মহানবীর কৈশরকাল

0
430

মহানবীর কৈশরকাল
আল্লামা ছফিউর রহমান মোবরকপুরী
অনুবাদ: খাদিজা আখতার রেজায়ী

মায়ের স্নেহকোলে
এ ঘটনার পর বিবি হালিমা ভীত হয়ে তাঁকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এলেন। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মায়ের ¯েœহছায়ায় কাটান।
এদিকে হযরত আমেনার ইচ্ছা হলো, তিনি পরলোকগত স্বামীর কবর যেয়ারত করবেন। পুত্র মোহাম্মদ, দাসী উম্মে আয়মান এবং শ^শুর আবদুল মোত্তালেবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌঁছেন। একমাস সেখানে অবস্থানের পর মক্কার পথে রওয়ানা হন। মদীনা থেকে রওয়ানা করে শুরুতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে এ অসুস্থতা কঠিন আকার ধারণ করে। অবশেষে মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক জায়গায় এসে বিবি আমেনা ইন্তেকাল করেন।

দাদার ¯েœহছায়ায়
আবওয়ায় মা আমেনার ইন্তেকালের পর বৃদ্ধ আবদুল মোত্তালেব পৌত্রকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় পৌঁছলেন। পিতৃমাতৃহীন পৌত্রের জন্যে তাঁর মনে ছিলো ভালোবাসার উত্তাপ। তিনি নতুন করে যে আঘাত পেলেন তা অতীত আঘাতের কথা জাগিয়ে তোলে। পিতৃমাতৃহীন পৌত্রকে তিনি যতোটা ভালোবাসতেন, এতো ভালোবাসা তার নিজ পুত্র কন্যা কারো জন্যেই ছিলো না। ভাগ্যের লিখন বালক মোহাম্মদকে নিসংগতার যে প্রান্তরে এনে দাঁড় করিয়েছিলো, আবদুল মোত্তালেব তাঁকে সে নিসঙ্গতার ময়দানে একা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।
তিনি পৌত্রকে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন এবং বড়োদের মতো সম্মান করতেন। ইবনে হেশাম বলেন, আবদুল মোত্তালেবের জন্যে কাবা ঘরের ছায়ায় বিছানা পেতে দেয়া হতো। তার সব সন্তান সে বিছানার চারদিকে বসতো, আবদুল মোত্তালেব আসলে কেবল তিনিই বিছানার ওপর বসতেন। তাঁর সম্মান মর্যাদার কারণে সন্তানদের কেউই এ বিছানায় বসতেন না, কিন্তু রসূলুল্লাহ (স.) এলে দাদা আবদুল মোত্তালেবের জন্যে পাতা বিছানায়ই বসতেন। এ সময় তিনি ছিলেন অল্প বয়স্কশিশু। চাচারা তাঁকে বিছানা থেকে সরিয়ে দিতেন, কিন্তু আবদুল মোত্তালেব বলতেন, ওকে সরিয়ে দিয়ো না, ওর মর্যাদা অসাধারণ। এ কথা বলে তিনি তাকে নিজের পাশে বসাতেন। শুধু বসানোই নয়, তিনি প্রিয় দৌহিত্রের পিঠে হাত বুলাতেন। বালক মোহাম্মদের কাজকর্ম তাঁকে আনন্দ দিতো।

আট বছর দুই মাস দশ দিন বয়স হওয়ার পর দাদার ¯েœহের ছায়াও উঠে যায়। তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি পুত্র আবু তালেবকে অসিয়ত করে গেলেন, তিনি যেন ভ্রাতুস্পুত্রের বিশেষ যতœ নেন। আবু তালেব এবং আবদুল্লাহ ছিলেন একই মায়ের সন্তান।

চাচার ¯েœহবাচ্ঞসল্যে
আবু তালেব ভ্রাতুস্পুত্রকে গভীর ¯েœহ-মমতার সাথে প্রতিপালন করেন। তিনি তাঁকে নিজ সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন; বরং সন্তানদের চেয়ে ভাতিজাকেই তিনি বেশি ¯েœহ করতেন। চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত তিনি প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্রকে সহায়তা দেন। আবু তালেব ভ্রাতস্পুত্রের প্রতি লক্ষ্য রেখেই মানুষের সাথে শত্রুতা মিত্রতার বন্ধন স্থাপন করতেন।

চেহারার বরকতে রহমতের বৃষ্টি প্রার্থনা
ইবনে আসাকের জুলহামা ইবনে আরফাতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি মক্কায় এলাম। মানুষ দুর্ভিক্ষের কারণে চরমভাবে সংকটাপন্ন ছিলো। কোরায়শ বংশের লোকেরা আবু তালেবকে বললো, মক্কা উপত্যকা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে আছে। আমাদের সন্তানাদি দুর্ভিক্ষ কবলিত। চলুন, বৃষ্টির জন্যে দোয়া করুন। আবু তালেব একটি বালককে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। বালকটিকে দেখে মেঘে ঢাকা সূর্য মনে হচ্ছিলো। আশেপাশে অন্যান্য বালকও ছিলো। আবু তালেব বালকের হাত ধরে নিয়ে তাকে কাবা ঘরের দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসিয়ে দেন। বালক আবু তালেবের আঙ্গুল ধরে রেখেছিলেন। সে সময় আকাশে এক টুকরো মেঘও ছিলো না, কিন্তু দেখতে দেখতে এদিক ওদিক থেকে মেঘ আসতে শুরু করে এবং এমন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়, যাতে সমগ্র উপত্যকা সয়লাব হয়ে যায় এবং শহর প্রান্তর সজীব হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে আবু তালেব এ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, তিনি সুদর্শন, তাঁর চেহারার বরকতে বৃষ্টি প্রত্যাশা করা হয়। তিনি এতিমদের আশন্দয় এবং বিধবাদের রক্ষাকারী।

পাদ্রী বোহায়রা
সূত্রগত মর্যাদায় সন্দেহ সংশয়পূর্ণ কিছু রেওয়ায়াত মোতাবেক নবী মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন বারো বছর, মতান্তরে বারো বছর দুই মাস দশ দিন, ১৬ তখন আবু তালেব তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়ায় রওয়ানা হন এবং বোসরা পেঁৗঁছার পর এক জায়গায় তাঁবু স্থাপন করেন। বোসরা সিরিয়ার এক জায়গার নাম এবং হূরানের কেন্দ্রীয় শহর। সে সময় বোসরা আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত অঞ্চলের রাজধানী ছিলো। এ শহরে জরজেস নামে একজন পাদ্রী অবস্থান করতেন। তিনি বোহায়রা উপাধিতে সমধিক পরিচিত ছিলেন। কাফেলা তাঁবু স্থাপনের পর বোহায়রা গির্জা থেকে বের হয়ে কাফেলার লোকদের কাছে আসেন এবং তাদের মেহমানদারী করেন। অথচ পাদ্রী বোহায়রা এর আগে কখনো তার গির্জা থেকে বের হতেন না। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর গুণবৈশিষ্ট্যের আলোকে চিনে ফেলেন এবং তাঁর হাত ধরে বললেন, তিনি সাইয়েদুল আলামীন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রাহমাতুল লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করবেন।

আবু তালেব বোহায়রাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এটা কিভাবে বুঝলেন? তিনি বললেন, আপনারা এ দিকে আসার সময় এ বালকের সম্মানে সব গাছপালা এবং পাথর সাজদায় নত হয়েছে। এগুলো নবী ছাড়া অন্য কাউকে সাজদা করে না। তাছাড়া মোহরে নবুয়ত দ্বারা আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তাঁর কাঁধের নীচে নরম হাড়ের পাশে এটি ফলের মতো মজুদ রয়েছে। আমরা তাঁর উল্লেখ আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থেও দেখতে পাই।
এরপর পাদ্রী বোহায়রা আবু তালেবকে বললেন, ওকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দিন। সিরিয়ায় নেবেন না। তার ব্যাপারে ইহুদীদের তরফ থেকে ভয় রয়েছে। এ পরামর্শ অনুযায়ী আবু তালেব কয়েকজন ভৃত্যের সঙ্গে প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্রকে মক্কায় পাঠিয়ে দেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY