নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অবদান

0
262

আজ এই একবিংশ শতাব্দীর উত্তরাধুনিক সময়ের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমাদের বর্তমান প্রগতিশীল নারী সমাজে নারীর ব্যক্তিসত্তার উৎস খুঁজতে গিয়ে পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই এর মূলে রয়েছে আমাদের শান্তির ধর্ম ইসলাম। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম অন্য যেকোনো ধর্মের বিবেচনায় অগ্রসর ভূমিকা রেখেছে। ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেন সেখানে কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে অবমাননাকর ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো। তাদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্দয়তাও অহরহ ঘটতো। ইসলামী সমাজ এই ঘৃণ্য প্রথার চির অবসান ঘটায়। পবিত্র কোরআনে কন্যা সন্তান হত্যার মানসিকতাকে জঘন্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। সূরা নাহলের ৫৮ ও ৫৯নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘যখন তাদের (মক্কার পৌত্তলিকদের) কাউকে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার খবর দেওয়া হতো তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়। ক্রোধে সে জ্বলতে থাকে। *তাকে যে বিষয়ে খবর দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ কন্যা সন্তান জন্মের), সেই লজ্জায় সে সমাজের লোকদের কাছ থেকে পাশ কাটিয়ে চলে। (সে চিন্তা করে) লাঞ্ছনা ভোগ করে কন্যা সন্তান রেখে দেবে না তাকে মাটিতে পুতে ফেলবে।” ইসলাম এ ধরনের কুপ্রথা শুধু নিষিদ্ধই করেনি পবিত্র কোরআনে সূরা তাকবিরের ৮ ও ৯ আয়াতে সংশ্লিষ্টদের হুঁশিয়ারি করে বলা হয়েছে ‘স্মরণ কর, যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা জিজ্ঞাসিত হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ কোরআনের এই আয়াত দ্বারা বোঝানো হয়েছে যারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয় তাদের শেষ বিচারের দিনে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। ইসলামে কন্যা সন্তান লালন পালনকে উৎসাহিত করা হয়েছে নানাভাবে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি দু’জন কন্যা সন্তান পেয়ে তাদের উত্তমভাবে লালন পালন করল তারা তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ্) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি তিনজন কন্যা লালন পালন করে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব।
১. নারীর অধিকার কী?
আমাদের মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে নেয়া দরকার যে নারী অধিকার কী? নারী অধিকার অর্থ হলো সেই সমস্ত অধিকার যা-নারীকে আইনগত ও সামাজিক অবস্থান আদায় করে দেয় যেগুলো পুরুষ ভোগ করছে। অথবা নতুন করে তৈরি করা, নতুন অবস্থার প্রেক্ষিতে ঢেলে সাজানো বা যুগের চাহিদা মতো গড়ে তোলা। ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুযায়ী এর অর্থ দাঁড়ায়- নবায়ন করা যা একটি নতুন কাঠামো দেয়া বা আকার আকৃতি, অবয়ব দেয়া। তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, পুরুষেরা যে সমস্ত অধিকার ভোগ করে নারীদেরকেও অনুরূপ সুযোগ সুবিধা দেয়াকে নারী অধিকার বলে। ইসলাম নারী-পুরুষের অধিকারসমূহ সমান্তরালভাবে দিয়েছে। ইহা সমান বটে কিন্তু একই রকম নয়। ইসলামী শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। বোঝার সহজের জন্য নারী অধিকারসমূহকে ৭টি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন –
১. ধর্মীয় অধিকার
২. সামাজিক অধিকার
৩. অর্থনৈতিক অধিকার
৪. শিক্ষার অধিকার
৫. আইনগত অধিকার
৬. রাজনৈতিক অধিকার
৭. উত্তরাধিকার বা মিরাসি অধিকার।
১. ধর্মীয় অধিকারঃ- ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বোঝা যায় যে, ইসলাম নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নির্ধারণ করেছে। ইবাদত-বন্দেগী, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, জিকির-আযকার, দান-খয়রাত সকল ক্ষেত্রে সমান ঘোষণা করেছে। যেমন আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আহযাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন, ”নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ, ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালণকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, , যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী নারী-তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরষ্কার। (35)” আলোচ্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষের ইবাদতের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। উভয়ের জন্যই সমান পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। অথচ আধুনিক সভ্যতার দাবিদার পশ্চিমারা বলে থাকে যে জান্নাত শুধু মাত্র পুরুষের জন্য নারীদের কোন স্থান নেই। তারা এই বলে নারী জাতিকে হেয় করে। অথচ আল্লাহতায়ালা সূরা নিসার ১২৪ নম্বর আয়াতে, সূরা আন-নাহলের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষের জন্য জান্নাত লাভের ক্ষেত্রে জেন্ডার বা লিঙ্গের কোন শর্তারোপ করেননি বরং তিনি কর্মের কথা বলে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন।
২. নারীর সামাজিক অধিকারঃ- ইসলাম নারীকে যে সামাজিক মর্যাদা দিয়েছে তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীদেরকে ইসলাম শুধু পুরুষের সমান অধিকারই দেয়নি বরং অনেক অনেক বেশি অধিকার দিয়েছে। সহজভাবে বোঝার জন্য নারীর সামাজিক অবস্থানকে ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে :
ক. কন্যা হিসেবে মর্যাদা খ. স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা গ. মা হিসেবে মর্যাদা ঘ. বোন হিসেবে মর্যাদা
ক. কন্যা হিসেবে মর্যাদাঃ- ইসলাম কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কন্যাসন্তানের অধিকারের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তার জীবনের নিরাপত্তা। জাহেলি যুগে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ নিজের এবং বংশের জন্য লজ্জাজনক বিষয় ছিল। তাই তারা তাদেরকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করত। আর ইসলাম এক্ষেত্রে ফুলের মত নিষ্পাপ কন্যাসন্তানকে আদরের সাথে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। সন্তান পুত্র হোক বা কন্যা হোক উভয়ের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং তাদেরকে হত্যা করা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে সূরা আত-তাকবিরের ৮-৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে, “আর যখন জীবন্ত কবর দেয়া কন্যাসন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে তাকে কী অপরাধে হত্যা করা হয়েছিল।”৭ এ ছাড়া ধনী ও গরিব সকলকে উদ্দেশ করে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আনআম ১৫১ ও সূরা বনি ইসরাইলের ৩১ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না দরিদ্রতার ভয়ে। কেননা আমি তোমাদেরকে এবং তাদেরকে রিজিক দিয়ে থাকি।”৮ ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়ে নিজেদেরকে গর্বিত মনে করত। জাহিলিয়াত এখনও নির্মূল হয়নি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আল্ট্রাস্নোগ্রাফী-এর মাধ্যমে গর্ভে ভ্রুণ সনাক্ত করে কন্যাসন্তান হলে তাকে পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই মাতৃগর্ভে হত্যা করা হয়। পরিসংখ্যান রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতেই প্রতি বছর প্রায় দশ লাখ কন্যাকে নারী হওয়ার অপরাধে হত্যা করা হয়। তামিল নাড়ু– ও রাজস্থানের মত রাজ্যগুলোতে বিলবোর্ড এবং পোস্টার ছাপিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হয় যে পাঁচশ টাকা খরচ করুন ৫ লাখ টাকা সেভ করুন। অর্থাৎ ৫০০ টাকা দিয়ে আল্ট্রাস্নোগ্রাফী করে গর্ভের সন্তান কন্যা হলে তাকে হত্যা করে লালন পালনের ব্যয়ভার বাবদ ৫ লক্ষ টাকা বাঁচান। এ হলো ভারতের কন্যা সন্তানের অবস্থা। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে ভারতের এজেন্ডায় আমাদের দেশে নারীনীতির নামে নারীদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার লক্ষ্যে কুরআনবিরোধী নারীনীতি বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ইহার কিছু প্রভাব দেখা যায়। কন্যাসন্তান জন্মের সংবাদ শুনলে চাঁদের ন্যায় চেহারা মলিন হয়ে যায়। যেমন আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৫৮-৫৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “যখন তাদেরকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের খবর দেয়া হয় তখন তাদের চেহারা কালিমা লেপে যায় এবং তখন সে যেন রক্ত বমনের ঢোক গিলতে থাকে। মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায় এই জন্য যে এ কুৎসিত সংবাদের পর সে মুখ দেখাবে কী করে এবং ভাবতে থাকে এই অপমান সহ্য করে কন্যাসন্তানটিকে রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে হত্যা করবে।” উক্ত আয়াত থেকে বোঝা যায় ইসলাম শুধু কন্যাসন্তান হত্যা হারামই করেনি বরং পুত্রসন্তান হলে আনন্দ অনুষ্ঠান আর কন্যা সন্তান হলে মুখ কালো হওয়াকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। উপরন্তু ইসলাম কন্যাসন্তানকে উত্তমভাবে লালন পালনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। মুসনাদে আহমদ এ-বর্র্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তির দু’টি কন্যাসন্তান জন্মলাভ করবে আর তাকে ভালোভাবে লালন পালন করবে সে ও আমি জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি অবস্থান করব।” এ বলে নিজের হাতের দু’টি আঙুল একত্রিত করে দেখান। এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে কন্যাসন্তান হলে তার পিতা, মহানবী (সা) এর সাথে জান্নাতে পাশাপাশি থাকবে। পুত্রসন্তান হলে এমন নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কন্যাসন্তান পুত্র অপেক্ষা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
খ. স্ত্রী হিসেবে মর্যাদাঃ- ইসলাম নারীর অপমান ও লাঞ্ছনার অতল গহ্বর থেকে উত্তরণ করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম-পূর্ব অন্যান্য ধর্মের লোকেরা নারীকে শয়তানের গুটি বা হাতের পুতুল মনে করত। অর্থাৎ তারা ধারণা করত শয়তান যত অপকর্ম করে থাকে সব নারীর মাধ্যমে। আর ইসলাম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে মহীয়সী হিসেবে। এবং নারী-পুরুষের চরিত্রের জন্য ঢালস্বরূপ। সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে নবী করিম (সা) বলেছেন, “মুসলমানদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে।” তাহলে তার জন্য নিজের দৃষ্টির সংরক্ষণ এবং চরিত্রের পবিত্রতা বজায় রাখা সহজ হবে। নারীর মর্যাদা দিতে গিয়ে রাসূল (সা) আরও বলেছেন, হাদিসটি হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন, “যে বিবাহ করল সে দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করলো” এবং অন্য হাদিসে পুরুষের চরিত্র সংরক্ষণকারী বলা হয়েছে। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে এমনটি বলা হয়নি।
পবিত্র কুরআনে সূরা নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারীদেরকে কল্যাণের প্রতীক ঘোষণা করে বলেন, “তোমরা তাদের সাথে সুন্দর জীবন যাপন করো। যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করো তাহলে এমনও তো হতে পারে যে তোমরা তো একটি জিনিস অপছন্দ করছো কিন্তু তার মধ্যে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখে দিয়েছেন।” ইসলামে নারীর অবস্থা দাসী বা গৃহপরিচারিকা নয় বরং স্বামী-স্ত্রীর সমপর্যায়ের মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।” (সূরা বাকারা ১৮৭) পোশাক যেমন মানুষের সতর আবৃত করে এবং সৌন্দর্য বর্ধন করে তেমনি নারী-পুরুষ একে অপরের জন্য যাবতীয় দোষ-ক্রটি আবৃতকারী এবং প্রশান্তিদানকারী। ইসলাম নারী ও পুরুষের সামাজিক মর্যাদার মধ্যে কোনই পার্থক্য করেনি। তাহলে এখানে আমরা দেখতে পাই স্ত্রী হিসেবে নারীকে সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
গ. মা হিসেবে মর্যাদাঃ- ইসলাম নারীকে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়েছে মা হিসেবে, যা ইতঃপূর্বে কেহ দেয়নি। আল্লাহতায়ালার পরেই মাতা-পিতার প্রতি সম্মান ও সম্মানজনক আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, “তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে। তোমাদের মাঝে যদি তাদের মধ্য থেকে দু’জন অথবা একজন জীবিত থাকেন,, বার্ধক্যাবস্থায় তাহলে তাদের সাথে এমন আচরণ করবে না যাতে তারা ‘উফ’ শব্দ উচ্চারণ করে এবং মুখ বাঁকিয়ে বা কর্কশভাবে কথা বলবে না বরং তাদের সাথে কথা বলবে বিনয় নম্র ভদ্রভাবে ও কোমল সূরে এবং তাদের সামনে গর্বের সাথে বা উভয় বাহু বা বুক উঁচু করে কথা বলবে না। আল্লাহর কাছে দোয়া করবে এই বলে হে পরম করুণাময় তুমি তাঁদের প্রতি দয়া কর সেভাবে ঠিক যেভাবে তারা শিশুকালে আমাদের প্রতি দয়া- মায়া, স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করেছিলেন।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)
ইসলাম মানুষকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যে মাতা-পিতার সাথে মন্দ আচরণ তো করা যাবেই না উপরন্তু তারা মনে কষ্ট পাবে এমন বৈধ কাজও করা যাবে না। তাদের সামনে কথা বলতে হলে বিনয়ের সাথে সম্মানের সাথে এবং মমতামাখা কণ্ঠে কথা বলতে হবে। অত্র আয়াতে আল্লাহতায়ালা মাতা-পিতার সম্মান ও মর্যাদার কথা বলেছেন। কিন্তু অন্যান্য আয়াত ও হাদিসে পিতার তিন গুণ মাতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
অনুরূপভাবে আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে, “সে তার পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে, তার মা অনেক কষ্ট সহ্য করে তাকে পেটে ধারণ করেছিল। আর অনেক ব্যথা সহ্য করে তাকে প্রসব করেছিল এবং তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধ ছাড়াতে ত্রিশটি মাস সময় লেগেছে।” (সূরা আহকাফ : ১৫) মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজাহ শরীফে বর্ণিত আছে, “জান্নাত রয়েছে মায়ের পদ তলে” এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে পথচলার সময় পায়ের নিচে যা পড়বে তাই জান্নাতে পরিণত হয়ে যাবে বরং এর মানে আপনার ওপর অর্পিত সকল দায় দায়িত্ব পালন করলে এবং মাতা-পিতা সন্তুষ্ট থাকে এমন আচরণ, কথা ও কাজ করলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাত দিয়ে দেবেন।
সহীহ আল-বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট জানতে চাইলো আমার ওপরে সবচাইতে বেশি অধিকার কার রয়েছে। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, তোমার মায়ের। সে আবার জিজ্ঞাসা করল তার পর। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করল তার পরে। জবাবে রাসূল (সা) বলেন, তোমার মায়ের। অতঃপর যখন চতুর্থবার জিজ্ঞেস করল। তার পর রাসূল (সা) জবাব দিলেন, তোমার পিতার। এ হাদিসের আলোকে শতকরা ২৫ ভাগ অধিকার দেয়া হয়েছে পিতাকে আর ৭৫ ভাগ অধিকার দেয়া হয়েছে মাতাকে। যা এভাবেও বলা যায় যে ৪ ভাগের ৩ ভাগ অধিকার মায়ের আর ১ ভাগ অধিকার পিতার। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এ ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়ে ৭৫ ভাগ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ঘ. বোন হিসেবে অধিকারঃ-ইসলাম নারীকে চতুর্থ ধাপে যে মর্যাদা দিয়েছে তা বোন হিসেবে। জাহেলি যুগে কোন নারীকে তার ভাই-বোন হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করত। আর ইসলাম সে অপমানের পিরামিড ভেঙে চুরমার করে ভাই ও বোন পরস্পরের সহযোগী বলে ঘোষণা করেছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারী এরা পরস্পর সহযোগী বন্ধু বা আউলিয়া” আরবি আউলিয়া শব্দের অর্থ সহযোগী বন্ধু বা অভিভাবক। মুমিন নর-নারীগণ পরস্পর ভাই বোন। যদি তাদের মাঝে অন্য কোন সম্পর্ক না থাকে। ইসলাম নারীকে সামাজিকভাবে এত অধিক মর্যাদা দিয়েছে যা পুরুষের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি।
৩. নারীর অর্থনৈতিক অধিকারঃ- ইসলাম নারীদেরকে অর্থনৈতিক দিকে পরিপূর্ণভাবে সমতার ভিত্তিতে নয় বরং পুরুষের চেয়ে নারীকে এক ধাপ এগিয়ে অধিকার দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আমি ব্যবসাকে হালাল করেছি এবং সুদকে হারাম করেছি।” উক্ত আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়া এবং সুদ হারাম হওয়া সমভাবে প্রযোজ্য। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যে সমস্ত ব্যবসা করতে পারবে। নারীও সে ধরনের ব্যবসা করতে পারবে। পুরুষের ন্যায় নারী জমি ক্রয় বিক্রয় ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ি-গাড়ি সকল কিছু তৈরি করতে পারবে। সে বিবাহিতা হোক অথবা অবিবাহিতা হোক সে তার সম্পদের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। শরিয়ত অনুমোদিত সকল ব্যবসা বা কাজ করার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম নারীকে সম্পদ অর্জনের সুযোগ দিয়েছে এবং মালিকানাও তাকেই দিয়েছে কিন্তু তার ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব দিয়েছে পুরুষের ওপর। বিবাহের আগে নারীর ব্যয়ভার পিতার ওপরে বিয়ের পরে স্বামীর ওপরে আর স্বামীর অবর্তমানে ছেলে বা ভাইয়ের ওপরে। তদুপরি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য মোহরের ব্যবস্থা করেছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “নারীদের মহরানা অবশ্য কর্তব্য হিসেবে আন্তরিক সন্তুষ্টির সাথে আদায় কর। তবে সে যদি খুশি মনে কোন কিছু অংশ তোমাকে ক্ষমা করে দেয়। তাহলে তুমি তা আনন্দের সাথে ভোগ করো।” (সূরা আন নিসা-৪) নারী যদি তার অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে টাকার কুমিরও হয় তবুও তার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়। তাহলে বোঝা যায় যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
৪. নারীর শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকারঃ- ইসলাম নারী শিক্ষার প্রতি সমধিক গুরুত্বারোপ করেছে। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে যে, জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যেতে হলে যাও। তারও আগে আল্লাহতায়ালা বলেছেন “পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্ত হতে। পড় তোমার রব মহোত্তম। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন কিছু যা সে জানতো না।” (সূরা আলাক ১-৫ ) উক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা নারী- পুরুষ সবাইকে সমানভাবে শিক্ষার কথা নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ সে সময়ের যখন নারী শিক্ষার কোন ধারণাও ছিল না। রাসূল (সা) এর সময়কালে উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়শা (রা) ছিলেন সবচেয়ে বড় পণ্ডিত। বহু সাহাবী এবং বিখ্যাত তাবেয়িগণ তাঁর নিকট থেকে হাদিস, ফিকাহসহ বিভিন্ন জ্ঞান লাভ করেছে। তিনি ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর সম্পর্কে হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা) যিনি নিজে জালিলুল কদর সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, যখন আমরা সবাই মিলে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারতাম না তখন হযরত আয়শা (রা)-এর নিকট শরণাপন্ন হলে তার সঠিক জবাব পেয়ে যেতাম। তিনি ৭৭ জন সাহাবীর উস্তাদ ছিলেন। তা ছাড়া উম্মুল মুমেনীন হযরত সালমাও ছিলেন সমসাময়িক কালের শ্রেষ্ঠ আলেম। ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী বলেন, তিনি ৩২ জন সাহাবীর উস্তাদ ছিলেন। হযরত ফাতিমা বিনতে কায়েস উম্মুদ দারদা, হযরত আনাস (রা)-এর মাতা উম্মে ছালিমও অনেক বড় মাপের ইসলামী স্কলার ছিলেন। এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। উক্ত বিষয়গুলো সেই সময়ের যখন নারীকে মানুষ মনে করত ঘরের ব্যবহার্য আসবাবপত্র আর শিশুকন্যাকে জীবন্ত প্রোথিত করা হতো। অন্ধকার অমানিশার বুক চিরে ইসলামের সোনালি সূর্যোদয় পুরুষের ন্যায় নারীকেও দিয়েছে জ্ঞানের আলোকছোয়া, এতে উদ্ভাসিত হয়েছে মহীয়সী নারীরা। এখান থেকে বোঝা যায় ইসলাম নারীকে ঠকায়নি বরং দিয়েছে সমঅধিকার।
৫. আইনগত অধিকার- ইসলামী শরিয়তের মতে নারী- পুরুষ এক সমান। ইহা নারী ও পুরুষের জান, মাল ও ইজ্জতের অধিকার সমানভবে দিয়ে থাকে। ফলে আইনের অধিকারও একই রূপ। ইজ্জতের ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ সকলের জন্য ইসলামী আইন সমান। যেমন কোন পুরুষ কোন নারীকে হত্যা করলে ইসলামের যে বিধান অনুরূপ কোন নারী কোন পুরুষকে হত্যা করলেও একই বিধান। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ তোমাদের জন্য মাসয়ালাগুলোতে কিসাসের বিধান লিখে দেয়া হলো। অনুরূপ দাসের বিনিময় দাস, নারীর পরিবর্তে নারী।” (সূরা বাকারা : ১৭৮) ইসলামী বিধিবিধানে শারীরিক ক্ষতির শাস্তি পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সম্পূর্ণ সমান। একই সূরা মায়েদার ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন “চোর পুরুষ হোক বা মহিলা হোক যখন চুরি করবে তখন তোমরা হাত কেটে দেবে।” অনুরূপভাবে সূরা নূরের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “ব্যাভিচারী পুরুষ ব্যাভিচারী নারী যেই হোক তাকে একশটি বেত্রাঘাত কর।” সাধারণ ক্রাইমের শাস্তির জন্য সাক্ষী ২ জন আর বড় কোন অপরাধের শাস্তির জন্য সাক্ষী ৪ জন বাধ্যতামূলক। অনুরূপ নারীদের চরিত্রের ব্যাপারে অপবাদের জন্য ৪ জন সাক্ষী হাজির করতে বলা হয়েছে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় যে, নারী ও পুরুষ সমান আইনের অধিকারী হলেও এ ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
৬. রাজনৈতিক অধিকারঃ- ইসলাম নারীদেরকে অন্যান্য অধিকারের ন্যায় রাজনৈতিক অধিকারও বিশেষভাবে দিয়েছেন। নারী এবং পুরুষের ভোটাধিকার একই। এতে কোন পার্থক্য করা হয়নি। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীগণ এরা সবাই একে অপরের বন্ধু পৃষ্ঠপোষক। এরা একে অপরকে ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করে। এ লোকেরাই তারা যাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ অবশ্যই আসবে। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা মহা পরাক্রমশালী ও মহাবিজ্ঞানী।” (সূরা তাওবা -৭১) পুরুষ ও নারী শুধু সামাজিকভাবেই নয় বরং রাজনৈতিকভাবেও একে অপরের জন্য পরিপূরক সাহায্যকারী। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নারীদেরকে পুরুষের ন্যায় ভোটাধিকার প্রদান করেছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, তোমাদের আমানতকে যোগ্য পাত্রে অর্পণ করতে।” ইসলাম নারীকে শুধু ভোটাধিকার দেয়নি। আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও দিয়েছে। একদা হযরত ওমর (রা) বিবাহের মহর নির্ধারণ করে দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে এক বৃদ্ধ মহিলা পেছন থেকে ওঠে এর প্রতিবাদ করেন এবং কুরআনের এই আয়াত পাঠ করেন। “যদি তোমরা একজন স্ত্রীর জায়গায় অন্য একজন স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও তাহলে তোমরা যাকে তালাক দিতে চাচ্ছ তার মহরের জন্য সম্পদের একটি পর্বত যদি দিয়ে থাক, তাহলে তা থেকে একটি জিনিসও ফেরত লইতে পারবে না।” (সূরা নিসা-২০) অতঃপর সেই বৃদ্ধা বললেন, যেখানে আল্লাহতায়ালা মহরের কোন সীমা নির্ধারণ করে দেননি, সেখানে ওমর (রা) কিভাবে মহর নির্ধারণ করে দেবেন। তখন হযরত ওমর (রা) তাঁর মত প্রত্যাহার করেন এবং বলেন নিশ্চয়ই ওমর ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছিল আর এই নারী তা ঠিক করে দিলেন। এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীদেরকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে।
৭. নারীর উত্তরাধিকার বা মিরাসি অধিকারঃ- নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের মধ্যে উত্তরাধিকার মর্যাদার ক্ষেত্রে নারীকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলাম নারীদেরকে যে মর্যাদা দিয়েছে তাতে নারীদের ঠকায়নি বরং উচ্চ মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে একজন ছেলের অংশ দু’জন মেয়ের সমান। মৃতের সন্তান যদি শুধু মেয়েই হয় দুই বা দুয়ের অধিক। তাহলে কন্যারা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। যদি কন্যা একজন হয় তাহলে পাবে অর্ধেক। মৃত বক্তির সন্তানাদি থাকলে মৃতের পিতা-মাতা উভয়ের অংশ এক ষষ্ঠাংশ। আর যদি সন্তানাদি না থাকে আর পিতা-মাতাই শুধু ওয়ারিস হয় তাহলে মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ। এগুলো বণ্টন হবে মৃতের ওসিয়ত এবং দেনা পরিশোধের পর। তোমাদের জানা নেই যে, তোমাদের বাবা দাদা এবং নিচের দিকে পুত্র-পৌত্র এর মধ্যে উপকারের দিক থেকে কারা বেশি আপনজন। এই বিধান খোদ আল্লাহর নির্ধারিত। আর আল্লাহতায়ালা সবকিছু মহাবিজ্ঞ বিচারপতি। (সূরা আন নিসা ১১-১২)। ইসলামে উত্তরাধিকার নীতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর অংশ অর্ধেক বটে তবে সর্বক্ষেত্রে নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সমান পায় যেমন মৃতের কোন সন্তান না থাকলে মাতা-পিতা দু’জনেই এক- ষষ্ঠাংশ করে পায়। মৃত ব্যক্তি যদি নারী হয় আর তার কোন সন্তান না থাকে তাহলে স্বামী পাবে অর্ধেক। মাতা এক-তৃতীয়াংশ এবং পিতা এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের দ্বিগুণও পেয়ে থাকে।
ইসলামী আন্দোলনের কর্মি হিসেবে আমার দ্বায়িত্ব ও কর্তব্যঃ- প্রকৃত নারী স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায়, তা ইসলামের মহান নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-ই নারীজাতিকে প্রদান করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরস্কার দেব যা তারা করত। (সূরা নাহল, আয়াত: ৯৭) কুরআনের আলোকে রাসূল ((সা) পুরুষকে পরিবারের কর্তা এবং পরিবারের সদস্যদের ভরণ পোষণের জন্য দায়িত্বশীল নির্ধারণ করেছেন। আর নারীকে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা হল ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব। মহানবী (সা) ইরশাদ করেন: পুরুষ তার পরিবার পরিজনের তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষক এবং তাদের সম্পর্কে তাকে জবাবদিহী করতে হবে। তেমনি নারী তার স্বামীর গৃহের রক্ষণাবেক্ষণাকরীণী এবং এই সম্পর্কে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।” (বুখারী) প্রাচীন সামাজে নারীর জন্য শিক্ষার দ্বার রুদ্ধ ছিল। নবী করীম (সা) প্রথমেই এদিকে মনোযোগ দান করেন। তিনি ইরশাদ করেন, “ইলম অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের ওপর ফরজ।” (বুখারী) তাই আমাকে একজন নারী কর্মী হিসাবে ইসলামী জ্ঞান (ইলম) অর্জন করতে হবে। ইসলাম সম্পর্কে জরুরী ইলম অর্জন না করলে কোন লোকই ইসলাম পালন করতে পারে না। ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করা সম্ভব হয় না। ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর প্রকৃত শিক্ষা এই যে, তা দ্বারা তাকে উৎকৃষ্ট স্ত্রী, উৎকৃষ্ট মাতা, এবং উৎকৃষ্ট গৃহিনীরূপে গড়ে তোলা হবে। যেহেতু আমার কর্মক্ষেত্র প্রধানত: গৃহ সেহেতু আমাকে এমন শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন যা এক্ষেত্রে আমাকে অধিকতর উপযোগী করে তুলতে পারে। উপরন্তু আমার জন্য ঐসকল জ্ঞানবিদ্যারও প্রয়োজন যা মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তুলতে, আমার চরিত্র গঠন করতে, দৃষ্টি ভঙ্গি প্রশস্ত করতে এবং আমাকে আমার অবস্থানে দৃঢ় আসন গড়ে নিতে সহায়তা করে। এই ধরনের শিক্ষা দীক্ষা প্রত্যেক নারীর জন্য অপরিহার্য। অতঃপর কোন নারী যদি অসাধারণ প্রজ্ঞা ও মানসিক যোগ্যতার অধিকারিণী হন এবং এই সকল শিক্ষা দীক্ষার পরও অন্যান্য জ্ঞান বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে চান, তাহলে ইসলাম তার পথে প্রতিবন্ধক হবে না। কিন্তু শর্ত এই যে, সে যেন শরীয়ত নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে। এভাবে নিজেকে একজন বোন, মেয়ে, মা ও স্ত্রী হিসেবে সকল ক্ষেত্রে সাফল্যের সাথে অবধান রাখতে হবে। যাতে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর আদর্শ সমাজের সকল ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করতে কোন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়। তার সাথে সাথে আমার এই শিক্ষাকে সমাজের অন্য নারীদের মাঝে প্রচার করেতে হবে যাতে করে সকল নারীই তার প্রাপ্য ইসলামের অধিকার ভোগ করতে পারে। এবং কোন নারী যেন অধিকারের নামে চতুর পুরুষের জালে আটকে পড়ে না যায় সে জন্য সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে। তা হলে নারী তার হারানো অধিকার আবার ফিরে পাবে ইনশাআল্লাহ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY