আল্লাহর রসূলের শৈশব

0
274

আল্লাহর রসূলের শৈশব
আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী
অনুবাদ: খাদিজা আখতার রেজায়ী

জন্মের পর তার মা দাদা আবদুল মোত্তালেবের কাছে পৌত্রের জন্মের সুসংবাদ পাঠন। এ খবর পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত মনে ঘরে আসেন এবং তাঁকে কাবা ঘরে নিয়ে গিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া ও শোকর আদায় করেন। এ সময় তিনি তাঁর নাম রাখেন মোহাম্মদ। এ নাম আরবে পরিচিত ছিলো না। এরপর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সপ্তম দিনে খতনা করান।

মায়ের পর আবু লাহাবের দাসী সুওয়ায়বা প্রথম তাঁকে দুধ পান করান। এ সময় সুওয়ায়বার কোলের শিশুর নাম ছিলো মাছরুহ। রসূল (স.)-এর দুধপান করানোর আগে সুওয়ায়বা হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব, তার পরে আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমীকেও দুধ পান করিয়েছিলেন।

বনী স্দা গোত্রে
আরবের শহুরে নাগরিকদের রীতি ছিলো, তারা তাদের শিশুদের শহরের অসুখ বিসুখ থেকে দূরে রাখার জন্যে দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুঈন নারীদের কাছে সমর্পণ করতেন। যাতে শিশুদের দেহ শক্তিশালী এবং পেশীগুলো মযবুত হয়ে গড়ে ওঠে। এর আরেক উদ্দেশ্য হলো, দোলনা থেকেই যেন তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিখতে পারে। এ রীতি অনুযায়ী আবদুল মোত্তালেব ধাত্রীর খোঁজ করে তাঁর দৌহিত্রকে হালিমা বিনতে আবু যুওয়ায়বের হাতে তুলে দেন। হালিমা ছিলেন বনী স্দা ইবনে বকর গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তার স্বামী ছিলেন হারেস ইবনে আবদুল ওযযা, ডাক নাম আবু কাবশা। তিনিও ছিলেন বনী স্দা গোত্রেরই মানুষ।
দুগ্ধপান সম্পর্কের কারণে হারেসের সন্তানরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাই বোন ছিলো। তাদের নাম হলোÑ আবদুল্লাহ, ওনায়সা, হোযাফা বা জুযামা। হোযাফা বা জুযামার উপাধি ছিলো শাইমা এবং এ নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোলে নিতেন। হালিমার সন্তানদের ছাড়া রসূল (স.)-এর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোত্তালেবও হালিমার মাধ্যমে তাঁর দুধ ভাই ছিলেন। তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবকেও দুধপান করানোর জন্যে বনু স্দা গোত্রের এক মহিলার কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিলো। হালিমার কাছে থাকার সময় এ মহিলাও একদিন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধ পান করিয়েছিলেন। এ দিক থেকে তিনি এবং হামযা উভয়ে দুই সূত্রে দুধ ভাই ছিলেনÑ সুওয়ায়বার সূত্রে এবং বনু স্দা গোত্রের এ মহিলার সূত্রে।

দুধ পান করানোর সময় হযরত হালিমা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতের এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন যাতে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বিস্তারিত বিবরণ তাঁর মুখেই শোনা যাক। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে হযরত হালিমা বলেন, আমি আমার স্বামীর সাথে আমাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ বনী স্দা গোত্রের কয়েকজন মহিলার সঙ্গে নিজেদের শহর ছেড়ে দুগ্ধপানকারী শিশুর তালাশে বের হই। সময়টা ছিলো দুর্ভিক্ষের, চারদিকে অভাব অনটন। ব্যাপক দুর্ভিক্ষ কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। আমি সাদা রংয়ের একটি মাদী গাধার পিঠে সওয়ার ছিলাম। আমাদের কাছে একটি উটনীও ছিলো, কিন্তু সেটি থেকে এক ফোঁটা দুধও বের হতো না। ওই দিকে ক্ষুধার জ্বালায় দুধের শিশু ছটফট করতো। আমরা রাতভর ঘুমাতে পারতাম না। আমার বুকেও দুধ ছিলো না, উটনী ও নিজের বাচ্চার খাদ্য সরবরাহ করতে পারছিলাম না। বৃষ্টি এবং সজীব লতার অপেক্ষায় আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম।
মাদী গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় সেটি এতো ধীরে চলছিলো, যাতে কাফেলার সবাই বিরক্ত হয়ে যায়। যাক, অবশেষে যে কোনোভাবে হোক, আমরা দুগ্ধপায়ী শিশুর সন্ধানে মক্কায় গেলাম। আমাদের কাফেলার যতো মহিলা ছিলো, সকলের কাছেই রসূল (স.)-কে পেশ করা হয়েছিলো, কিন্তু এতিম পিতৃহীন হওয়ায় সবাই তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে। কেননা আমাদের সবাই সন্তানের পিতা থেকে ভালো দান দক্ষিণা পাওয়ার আশা করছিলাম, একজন বিধবা মা কি আর দিতে পারবে? এ কারণেই আমরা কেউ তাঁকে নিতে রাযি হইনি।
এদিকে আমাদের কাফেলার প্রত্যেক মহিলাই কোন না কোন শিশু পেয়ে গেলো। আমি কোন শিশুই পেলাম না।

ফেরার সময় আমি স্বামীকে বললাম, আমার বান্ধবীরা সবাই দুগ্ধপায়ী শিশু নিয়ে যাবে আর আমি খালি হাতে ফিরে যাবো, আল্লাহর কসম, এটা আমার ভালো লাগছে না। আমি বরং সেই এতিম শিশুকেই নিয়ে যাই। স্বামী রাযি হলেন। বললেন, হয়তো ওর উসিলায় আল্লাহ তায়ালা আমাদের বরকত দেবেন। এরপর আমি গিয়ে শুধু এ কারণে তাকে নিয়ে নেই যে, অন্য কোনো শিশু পাচ্ছিলাম না।

হযরত হালিমা (রা.) বলেন, শিশুকে নিয়ে আমি যখন ডেরায় ফিরে এলাম তখন আমার উভয় স্তন ছিলো দুধে পূর্ণ, শিশুটি এবং তার সঙ্গে তার দুধ ভাইও পেট ভরে দুধ পান করে। এরপর উভয়ে স্বস্তির সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ এর আগে আমার সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় ঘুমাতে পারত না। এদিকে আমার স্বামী উটনী দোহন করতে গিয়ে লক্ষ্য করলো, সেটির স্তন দুধে পরিপূর্ণ। তিনি এতো দুধ দোহন করলেন যে, আমরা তৃপ্তির সাথে পান করে বড় আরামে রাত কাটাই। সকালে আমার স্বামী বললেন, আল্লাহর কসম, হালিমা, তুমি একটি বরকতময় শিশু গ্রহণ করেছো। আমি বললাম, আমারও তাই মনে হয়।

হালিমা বলেন, এরপর আমাদের কাফেলা রওয়ানা হলো। আমি দুর্বল গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। শিশুটি ছিলো আমার কোলে। তখন আমাদের আগের দুর্বল গাধাটি কাফেলার সবাইকে অতিক্রম করে এতো দ্রুত সামনে চলে যায় যে, অন্য কোনো গাধাই সেটিকে ধরতে পারেনি। এমনকি আমার বান্ধবীরা বলতে লাগলো, ও আবু যুওয়ায়বের কন্যা, কি আশ্চর্য ব্যাপার! আমাদের দিকে একটু তাকাও। যে গাধায় সওয়ার হয়ে তুমি এসেছিলে, এটা কি সেই গাধা? আমি বললাম, হাঁ, সেটিই। তারা বললো, এর নিশ্চয়ই বিশেষ কোন ব্যাপার রয়েছে।

এরপর আমরা বনু স্দা গোত্রে নিজেদের ঘরে চলে এলাম। তখন আমাদের এলাকার চেয়ে বেশি অভাবগ্রস্ত দুর্ভিক্ষ কবলিত অন্য কোন এলাকা ছিলো কিনা আমি জানতাম না। আমাদের ফিরে আসার পর বকরীগুলো চারণভূমিতে গেলে ভরা পেট ও ভরা স্তনে ফিরে আসতো। আমরা দুধ দোহন করে পান করতাম। অথচ সে সময় অন্য কেউ এক ফোঁটা দুধও পেতো না। তাদের পশুদের স্তনে কোন দুধই থাকত না। আমাদের কওমের লোকেরা রাখালদের বলতো, হতভাগার দল, তোমরা তোমাদের বকরী সে এলাকায় চরাও যেখানে আবু যুওয়ায়বের কন্যার রাখাল তার বকরীগুলো চরাতে নিয়ে যায়, কিন্তু তবুও তাদের বকরীগুলো খালি পেটেই ফিরে আসতো। একফোঁটা দুধও সেগুলোর স্তনে পাওয়া যেতো না। অথচ আমার বকরীগুলো ভরা পেটে এবং ভরা স্তনে ফিরে আসতো। এমনি করে আমরা আল্লাহর রহমত ও বরকত প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম ।
এমনকি শিশুর বয়স দুই বছর হওয়ার পর আমরা তাকে দুধ ছাড়ালাম। অন্যান্য শিশুদের চেয়ে এ শিশু ছিলো অধিক হৃষ্টপুষ্ট এবং মোটাসোঁটা। এরপর আমরা শিশুটিকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম, কিন্তু আমরা তার যে বরকত প্রত্যক্ষ করেছিলাম, তাই চাচ্ছিলাম, শিশুটি আমাদের কাছেই থাকুক। তাই শিশুর মাকে আমি এ ইচ্ছার কথা জানিয়ে বললাম, ছেলেটিকে আপনি আমার কাছেই থাকতে দিন, সে আরো সবল হোক। আমি তার ব্যাপারে মক্কার মহামারীর আশংকা করছি। আমাদের পুন পুন অনুরোধে বিবি আমেনা শিশুকে পুনরায় আমার কাছেই ফিরিয়ে দেন।

বুক ফাড়ার ঘটনা
দুধ ছাড়ানোর পরও শিশু মোহাম্মদ বনু স্দা গোত্রেই ছিলেন। তাঁর বয়স যখন চার অথবা পাঁচ বছর তখন বুক ফাড়ার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, হযরত জিবরাঈল (আ.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আগমন করেন। এ সময় তিনি অন্য শিশুদের সাথে খেলা করছিলেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে শুইয়ে বুক চিরে দিল বের করে তা থেকে রক্তপিন্ডবের করে বললেন, এটা আপনার মাঝে শয়তানের অংশ। এরপর দিল একটি তশতরিতে রেখে যমযম কূপের পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর যথাস্থানে স্থাপন করেন। ওই দিকে অন্য শিশুরা ছুটে গিয়ে  তার ধাত্রীমাতা হালিমাকে বললো, মোহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ কথায় পরিবারের লোকেরা ঝটপট ছুটে এসে দেখলো, তিনি বিবর্ণ মুখে বসে আছেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY