আমাদের সমাজ ও নীতিবোধ

0
150

 

নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে সমাজে আজকাল আর তেমন কেউ কথাবার্তা বলেন না। বলেন না মানে বলতে চান না। কেউ মনে করেন, বলে কোনো লাভ নেই, কিছুই হয় না, আবার কেউ মনে করেন ওসব বললে সমাজে নীতিহীনতার সয়লাব বরং আরো বাড়ে। এ উভয়বিধ দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজে নীতি নৈতিকতার কথা বলাটা ইদানিং অনেকটা প্রথাসর্বস্ব ব্যাপারে পরিণত হয়ে পড়েছে। সমাজের যুব চরিত্রের অবয় নিয়ে এরপরও আমরা যারা আমাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করি, কিছুটা অন্তত বলাবলি করতে চাই, তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম। সমাজের বিপুল মানবগোষ্ঠীর মাঝে আমরা কিছু সংখ্যক মানুষ যারা এখনো ভাবি, এখনো আশা করি সমাজের একটা ব্যাপক পরিবর্তন হোক, তাদের নিয়েই যতো ভাবনা। আমরা চোখ বুজে বসে থাকতে চাই না, আবার মুখ ফুটে কিছু বলতে যেয়েও কেন যেন সার্থকভাবে তা বলতে পারি না।

আজ সমাজের এ চেহারা কেন হলো? এ কথার জবাব আমি কেন কেউই দিতে পারবে না। কারণ, এটা বিজ্ঞজনদের ব্যাপার। আমি শুধু বুঝি, সমাজের যুব চরিত্র বিনষ্ট হয়ে গেছে। সমাজ এখন আর যুবকদের কাছে তেমন কিছুই আশা করে না। যে দেশ, যে সমাজের জন্যে যুব গোষ্ঠী বিপুল অবদান যোগাতে পারতো, তাদের ব্যাপারে আজ গোটা জাতিরই রয়েছে একটা দুঃখজনক অনীহা। অথচ আমরা চাই এ অবস্থার অবসান হোক। কারণ, কোনো সুস্থ সামাজিক পরিসরেই এ অবস্থাকে বেশীদিন চলতে দেয়া যায় না। কিন্তু আমরা না চাইলেই কি? সমাজে কোনো কিছুর চলা না চলা আমাদের চাওয়া না চাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং ত্রে বিশেষে আমাদের চলা না চলাটাই অন্যদের চাওয়া না চাওয়ার ওপর নির্ভর করে।

আসলে আমরা সবাই এক নিদারুণ বৈপরিত্বের ব্যাধিতে ভুগছি। আমরা যুবকদের কাছ থেকে সুষ্ঠু মানবিক চরিত্র আশা করি, অথচ চরিত্র বিধ্বংসী যাবতীয় উপায়-উপকরণকে সমাজে নির্বিবাদে চালু করে রেখেছি। আমরা মনে করি, এসব কিছুর বর্তমান থাকা অবস্থায়ও একটি যুবককে চরিত্রবান হওয়া উচিৎ। চরিত্র বিধ্বংসী অশ্লীলতা ও নগ্নতাকে সমাজে অবাধে চলার অনুমতি আমরাই দিয়ে রেখেছি। আমরাই যুবকদের দেশী বিদেশী অশ্লীল বই পুস্তক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির জোয়ারে ভাসতে দিয়েছি। আমরাই তাদের জন্যে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘অনলি ফর এ্যাডাল্ট’ ছায়াছবি আমদানী করে তাদের দেখতে দিচ্ছি। আমরাই সহশিার আড়ালে উঠতি বয়সের কিশোরী ও যুবতীদের এক সাথে অবাধ ও নির্বঘ্ন  চলার অনুমতি দিয়েছি। মাত্র কয়েক ঘন্টার সামান্য একটি চ্যানেলের অনুমতি দিতে না পারলেও ডজনে ডজনে স্যাটালাইট চ্যানেলের অনুমতি দিয়ে বিশ্ব বেহায়াদের সম্মেলন ঘটিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা যুবকতের তা দেখার সুযোগ করে দিচ্ছি। আমরা অবশ্য এসব কিছু করেছি প্রগতির স্বার্থে। প্রগতি ও উন্নতির এ লীলা নিকেতন তৈরী করে আমরা তাদের কাছ থেকে আবার নৈতিক গুণাবলীর বিকাশ আশা করি।

অন্যায় করা যতো বড়ো অপরাধ অন্যায়ের পথে ঠেলে দিয়ে কারো কাছ থেকে ন্যায়ের আশা করা সম্ভবত তার চেয়েও বড়ো অপরাধ। বলতে দ্বিধা নেই, আমরা সবাই আজ এই অপরাধে কম বেশী অপরাধী। আমরা রাজ পথে বিশাল গর্ত খুঁড়ে নিরীহ পথচারীকে তাতে স্বজোরে ধাক্কা দিয়ে বলি-খবরদার, গর্তে পড়বেন না। জানি না এতো বড়ো বৈপরিত্য বা মোনাফেকী নিয়ে পৃথিবীতে আমরা কি করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো?

আমরা যুবক যুবতীদের জন্যে যে ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছি, তা আরেক দুর্ভেদ্য রহস্য। শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে আমরা মাষ্টার্স পর্যন্ত কোথাও তাকে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দেই না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী অনেক কিছুই তাকে পড়তে বাধ্য করি। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীতেই তাকে শিখিয়েছি এক সের দুধের সাথে একপোয়া পানি মেশাবার তথাকথিত লাভজনক ফর্মূলা। পরবর্তীকালে সে যখন বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভেজালের কারবার করে তখন আমরা বিব্রত বোধ করি। অথচ আমরা কেউ ভেবে দেখি না যে, দিনে দিনে আলো- বায়ু দিয়ে যত্ন করে যে মাকাল ফলের গাছ বড়ো করেছি, তা হঠাৎ করে একদিন আমাদের মুখে কাঁঠাল তুলে দিতে পারবে না।

বাইরের পৃথিবীর ব্যাপারে একথাগুলো আমরা ভালোই বুঝি, কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবে যখন আসি তখন কেন যেন এগুলো আর বুঝতে চাই না। নতুবা একটি শিশু-কিশোরকে সারা জীবন ধরে চরিত্র বিধ্বংসী অন্যায় অনাচারের ট্রেনিং দিয়ে তার কাছ থেকে আমরা কি করে হঠাৎ একদিন ভালো চরিত্র আশা করি? আমাদের এ দুঃখজনক বৈপরিত্যের কারণেই জাতীয় জীবনে যুব সমাজ কোনোদিনই তাদের ভালো চরিত্রের প্রদর্শন করতে পারেনি।

অনেক আশা ভরসা করেই আমরা দেশের পরিবর্তন আনয়ন করেছিলাম। অনেক প্রাণও এ জন্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। মনে করেছিলাম আমরা স্বাধীনতা পাবো, খেয়ে পরে সুখে থাকবো। ছেলে-মেয়েরা মানুষ হবে। কিন্তু আজ হিসাব করুন, কী চেয়ে কী পেলাম। পত্রিকা খুলতেই আজ চোখে পড়ে অমুক কোম্পানীর অত লাখ টাকা নিয়ে অমুক কর্মচারী উধাও হয়েছে, অথবা ভুয়া চেক দিয়ে কোনো লোক কোনো প্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ টাকার মালামাল নিয়ে সরে পড়েছে, নয়তো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কেউ মেরে দিয়েছে কারো লাখ লাখ টাকা। এভাবে ফিরিস্তি দিতে গেলে দু’ পাঁচ শ’ পৃষ্ঠা কাগজেও তা শেষ হবে না। এই ফিরিস্তি দিয়ে লাভ নেই। ওতো অল্প বিস্তর আপনি আমি সবাই জানি। তার চেয়ে আসুন ভিন্ন কথা বলি।

দেশের যুব মানসে আজ যে অপরাধ প্রবণতা মর্মান্তিকভাবে বেড়ে চলেছে তার ইতি কোথায়? এই প্রবণতা আমাদের যুব গোষ্ঠিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমাদের যাদের হাতে সমাজ পরিচালনার চাবিকাঠি আছে তারা কয়জন এসব সমস্যার কথা ভাবি? আমরা বয়স্করাই যেন আজ সর্বাধিক ব্যাধিতে আক্রান্ত।

আপনি বলবেন কী সেই ব্যাধি? আসলে আমাদের সেই সামগ্রিক ব্যাধি হচ্ছে নৈরাশ্য। সব কাজে একটা নিদারুণ হতাশা, অপর কথায় ‘কিছুই হবে না’ এমন একটা ভাব। যখনি কোনো অন্যায় কাজের প্রতিরোধ ও ন্যায় কাজের প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, তখনই আমাদের মনমানসে সে নৈরাশ্যবাদীতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমরা ভাবি এ করে কী হবে? আমাদের চেষ্টায় কি অমুক ন্যায় কাজটি প্রতিষ্ঠা লাভ করবে? না, অমুক অন্যায়েরই নির্মূল করা সম্ভব হবে, আর কোনো জাতির বৃহত্তর অংশ যখন এই মানসিক ব্যাধিতে ভোগে তখন সে জাতির কিছুতেই মুক্তি আসতে পারে না। মুক্তির প্রত্যাশা করলে সবাইকে আবার নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে উৎসাহী ও আস্থাবান হতে হবে।

এবার আসুন জাতি হিসেবে আমরা আমাদের এই নৈরাশ্যবাদী মানসিকতার উৎস খুঁজে দেখি। কারণ, আজ যে অধপতন আমাদের জীবনকে বিষবাস্পের মতো ছেয়ে দিয়েছে তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দিনে দিনে, বছরে বছরে আমাদের যুব মানসে এই অধপতন তার অশুভ বীজ বপন করেছে। আসলে এর সব দোষ কিন্তু আমাদের বড়োদেরই। আমরা আমাদের যুবকদের স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে চলার সুযোগ দিয়েছি। আমরা মনে করেছি, যদি আজ উচ্ছৃংখল ও অন্যায় কাজের সুযোগ এদের না দেই, তবে দুদিন পর এরা আমাদেরকে রাজনীতির ময়দান দখল করার ব্যাপারে সাহায্য করবে কি করে? নিজেদের ভবিষ্যত নিরাপদ করার জন্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা যুব গোষ্ঠীকে আইন মানায় অভ্যস্থ তথা সুনাগরিক হয়ে থাকার অনুপ্রেরণা দেইনি। দেশের যুব মনে আজ যে অপরাধ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার উৎসও কিন্তু এখানে। জানি না, আমাদের সমাজপতিরা এসব কথা ভেবে দেখেন কিনা। তবে একথা সত্য যে, আমাদের সৃজনশীল যুব গোষ্ঠীকে সঠিক পথে আনতে হলে তাদের মূল থেকেই সংশোধন করতে হবে। রোগীর দেহে যখন রোগ প্রবলবেগে আক্রমণ করে তখন কোনো ডাক্তারই তাকে সাধারণ টেবলেট খেতে বলেন না। কারণ; কোনো স্থুল চিকিৎসা তখন আর কাজে আসে না। জাতি আজ যে সামগ্রিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, তার প্রতিকার দু’একটি স্থুল চিকিৎসা দ্বারা সম্ভব হবে না। বরং এতে রোগ আরো বেড়ে যাবে। আমাদের যুব কিশোরদের যদি আমরা দেশের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির কাজে লাগাতে চাই, তাহলে আমাদের ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক একথাগুলো অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY