প্রিয় নবীর শেষ খোতবা

0
240

প্রিয় নবীর শেষ খুতবা-
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ (ভারত)
অনুবাদ: মওলানা মহিউদ্দীন খান

এই উম্মতের জন্য আল্লাহর রাসূলের শেষ যে অশ্রু ব্রিু প্রবাহিত হয়েছিল, তা বিদায় হজ্জের খুৎবায় পুঞ্জীভূত হয়ে রহেছে। এই সময় রাজ্য ও সম্পদ প্লাবনের মত মুসলমানদের দিকে ছুটে আসছিলো। রাসূলাল্লাহ (সা.) এর ভাবনা ছিলো, সম্পদের এই প্রাচুর্য্যর তাঁর অবর্তমানে উম্মাতের ঐক্যবন্ধন ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলবে। এজন্য উম্মাতের ঐক্যবদ্ধতা সম্পর্কে আলোচনার সুত্রপাত করলেন। নবীসুলভ সবটুকু আবেগ এর উপরই ব্যয় করলেন। প্রথমত: অত্যন্ত মর্মস্পশী ভাষায় ঐক্য কায়েম রাখার আবেদন জানালেন। অত:পর বলতে লাগলেন, ‘‘দুর্বল শ্রেণীকে অভিযোগ করার সুযোগ দিও না, যেন ইসলামের এই প্রাচীরে কোন প্রকার ফাটল সৃষ্টি হতে না পারে। তৎপর মুনাফেকী তথা পরস্পরের মন কষাকষির বিস্তারিত বিবরণ পেশ করত: তাহা হতে বোঁচে থাকার বাস্তব পথ দির্দেশ করলেন। তারপর উম্মতের ঐক্য বন্ধনের মূল ভিত্তিবস্তু কি, তাও ভালোভাবে বলে দিলেন। শেষ অছিয়ত করলেনÑএই বাণী এবং শিক্ষা যেন পরবর্তী যুগের মানুষের নিকট প্রচার করার সুব্যবস্থা করা হয়। খুৎবা শেষ করে আল্লাহর রাসূল (সা.)তাঁর দায়িত্ব হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপস্থিত লোকজনের নিকট সাক্ষ্য গ্রহণ করত: আল্লাহকে এমনভাবে ডাকতে শুরু করলেন যে, উপস্থিত সকলের অন্তর গলে গেলো। চক্ষু ফেটে অশ্রুর বন্যা বইল, দেহের পিঞ্জরে আত্মা যেন ছটফট করে, শান্তির কাতর স্বরে চিৎকার করে উঠিল।
আল্লাহর মহিমা কীর্তনের পর খুৎবার সর্বপ্রথম হৃদয়স্পর্শী কথা ছিল-
–    লোকসকল! আমার ধারণা যে, আজকের পর আমি এবং তোমরা এরুপ জামায়াতে আর কখনও একত্রিত হব না।
এতটুকু শুনেই সম্মেলনের উদ্দেশ্য এবং গুরুত্ব সকলের নিকট স্পষ্ট হয়ে উঠল। অত:পর যারা এই নিদারুণ বাণী শুনল, তাঁদের অন্তরই কেঁেপ উঠল। আসল কথা শুরুকরলেন”
– লোকসকল! তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের মানসম্ভ্রম পরস্পরের নিকট ততটুকুই পবিত্র যতটুকু পবিত্র আজকের এই (জুমার) দিন, আজকের এই (জিলহজ্জ) মাস এবং এই মক্কা শহর!

আর একটু জোর দিয়ে তিনি বললেন,
-লোক সকল! শেষ পর্যন্ত একদিন না একদিন তোমাদেরকে আল্লাহ সর্ব শক্তিমানের দরবারে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে তোমাদের করুতকর্মের হিসাব করা হবে। সাবধান! আমার পর ভ্রান্ত হয়ে একে অপরের মস্তক কর্তন করতে শুরু করোনা!
রসূল পাকের (সা.)বেদনা-বিধুর অছিয়তে প্রতিটি কথা তাঁর জবান হতে বের হয়ে শ্রোতাদের অন্তর ছেদন করে গেলো। অত:পর তিনি উম্মতের মজবুত প্রাচীরে ভবিষ্যতে যে ছিদ্রপথ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো, সে দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। অর্থাৎ ইসলামের সামাজিক মূল্যবোধ ভুলে হয়ত সবল কর্তৃক দুর্বল ও অসহায় শ্রেণীর উপর নির্যাতন হতে পারে। এদিকে লক্ষ করেই তিনি বললেন,-

– লোকসকল! স্ত্রীদের সম্পর্কে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা আল্লাহর নামের শপথ করে তাহাদিগকে দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছো এবং আল্লাহর নাম নিয়েই তাহাদের দেহ নিজেদের জন্য হালাল করিয়াছ। স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার, তার অপরকে সঙ্গসুখ প্রদান করতে পারবে না। যদি তারা এইরুপ করে, তাদের এমন শাস্তি প্রদান করতে পার যাহা প্রকাশ না পায়। আর তোমাদের উপর স্ত্রীলোকের অধিকার হচেছ, তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খেতে দিবে। যা নিজে পরিধান করবে, তাই তাদেরকে পরাবে।

– হে লোকসকল! তোমাদের দাস-দাসী!! যা নিজে খাবে, তাই তাদেরকেও খেতে দেবে। যাহা নিজে পরিধান করবে, তাই তাদেরকে পরাবে।

আরবে রক্ষক্ষয়ী দাঙ্গা হাঙ্গামার মূল কারণ ছিল দুইটি। ঋণের বিপুল পরিমাণ সুদ আদায়ে পীড়াপীড়ি ও কোন নিহত ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ স্পৃহা। একে অপরের নিকট পুরুষানুক্রমিক সুদের দাবী করতো এবং সেই সূত্রেই ঝগড়া শুরুহয়ে রক্তের দরিয়া প্রবাহিত হতো। একে হয়ত অপরকে হত্যা করতো, আর এই হত্যার প্রতিশোধ স্পৃহা বংশ পরস্পরায় বিস্তৃতি লাভ করতো। আল্লাহর রসূল (সা.)এই দুইটি ঝগড়ার সূত্রেরই অবসান ঘোষণা করলেন। তিনি উদার্ত্ত কণ্ঠে বললেন”

-লোক সকল! আজ আমি বর্বর যুগের সকল প্রথা পদদলিত করছি। গত যুগের সকল হত্যা সম্পর্কিত ঝগড়ার সমাপ্তি ঘোষণা করছি। সর্বপ্রথম আমি আমার স্বগোত্রীয় নিহত ব্যক্তি রাবীয়া ইবনে হারেস, যাকে হোযাইত হত্যা করেছিল তাকে ক্ষমা করে দিচিছ। জাহেলিয়াতের যুগের সকল সুদের দাবী বাতিল ঘোষণা করছি। এবং সর্বপ্রথম আমার স্বগোত্রের হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালেবের প্রাপ্য সকল সুদের দাবী পরিত্যাগ করছি।
সুদ ও রক্তের দাবী সম্পর্কিত প্রথার অবসান ঘোষণা করে পারস্পরিক সম্পর্কের দুর্বল আর একটি দিকের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং উত্তরাধিকার বংশপরিচয়, জামানত  প্রভৃতি হতে উৎপন্ন ঝগড়ার প্রতি সকলের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলে লাগলেনÑ
স্বয়ং আল্লাহ প্রত্যক হকদারে অধিকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সুতরাং উত্তরাধিকারীদের কারো সম্পর্কে কোন প্রকার অছিয়ত কারো আর কোন প্রয়োজন নেই। সন্তান যাহার ঔরস হতে জন্ম লাভ করে, তার অধিকার তাকেই দিতে হবে। ব্যভিচারীদের জন্য রয়েছে প্রস্তরের শাস্তি। আর তাহার জওয়াবদিহী করিতে হইবে আল্লাহর নিকট। যে সন্তান পিতা ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির প্রতি নিজের বংশপরিচয় সংযুক্ত করে এবং যে গোলাম স্বীয় মনিব ব্যতীত অন্য লোকের সহিত মালিকানার পরিচয় দেয়, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। স্ত্রীরা যেন স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে স্বামীর সম্পদ ব্যয় না করে। ঋণ সর্বাবস্থায়ই পরিশোধ্য। ধার করা বস্তু ফেরত দিতে হবে। উপহারের প্রতিদানও দেওয়া উচিৎ। জরিমানার জন্য জামীন দায়ী হইবে।

আরববাসীদের ঝগড়া-বিবাদ ও তার সকল উৎসমূল চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হলো। অত:পর আল্লাহর রসুল (সা.)শতাব্দী পর আরব-অনারব, গোরা কালো, শে^ত, প্রভৃতি যে আর্ন্তজাতিক বিদ্বেষের সম্ভাবনা ছিল সেই দিকে ইশারা করে বললেন”-
– লোক সকল! তোমাদের সকলের খোদা এক, তোমাদের সকলের আদি পিতাও এক ব্যক্তি। সুতরাং কোন আরব-অনারবের উপর, কোন সাদার উপর কালো অথবা কোন কালোর উপর সাদা কোন প্রকার জন্মগত প্রাধান্য নাই। প্রকৃত সম্মানীত সেই ব্যক্তি যিনি খোদাভীরু। প্রত্যেক মুসলিম একে অপরের ভাই। আর বিশ^-মুসলিম মিলে এক জাতি।

অত:পর ইসলামী ঐক্যের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন।
-লোক সকল! আমি তোমাদের জন্য এমন একটি বস্তু রেখে যাচিছ, যদি তা তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রাখো, তবে তোমরা কখনও বিভ্রান্ত হবে না। ঐ বস্তুটি হচেছ আল্লাহর কোরআন।

উম্মতের ভবিষ্যত ঐক্য বন্ধনের বাস্তব কর্মপন্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেনÑ
– শোন! আমার পর আর কোন নবী আসবে না। না অন্য কোন নতুন উম্মতের সৃষ্টি হবে। সুতরাং তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর এবাদত করিও। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ সম্পর্কে দৃঢ় থাকিও। রমযানের রোযা রাখিও। হৃষ্টচিত্তে সম্পদের জাকাত আদায় করিও। আল্লাহর ঘরে হজ্জ্ব করিও। তোমাদের শাসন কর্তাদের নির্দেশ মান্য করিও এবং আল্লাহর বেহেশতে স্থান গ্রহণ করিও। সর্বশেষ বললেন-

-তোমরা অমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তখন তোমরা কি বলবে?
প্রতুত্তরে জনতার মধ্য হইতে আবেগপূর্ণ অওয়াজ উঠিল ‘‘হে  আল্লাহর রাসুল! আপনি সকল হুকুম পৌঁছাইয়া দিয়েছেন।  এবং  আল্লাহর রসূল এবং আপনি ভালো-মন্দ সব পৃথক করে দিয়েছেন।

এই সময় হযরতের পবিত্র অঙ্গুলি আকাশের দিকে উত্থিত হলো। একবার অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠতেছিলো এবং অন্যবার জনতার দিকে নির্দেশ করে বলতেছিলো”

হে আল্লাহ!  মানুষের স্বাক্ষ্য শুন!
হে আল্লাহ! তোমার সৃষ্ট জীবদের স্বীকৃতি শুন!
হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক!!
অত:পর বলিলেন : যারা উপস্থিত আছে তারা যেন যারা উপস্থিত নাই তাদের নিকট আমার এই বাণী পৌঁছে দেয়। হয়তবা আজকের উপস্থিতি শ্রোতাদের চাইতেও অধিক সংখ্যক লোক এই নির্দেশের বিরোধিতা করিবে।

দ্বীনের পূর্ণতা
আল্লাহর রসূল (সা.)খুৎবা সমাপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে হযরত জিবরাইল (আ:) দ্বীন ইসলামের পূর্ণতার মুকুট নিয়ে আসলেন। কোরআনের আয়াত নাযিল হইল-
– আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করে দিলাম এবং দ্বীন ইসলামের উপর আমার সন্তুষ্টির সীলমোহর দিয়ে দিলাম।
সরওয়ারে কায়েনাত আল্লাহর প্রিয় রসূল (সা.) যখন জনতার সম্মুখে দ্বীন ও আল্লাহর নেয়ামতের পূর্ণতার কথা ঘোষণা করেন তখন তার নিজের সোয়াপরটির মূল্য এক হাজার টাকার অধিক ছিল না। খুৎবা শেষ হওয়ার পর হযরত বেলাল আজান দিলেন এবং হুজুর (সা.)জোহর ও আসরের নামাজ একত্রিত হয়ে আদায় করলেন। নামাজান্তে তাঁবুতে ফিরলেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে লাগলেন। সূর্যাস্তের একটু পূর্বে রসূল খোদার (সা.)উট যখন জনতার মধ্য দিয়ো চলছিল, তখন তাঁর সাথে খাদেম হজরত উসামা একই উটে আরোহী ছিলেন। ভীড়ের চাপে জনতার মধ্যে অস্বস্থির সৃষ্টি হচিছল। এই সময় রসূলে খোদা (সা.)নিজ হাতে উটের লাগাম টানিয়া লোকদিগকে বলিতেছিলেন,

ওগো আরামের সহিত
ওগো, শান্তির সহিত
মুজদালেফাতে এসে মাগরিবের নামাজ সমাপ্ত করলেন এবং বিশ্রামের জন্য সকল বাহনের উট ইত্যাদি ছেড়ে দিলেন। এশার নামাজ শেষ করে আরামে শুয়ে পড়লেন। মোহাদ্দেসগণ বর্ণনা করেন সমস্ত জীবনে এই একদিনই আল্লাহ রসূল তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন নাই।
১০ই জিলহজ্জ শনিবার দিবস তিনি জামরার দিকে রওয়ানা হলেন। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তাঁর পিতৃব্য-পুত্র হযরত ফজল ইবনে আব্বাস। তাঁর উট এক পা এক পা করে অগ্রসর হচিছল। চারিদিকে জনতার বিপুল ভীড় ছিল। জনসাধরণ বিভিন্ন মাছআলা জিজ্ঞাসা করছিল; আর তিনি ধীর শান্ত স্বরে ঐগুলির জওয়াব দিয়ে চলছিলেন। জামরার নিকট আসিয়া হযরত ফজল কতিপয় কংকর তুলে দিলেন রসূলে খোদা  নিক্ষেপ করলেন এবং বলতে লাগলেন; লোকসকল! ধর্মীয় বাড়াবাড়ি করিও না। তোমাদের পুর্বেকার বহু জাতি এই ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর পর যেন তাঁহার উম্মতের নিকট হইতে আসন্ন বিরহ ব্যথার বেদনা ফুটে উঠছিল। এই সময় তিনি বলছিলেন,
এই সময় হজ্জ্বের মাছআলা শিখে নাও। অত:পর আর দ্বিতীয়বার হজ্জ্বের সুযোগ আসবে না, সে কথা আমি বলতে পারি না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY