অমুসলিমদের অন্তরে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা

0
99

অমুসলিমদের অন্তরে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা
ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রা.) শেরেক ও মূর্তিপূজার জালে আবদ্ধ ছিলেন। তিনি ছিলেন ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন দলের অন্তর্ভুক্ত। এ সময় তিনি ইসলাম এবং ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কার্যক্রম, রীতিনীতির কোনোটাকেই ভালো নযরে দেখতেন না। তাকে কোরায়শের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে মান্য করা হতো। অথচ তাজ্জবের বিষয়, হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর ভালোবাসায় ছিলেন বিভোর।
হাদীস ও ইতিহাসবেত্তা হযরত ইবনে আসাকের (র.) স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে যোবায়র ইবনে বাক্কার (রা.)-এর সূত্রে উল্লেখ করেন, এক সময় নির্দয় যালেম কাফেররা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর গোত্র বনী হাশেমকে সম্পূর্ণ বয়কট করে পাহাড়ী উপত্যকায় আবদ্ধ করে তাদের কাছে খাদ্য পানীয় পৌঁছার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলো। এ বয়কটের সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের গাছের পাতা খেয়ে দিনাতিপাতের ঘটনাও ঘটে। এ সময় নিজের বংশ, গোত্র ও সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের জন্যে খাদ্য পানীয় পাঠায় এমন বুকের পাটা কার, কিন্তু হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) অবরুদ্ধ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে খাদ্যশস্য পৌঁছানের একটা পন্থা উদ্ভাবন করেন। পন্থাটি হচ্ছে, তাঁর ব্যবসায়ী কাফেলা যখন গম নিয়ে শাম (সিরিয়া) থেকে আসতো, তখন যেসব উট ও গাধার পিঠে গমের বোঝা থাকতো, সেগুলোকে উক্ত পাহাড়ী উপত্যকার প্রবেশপথে নিয়ে তিনি পেটাতে শুরু করতেন। এমনভাবে পেটাতেন যে, গমবাহী উট ও গাধাগুলো ভেগে গিয়ে পাহাড়ী উপত্যকায় পৌঁছে যেতো, আর এ সুযোগে বনী হাশেমের লোকেরা সেগুলো ধরে তাদের পিঠ থেকে খাদ্যশস্য নামিয়ে নিতেন।
হযরত ইমাম আহমদ (র.) বর্ণনা করেন, হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রা.) বলতেন, জাহেলিয়াতের যুগেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিলো অনেক বেশী। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হিজরত করে যখন মদীনায় উপনীত হন, তখন হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রা.) হজ্জের মওসুমে হজ্জ আদায় করছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, আরবের সুপ্রসিদ্ধ বাদশাহ যী-ইয়াযানের একটি চোগা বাজারে বিক্রী হচ্ছে। তিনি যদিও তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার প্রেরণা তাকে বাধ্য করলো, বাদশাহ যী-ইয়াযানের এ মূল্যবান সুন্দর চোগাটি তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে হাদিয়া দেবেন। তিনি চড়া মূল্যে চোগাটি কিনে মদীনার উদ্দেশে যাত্রা করেন, এক সময় তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপনীত হলেন। খেদমতে উপনীত হয়ে তিনি নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! এ চোগাটি আমার থেকে হাদিয়ারূপে গ্রহণ করুন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কখনও কখনও কাফেরের হাদিয়াও গ্রহণ করতেন। নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে এর প্রমাণ রয়েছে। এ েেত্র হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রা.)-এর ভালোবাসা দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে, সম্ভবত হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করবেন। তিনি এরশাদ করলেন, আমি মোশরেকদের হাদিয়া গ্রহণ করি না। অবশ্য আপনি চাইলে আমি মূল্য পরিশোধ করে এ চোগা নিতে পারি।
এক বর্ণনায় আছে, হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমার হাদিয়া ফেরত দেয়ায় আমি কঠোর অস্থিরতায় নিপতিত হই। তাঁর থেকে মূল্য গ্রহণ করে হাদিয়াটা তাঁকে দেয়াও আমার পছন্দের বিষয় ছিলো না। তাই আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দরবার থেকে এ দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উঠি, সর্বপ্রথম যার সাথে দেখা হবে তার কাছেই আমি চোগাটি বিক্রি করবো। এতে দাম যতো কমই হোক। ওদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হযরত যায়দ বিন হারেসা (রা.)-কে গোপনে আমার পেছনে লাগিয়ে দেন। তাকে বলে দিলেন, হাকীম চোগাটি বেচতে চাইলে তুমি কিনে নেবে। হযরত যায়দ বিন হারেসা (রা.) আমার বিক্রি করা চোগাটি রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের জন্যে কিনে নেন। এ ঘটনার পর যখন আমি চোগাটি তাঁর দেহে সুশোভিত দেখতে পাই, তখন আমার আনন্দের আর কোনো সীমা থাকেনি। কেননা, এতে একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন এ চোগাটি পরিধান করতেন, তখন আমার তাঁকে দুনিয়ার সবচাইতে সৌন্দর্যমণ্ডিত মানুষ বলে মনে হতো। (তারীখে ইবনে আসাকের, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৫; লেগায়াহ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৬)
বদর যুদ্ধের সময়ও হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) নিজের স্বজাতিকে রসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সাথে যুদ্ধ থেকে ফেরানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ওতবা বিন রবিয়াকে অনেকটা নিজের সমমনা করেও ফেলেছিলেন, কিন্তু এ যুদ্ধে আবু জাহলের ভাগ্যলিপিতে মৃত্যু লেখা ছিলো, তাই যুদ্ধ বন্ধের কোনো প্রচেষ্টাই সে কার্যকর হতে দেয়নি। (তারীখে ইবনে আসাকের, চতুর্খ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪)
হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) জাহেলী যুগে কুফুরের অবস্থায়ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করতেন, যেমনটা আগের ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয়। তবে ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তখনও তাঁর অন্তর পুরোপুরি প্রশস্ত এবং আশ্বস্ত হয়নি। তাই নবম হিজরী সন পর্যন্ত নিজের পিতৃপুরুষের ধর্মের ওপরই তিনি স্থির থাকেন। অনন্তর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামও তাঁর সত্যনিষ্ঠ ভালোবাসার কারণে আন্তরিকভাবে এ বাসনা পোষণ করতেন, যেন হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করে সৌভাগ্যশালী হন এবং কুফুর ও শেরেকের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মক্কা মোকাররামার নিকটবর্তী হয়ে আমাকে বললেন, মক্কা শরীফে এমন চার ব্যক্তি রয়েছে, যাদের শেরেকে জড়িয়ে থাকা আমার কাছে অত্যন্ত কষ্টকর এবং অপসন্দনীয়। আমার আন্তরিক কামনা, তারা মুসলমান হয়ে যাক। আমি নিবেদন করলাম ইয়া রসূলাল্লাহ! সে চার ব্যক্তি কারা ? তিনি এরশাদ করলেন, সে চার ব্যক্তি হচ্ছে-
(১) এতাব বিন ওসায়দ, (২) জোবায়র বিন মোতয়েম, (৩) হাকীম বিন হেযাম, (৪) সাহল বিন ওমর। মহান আল্লাহ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাসনা পূর্ণ করে দেন। এ চার জনই ইসলাম গ্রহণ করেন।
সারকথা হচ্ছে, যতোণ পর্যন্ত ইসলাম এবং ইসলামের শিার সত্যতা সম্পর্কে হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-এর অন্তর পূর্ণরূপে আশ্বস্ত হয়নি, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আন্তরিক প্রীতি ভালোবাসা পোষণ সত্ত্বেও ততোণ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। আর যখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করলেন এবং তিনি তাওহীদের স্বাদ আস্বাদন করেন, তখন বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের জন্যে ততোদিন পর্যন্তই দুখ প্রকাশ করতে থাকেন।
একদিন দেখা গেলো, হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) অঝোরে কাঁদছেন। তাঁর মেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আব্বা! আপনি এমন অঝোরে কাঁদছেন কেন ? তিনি বললেন, আমার সকল কর্মতৎপরতাই হচ্ছে কান্নার উপযোগী। আমি ইসলাম গ্রহণে এতোটা বিলম্ব করে ফেলেছি যে, বড়ো বড়ো যুদ্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সাথে শরীক থাকার সুযোগ আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলাম সম্পর্কে আমার অন্তর পূর্ণ প্রশস্ত হয়নি।
(তারীখে ইবনে আসাকের, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৭)
কোথায় সে মিথ্যারোপকারী যালেম, যে প্রচার করে বেড়ায়,ইসলাম তরবারির জোরে প্রসার লাভ করেছে? সে মিথ্যারোপকারী যালেম হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-কে গিয়ে জিজ্ঞেস করুক, কোন্ তরবারি তাঁকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে।
মক্কা বিজয়কালে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হবার পর পরই হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.) রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়া সাল্লামের সাথে হোনায়নের জেহাদে শরীক হন। একবার তাঁর আর্থিক প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সমীপে তাঁকে কিছু আর্থিক অনুদান প্রদানের আবেদন করেন। তাঁর আবেদনক্রমে সে যাত্রা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁকে কিছু আর্থিক অনুদানও প্রদান করেন। পরবর্তীতে আবার এমন অবস্থা দেখা দিলে তিনি পুনরায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কাছে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। এবারও তিনি হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-কে দান করলেন বটে, তবে সাথে সাথে উপদেশ দিলেন-
এ ধন সম্পদ হামেশাই মনোলোভা এবং মিষ্ট। যে তা পরাক্সমুখ হয়ে গ্রহণ করে তার তাতে বরকত হয়, আর যে মানসিক কামনা-বাসনা আর লোলুপতার সাথে তা গ্রহণ করে, তাতে তার কোনো বরকত হয় না। তার অবস্থা দাঁড়ায় সে ব্যক্তির মতো, যে খায় অথচ তার উদরপূর্তি হয় না। মনে রেখো, দাতার হাত গ্রহীতার হাত থেকে উত্তম। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এ উপদেশ চিরকালের জন্যে নিজের কণ্ঠহার বানিয়ে নেন। নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আপনার পরে আমি আর কাউকে আমাকে কিছু দেয়ার কষ্টে ফেলবো না। এর পর তিনি গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) মাল থেকেও নিজের নির্ধারিত অংশ গ্রহণ করেননি। হযরত সিদ্দীকে আকবর ও হযরত ওমর (রা.) গনীমতের মালের অংশ হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-কে দিতে চাইতেন, কিন্তু তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপদেশ সম্বলিত উল্লিখিত হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে গনীমতের মাল থেকে নিজের অংশ গ্রহণে অমতা প্রকাশ করতেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY