বিশ্বনবীর পারিবারিক ইতিহাস

0
141

পারিবারিক পরিচয়

হাশমী বংশ:
নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরদাদা হাশেম, ইবনে আবদে মানাফের পরিচয়ে হাশেমী বংশোদ্ভূত হিসাবে পরিচিত। কাজেই হাশেম এবং তার পরবর্তী কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা জষ্পরী।
এক. হাশেম ”  বনু আবদে মানাফ এবং বনু আবদুদ দারের মধ্যে পদ ন্টনে সমঝোতা হয়েছিলো। এর প্রেক্ষিতে আবদে মানাফের বংশধররা হাজীদের পানি পান করানো এবং মেহমানদের আতিথেয়তার পদ লাভ করেন।

হাশেম বিশিষ্ট সম্মানিত এবং সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনিই প্রথম মক্কার হাজীদের সুরুয়া রুটি খাওয়ানোর ব্যবস্থা চালু করেন। তার প্রকৃত নাম ছিলো আমর, কিন্তু রুটি ছিঁড়ে সুরুয়ায় ভেজানোর কারণে তাকে বলা হতো হাশেম। হাশেম অর্থ হড়ে– যিনি ভাঙ্গেন। হাশেমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোরায়শদের গ্রীষ্ম এবং শীতে বছরে ২ বার বাণিজ্যিক সফরের ভিত্তি স্থাপন করেন।

তার প্রশংসায় কবি বলেন ‘‘তিনি সেই আমর, যিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্বল স্বজাতিকে মক্কায় রুটি ভেঙ্গে ছিঁড়ে সুরুয়ায় ভিজিয়ে খাইয়েছিলেন এবং শীত ও গ্রীষ্মে ২ বার সফরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।’’
হাশেম বা আমরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্চে–, তিনি ব্যবসায়ের কাজে সিরিয়া সফরে গিয়েছিলেন। পথে মদীনায় পৌঁছে বনী নাজ্জার গোত্রের সালমা বিনতে আমরের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। গর্ভবতী অবস্থায় স্ত্রীকে পিত্রালয়ে রেখে তিনি সিরিয়ায় রওয়ানা হন এবং সেখানে গিয়ে ফিলিস্তিনের গাযা শহরে ইন্তেকাল করেন। এদিকে সালমার এক পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। এটা ৪৯৭ ঈসায়ী সালের ঘটনা। শিশুর মাথার চুলে ছিলো শুভ্রতার ছাপ, এ কারণে সালমা তার নাম রাখেন শায়বা।

সালমা ইয়াসরেব বা মদীনায় তার পিত্রালয়েই সন্তান, প্রতিপালন করেন। পরবর্তীকালে এ শিশুই আবদুল মোত্তালেব নামে পরিচিত হন। দীর্ঘকাল যাবত হাশেমী বংশের লোকেরা এ শিশুর জন্মের খবর জানতে পারেনি। হাশেমের মোট চার পুত্র ও পাঁচ কন্যা ছিলো। পুত্রদের নাম নিষ্পাপ: আসাদ, আবু সায়ফী, নাযলা, আবদুল মোত্তালেব। আর কন্যাদের নাম হলো শেফা, খালেদা, যঈফা, রোকায়া এবং জুন্নাহ।
দুই. আবদুল মোত্তালেব ” ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, হাজীদের পানি পান করানো এবং মেহমানদারীর দায়িত্ব হাশেমের পর তার ভাই মোত্তালেব পেয়েছিলেন। তিনিও ছিলেন নিজ পরিবার ও কওমের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। তার কথা কেউ উপেক্ষা করতো না। দানশীলতার কারণে কোরায়শরা তাকে ‘‘ফাইয়ায’’ উপাধি দিয়েছিলো। শায়বা অর্থাৎ আবদুল মোত্তালেব-এর বয়স যখন দশ বারো বছর, তখন মোত্তালেব তার খবর পান। তিনি শায়বাকে নিয়ে আসার জন্যে রওয়ানা হন। মদীনা অর্থাৎ ইয়াসরেবের কাছাকাছি পৌঁছার পর শায়বার ওপর দৃষ্টি পড়তেই তার দু’ চাখ অশনাদ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর নিজের উটের পেছনে বসিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হন, কিন্তু শায়বা তার মায়ের অনুমতি না নিয়ে মক্কায় যেতে অস্বীকার করেন। মোত্তালেব শায়বার মা সালমার কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তখন মোত্তালেব বললেন, ও তো তার পিতার হুকুমত এবং আল্লাহর হারেমের দিকে যাড়ে–।

একথা বলার পর সালমা অনুমতি দেন। মোত্তালেব তাকে নিজের উটের পেছনে বসিয়ে মক্কায় নিয়ে আসেন। মক্কায় নিয়ে আসার পর লোকেরা তাকে দেখে বলাবলি করতে লাগলো, এ তো আবদুল মোত্তালেব, অর্থাচ্ঞ মোত্তালেবের দাস। মোত্তালেব বললেন, না, না, এ তো আমার ভাই হাশেমের ছেলে। এরপর থেকে শায়বা মোত্তালেবের কাছে প্রতিপালিত হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেন। পরবর্তীকালে মোত্তালেব ইয়েমেন দেশের রোমানে মারা যান এবং তার রেখে যাওয়া পদ শায়বা লাভ করেন। আবদুল মোত্তালেব স্বজাতির মধ্যে এতো বেশি সম্মান মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে, ইতিপূর্বে তার পিতৃপুরুষের কেউ এতোটা সম্মান মর্যাদালাভে সক্ষম হয়নি। স্বজাতির লোকেরা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালো বেসেছে এবং অভূতপূর্ব সম্মান দিয়েছে।৬
মোত্তালেবের মৃত্যুর পর নওফাল জোরপূর্বক আবদুল মোত্তালেবের আংগিনা দখল করে নেয়।

আবদুল মোত্তালেব কোরায়শ বংশের কয়েকজন লোকের কাছে নওফালের বিরুদ্ধে সাহায্য চান, কিন্তু তারা এই বলে অক্ষমতা প্রকাশ করে, আমরা আপনার এবং আপনার চাচার বিরোধে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। অবশেষে আবদুল মোত্তালেব বনী নাজ্জার গোত্রে তাঁর মামার কাছে কয়েকটি কবিতা লেখে পাঠান। সে কবিতায় সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছিলো। জবাবে তার মামা আবু দা ইবনে আদী আশি জন সওয়ার নিয়ে রওয়ানা হয়ে মক্কার নিকটবর্তী আবতাহ নামক জায়গায় অবতরণ করেন। আবদুল মোত্তালেব সেখানেই মামার সাথে সাক্ষাত করে তাকে ঘরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু আবু দা বললেন, না, আমি আগে নওফালের সাথে দেখা করতে চাই। এরপর আবু দা নওফালের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নওফাল এ সময় মক্কার কয়েকজন প্রবীণ কোরায়শের সাথে কাবার হাতিমে বসা ছিলেন। আবু দা তলোয়ার কোষমুক্ত করে বললেন, এ ঘরের প্রভুর শপথ, যদি তুমি আমার ভাগ্নের জমি ফিরিয়ে না দাও তবে এ তলোয়ার তোমার দেহে ঢুকিয়ে দেবো। নওফাল বললেন, আচ্চা নাও, আমি ফিরিয়ে দিচ্চি। আবু দা প্রবীণ কোরায়শ ব্যক্তিদের কয়েকজনের সাক্ষী রেখে আবদুল মোত্তালেবকে তার জমি ফিরিয়ে দেন। এরপর আবু দা আবদুল মোত্তালেবের ঘরে যান এবং সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর ওমরা পালন করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
এরপর নওফাল বনী হাশেমের বিরুদ্ধে বনী আবদে শামস সহায়তার অংগীকার করে। এদিকে বনু খোযায়া গোত্র লক্ষ্য করলো, বনু নাজ্জার আবদুল মোত্তালেবকে সাহায্য করেছে। তখন তারা বললো, আবদুল মোত্তালেব যেমন তোমাদের সন্তান তেমনি আমাদেরও সন্তান। কাজেই তাকে সাহায্য করার অধিকার আমাদের অধিক। এর কারণ ছিলো, আবদে মানাফের মা বনু খোযায়া গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলো। এ কারণে বনু খোযায়া ষ্ক্রদাষ্পন নোদওয়ায়্ গিয়ে বনু আবদে শামস এবং বনু নওফালের বিরুদ্ধে বনু হাশেমকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। এ প্রতিশ্রুতিই পরবর্তী সময়ে ইসলামী যুগে মক্কা বিজয়ের কারণ হয়েছিলো। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।

সূত্র: আর রাহীকুল মাখতুম

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY