নবী পরিবারের পরিচয়

0
155

নবী পরিবারের পরিচয়

বংশ পরিচয়

নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধারাকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর এক অংশের নির্ভুলতার ব্যাপারে সীরাত রচয়িতা এবং বংশধারা বিশেষজ্ঞরা একমত। দ্বিতীয় অংশ সম্পর্কে সীরাত রচয়িতাদের মাঝে কিছু মতভেদ রয়েছে। কেউ নীরবতা অবলম্বন করেছেন, কেউ তা নির্ভুল হওয়ার প্রবনতা। এ অংশ আদনান থেকে ওপরের দিকে হযরত ইবরাহীম (আ.) পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। তৃতীয় অংশে নিশ্চিত কিছু ভুল রয়েছে, এটা হযরত ইবরাহীম (আ.) থেকে হযরত আদম (আ.) পর্যন্ত পৌছেছে। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে ইংগিত করা হয়েছে। নিচে উক্ত তিনটি অংশ সম্পর্কেই মোটামুটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাচ্ছে।

প্রথম অংশ

মহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোত্তালেব (শায়বা) ইবনে হাশেম (আমর) ইবনে আবদে মানাফ (মুগীরা) ইবনে কুসাই (যায়দ) ইবনে কেলাব ইবনে মোররা, ইবনে কা’ব ইবনে লুয়াই ইবনে গালেব ইবনে ফেহের (এর উপাধিই ছিলো কোরায়শ এবং তার প্রতি সম্বন্ধিত করেই কোরায়শ গোত্রকে কোরায়শ বলা হয়,) ইবনে মালেক ইবনে নযর (কায়স) ইবনে কেনানা ইবনে খোযায়মা ইবনে মোদরেকা (আমের) ইবনে ইলিয়াস ইবনে মোদার ইবনে নাযার ইবনে মায়া’দ ইবনে আদনান।১

দ্বিতীয় অংশ  

আদনান থেকে ওপরের দিকে- আদনান ইবনে উদ ইবনে হোমায়সা ইবনে সালামান ইবনে আওছ ইবনে বুয ইবনে কাময়াল ইবনে উবাই ইবনে আওয়াম ইবনে নাশেদ ইবনে হাজা ইবনে বালদাস ইবনে ইয়াদলাফ ইবনে তারেখ ইবনে জাহেম ইবনে নাহেশ ইবনে মাখী ইবনে আয়েয ইবনে আবকার ইবনে ওবায়দ ইবনে আদদায়া ইবনে হামদান ইবনে সুনবর ইবনে ইয়াসরেবী ইবনে ইয়াহয়ুন ইবনে ইয়ালহান ইবনে আরওয়া ইবনে ঈয ইবনে যায়শান ইবনে আয়সার ইবনে আফনাদ ইবনে আইহাম ইবনে মোকাসসের ইবনে নাহেছ ইবনে জারেহ ইবনে সুমাই ইবনে সেময়ী ইবনে আওযা ইবনে এরাম ইবনে কাইদার ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম (আ.)।

তৃতীয় অংশ

হযরত ইবরাহীম (আ.) থেকে ওপরের দিকে- ইবরাহীম ইবনে তারেখ (আযর) ইবনে নাহুব ইবনে ছারদা (সারুগ) ইবনে রাউ ইবনে ফালেখ ইবনে আবের ইবনে শালেখ ইবনে আরফাখশাদ ইবনে সাম ইবনে নূহ (আ.) ইবনে লামেক ইবনে মাতুশালাখ ইবনে আখনুখ (বলা হয়, আখনুকই হযরত ইদরিস আ.) ইবনে ইয়ারদ ইবনে মাহলায়েল ইবনে কায়নান ইবনে আনুশা ইবনে শীস ইবনে আদম (আ.)।

 

 

পারিবারিক পরিচয়

নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরদাদা হাশেম, ইবনে আবদে মানাফের পরিচয়ে হাশেমী বংশোদ্ভূত হিসাবে পরিচিত। কাজেই হাশেম এবং তার পরবর্তী কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা জরুরী।

এক. হাশেম – ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, বনু আবদে মানাফ এবং বনু আবদুদ দারের মধ্যে পদ বন্টনে সমঝোতা হয়েছিলো। এর প্রেক্ষিতে আবদে মানাফের বংশধররা হাজীদের পানি পান করানো এবং মেহমানদের আতিথেয়তার পদ লাভ করেন। হাশেম বিশিষ্ট সম্মানিত এবং সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনিই প্রথম মক্কার হাজীদের সুরুয়া রুটি খাওয়ানোর ব্যবস্থা চালু করেন। তার প্রকৃত নাম ছিলো আমর, কিন্ত রুটি ছিঁড়ে শুরবায় ভেজানোর কারণে তাকে বলা হতো হাশেম। হাশেম অর্থ হচ্ছে যিনি ভাথেন। হাশেমই প্রথম ব্যক্তি , যিনি কোরায়শদের গ্রীষ্ম এবং শীতে বছরে দু’বার বাণিজ্যিক সফরের ভিত্তি স্থাপন করেন। তার প্রশংসায় কবি বলেন-‘তিনি সেই আমর, যিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্বল স্বজাতিকে মক্কায় রুটি ভেথে ছিঁড়ে সুরুয়ায় ভিজিয়ে খাইয়েছিলেন এবং শীত ও গ্রীষ্মে দু’বার সফরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

হাশেম বা আমরের একটি গুরত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, তিনি ব্যবসায়ের কাজে সিরিয়া সফরে গিয়েছিলেন। পথে মদীনায় পৌঁছে বনী নাযার গোত্রের সালমা বিনতে আমরের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। গর্ভবতী অবস্থায় স্ত্রীকে পিত্রালয়ে রেখে তিনি সিরিয়ায় রওয়ানা হন এবং সেখানে গিয়ে ফিলিস্তিনের গাযা শহরে ইন্তেকাল করেন। এদিকে সালমার এক পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। এটা ৪৯৭ ঈসায়ী সালের ঘটনা। শিশুর মাথার চুলে ছিলো শুভ্রতার ছাপ, এ কারণে সালমা তার নাম রাখেন শায়বা।সালমা ইয়াসরেব বা মদীনায় তার পিত্রালয়েই সন্তান প্রতিপালন করেন। পরবর্তীকালে এ শিশুই আবদুল মোত্তালেব নামে পরিচিত হন। দীর্ঘকাল যাবত হাশেমী বংশের লোকেরা এ শিশুর জন্মের খবর জানতে পারেনি। হাশেমের মোট চার পুত্র ও পাঁচ কন্যা ছিলো। পুত্রদের নাম – আসাদ, আবু সায়ফী, নাযলা, আবদুল মোত্তালেব। আর কন্যাদের নাম হলো- শেফা, খালেদা, যঈফা, রোকায়া এবং জুন্নাহ।

দুই. আবদুল মোত্তালেব – ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, হাজীদের পানি পান করানো এবং মেহমানদারীর দায়িত্ব হাশেমের পর তার ভাই মোত্তালেব পেয়েছিলেন। তিনিও ছিলেন নিজ পরিবার ও কওমের মধ্যে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। তার কথা কেউ উপেক্ষা করতো না। দানশীলতার কারণে কোরায়শরা তাকে ‘ফাইয়ায’ উপাধি দিয়েছিলো। আবদুল মোত্তালেব-এর বয়স যখন দশ বারো বছর, তখন মোত্তালেব তার খবর পান। তিনি শায়বাকে নিয়ে আসার জন্যে রওয়ানা হন। মদীনা বা ইয়াসরেবের কাছাকাছি পেঁথছার পর শায়বার ওপর দৃষ্টি পড়তেই তার দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর নিজের উটের পেছনে বসিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হন, কিন্তু শায়বা তার মায়ের অনুমতি না নিয়ে মক্কায় যেতে অস্বীকার করেন। মোত্তালেব শায়বার মা সালমার কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তখন মোত্তালেব বললেন, ও তো তার পিতার হুকুমত এবং আল্লাহর হারেমের দিকে যাচ্ছে। একথা বলার পর সালমা অনুমতি দেন। মোত্তালেব তাকে নিজের উটের পেছনে বসিয়ে মক্কায় নিয়ে আসেন। মক্কায় নিয়ে আসার পর লোকেরা তাকে দেখে বলাবলি করতে লাগলো, এ তো আবদুল মোত্তালেব, অর্থাৎ মোত্তালেবের দাস। মোত্তালেব বললেন, না, না, এ তো আমার ভাই হাশেমের ছেলে। এরপর থেকে শায়বা মোত্তালেবের কাছে প্রতিপালিত হয়ে যেথবনে পদার্পণ করেন। পরবর্তীকালে মোত্তালেব ইয়েমেন দেশের রোমানে মারা যান এবং তার রেখে যাওয়া পদ শায়বা লাভ করেন। আবদুল মোত্তালেব স্বজাতির মধ্যে এতো বেশি সন্মান মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে, ইতিপূর্বে তার পিতৃপুরুষের কেউ এতোটা সন্মান মর্যাদালাভে সক্ষম হয়নি। স্বজাতির লোকেরা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালো বেসেছে এবং অভূতপূর্ব সন্মান দিয়েছে।

মোত্তালেবের মৃত্যুর পর নওফাল জোরপূর্বক আবদুল মোত্তালেবের আংগিনা দখল করে নেয়। আবদুল মোত্তালেব কোরায়শ বংশের কয়েকজন লোকের কাছে নওফালের বিরুদ্ধে সাহায্য চান, কিন্তু তারা এই বলে অক্ষমতা প্রকাশ করে, আমরা আপনার এবং আপনার চাচার বিরোধে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। অবশেষে আবদুল মোত্তালেব বনী নাথার গোত্রে তাঁর মামার কাছে কয়েকটি কবিতা লেখে পাঠান। সে কবিতায় সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছিলো। জবাবে তার মামা আবু সা’দ ইবনে আদী আশি জন সওয়ার নিয়ে রওয়ানা হয়ে মক্কার নিকটবর্তী আবতাহ নামক জায়গায় অবতরণ করেন। আবদুল মোত্তালেব সেখানেই মামার সাথে সাক্ষাত করে তাকে ঘরে যাওয়ার আমন্ত্রন জানান, কিন্তু আবু সা’দ বললেন, না, আমি আগে নওফালের সাথে দেখা করতে চাই। এরপর আবু সা’দ নওফালের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নওফাল এ সময় মক্কার কয়েকজন প্রবীণ কোরায়শের সাথে কাবার হাতিমে বসা ছিলেন। আবু সা’দ তলোয়ার কোষমুক্ত করে বললেন, এ ঘরের প্রভুর শপথ, যদি তুমি আমার ভাগ্নের জমি ফিরিয়ে না দাও তবে এ তলোয়ার তোমার দেহে ঢুকিয়ে দেবো। নওফাল বললেন, আচ্ছা নাও, আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি। আবু সা’দ প্রবীণ কোরায়শ ব্যাক্তিদের কয়েকজনের সাক্ষী রেখে আবদুল মোত্তালেবকে তার জমি ফিরিয়ে দেন। এরপর আবু সা’দ আবদুল মোত্তালেবের ঘরে যান এবং সেখানে তিন দিন অবস্থানের পর ওমরা পালন করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

এরপর নওফাল বনী হাশেমের বিরুদ্ধে বনী আবদে শামস সহায়তার অংগীকার করে। এদিকে বনু খোযায়া গোত্র লক্ষ্য করলো, বনু নাথার আবদুল মোত্তালেবকে সাহায্য করেছে। তখন তারা বললো, আবদুল মোত্তালেব যেমন তোমাদের সন্তান তেমনি আমাদেরও সন্তান। কাজেই তাকে সাহায্য করার অধিকার আমাদের অধিক। এর কারণ ছিলো, আবদে মানাফের মা বনু খোযায়া গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলো। এ কারণে বনু খোযায়া ‘দারুন নোদওয়ায়’ গিয়ে বনু আবদে শামস এবং বনু নওফালের বিরুদ্ধে বনু হাশেমকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। এ প্রতিশ্রুতিই পরবর্তী সময়ে ইসলামী যুগে মক্কা বিজয়ের কারণ হয়েছিলো। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে। কাবা ঘরের সাথে সম্পর্কিত থাকার কারণে আবদুল মোত্তালেবের সাথে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। একটি হচ্ছে যমযম কূপ খনন, অন্যটি হাতীর যুগের ঘটনা।

 

যমযম কূপ খনন

এ ঘটনার সারমর্ম হচ্ছে, আবদুল মোত্তালেব স্বপ্নে দেখলেন, তাকে যমযম কূপ খননের আদেশ দেয়া হচ্ছে। স্বপ্নে তাকে জায়গাও দেখিয়ে দেয়া হয়। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর তিনি যমযম কূপ খনন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে সে সব জিনিস আবিষ্কৃত হয়, বনু জোরহাম গোত্র মক্কা থেকে চলে যাওয়ার সময় এগুলো যমযম কূপে ফেলে গিয়েছিলো। তা হচ্ছে তলোয়ার, অলংকার এবং সোনার দু’টি হরিণ। আবদুল মোত্তালেব উদ্ধারক্রিত তলোয়ার দিয়ে কাবার দরোজা ঢালাই করেন। সোনার দু’টি হরিণও কাবার দরোজায় স্থাপন করেন এবং হাজীদের যমযম কূপের পানি পান করানোর ব্যবস্থা করেন।

যমযম কূপ প্রকাশিত হওয়ার পর কোরায়শরা আবদুল মোত্তালেবের সাথে ঝগড়া শুরু করে। তাদের দাবী, আমাদেরও খনন কাজে শরীক করতে হবে আবদুল মোত্তালেব বললেন, আমি সেটা করতে পারি না। আমাকেই এ কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, কিন্তু কোরায়শরা মানতে চাইলো না। অবশেষে ফয়সালার জন্যে সবাই বনু সা’দ গোত্রের এক জ্যোতিষী মহিলার কাছ গমন করে, কিন্তু  যাওয়ার পথে আল্লাহ তায়ালা তাদের এমন কিছু বিস্ময়কর নির্দশন দেখান যাতে তারা বুঝতে পারে, কুদরতীভাবেই যমযম কূপ খননের দায়িত্ব আবদুল মোত্তালেবকে দেয়া হয়েছে। তাই বিবাদকারী কোরাশয়রা পথ থেকেই ফিরে আসে। এ সময় আবদুল মোত্তালেব মানত করেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যদি তাকে দশটি পুত্র সন্তান দেন এবং তারা নিজেদের রক্ষার মতো বয়সে উপনীত হয়, তবে একজনকে কাবার পাশে আল্লাহর নামে কোরবানী করবেন।

 

হস্তী যুগের ঘটনা

হস্তি যুগের ঘটনার সারমর্ম হচ্ছে, আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর পক্ষ থেকে আবরাহা সাবাহ হাবশী ইয়েমেনের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত ছিলো। আবরাহা লক্ষ্য করলো, আরবের লোকেরা কাবা ঘরে হজ্জ পালনের জন্যে যাচ্ছে। এটা দেখে সে সানয়ায় একটি গির্জা তৈরী করে। সে চাচ্ছিলো, আরবের লোকেরা হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় না গিয়ে সানয়ায় যাবে। এ খবর জানার পর বনু কেনানা গোত্রের এক লোক রাতের বেলা আবরাহার নির্মিত গির্জার ভেতর প্রবেশ করে মেহরাবে মল ত্যাগ করে। আবরাহা এ খবর পেয়ে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে ষাট হাজার দুর্ধর্ষ সৈন্য নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংস করতে অগ্রসর হয়। নিজের জন্যে সে একটি বিশাল হাতীরও ব্যবস্থা করে তার বাহিনীতে মোট নয় বা তেরোটি হাতী ছিলো। আবরাহা ইয়েমেন থেকে মগাম্মাস নামক জায়গায় পৌঁছে সৈন্যদের বিন্যস্ত করে মক্কায় প্রবেশের উদ্দেশে অগ্রসর হয়। মোযদালাফা এবং মিনার মধ্যবর্তী মোহাস্সার প্রান্তরে পৌছলে আবরাহার হাতী বসে পড়ে। অনেক চেষ্টার পরও সেটিকে কাবার দিকে যাওয়ার জন্যে ওঠানো সম্ভব হয়নি। হাতীটিকে উত্তর, দক্ষিণ বা পূর্ব দিকে মুখ করালে উঠে দেথড়াতে শুরু করতো,  কিন্তু কাবার দিকে মুখ করলেই বসে পড়তো। এ সময় আল্লাহ তায়ালা এক পাল  পাখি প্রেরণ করেন। পাখিপাল আবরাহার সৈন্যদের ওপর ছোটো ছোটো পাথরকণা নিক্ষেপ করে। এ পাথরকণা যার ওপরই নিক্ষিপ্ত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা তাকে চর্বিত ঘাসের মতো করে দিয়েছেন। ছোট পাখিগুলো  চড়ুই পাখির মতো ছিল । প্রতিটি পাখি তিনটি পাথর বহন করছিলো। একটি মুখে, অন্য দু’টি দুই পাঞ্জায়। পাথরূলো ছিলো মটরশুঁটির মতো। যার গায়ে সে পাথর পড়তো, তার অথ প্রত্যথ খসে পড়তে শুরু করতো এবং সে মরে যেতো। প্রত্যেকের গায়ে এ পাথর পড়েনি, কিন্তু সেনাদলের মধ্যে এমন আতথ এবং বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ে যে, প্রত্যেকে অন্যকে পদদলিত ও উঠিপড়ি করে পালাতে শুরু করে। এরপর পলায়নরতরা পথে ঘাটে, এখানে সেখানে এবং কূপে পড়ে মরতে লাগলো। এদিকে আবরাহার ওপর আল্লাহ তায়ালা এমন গযব নাযিল করলেন যে, তার হাতের আথুলের কর খসে পড়তে থাকে। সানয়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে তার কলিজা ফেটে বাইরে এসে সে মারমান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করলো।

আবরাহার এ হামলার সময় মক্কার অধিবাসীরা প্রাণভয়ে গিরিপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং পাহাড় চূড়ায় গিয়ে আত্মগোপন করে। আবরাহার সেনাদলের ওপর আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হয়ে গেলে মক্কাবাসী নিশ্চিন্তে নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে আসে।

অধিকাংশ সীরাত রচয়িতার অভিমত অনুযায়ী উল্লিখিত ঘটনা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন দিন আগে মহররম মাসে, ৫৭১ ঈসায়ী সালের ফেব্রুয়ারীর শেষ বা মার্চের শুরুতে সংঘটিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী এবং তাঁর পবিত্র ঘর কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে ভূমিকাস্বরূপ এ ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। আপনারা বায়তুল মাকদেসকে দেখুন, স্বযুগে যা মুসলমানদের কেবলা এবং সেখানকার অধিবাসীরা মুসলমান ছিলো। তা সত্ত্বেও বায়তুল মাকদেসের ওপর আল্লাহ তায়ালার দুশমন মোশরেকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন ৫৮৭ খৃস্ট পূর্বাব্দে বখতে নসরের এর আগে ৭০ সালে রোমকদের বায়তুল মাকদেস অধিকার থেকে এ কথার প্রমাণ মেলে। পক্ষকান্তরে কাবার ওপর খৃস্টানরা কখনোই আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। অথচ সে সময় খৃস্টানরাই ছিলো আল্লাহ বিশ্ববাসী মুসলমান এবং কাবার অধিবাসীরা ছিলো মোশরেক।

হস্তীযুগের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তদানিন্তন উন্নত দেশ হিসাবে পরিচিত রোম এবং পারস্যে এ খবর পৌঁছে গিয়েছিলো। কেননা হাবশার সাথে রোমকদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক  ছিলো। অন্যদিকে সব সময় রোমকদের ওপর পারসিকদের নযর থাকতো। রোমক এবং তাদের সহযোগীদের যাবতীয় ঘটনা পারসিকরা পর্যবেক্ষণ করতো। তাই দেখা যায়, আবরাহার পতনের পর পরই পারস্যবাসী অতি দ্রুত ইয়েমেন দখল করে নেয়। যেহেতু পারস্য এবং রোমই তখন সভ্য দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতিনিধি ছিলো, তাই এ ঘটনায় বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কাবার প্রতি নিবদ্ধ  হয়। এ ঘটনায় তারা কাবা ঘরের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করে। তারা বুঝতে পারে, এ ঘরকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র ও সম্মানিত ঘর হিসাবে মনোনীত করেছেন। কাজেই মক্কার জনপদ থেকে নবুয়তের দাবীসহ কারো উত্থান আলোচ্য ঘটনা মোতাবেক সমীচীন হবে। আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞা ও কৌশলের ব্যাখ্যা তাই হবে, যা উপায় উপকরণের ঊর্ধ্বে ঈমানদারদের বিপরীতে মোশরেকদের সাহায্যের মাঝে নিহিত ছিলো।

আবদুল মোত্তালেবের দশ পুত্র ছিলো। তারা হলো: হারেস, যোবায়র, আবু তালেব, আব্দুল্লাহ  হামযা, আবু লাহাব, গায়দাক, মোকাওয়েম, সেফার এবং আব্বাস। কেউ কেউ এগারো জন বলেছেন। তারা একজনের নাম বলেছেন কাছম। কেউ তেরো জন বলেছেন। তারা একজনের নাম আবদুল কাবা এবং অন্যজনের নাম হোজাল বলেছেন, কিন্তু যারা আবদুল মোত্তালেবের দশ পুত্র সন্তানের প্রবক্তা, তারা বলেন, মোকাওয়েমের অপর নাম আবদুল কাবা আর গায়দাকের অপর নাম ছিলো হোজাল। কাছম নামে আবদুল মোত্তালেবের কোন পুত্র সন্তান ছিলো না। আবদুল মোত্তালেবের কন্যা ছিলো ছয় জন। তাদের নাম হলো-উম্মুল হাকিম (বায়যা), বাররা, আতেকা, সফিয়া, আরওয়া ও উমায়মা।

তিন. আবদুল্লাহ ছিলেন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা। তার মায়ের নাম ফাতেমা। তিনি ছিলেন আমর ইবনে আয়েয ইবনে এমরান ইবনে মাখযুম ইবনে ইয়াকযা ইবনে মোররার কন্যা। আবদুল মোত্তালেবের সন্তানদের মধ্যে আবদুল্লাহ ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন, সচ্চরিত্র এবং সর্বজনপ্রিয়। তাকে বলা হতো যবীহ (যবাইকৃত)। এরূপ বলার কারণ হচ্ছে, আবদুল মোত্তালেবের পুত্রদের সংখ্যা পুরোপুরি দশ এবং তারা নিজেদের রক্ষায় সমর্থ হওয়ার মতো বয়সে উন্নীত হওয়ার পর তিনি তাদের নিজের মানতের কথা জানান। সবাই তার কথা মেনে নেন। এরপর আবদুল মোত্তালেব ভাগ্য পরীক্ষার তীরের গায়ে তাদের সকলের নাম লিখে হোবল মূর্তির তত্ত্বাবধায়কের হাতে দেন। তত্ত্বাবধায়ক লটারি করলে আবদুল্লাহর নাম ওঠে। আবদুল মোত্তালেব আবদুল্লাহর হাত ধরেন ছুরি নিয়ে নেন এবং তাকে জবাই করতে কাবা ঘরের পাশে নিয়ে যান, কিন্তু সকল কোরায়শ  বিশেষত আবদুল্লাহর ভাই আবু তালেব বাধা দেন। আবদুল মোত্তালেব বললেন, তোমরা যদি বাধা দাও তবে আমি মানত পূর্ণ করবো কিভাবে? তারা পরামর্শ দিলেন, আপনি কোন মহিলা সাধকের কাছে গিয়ে এর সমাধান চান। আবদুল মোত্তালেব এক মহিলা সাধকের কাছে গেলেন। সেই সাধক আবদুল্লাহ এবং দশটি উটের নাম লিখে লটারি করার পরামর্শ দেন। তবে বললেন, যদি আবদুল্লাহর নাম না ওঠে তবে দশটি করে উট বাড়াতে থাকবেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ  খুশি না হন। এরপর যতোটি উটের নাম লটারিতে ওঠবে ততোটি জবাই করবেন। আবদুল মোত্তালেব ফিরে গিয়ে লটারি শুরু করেন। প্রথম দশটিতে আবদুল্লাহর নাম এলো না। এরপর দশটি করে বাড়াতে লাগলেন। একশ উট হওয়ার পর আবদুল্লাহর নাম ওঠে। এরপর আবদুল মোত্তালেব একশ উট জবাই করে সেখানেই ফেলে রাখেন। মানুষ পশু কারো জন্যে তাতে বাধা ছিলো না। এ ঘটনার আগ পর্যন্ত কোরায়শ এবং আরবদের মধ্যে র৩পণের পরিমাণ ছিলো দশটি উট, কিন্তু এ ঘটনার পর সে পরিমাণ বাড়িয়ে একশ উট করা হয়। ইসলামও এ পরিমাণ যথারীতি বহাল রাখে। নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি দুই যবীহের সন্তান। একজন হযরত ইসমাঈল (আ.) অন্যজন আমার পিতা আবদুল্লাহ।১১

আবদুল মোত্তালেব তার পুত্র আব্দুল্লাহর বিয়ের জন্যে আমেনাকে মনোনীত করেন। আমেনা ছিলেন ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফ ইবনে যোহরা ইবনে কেলাবের কন্যা। তারা বংশ মর্যাদায় কোরায়শদের মধ্যে সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হতো। আমেনার পিতা বংশ মর্যাদা এবং আিভজাত্যে বনু যোহরা গোত্রের সর্দার ছিলেন। বিয়ের পর আমেনা পিত্রালয় থেকে বিদায় নিয়ে মক্কায় স্বামীগৃহে চলে আসেন। কিছুদিন পর আবদুল মোত্তালেব আব্দুল্লাহকে খেজুর আনতে মদীনায় পাঠালে তিনি সেখানে ইন্তেকাল করেন।

কোন কোন সীরাতকার বলেন, আবদুল্লাহ ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। কোরায়শদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সাথে মক্কায় ফিরে আসার সময় অসুস্থ হয়ে মদীনায় অবতরণ করে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। নাবেগা জাদীর বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। সে সময় তাঁর বয়স ছিলো পঁচিশ বছর। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে রসূল (স.) তখনো জন্ম গ্রহণ করেননি। অবশ্য কিছু কিছু সীরাতকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তাঁর পিতার ইন্তেকাল দু’মাস আগে হয়েছিলো।

স্বামীর মৃত্যু সংবাদ মক্কা শরীফে পৌছার পর আমেনা বেদনামথিত কণ্ঠে শোকগাঁথা আবৃত্তি করেন-

‘বাতহার কোল হাশেমের বংশধর থেকে খালি হয়ে গেছে। শোরগোল আর হৈ-চৈয়ের মাঝখানে তিনি এক কবরে নিদ্রামগ্ন রয়েছেন। মৃত্যু তাকে ডাক দিয়েছে আর তিনি হাযির বলে সে ডাকে সাড়া দিয়েছেন। মৃত্যু এখন ইবনে হাশেমের মতো কোন লোক রেখে যায়নি। কতো দুঃখজনক ছিলো সে সন্ধ্যা, যে সংন্ধ্যায় তাঁকে লোকেরা খাটিয়ায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। মৃত্যু যদিও তার অস্তিত্ব মুছে দিয়েছে, কিন্তু তার কীর্তি মুছে দিতে পারবে না। তিনি ছিলেন বড়ো দাতা এবং দয়ালু।

মৃত্যুকালে তিনি পাঁচটি উট, এক পাল বকরী, বরকত নামের এক হাবশী দাসী রেখে যায়। যার নাম বরকত, কুনিয়ত উম্মে আয়মান। উম্মে আয়মান রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধ খাইয়েছিলেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY