বিশ্বনবীর দৈহিক গঠন ও প্রকৃতি

0
273

বিশ্বনবীর দৈহিক গঠন ও প্রকৃতি
সূূত্র: তিনি চাঁদের চেয়ে সুন্দর

হিজরতের সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উম্মে মাবাদ খোযাঈয়ার তাঁবুতে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে যান। তাঁর চলে যাওয়ার পর উম্মে মাবাদ স্বামীর কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দেহ অবয়বের যে চিত্র তুলে ধরেন তা ছিলো চমকানো রং, উজ্জ্বল চেহারা, সুন্দর গঠন, সটান সোজাও নয়, আবার ঝুঁকে পড়াও নয়, অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিত্তাকর্ষক দৈহিক গঠন, সুরমারাঙা চোখ, লম্বা পলক, ঋজু কন্ঠস্বর, লম্বা ঘাড়, সাদা কালো চোখ, সুরমা কালো পলক, সূক্ষ্ম এবং পরস্পর সম্পৃক্ত ভ্রুণ, চমকানো কালো চুল, চুপচাপ থাকার সময় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, কথা বলার সময় আকর্ষণীয়, দূর থেকে দেখে মনে হয় সবার চেয়ে উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যপূর্ণ, কাছে থেকে সুদর্শন মিষ্টি মধুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট, কথা খুব সংক্ষিপ্তও নয় আবার দীর্ঘায়িতও নয়, কথা বলার সময় মনে হয় যেন মুক্তা ঝরছে, মাঝারি উ”তাসম্পন্ন, বেঁটেও নয় লম্বাাও নয় যে, দেখে খারাপ মনে হবে। সহচররা তাঁকে ঘিরে যদি কিছু বলে, তবে তিনি সেকথা গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন। তিনি কোনো আদেশ করলে তারা ছুটে গিয়ে সে আদেশ পালন করেন, সহচররা তাঁর অত্যন্ত অনুগত এবং তাঁর প্রতি গভীর সম্মান শন্দদ্ধার মনোভাব পোষণ করেন, কেউ উদ্ধত দুর্বিনীত নয়, কেউ বাহুল্য কথাও বলেন না।

হযরত আলী (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দৈহিক সৌন্দর্য বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি অস্বাভাবিক লম্বা ছিলেন না, আবার বেঁটেও ছিলেন না, ছিলেন মাঝারি গঠন আকৃতিসম্পন্ন। তাঁর চুল খুব বেশী কোঁকড়ানো ছিলো না, আবার একেবারে খাড়াও ছিলো না ছিলো উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের। তাঁর কপোল মাংসলও ছিলো না আবার শুকনোও ছিলো না; বরং উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের ছিলো। তাঁর কপাল ছিলো প্রশস্ত, গায়ের রং ছিলো গোলাপী ও গৌর রংয়ের মিশ্র রুপ।

চোখ সুরমারাঙা লালচে, ঘন পল্লববিশিষ্ট। বুকের ওপর নাভি থেকে হালকা চুলের রেখা, দেহের অন্য অংশ লোমশূন্য, হাত পা মাংসল। চলার সময় স্পন্দিত ভঙ্গিতে পা তুলতেন। তাঁকে হেটে যেতে দেখে মনে হতো তিনি যেন ওপর থেকে নীচের দিকে যাচ্ছেন। কোনো দিকে লক্ষ্য করলে পুরোপুরি লক্ষ্য করতেন। উভয় কাঁধের মাঝখানে তাঁর মোহরে নবুয়ত ছিলো। তিনি ছিলেন সকল নবীর শেষ নবী, ছিলেন সর্বাধিক দানশীল, সর্বাধিক সাহসী, সর্বাধিক সত্যবাদী, সর্বাধিক অঙ্গীকার পালনকারী, সর্বাধিক কোমলপ্রাণ এবং সর্বাধিক আভিজাত্যসম্পন্ন। হঠাৎ করে কেউ তাঁকে দেখলে ভীত-বিহবল হয়ে পড়তো, পরিচিত কেউ তাঁর সামনে গেলে ভালোবাসায় ব্যাকুল হতো। তাঁর গুণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনাকারীকে বলতে হতো, আমি তাঁর আগে তাঁর মতো অন্য কাউকে দেখিনি।

হযরত আলী (রা.)-এর অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তাঁর মাথা ছিলো বড়ো, জোড়ার হাড় ছিলো ভারি, বুকের মাঝখানে লোমের হালকা রেখা ছিলো। তিনি চলার সময় এমনভাবে চলতেন, মনে হতো কেউ যেন উঁচু থেকে নীচুতে অবতরণ করছে।

হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পেশী ছিলো চওড়া, চোখ ছিলো লালচে, পায়ের গোড়ালি ছিলো সষ্প ধরনের।

হযরত আবু তোফায়ল (রা.) বলেন, তিনি ছিলেন গৌর রংয়ের, চেহারা ছিলো মোলায়েম, তাঁর উ”তা ছিলো মাঝামাঝি ধরনের।

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের হাতের তালু ছিলো প্রশস্ত, রং ছিলো চমকদার, একেবারে সাদাও ছিলো না, একেবারে গম-এর রংও ছিলো না। ওফাতের সময় পর্যন্ত তাঁর মাথা এবং চেহারার বিশটি চুলও সাদা হয়নি।
শুধু কানপট্টির কয়েকটি এবং মাথার কয়েকটি চুল সাদা হয়ে ছিলো।
হযরত আবু জোহায়ফা (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নীচের ঠোঁট সংলগ্ন দাড়ি সাদা দেখেছি।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বোসর (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নীচের ঠোঁট সংলগ্ন দাড়ির কয়েকটি সাদা হয়ে গিয়েছিলো।

হযরত বারা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ছিলেন মাঝারি উ”তাসম্পন্ন। উভয় কাঁধের মাঝখানে দূরত্ব ছিলো। মাথার চুল ছিলো উভয় কানের লতিকা পর্যন্ত। আমি তাঁকে লাল পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। কখনো কোনো জিনিস তাঁর চেয়ে অধিক সৌন্দর্যসম্পন্ন দেখিনি।

তিনি প্রথমে আহলে কিতাবদের মতো চুল আঁচড়াতে পছন্দ করতেন। এ কারণে চুল আঁচড়ালে সিঁথি করতেন না, কিন্তু পরবর্তীতে সিঁথি করতেন।

হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন, তাঁর চেহারা ছিলো সবচেয়ে সুন্দর এবং তাঁর চরিত্র বৈশিষ্ট্য ছিলো সকলের চেয়ে উৎকৃষ্ট।

হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিলো? তিনি বললেন, না; বরং তাঁর চেহারা ছিলো চাঁদের মতো। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের চেহারা ছিলো গোলাকার।

রবী বিনতে মোয়াওয়েয (রা.) বলেন, তোমরা যদি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামÑকে দেখতে, তবে মনে হতো যেন উদীয়মান সূর্য দেখছো।

হযরত জাবের ইবনে ছামুরা (রা.) বলেন, এক চাঁদনী রাতে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে দেখেছিলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো লাল পোশাক। আমি একবার তাঁর প্রতি এবং একবার চাঁদের প্রতি তাকাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, তিনি চাঁদের চেয়েও অধিক সুন্দর।

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক সুন্দর কোনো মানুষ  আমি দেখিনি। মনে হতো যেন তাঁর চেহারায় সূর্য জ্বলজ্বল করছে। আমি তাঁর চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন কাউকে দেখিনি। তিনি হাঁটতে শুষ্প করলে যমীন যেন তাঁর পায়ে সংকুচিত হয়ে আসতো। তাঁর সাথে হাঁটার সময় আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, কিন্তু তিনি থাকতেন নির্বিকার।

হযরত ক্বা ইবনে মালেক (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন খুশী হতেন, তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠতো। দেখে মনে হতো যেন এক টুকরো চাঁদ।

একবার তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে অবস্থান করছিলেন। ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠার পর তাঁর চেহারা আরো উজ্জ্বল সুন্দর দেখাচ্ছিলো। এ অবস্থা দেখে হযরত আয়েশা (রা.) আবু কবীর হোযালীর কবিতা আবৃত্তি করেন, ১৮  যার অর্থ হচ্ছে
তাঁর চেহারায় তাকিয়ে দেখতে পেলাম
চমকানো মেঘ যেন চমকায় অবিরাম।্
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁকে দেখে যে কবিতা আবৃত্তি করতেন তার অর্থ হচ্চে
ভালোর পথে দেন দাওয়াত পূরণ করেন অঙ্গীকার
চতুর্দর্শীর চাঁদ, লুকোচুরি খেলে যেন অন্ধকার।্
হযরত ওমর (রা.) তাঁর সম্পর্কে যোহায়র (রা.)-এর কবিতা আবৃত্তি করতেন যা হরম ইবনে সেনান সম্পর্কে লেখা হয়েছিলো।২০ তার অর্থ হচ্ছেÑ
মানুষ যদি না হতেন আল্লাহর এ প্রিয়জন
চতুর্দশীর রাত তিনি করতেন তবে রওশন।
তিনি যখন ক্রোধানি^ত হতেন তখন চেহারা লাল হয়ে যেতো, মনে হতো যেন উভয় কপালে আংগুরের দানা নিংড়ে দেয়া হয়েছে।

হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন হাসতেন মৃদু হাসতেন, তাঁর চোখ দেখে মনে হতো যেন সুরমা লাগানো, অথচ সুরমা লাগানো ছিলো না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সামনের দুটি দাঁত পৃথক পৃথক ছিলো। কথা বলার সময় উভয় দাঁতের মধ্য থেকে আলোকআভা বিচ্ছুরিত হতো।

তাঁর গ্রীবা ছিলো রৌপ্যের নির্মিত পাত্রের মত পরিচ্ছন্ন, চোখের পলক ছিলো দীর্ঘ, দাড়ি ছিলো ঘন, ললাট ছিলো প্রশস্ত, ভ্রু পৃথক, নাসিকা উন্নত, নাভি থেকে বক্ষ পর্যন্ত হালকা লোমের রেখা, বাহুতে কিছু লোম ছিলো। পেট এবং বুক ছিলো সমান্তরাল, বুক প্রশস্ত, হাতের তালু প্রশস্ত। পথ চলার সময় তিনি কিছুটা ঝুঁকে মধ্যম গতিতে চলতেন।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি এমন কোনো রেশম দেখিনি, যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের হাতের তালুর চেয়ে বেশী নরম। এমন কোনো মেশক আ¤ক্ষর শুঁকিনি, যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সুগন্ধির চেয়ে অধিক সুবাসিত ছিলো।

হযরত আবু জোহায়ফা (রা.) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের হাত আমার চেহারার ওপর রেখেছিলাম। সে সময় আমি অনুভব করলাম, সেই হাত বরফের চেয়ে বেশী ঠান্ডা এবং মেশকের চেয়ে বেশী খোশবুদার।

কিশোর বয়স্ক হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমার কপোলে হাত রেখেছিলেন, এতে আমি এমন শীতলতা ও সুবাস অনুভব করলাম, মনে হলো, তিনি তাঁর পবিত্র হাত আতর বিক্রেতার আতরদান থেকে বের করেছেন।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ঘাম ছিলো মুক্তার মতো। হযরত উম্মে সোলায়ম (রা.) বলেন, এ ঘামই ছিলো সবচেয়ে উত্তম খোশবু।

হযরত জাবের (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কোনো রাস্তা দিয়ে পথ চলার পর অন্য কেউ সে পথ দিয়ে গেলে বুঝতে পারতো, তিনি এ পথে গমন করেছিলেন।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উভয় কাঁধের মাঝামাঝি জায়গায় ছিলো মোহরে নবুয়ত। কবুতরের ডিমের মতো দেখতে এ মোহরে নবুয়তের রং ছিলো তাঁর দেহ বর্ণের মতো। এটি বাম কাঁধের নরম হাড়ের পাশে অবস্থিত ছিলো।

সূত্র: তিনি চাঁদের চেয়ে সুন্দর

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY