নাকাটি আহাযারি করতে হুযুর (স.) নিষেধ করেছেন।

পরিচ্ছন্নতা ও চিত্তবিনোদন
হুযুর (স.) পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। নিয়মিত গোসল করতেন। সাহাবাদেরকেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তাকওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে।
হুযুর (স.) বাম হাতে নাক পরিষ্কার করতেন। পানি দিয়ে নাক ধুতেন। জুতো স্যাস্কেলও বাম হাতে পরিষ্কার করতেন। প্রাক”তিক প্রয়োজন পূরণের পর বাম হাতে পানি ব্যবহার করতেন। এরপর মাটি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতেন। পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিতেন। কোন কাজ করার সময়ে যদি হাতে ময়লা বা নোংরা কিছু লাগার সম্ভাবনা থাকতো তবে তিনি বাম হাত ব্যবহার করতেন। অন্যান্য কাজে যথারীতি ডান হাত ব্যবহার করতেন।
মাঝে মাঝে ভ্রমণের এবং চিত্ত বিনোদনের জন্য হুযুর (স.) বাগানে যেতেন। ঘোড়ায় আরোহন ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দের। মাঝে মাঝে গাধার পিঠেও তিনি সওয়ার হতেন। সওয়ারী পশুর তিনি বিশেষ যতœ নিতেন। মানুষের মতো তিনি পশুদের প্রতিও ছিলেন সহানুভূতিশীল। পশুর মালিকদের বলতেন তারা যেন পশুদেরকে নিয়মিতভাবে পরিমিত পরিমাণ খাবার খেতে দেয়। তিনি বলতেন তোমাদের গৃহপালিত পশু যেন ক্ষুধার্ত না থাকে। পশুদের শক্তি সামর্থের বেশী কাজ তাদের কাছ থেকে নেবে না।

হুযুর (স.) শ্রমিকদেরকে তাদের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দিয়ে দিতে বলতেন। শ্রমিকদের শক্তি সামর্থের বেশী বোঝা যেন তাদের ওপর চাপানো না হয় বেশী শ্রম যেন না করানো হয় সে বিষয়েও তিনি সবাইকে সতর্ক করতেন।

জানাযায় অংশ গ্রহণ
হুযুর (স.) কোন মুসলমানের যানাযার নামাযে অংশ গ্রহণের সময়ে প্রথমে জিজ্ঞাসা করতেন, তার ওপর কোন ঋণ আছে কিনা। যদি তা পরিশোধের ব্যবস্থা না হতো তবে সাহাবাদের বলতেন, তোমরাই তার জানাযায় নামায পড়ো। আর যদি কর্জ পরিশোধের ব্যবস্থা হতো তখন তিনি নিজেই জানাযার নামায পড়াতেন। খাটিয়ায় লাশ তোলার পর কবরস্থানে নেয়ার সময়ে তিনি খাটিয়ায় কাঁধ লাগাতেন। জানাযার পেছনে পেছনে অনেক সময় কবরস্থান পর্যন্ত যেতেন। মৃতের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করতেন। প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই এই সুন্নত পালন করা আবশ্যক।
হুযুর (স.) এর নিকট কেউ কোন কথা বলতে শুরু করলে তিনি পূর্ণ মনযোগ সহকারে সেই ব্যক্তির কথা শুনতেন। তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসতেন। শুধু দূরে থেকে তার দিকে তাকিয়ে কথা শুনতেন না।

দিনের কর্মসূচীর সমাপ্তি
জামাতে এশার নামায আদায়ের পর হুযুর (স.) সাহাবাদের বিদায় করে দিয়ে নিজের ঘরে যেতেন। হুযুর (স.)-এর বিছানার পাশে যেসব জিনিস থাকতো সেগুলো হচ্ছে, সুর্মাদানি, চিরুনি, তেলের শিশি, কাঁচি, মেসওয়াক, আয়না এবং ছোট এক টুকরো কাঠ। সেই কাঠের টুকরোটাকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানোর প্রয়োজনে তিনি ব্যবহার করতেন।
হুযুর (স.)-এর বিছানা ছিলো খেজুর পাতায় তৈরী। মাঝে মাঝে তা দুই ভাঁজ করে নেয়া হতো। বিছানায় শোয়ার আগে হুযুর (স.) চোখে কিছু সুরমা ব্যবহার করতেন। ওযু করা অবস্থায় তিনি শয়ন করতেন। তিনি কখনো উপুড় হয়ে শয়ন করতেন না। কাউকে উপুড় হওয়া অবস্থায় শায়িত দেখলে খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে দিতেন এবং ওভাবে শোয়ার কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন।
হুযুর (স.) বিছানায় শয়নের সময় ডান হাতের তালু ঘাড়ের নীচে রাখতেন। ডান দিকে কাত হয়ে কেবলা মুখী হয়ে তিনি শয়ন করতেন। সেই সময় তিনি এই দোয়া পাঠ করতেন, ‘‘আল্লাহুম্মা কে’’নি আযাবাকা ইয়াওমা তাবআছু এবাদাকা।’’ অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক, আমাকে আযাব থেকে রক্ষা করো, যেদিন তুমি বান্দাদের জীবিত করবে।
এই দোয়া তিনি তিনবার পাঠ করতেন। এরপর সূরা এখলাছ, সূরা ফালাক, সূরা নাছ পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে সারা দেহ স্পর্শ করতেন। এই আমলও তিনি তিনবার করতেন। এই দোয়াও করতেন ‘‘আল্লাহুম্মা বে এছমেকা আমুত ওয়া আহইয়া।’’ অর্থাৎ হে আল্লাহ পাক, আমি তোমার নামেই মৃত্যু বরণ করছি এবং তোমার নামেই জীবিত আছি।
ঘুমানোর আগে পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলতেন। মাঝে মাঝে আল্লাহ পাকের প্রশংসা করতেন। এভাবে এক সময় প্রিয় নবী ঘুমিয়ে পড়তেন। অবশ্য বাহ্যিক দিক থেকে ঘুমিয়ে পড়লেও তার অন্তকরণ কিন্তু জেগেই থাকতো।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY